খোদাতায়ালার ওপর ইমান
মানুষ সৃষ্টি (মাখলুক)। ধর্মের মূল বক্তব্য এই সত্যের উপলব্ধি থেকেই শুরু হয়। এটা এক অস্তিত্বগত বাস্তবতা, যা আমরা যখন খুশি নিজ চোখে পর্যবেক্ষণ করতে পারি। আমরা জানি, মানুষের সৃষ্টি কোন ধরনের প্রাণহীন উপাদান দিয়ে হয়। আমাদের খাদ্যের মাধ্যমে এগুলো কোথায় এবং কোন কারখানায় (Factory) যায়। আমরা জানি যে, এগুলোর মধ্যে মানুষের কোনো বীজ থাকে না এবং এমন কোনো জিনিসও থাকে না, যা পদার্থকে জীবনে এবং জীবনকে চেতনায় রূপান্তর করতে পারে। কিন্তু এই খাদ্যই যখন একটি বিশেষ স্থানে পৌঁছায়, তখন তা সেই বীর্যে পরিণত হয়, যার মধ্যে মানুষ হয়ে ওঠার যোগ্যতাসম্পন্ন বীজ বিদ্যমান থাকে। একজন পুরুষের দেহ থেকে একই সময়ে যে পরিমাণ বীর্য নির্গত হয়, তাতে লক্ষ লক্ষ ও কোটি কোটি বীজের অস্তিত্ব থাকে। এগুলোর প্রতিটি এই সক্ষমতা রাখে যে, তা যদি নারীর ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হয় — যা একইভাবে অন্য একটি কারখানায় (Factory) তৈরি হয় — তবে তা পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত হতে পারে। আমরা দেখতে পাই যে, বীর্য যখন ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হয়, তখন শুরুতে যা অস্তিত্ব লাভ করে, তা এতই ক্ষুদ্র যে অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া দেখা দুষ্কর। অথচ এই তুচ্ছ বস্তুটিরই বিবর্তন ঘটে; নয় মাস কয়েক দিনের ব্যবধানে এক ফোঁটা পানি থেকে তা রক্তপিণ্ডে, রক্তপিণ্ড থেকে মাংসপিণ্ডে এবং মাংসপিণ্ড থেকে হাড় ও হাড়ের ওপর মাংসের আবরণে সজ্জিত এক সম্পূর্ণ ভিন্ন সত্তায় রূপান্তর লাভ করে মায়ের গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসে। অতঃপর এই পৃথিবীতে সে তার বিস্ময়কর শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে জ্ঞান-যুক্তি, বুদ্ধি-প্রজ্ঞা এবং শিল্প-কারুশৈলীর এমন সব উৎকর্ষ প্রদর্শন করে, যা আজ জগতের সর্বত্রই দৃশ্যমান।
আমরা এই সৃষ্টিকে দেখি এবং আমাদের চেতনার গঠনের কারণেই আমরা এর স্রষ্টাকে খুঁজতে বাধ্য হই। প্রতিটি জিনিসের স্রষ্টা থাকতে হবে —বিষয়টি এমন নয়, বরং প্রতিটি ‘সৃষ্টির’ একজন স্রষ্টা থাকতে হবে। এই ‘সৃষ্টির কর্ম’-ই আমাদের এই অনুসন্ধানে বাধ্য করে। আমরা এই সহজাত তাড়না নিয়েই জন্মেছি, তাই আমরা কখনোই এতে সন্তুষ্ট হতে পারি না যে — কার্যের জন্য কারণ এবং কর্মের জন্য কর্তার অনুসন্ধান থেকে বিরত থাকব। দর্শন, বিজ্ঞান এবং সুফিবাদের মহীরুহদের একে একে দেখে নিন, কেউই এ থেকে বিমুখ হতে পারেননি। সুতরাং জ্ঞানের পুরো ইতিহাসই এই বাস্তবতার স্বীকৃতির ইতিহাস যে — প্রতিটি সৃষ্টির একজন স্রষ্টা আছেন; মানুষ সৃষ্টি, অতএব মানুষেরও একজন স্রষ্টা আছেন।
শুধু তাই নয়, আমরা জানি যে, সৃষ্টির যে কর্ম আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি, তা সুচিন্তিত এবং এর প্রতিটি অংশে অসীম ক্ষমতা এবং অনন্য জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রকাশ ঘটেছে। আমরা যেমন সৃষ্টিকে অস্বীকার করতে পারি না, তেমনি এই কর্মের প্রকৃতিকেও অস্বীকার করতে পারি না। কারণ, এই কর্মের প্রকৃতিও ঠিক তেমনই এক বাস্তবতা, যেমন সৃষ্টির কর্মও একটি বাস্তবতা। আমরা যেভাবে কর্ম পর্যবেক্ষণ করি, ঠিক সেভাবেই এই বাস্তবতাকেও পর্যবেক্ষণ করি। সুতরাং আমরা এ কথা স্বীকার করতেও বাধ্য যে, মানুষের স্রষ্টা ইচ্ছাশক্তির অধিকারী, তাঁর ক্ষমতা অসীম এবং তিনি মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়।
