রুকইয়াহ ও তাবিজ: দ্বীন বনাম মানবিক অভিজ্ঞতা
বর্তমান সময়ে ‘রুকইয়াহ শরইয়্যাহ’ নামে একটি চর্চা আমোদের দেশে ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করেছে। এর পাশাপাশি তাবিজ, ঝাড়ফুঁক, বিভিন্ন দোয়া-দরুদ কিংবা নির্দিষ্ট সূরা-আয়াত বা আল্লাহর নাম নির্দিষ্ট সংখ্যায় পাঠ করে রোগমুক্তি, রিজিক বৃদ্ধি, বিয়ে, ব্যবসার উন্নতি, জিন-জাদু ও বদনজর থেকে মুক্তিসহ নানা পার্থিব উপকার লাভের বিশ্বাসও দীর্ঘদিন ধরে সমাজে প্রচলিত। প্রশ্ন হলো—এটা কি দ্বীনের সাথে সম্পর্কিত বিষয়, নাকি মানুষের অভিজ্ঞতাভিত্তিক একটি চর্চা? এ দুটি বিষয়কে পৃথকভাবে বোঝা অত্যন্ত জরুরি।
ইসলামের মৌলিক শিক্ষা হলো, মানুষ বিপদ-আপদে একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইবে, তাঁর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করবে এবং আল্লাহ প্রদত্ত বৈধ উপায় অবলম্বন করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ
“সবর ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো।” (সূরা বাকারা ২:৪৫)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি বিভিন্ন সময়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন, অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য দোয়া করেছেন এবং কখনো হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে হাত শরীরে বুলিয়ে নিয়েছেন। এটাও মূলত দোয়ার একটি পদ্ধতি।
কিন্তু ‘রুকইয়াহ শরইয়্যাহ’ বা ঝাড়ফুঁক ও তাবিজ নামে যেভাবে একটি বিশেষ চিকিৎসা-পদ্ধতির চর্চা রয়েছে, কিংবা এর মাধ্যমে জিন, জাদু, বদনজর, মানসিক ও শারীরিক রোগের নিরাময়ের ব্যাপক দাবি করা হয়, তার সাথে দ্বীনের কোনো সম্পর্ক নেই। ঝাড়ফুঁক ও তাবিজ মূলত মানবীয় অভিজ্ঞতাভিত্তিক একটি চর্চা। এই অভিজ্ঞতাভিত্তিক চর্চা শুধু মুসলমানদের মধ্যেই নয়; অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও দেখা যায়। দ্বীন কোনো চিকিৎসা-পদ্ধতি দেওয়ার জন্য আসেনি, বরং দ্বীন এসেছে পরকালে সফলতা লাভের জন্য এই দুনিয়ার জীবনে মানুষ কীভাবে নিজেকে সব দিক থেকে পরিশুদ্ধ করতে পারে, তার নির্দেশনা দেওয়ার জন্য।
দ্বীন এ ক্ষেত্রে একটা কথাই বলেছে—কোনো অবস্থাতেই শিরকের উপাদান থাকা চলবে না। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
اعْرِضُوا عَلَيَّ رُقَاكُمْ، لَا بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ
“তোমরা তোমাদের ঝাড়ফুঁক আমার সামনে পেশ করো। ঝাড়ফুঁকে কোনো শিরক না থাকলে তাতে কোনো অসুবিধা নেই।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২০০)
অতএব, ইসলামের দৃষ্টিতে দোয়া, বৈধ উপায় অবলম্বন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই মূল শিক্ষা। আর মানুষের অভিজ্ঞতাভিত্তিক কোনো পদ্ধতি যদি শিরকমুক্ত হয়, তবে সেটিকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখা যেতে পারে; কিন্তু কখনোই দ্বীনের বিষয় মনে করার সুযোগ নেই। তাবিজ, ঝাড়ফুঁক কিংবা ‘রুকইয়াহ শরইয়্যাহ’—সবকিছুকেই এই একই নীতির আলোকে বিচার করা উচিত। দ্বীনের শিক্ষা এবং মানুষের অভিজ্ঞতাভিত্তিক চর্চাকে একাকার না করে, প্রত্যেকটিকে তার নিজস্ব অবস্থানে রাখা জরুরি।
তবে এখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সীমানা পাড়ি দিয়ে এটি এখনও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। মানুষের অভিজ্ঞতা বিভিন্ন কারণে ভুল হতে পারে। হয়তো বা অন্য কোনো কারণে উপকার হয়েছে, কিন্তু মানুষ ভুল করে এটাকেই উপকারের কারণ মনে করেছে। তাছাড়া বর্তমানে রুকইয়াহ, ঝাড়ফুঁক ও তাবিজের নামে যারা দোকান খুলে বসে আছে, তাদের প্রায় সবাই ধান্দাবাজ। বিভিন্ন উপায়ে তারা মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে অর্থ উপার্জন করে। তাই ইসলাম আমাদেরকে যে সতর্কতা অবলম্বনের শিক্ষা দেয়, তার দাবি হলো এই অপ্রমাণিত অভিজ্ঞতা ও প্রতারণার ফাঁদ থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকা এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত চিকিৎসা-পদ্ধতি গ্রহণ করা।





