ধর্ম ও জ্ঞান : জ্ঞান ও যুক্তি-প্রমাণ
জাভেদ আহমেদ গামিদি، ইমদাদ হোসেন
মানুষের জন্য তার জ্ঞানের বিষয়বস্তু কেবল দুটি জিনিসই হতে পারে:
এক : নফস (সত্তা) এবং
দুই : পদার্থ।
এরপর এগুলোর বহিঃপ্রকাশ নিয়ে চিন্তা করলে সেগুলোও কেবল দুটি রূপেই প্রকাশিত হয়:
এক : বস্তু এবং
দুই : তাতে শক্তির প্রকাশ।
নাম (বিশেষ্য) ও ক্রিয়ার শব্দগুলো দুনিয়ার সমস্ত ভাষায় এই বাস্তবতাই বর্ণনা করে এবং এই ভিত্তিতেই তাদের ব্যাকরণের ভিত প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলো বোঝার জন্য যে সক্ষমতা মানুষকে দান করা হয়েছে, তাকে আমরা বুদ্ধি-বিবেক (আকল) বলি। এটাই মানুষের আসল শ্রেষ্ঠত্ব। নফস ও পদার্থ — উভয় পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য যে মাধ্যমগুলো মানুষের আয়ত্তে আছে, সেগুলোকে ইন্দ্রিয় বলে। বুদ্ধির জন্য এগুলোর মর্যাদা যেন জ্ঞানের প্রবেশদ্বারের মতো। এই ইন্দ্রিয়গুলো যেমন প্রকাশ্য, তেমনি অভ্যন্তরীণও বটে। বাহ্যিক ইন্দ্রিয়গুলো মানুষের বুদ্ধিকে পদার্থের সাথে সম্পর্কিত করে এবং অভ্যন্তরীণ ইন্দ্রিয়গুলো নফসের সাথে তার সংযোগ ও সম্পর্কের মাধ্যম হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে যেসব সত্য মানুষের জ্ঞানে আসে, সেগুলোর জন্য কোনো যুক্তি-প্রমাণের প্রয়োজন হয় না, যেন ‘সূর্যই সূর্যের আগমনের দলিল’। এই কারণে সেগুলোকে ‘অস্তিত্বগত সত্য বা স্বতঃসিদ্ধ সত্য’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। মানুষের জ্ঞানের সূচনা এই সত্যগুলোর উপলব্ধির মাধ্যমেই হয়।
এই উপলব্ধি কীভাবে জ্ঞান হয়ে ওঠে, তার ব্যাখ্যা আমরা এই বইয়ের “জ্ঞানের ভিত্তি” শিরোনামের অধীনে করেছি। মানুষের বুদ্ধি যখন এই জ্ঞান দ্বারা উপকৃত হয় এবং এই ‘অস্তিত্বগত সত্য বা স্বতঃসিদ্ধ সত্য’গুলো উপলব্ধি করে, তখন সে জানা বিষয় থেকে অজানা বিষয়ে পৌঁছানোর দিকে যাত্রা শুরু করে। একেই যুক্তি-প্রমাণ (ইস্তিদলাল) বলা হয়। উপলব্ধির পর এটা জ্ঞানের দ্বিতীয় মাধ্যম।
এই যুক্তি-প্রমাণ যখন মানুষের চেতনার কাঠামাতে বিদ্যমান ‘আবশ্যিক জ্ঞান’-এর বাস্তবতাসমূহকে যুক্তির ভিত্তি বানায়, তখন এর অনিবার্য ফল হিসেবে দ্বিতীয় কিছু সত্য অস্তিত্বে আসে; যেমন — প্রভাব থাকলে প্রভাব বিস্তারকারীও আছে এবং কর্ম থাকলে কর্তাও আছে, অথবা কর্মে যেসব গুণের প্রকাশ ঘটেছে, সেগুলো কর্তার মাঝেও অবশ্যই থাকবে।
আর যখন কল্পনার ভিত্তিতে [যুক্তি-প্রমাণ প্রয়োগ] করা হয়, তখন তা জ্ঞানের নতুন জগতের সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। জ্ঞানের সমস্ত অনুমান — চাই তা মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান হোক কিংবা বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান হোক — সবই এখান থেকে সৃষ্টি হয় এবং গ্রহণ-বর্জনের ধাপগুলো অতিক্রম করে।
শুধু তাই নয়, এর অর্জনও অত্যন্ত অসাধারণ। তাই আমরা দেখতে পাই যে, মানুষের বুদ্ধি যখন নফসের গভীরে প্রবেশ করল, তখন রানি বিলকিসের সিংহাসন চোখের পলকে ইয়েমেন থেকে জেরুজালেমে নিয়ে আসা হলো। আবার এই বুদ্ধিই যখন পদার্থের রহস্যভেদ করে অণুর হৃদয় বিদীর্ণ করতে সফল হলো, তখন আমাদের প্রতিচ্ছবি জীবন্ত অস্তিত্বের রূপ নিয়ে পৌঁছে গেল প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি আসরে। এমনকি আমাদেরই উদ্ভাবিত যন্ত্রসমূহ আজ আমাদের জন্য শিক্ষকের মর্যাদা লাভ করেছে। এসবই আমরা নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছি; কিন্তু বলা যায় না যে, বিচিত্র রূপের অধিকারিণী এই মানবিক বুদ্ধি ভবিষ্যতে আরও কী কী বিস্ময় উপহার দেবে, যা আজ হোক বা কাল একইভাবে বিশ্বমঞ্চে প্রকাশিত হবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, নফস ও পদার্থের এই জগতের বাইরেও এর পৌঁছানোর কোনো সম্ভাবনা আছে। কখনো নয়, এর বিচরণক্ষেত্র এই জগতই; যার সীমানা কুরআন اَقْطَارُ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ (আকতারুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ — আসমান ও জমিনের প্রান্তসমূহ) শব্দগুলোর মাধ্যমে নির্ধারণ করে দিয়েছে। কাজেই এই সীমানার ওপারে যাবার না আছে উপলব্ধির কোনো সুযোগ, আর না আছে যুক্তির কোনো পথ। নফস ও পদার্থের এই জগতের সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলে তার জন্য ‘সুলতান’ (বিশেষ অনুমতি) প্রয়োজন; আর তা কেবল মহান আল্লাহর দরবার থেকেই লাভ করা সম্ভব:
يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ إِنِ اسْتَطَعْتُمْ أَن تَنفُذُوا مِنْ أَقْطَارِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ فَانفُذُوا ۚ لَا تَنفُذُونَ إِلَّا بِسُلْطَانٍ ﴿٣٣﴾ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٣٤﴾
“হে জিন ও মানবগোষ্ঠী! তোমরা যদি আসমান ও জমিনের সীমানা ছাড়িয়ে বেরিয়ে যেতে পারো, তবে বেরিয়ে যাও। কিন্তু তোমরা তা পারবে না, এর জন্য প্রয়োজন বিশেষ আদেশের।
সুতরাং তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন মহিমা বা শানকে অস্বীকার করবে?”
(কুরআন, সুরা রহমান, ৫৫:৩৩-৩৪)