মানুষের বুদ্ধি তাকে এই পর্যন্ত নিয়ে আসে। এই সফরে তার বাইরে থেকে কোনো নির্দেশনার প্রয়োজন হয় না। জ্ঞান ও উপলব্ধির যে সক্ষমতা মানুষকে তার জন্মের সাথে দান করা হয়েছে, সেটা-ই এই সফরে পথ দেখানোর জন্য যথেষ্ট। কিন্তু এর পরের প্রশ্ন হলো— সেই স্রষ্টা কে? এই প্রশ্নের উত্তর মানুষের বুদ্ধি এমন অকাট্য নিশ্চয়তা ও দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে দিতে পারে না। তাই সে সাধারণত সেই দুটি উত্তরের দিকে তাকায়, যা মানবজাতির পুরো ইতিহাসে এ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে এবং সেগুলোর মধ্য থেকে কোনো একটি বেছে নেয় অথবা সেগুলোর মাঝে দোদুল্যমান থাকে।
প্রথম উত্তরটি হলো — মানুষ যে মহাবিশ্বের কোলে চেতনার চোখ খোলে, সেই মহাবিশ্বই তার স্রষ্টা। এটা নাস্তিক্যবাদের উত্তর।
এর ব্যাখ্যা সাধারণত এভাবে করা হয় যে, মহাবিশ্বের নিজস্ব চেতনা আছে, ফলে এর অভ্যন্তরেই এমন এক শক্তি বিদ্যমান, যা তার সত্তাগত দিক থেকে ‘সৃষ্টিকর্তা’। এর বাইরে আর কিছু নেই, এমনকি ভেতর ও বাইরের পার্থক্যটুকুও এর ভেতরেই সীমাবদ্ধ। মহাবিশ্বের প্রতিটি অংশ একদিকে যেমন তার অভ্যন্তরীণ সত্তা, অন্যদিকে তেমনই তার বাহ্যিক প্রকাশ। এটা কার্যকারণ সম্পর্কের এক বিশাল কারখানা হতে পারে, তবে সামগ্রিক বিচারে এটা নিজেই নিজের চূড়ান্ত কারণ (Ultimate Cause)।
এই উত্তরটি নিছক একটি দাবি মাত্র।
প্রথমত এই কারণে যে, এতে মহাবিশ্বের যে স্ব-চেতনার দাবি করা হয়েছে, তার কোনো প্রমাণ আমাদের পর্যবেক্ষণে কখনো আসেনি। আমরা জানি যে, মহাবিশ্বের মূল সত্তা হলো পদার্থ (Matter), আর পদার্থ ইচ্ছাশক্তিহীন; তা জ্ঞান ও বুদ্ধি থেকেও শূন্য। এই জিনিসগুলো যদি কোনো মাত্রায় কোথাও পাওয়া যায়, তবে তা সেই ‘সৃষ্টির’ মধ্যেই পাওয়া যায়, যার স্রষ্টা হিসেবে এই মহাবিশ্বকে দাবি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সেই ক্ষমতাও যদি কোনো স্তরে কোথাও থেকে থাকে, তবে তা সেই সৃষ্টির মধ্যেই আছে; যা ছাড়া জ্ঞান, বুদ্ধি এবং ইচ্ছা — সবই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত এই কারণে যে, মহাবিশ্বের যে শক্তির বহিঃপ্রকাশকে অনেকে ‘সৃষ্টি’ বলে ভুল করেন, তা আসলে জড় পদার্থের সহজাত বৈশিষ্ট্য এবং তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফল মাত্র। শক্তির এমন প্রকাশ তো মানুষের তৈরি প্রতিটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের কলকব্জাতেও দেখা যায়; যার চরম উৎকর্ষ বর্তমানে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ (Artificial Intelligence) রূপে আমাদের প্রত্যেককে প্রতিনিয়ত বিস্মিত করছে।
তৃতীয়ত এই কারণে যে, এই মহাবিশ্বের যদি কোনো সামগ্রিক সত্তা থেকেও থাকে, তবে তা সেইসব বস্তুগত প্রভাব ও বৈশিষ্ট্যেরই সমষ্টি, যা কেবল কার্যকারণ সম্পর্কের একটি শৃঙ্খল তৈরি করে। এর সাথে সৃষ্টির সেই মহান কার্যের কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই — যা প্রতিটি পদে পদে জ্ঞান, বুদ্ধি, অভিপ্রায় এবং সৃজনশীল ক্ষমতার দাবি রাখে। এটা নিছক উপায়-উপকরণ, কর্মপদ্ধতি আর প্রাকৃতিক নিয়মের একটি জগৎ; এর বাইরে এর কোনো স্বতন্ত্র বা অতিপ্রাকৃত মর্যাদা নেই।
মানুষের স্রষ্টা কে? এই প্রশ্নের দ্বিতীয় উত্তরটি তারা দিয়েছেন, যারা নিজেদেরকে ‘নবী’ হিসেবে পেশ করেন। মানুষকে এই উত্তর তার সৃষ্টির সাথেই প্রদান করা হয়েছিল। সুতরাং প্রথম মানুষ যেভাবে প্রথম মানুষ ছিলেন, তেমনি তিনি প্রথম নবীও ছিলেন। এই উত্তরের সারকথা হলো — মানুষের স্রষ্টা এই মহাবিশ্বের ঊর্ধ্বে এক মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময় সত্তা।
মানুষের সৃষ্টির সূচনা হয়েছিল মাটির গভীর থেকে। মাটির সেই উপাদানগুলো — যা বর্তমানে খাদ্যের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে এবং এক বিন্দু তুচ্ছ জলীয় নির্যাস হিসেবে আমাদের মানুষ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটায় — সেগুলো তখন পচা কাদার ভেতরে ঠিক একই ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছিল। এই প্রক্রিয়াটি ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে থাকে, যতক্ষণ না দৈহিক কাঠামোটি পূর্ণতা পায়; আর সে পর্যায়ে কাদাটি উপরিভাগ থেকে শুকিয়ে শক্ত মাটিতে পরিণত হয়। অতঃপর তা বিদীর্ণ হয়ে একটি জ্যান্ত প্রাণীর আবির্ভাব ঘটে, যা মানুষের প্রাথমিক বা আদিম জৈবিক সত্তারই প্রতিনিধিত্ব করে।
পরবর্তীতে, পৃথিবীর বুকে যে রূপান্তর বা বিবর্তন দেখা গিয়েছিল, তা-ই জ্ঞান ও উপলব্ধিহীন এই অপরিপক্ব প্রাণীটির ভেতরেও সঞ্চারিত হতে শুরু করে। কয়েক প্রজন্মের পারস্পরিক সংমিশ্রণ ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের এই আদি রূপটি ধীরে ধীরে মার্জিত ও সুশোভিত হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের ‘ব্যক্তিত্ব’ ধারণ করার উপযোগী এক পর্যায়ে পৌঁছায়। পরিশেষে, একটি সূক্ষ্ম ফুৎকারের মাধ্যমে সেই ব্যক্তিত্ব তাকে দান করা হয় — যা আমাদের চেনা মানবজাতির সৃষ্টির চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে চিহ্নিত।
وَبَدَأَ خَلْقَ الْإِنسَانِ مِن طِينٍ ﴿٧﴾ ثُمَّ جَعَلَ نَسْلَهُ مِن سُلَالَةٍ مِّن مَّاءٍ مَّهِينٍ ﴿٨﴾ ثُمَّ سَوَّاهُ وَنَفَخَ فِيهِ مِن رُّوحِهِ ۖ وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ ۚ قَلِيلًا مَّا تَشْكُرُونَ ﴿٩﴾
“মানুষের সৃষ্টির সূচনা তার স্রষ্টা মাটি থেকেই করেছিলেন; অতঃপর তার বংশধারা এক তুচ্ছ তরলের নির্যাস থেকে চলমান রেখেছেন। এরপর তিনি তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুঠাম ও সুশোভিত করেছেন এবং তার মধ্যে নিজের রূহ ফুঁকে দিয়েছেন। আর তিনি তোমাদের (শোনার জন্য) কান, (দেখার জন্য) চোখ এবং (উপলব্ধির জন্য) অন্তর তৈরি করেছেন; তোমরা খুব সামান্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।”
(কুরআন, সাজদা, ৩২:৭-৯)
এই উত্তরটি সর্বশেষ যে মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে, তা হলো এই কুরআন, যার আয়াতগুলো উপরে উদ্ধৃত হয়েছে। যে নবী এটা পেশ করেছেন, তার দাবি হলো: এটা স্রষ্টার নিজস্ব কালাম, যা তার ওপর নাজিল করা হয়েছে। যেভাবে নাজিল করা হয়েছে, তিনি অবিকল সেভাবেই মানুষকে পড়ে শুনিয়েছেন। এতে একটি অক্ষর বা একটি চিহ্নের পরিবর্তনও তিনি করেননি এবং কিয়ামত পর্যন্ত কেউ তা করার দুঃসাহস দেখাতে পারবে না।
এই দাবি খোদ কুরআনেই বর্ণিত হয়েছে এবং এর সাথে অত্যন্ত স্পষ্ট একটি মানদণ্ডও সামনে রাখা হয়েছে, যার ভিত্তিতে আমরা ফয়সালা করতে পারি যে — কুরআন কি আসলেই স্রষ্টার কালাম নাকি কোনো মানুষ মিথ্যা রচনা করে একে স্রষ্টার সাথে সম্পৃক্ত করেছে?
সেই মানদণ্ড কী? একে আমরা নিম্নোক্ত তিনটি পয়েন্টের আকারে পেশ করতে পারি:
প্রথমত, মানুষ যে জ্ঞানই সৃজন করুক না কেন, শব্দ ও অর্থ — উভয় দিক থেকেই তাকে ‘ভুল ও সংশোধন’ (Trial and Error)-এর বহু স্তর পার হয়ে আসতে হয়। জন্মের প্রথম দিনেই কেউ সক্রেটিস বা প্লেটো হয়ে যায় না; রাতারাতি কেউ গালিব, শেক্সপিয়র কিংবা নিউটন বা আইনস্টাইন হয়ে ওঠে না। বরং মানুষ শেখে, অনুধাবন করে এবং শেখার প্রতিটি ধাপে ভুল করে আবার তা সংশোধনও করে। আমরা দেখি, মানুষ বছরের পর বছর ধরে তার পূর্বসূরিদের জ্ঞান আহরণ করে, তা নিয়ে নিরন্তর চর্চা ও সাধনা চালায় এবং ধাপে ধাপে উন্নতির দিকে এগিয়ে যায়; অবশেষে তার পক্ষ থেকে জ্ঞান বা সাহিত্যের কোনো কালজয়ী সৃষ্টি আত্মপ্রকাশ করে। এটাই মানুষের চিরায়ত নিয়তি এবং সে এভাবেই সৃজিত হয়েছে। জ্ঞান ও সাহিত্যের দীর্ঘ ইতিহাসে এর কোনো ব্যতিক্রম কখনো দেখা যায়নি এবং ভবিষ্যতেও তেমন কিছু কল্পনা করা যায় না।
তবে কুরআন এই সর্বজনীন নিয়মের এক অনন্য ব্যতিক্রম। এটা যার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, সেই ব্যক্তি কয়েকশ ঘরের এক ছোট জনপদে দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে তার জাতির চোখের সামনেই দিন-রাত অতিবাহিত করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তার প্রতিটি কর্মকাণ্ড ছিল সবার কাছে দৃশ্যমান; অথচ সাধারণ মানুষের জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে ‘ভুল ও সংশোধনের’ যে চিরাচরিত প্রক্রিয়া অনিবার্য, তার মাঝে কখনো তার সামান্যতম চিহ্নও কেউ দেখতে পায়নি। ফলে, তাদের কাছে এটা ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর যে — তাদেরই মাঝে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত (সাদিক ও আমিন) হিসেবে সুপরিচিত একজন মানুষ কীভাবে নিজে থেকে এমন গভীর জ্ঞান ও প্রাঞ্জল বাণীর অধিকারী হতে পারেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তারা তখন ধারণা করতে শুরু করল যে, নিশ্চয়ই কোনো শিক্ষিত অনারব ব্যক্তি তাকে এসব তথ্য শিখিয়ে দিচ্ছে। তাদের এই সংশয় ও অপবাদের জবাবে কুরআন নিজেই বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছে:
قُل لَّوْ شَاءَ اللَّهُ مَا تَلَوْتُهُ عَلَيْكُمْ وَلَا أَدْرَاكُم بِهِ ۖ فَقَدْ لَبِثْتُ فِيكُمْ عُمُرًا مِّن قَبْلِهِ ۚ أَفَلَا تَعْقِلُونَ ﴿١٦﴾ فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَىٰ عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِآيَاتِهِ ۚ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْمُجْرِمُونَ ﴿١٧﴾
“(আপনি তাদের) বলে দিন — আল্লাহ যদি চাইতেন, তবে আমি তোমাদের এই কুরআন পড়ে শোনাতাম না এবং আল্লাহও তোমাদের এ বিষয়ে অবহিত করতেন না। এটা সম্পূর্ণ তাঁরই সিদ্ধান্ত; কারণ, আমি তো এর আগে তোমাদের মাঝে জীবনের দীর্ঘ একটি সময় কাটিয়েছি। (আমি কি আগে কখনো এমন কোনো কথা বলেছি?) তবে কি তোমরা সামান্যতম বুদ্ধিও খাটাবে না? সুতরাং সেই ব্যক্তির চেয়ে বড় জালেম আর কে হতে পারে, যে আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করে কিংবা তাঁর আয়াতগুলোকে অস্বীকার করে? সত্য এই যে, এমন অপরাধীরা কখনোই সফল হতে পারবে না।”
(কুরআন, ইউনুস, ১০: ১৬-১৭)
কথা ছিল এমন যে — হে নির্বোধরা, তোমরা আমাকে কবে এই সব বিষয়ে আগ্রহী হতে দেখেছ, কিংবা এসব বিষয়ে কোনো চিন্তা ও মত প্রকাশ করতে দেখেছ, অথবা এগুলোর বিন্যাস ও সংকলনের জন্য কোনো চর্চা ও সাধনায় নিমগ্ন হতে দেখেছ, কিংবা এ সংক্রান্ত কোনো জ্ঞান বা বিদ্যা অর্জন করতে দেখেছ — যা এখন কুরআনের সুরাগুলোতে একের পর এক আলোচিত হচ্ছে? পুরো চল্লিশটি বছর আমি তোমাদের মাঝে কাটিয়েছি, আমার কথাবার্তা এবং আমার চলন-বলনের মধ্যে তোমরা কবে এমন কিছু অনুভব করেছ, যা এই দাওয়াতের ভূমিকা বা প্রস্তুতি বলা যেতে পারে? আজ আমি যা বলছি, তার ক্রমবিকাশ বা বিবর্তনের কোনো চিহ্ন কি তোমরা কখনো আমার জীবনে পেয়েছ? তোমরা জানো যে, মানুষের মস্তিষ্ক তার বয়সের কোনো পর্যায়েই এমন কিছু পেশ করতে পারে না, যার ক্রমবিকাশের চিহ্ন তার আগের ধাপগুলোতে বিদ্যমান নেই। তোমরা বলছ যে, আমি আল্লাহর নামে মিথ্যা বলছি। এর আগে কোনো মিথ্যা, প্রতারণা, জালিয়াতি বা ধূর্ততার সামান্যতম রেশও কি কখনো আমার চরিত্র ও স্বভাবে দেখেছ? আজ পর্যন্ত তোমরা আমাকে সাদিক ও আমিন বলে জেনে এসেছ। এখন কীভাবে বলছ যে, সেই সাদিক ও আমিন রাতারাতি আত্মম্ভরী, চরম মিথ্যাবাদী ও মিথ্যা রটনাকারী হয়ে গেছে? আল্লাহর বান্দারা, তোমরা কেন বুদ্ধি খাটাও না?
দ্বিতীয়ত, মানুষের জ্ঞান কখনোই স্ববিরোধিতা (Contradictions) থেকে মুক্ত হতে পারে না। “গড়লাম, পূজা করলাম, আবার ভেঙে ফেললাম” — মানুষ প্রথম দিন থেকে যে চিন্তার যাত্রা শুরু করে, শেষ পর্যন্ত সেই ভাঙা-গড়ার গল্পই অব্যাহত থাকে। গভীর চিন্তা করলে দেখা যায়, এটাও মূলত সেই ‘ভুল ও সংশোধন’ প্রক্রিয়ারই ফল, যার কথা আগে বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, মানুষের এই জ্ঞান যখন সাহিত্যের রূপ পরিগ্রহ করে, সেখানেও একই চিত্র ফুটে ওঠে। মানুষের সৃজনশীল কর্মগুলোকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখলে ছন্দ, অলংকার ও অর্থের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান চোখে পড়ে। তার বক্তব্য কোথাও হয়তো অলৌকিক সৌন্দর্যে ভাস্বর হবে, আবার কোথাও হবে অত্যন্ত সাধারণ, এমনকি অসংলগ্ন। বাস্তবতা এই যে, পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষের জন্ম হয়নি, যে বৈচিত্র্যময় বিষয় ও ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে অলঙ্কার ও বাচনভঙ্গির এমন এক উচ্চস্তরে পৌঁছে নিরবচ্ছিন্নভাবে কথা বলে যাবে — যা সংকলিত করলে একটি সুসংগত ও অভিন্ন বাণীসমগ্রের রূপ নেবে; যেখানে চিন্তাধারার কোনো সংঘাত থাকবে না, বক্তার মানসিক অস্থিরতার কোনো ছাপ থাকবে না এবং মতামত বা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কোনো চিহ্নও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
এ ক্ষেত্রেও যদি কোনো ব্যতিক্রম থেকে থাকে, তবে তা একমাত্র কুরআন। এজন্যই বলা হয়েছে:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا
“তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না? এটা যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এতে অবশ্যই অনেক অসঙ্গতি ও বৈপরীত্য খুঁজে পেত।”
(কুরআন, সুরা নিসা, ৪:৮২)
উস্তাদ ইমাম [আমিন আহসান ইসলাহি] লিখেছেন:
“... কুরআনের প্রতিটি কথা তার মূলনীতি ও শাখা-প্রশাখায় এতটাই সুসংহত ও সুবিন্যস্ত যে, গণিত বা ইউক্লিডীয় জ্যামিতির ফর্মুলাগুলোও অতটা সুসংহত ও সুবিন্যস্ত হতে পারে না। কুরআন যেসব আকিদার শিক্ষা দেয়, সেগুলো একে অপরের সাথে এমনভাবে গাঁথা যে, যদি তার মধ্য থেকে কোনো একটিকেও আলাদা করা হয়, তবে পুরো শৃঙ্খলাটিই ভেঙে পড়বে। কুরআন যেসব ইবাদত ও আনুগত্যের আদেশ দেয়, সেগুলো আকিদা থেকে এমনভাবে উৎসারিত হয়, যেভাবে কান্ড থেকে শাখা-প্রশাখা গজিয়ে ওঠে; এটা যেসব আমল ও নৈতিকতার তাকিদ দেয়, সেগুলো তার মূলনীতি থেকে এমনভাবে প্রকাশিত হয়, যেভাবে কোনো বস্তু থেকে তার প্রাকৃতিক ও স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। কুরআনের সামগ্রিক শিক্ষা থেকে জীবনের যে ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তা একটি ‘বুনইয়ানুম মারসুস’ বা সিসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় মূর্ত হয়; যার প্রতিটি ইট অন্যটির সাথে এমনভাবে যুক্ত যে, পুরো ইমারতে শূন্যতা সৃষ্টি না করে তার কোনো একটি ইটকেও আলাদা করা সম্ভব নয়।"
(তাদাব্বুরে কুরআন, ২/৭৪৩)
তৃতীয়ত, কোনো মানুষের জ্ঞান কখনোই পুরোপুরি সত্য হয় না। তার মধ্যে সত্যের সাথে সবসময়ই কিছু না কিছু মিথ্যার মিশ্রণ ঘটে। ফলে সে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে না নিতেই তার জ্ঞান, তথ্য, গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত, যুক্তি এবং অনুমানের ভুলগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করে। সক্রেটিস ও প্লেটো, নিউটন ও আইনস্টাইন — প্রত্যেকের নিয়তি এটাই। এ থেকে কারোর নিস্তার নেই। জ্ঞান ও সাহিত্যের পুরো ইতিহাসে এমন কোনো ব্যক্তিকেও কোনো যুগে বা কোনো স্থানে দেখা যায়নি, যিনি এর ব্যতিক্রম। কিন্তু কুরআন এই ক্ষেত্রেও এক বিস্ময়কর ব্যতিক্রম। আজ প্রায় দেড় হাজার বছর হতে চলল এটা নিরন্তর পরীক্ষার সম্মুখীন, কিন্তু বড় থেকে বড় দার্শনিক, প্রাজ্ঞ ব্যক্তি বা বিজ্ঞানীর পক্ষেও সম্ভব হয়নি এর কোনো কথাকে ভুল এবং কোনো শিক্ষাকে মিথ্যা প্রমাণ করা। গত তিন শতাব্দীতে পৃথিবী কোথায় থেকে কোথায় পৌঁছেছে, কিন্তু এই পুরো সফরে এমন কোনো বাস্তবতা উন্মোচিত হয়নি, যা কুরআনের পেশ করা সত্যের পরিপন্থী। কোনো জ্ঞানই কুরআনের বর্ণিত জ্ঞানকে অসার প্রমাণ করতে পারেনি; এমন কোনো পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ আজ পর্যন্ত ঘটেনি, যা কুরআনের দেওয়া কোনো নির্দেশনাকে ভুল প্রমাণ করতে পারে — তা সে যে উদ্দেশ্যেই মানুষকে দেওয়া হোক না কেন। কুরআন যাকে حق (সত্য) বলে, তা কখনো মিথ্যা হয়নি এবং যাকে باطل (মিথ্যা) বলে, তা কখনো সত্য প্রমাণিত হয়নি। কুরআন সম্পর্কে এই সত্যগুলো অনস্বীকার্য। বলা হয়েছে:
وَإِنَّهُ لَكِتَابٌ عَزِيزٌ ﴿٤١﴾ لَّا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِن بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ ۖ تَنزِيلٌ مِّنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ ﴿٤٢﴾
“হাকিকত হচ্ছে: এটা এক সুউচ্চ মর্যাদার কিতাব। এর সামনে কিংবা পেছন — কোনো দিক থেকেই মিথ্যা বা ভ্রান্তি এতে প্রবেশ করতে পারে না। এটা অত্যন্ত সুনিপুণ ব্যবস্থাপনায় সেই সত্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে, যিনি পরম প্রজ্ঞাময় এবং যাবতীয় প্রশংসার অধিকারী।
(কুরআন, হামিম সাজদা, ৪১: ৪১-৪২)
এটা-ই সেই মানদণ্ড, যার আলোকে নিজের সত্যতা প্রমাণ করার পর কুরআন মানুষকে জানিয়েছে যে — যেই মহাবিশ্বকে তোমরা নিজের স্রষ্টা মনে করার ভুল করছ, সেটাও তাঁরই সৃষ্টি, যিনি তোমাদের স্রষ্টা। তোমরা কি দেখ না যে, এই দুনিয়ার প্রতিটি জিনিস সৃষ্টির সৌন্দর্যের এক মুজিজাপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ? প্রতিটি জিনিসের মাঝে রয়েছে অগাধ সার্থকতা, অসাধারণ পরিকল্পনা, প্রজ্ঞা, কুশলী ব্যবস্থাপনা, উপযোগিতা এবং বিস্ময়কর নিয়ম-শৃঙ্খলা। এতে রয়েছে চরম সামঞ্জস্য ও গভীর সমন্বয়; রয়েছে অতুলনীয় জ্যামিতিক ও গাণিতিক হিসাব, যার কোনো ব্যাখ্যা এটা ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না যে — এটাকেও সেই মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময় সত্তাই সৃষ্টি করেছেন, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন। তিনিই সেই সত্তা, যিনি জমিনকে তোমাদের জন্য দোলনা এবং পাহাড়গুলোকে তার পেরেক বানিয়ে দিয়েছেন; তোমাদের জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন; তোমাদের ঘুমকে বিশ্রামের মাধ্যম এবং রাতকে আবরণ ও দিনকে জীবিকা অন্বেষণের সময় বানিয়েছেন; তোমাদের ওপর সাতটি সুদৃঢ় আকাশ নির্মাণ করেছেন এবং সেগুলোর মধ্যে একটি প্রজ্বলিত প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছেন। তিনিই সে সত্তা, যিনি মেঘমালা থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তা দিয়ে শস্য, উদ্ভিদ ও ঘন বাগান উৎপন্ন করেন:
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ ۖ هُوَ الرَّحْمَٰنُ الرَّحِيمُ ﴿٢٢﴾ هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ ۚ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ ﴿٢٣﴾ هُوَ اللَّهُ الْخَالِقُ الْبَارِئُ الْمُصَوِّرُ ۖ لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ ۚ يُسَبِّحُ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ ﴿٢٤﴾
“তিনিই আল্লাহ, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্য সবকিছুর পরিজ্ঞাতা। তিনি পরম করুণাময়, তাঁর মমতা চিরন্তন। তিনিই আল্লাহ, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তিনি অধিপতি, পরম পবিত্র সত্তা, শান্তি ও নিরাপত্তার আধার, রক্ষক, পরাক্রমশালী, মহাপ্রতাপান্বিত এবং শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। তারা যাদের শরিক করে, আল্লাহ তা থেকে পবিত্র। তিনিই আল্লাহ — যিনি পরিকল্পনাকারী, অস্তিত্বদানকারী ও রূপকার; সকল সুন্দর নাম তাঁরই। আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিটি বস্তু তাঁরই মহিমা ঘোষণা করে; আর তিনি পরম শক্তিশালী ও প্রজ্ঞাময়।”
(কুরআন, সুরা হাশর, ৫৯: ২২-২৪)
কুরআন জানিয়েছে যে, এই স্রষ্টার রুবুবিয়্যত বা প্রভুত্বের স্বীকৃতি এমন এক বিষয়, যা সৃষ্টির সূচনা থেকেই মানুষের ফিতরাতের ভেতরে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী এর প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল এক অঙ্গীকার ও চুক্তির মাধ্যমে। এই অঙ্গীকারের কথা কুরআন একটি বাস্তব ঘটনারূপে বর্ণনা করে। মানুষকে এখানে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে, তাই এই ঘটনাটি তার স্মৃতি থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে; কিন্তু এর হাকিকত বা বাস্তবতা তার হৃদয়ের পটে অঙ্কিত এবং মস্তিকের গহীনে প্রোথিত রয়েছে — কোনো কিছুই একে মুছে ফেলতে পারে না। ফলে পরিবেশগত কোনো কিছু যদি অন্তরায় না হয় এবং মানুষকে এটা মনে করিয়ে দেওয়া হয়, তবে সে এর দিকে সেভাবেই ছুটে যায়, যেভাবে একটি শিশু তার মায়ের দিকে ছুটে; অথচ সে নিজেকে কখনো মায়ের পেট থেকে বের হতে দেখেনি। সে এই দৃঢ় বিশ্বাসের সাথেই ছুটে যায় যেন সে আগে থেকেই তাকে চিনত। সে অনুভব করে যে, স্রষ্টার এই স্বীকৃতি তার ভেতরের একটি স্বভাবজাত প্রয়োজনেরই উত্তর, যা তার মধ্যেই বিদ্যমান ছিল। যখন সে এটা পেয়ে যায়, তখন তার মনস্তত্ত্বের সকল দাবিও এর সাথেই নিজ নিজ স্থান খুঁজে পায়। কুরআনের বক্তব্য হলো — মানুষের অন্তরের এই সাক্ষ্য এতটাই অকাট্য যে, আল্লাহর রুবুবিয়্যত বা প্রভুত্বের ক্ষেত্রে প্রতিটি ব্যক্তি কেবল এই সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে বাধ্য। কুরআনে বলা হয়েছে:
وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِن بَنِي آدَمَ مِن ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ ۖ قَالُوا بَلَىٰ ۛ شَهِدْنَا ۛ أَن تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَٰذَا غَافِلِينَ ﴿١٧٢﴾ أَوْ تَقُولُوا إِنَّمَا أَشْرَكَ آبَاؤُنَا مِن قَبْلُ وَكُنَّا ذُرِّيَّةً مِّن بَعْدِهِمْ ۖ أَفَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ الْمُبْطِلُونَ ﴿١٧٣﴾ وَكَذَٰلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ وَلَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ ﴿١٧٤﴾
“তাদের সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দিন, যখন আপনার প্রতিপালক বনি আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদের নিজেদের ওপরই তাদের সাক্ষী রাখলেন। (তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন): ‘আমি কি তোমাদের রব নই?’ তারা উত্তর দিয়েছিল: ‘হ্যাঁ, (আপনিই আমাদের রব), আমরা এর সাক্ষ্য দিচ্ছি।’ এটা এ কারণে করা হয়েছে, যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা বলতে না পারো যে, ‘আমরা তো এ বিষয়ে একেবারেই বেখবর ছিলাম।’ অথবা এই অজুহাত পেশ করতে না পারো যে, ‘শিরক বা অংশীদারিত্বের শুরু তো আমাদের বাপ-দাদারা আগে থেকেই করে রেখেছিল, আর আমরা ছিলাম তাদের পরবর্তী বংশধর মাত্র। তবে কি আপনি সেই পথভ্রষ্টদের কর্মের কারণে আমাদের ধ্বংস করবেন?’ আমি এভাবেই আমার আয়াতগুলো বিস্তারিত বর্ণনা করি, যাতে মানুষের ওপর দলিল-প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তারা যেন ফিরে আসে।”
(কুরআন, সুরা আরাফ, ৭: ১৭২-১৭৪)
এই স্বীকৃতিই মহাবিশ্বের প্রাণ। মানুষের বুদ্ধি এতেই প্রশান্ত হয় এবং তার হৃদয় এতেই নুরের উদয়স্থলে পরিণত হয়। ফলে সে চিৎকার করে বলে ওঠে — নিঃসন্দেহে আল্লাহই সেই সত্তা, যাঁর নুরে এই আকাশ ও পৃথিবী আলোকিত:
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ ۖ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ ۖ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِن شَجَرَةٍ مُّبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَّا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ ۚ نُّورٌ عَلَىٰ نُورٍ ۗ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ ۗ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
“আল্লাহ আসমান ও জমিনের জ্যোতি। (মানুষের অন্তরে) এই জ্যোতির উদাহরণ একটি তাকের মতো, যার মধ্যে রয়েছে একটি প্রদীপ। প্রদীপটি রয়েছে একটি কাঁচের আবরণের ভেতরে। সেই কাঁচটি দেখতে যেন একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। সেই প্রদীপটি জলপাইয়ের এমন এক বরকতময় বৃক্ষের তেল দিয়ে জ্বালানো হয়, যা না পূর্বদিকের, না পশ্চিমদিকের। তার তেল (এতটাই স্বচ্ছ যে), মনে হয় আগুন স্পর্শ করার আগেই তা দাউদাউ করে জ্বলে উঠবে। জ্যোতির ওপর জ্যোতি! আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাঁর এই জ্যোতির দিকে পথপ্রদর্শন করেন। আল্লাহ মানুষের (বোঝার) জন্য এসব উপমা বর্ণনা করেন এবং আল্লাহ প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে অবগত।”
(কুরআন, সুরা নুর, ২৪:৩৫)
উস্তাদ ইমাম লিখেন:
“... এই আকাশ ও পৃথিবী, বরং এই পুরো মহাবিশ্ব সেই ব্যক্তির জন্য এক অন্ধকার জগৎ এবং এক অন্ধকারপুরী, যে আল্লাহকে বিশ্বাস করে না কিংবা বিশ্বাস করলেও আল্লাহর গুণাবলি ও সেগুলোর দাবিকে স্বীকার করে না। এমন ব্যক্তি না এটি জানতে পারে যে, দুনিয়া কোথা থেকে এসেছে, না এটা জানতে পারে যে, এর অস্তিত্বে আসার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কী? সে নিজের সম্পর্কেও এই ফয়সালা করতে পারে না যে, তার অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কী? সে এই দুনিয়ায় লাগামহীন ও যা খুশি করার অধিকারী নাকি কোনো বিধানের অনুগত ও আজ্ঞাবহ? সে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নাকি ঊর্ধ্বে নয়? তার জন্য কোনটি কল্যাণ আর কোনটি অকল্যাণ? তাকে কি জুলুমের পথ অবলম্বন করতে হবে নাকি ন্যায়ের? তাকে কি কেবল নিজের স্বার্থ ও কামনা-বাসনার অনুসরণ করতে হবে নাকি সেগুলোর চেয়ে কোনো উচ্চতর লক্ষ্যের অনুসরণ করতে হবে? এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তরের ওপরই সঠিক ও সফল জীবন নির্ভর করে। কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহকে বিশ্বাস করে না, সে এই প্রশ্নগুলোর সঠিক সমাধান পেতে পারে না। সে অন্ধকারের মাঝে অন্ধ মহিষের মতো পথ হাতড়ে বেড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের গহ্বরে পতিত হয়ে নিজের কর্মফল ভোগ করে। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে তাঁর সঠিক গুণাবলির সাথে বিশ্বাস করে, সে এই মহাবিশ্বের আদি উৎসও খুঁজে পায় এবং এর পরিণামও তার কাছে স্পষ্ট। তার কাছে সেই সব প্রশ্নের উত্তরও উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, যা আল্লাহর অবিশ্বাসী ব্যক্তি কখনো সমাধান করতে পারে না। এই কারণে এ দুনিয়া তার জন্য অন্ধকারপুরী থাকে না, বরং ইমানের নুরে তার জন্য প্রতিটি জিনিস ঝলমল করে ওঠে এবং এর প্রতিটি দিক তার কাছে উজ্জ্বল হয়। সে যে পদক্ষেপই ফেলে, পূর্ণ দিনের আলোতে ফেলে এবং যে দিকেই সে চলে, আল্লাহর ওপর ইমানের নুর তাকে পথ দেখায়। এই বাস্তবতাটি-ই এই আয়াতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আকাশ ও জমিনের নুর হলেন আল্লাহ। যাঁর কাছে এই নুর আছে, তিনি আলোতে এবং সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর আছেন। আর যে এই নুর থেকে বঞ্চিত, সে এক অন্ধকার জগতে পথ হারিয়েছে এবং অন্য কেউ তাকে আলো দিতে পারে না — وَمَنْ لَّمْ يَجْعَلِ اللّٰهُ لَهٗ نُوْرًا فَمَا لَهٗ مِنْ نُّوْرٍ (আল্লাহ যাকে নুর দেন না, তার জন্য কোনো নুর নেই)।”
(তাদাব্বুরে কুরআন, ৫/৪০৯)






