নাস্তিকতার যুক্তি
ধর্ম যে খোদার প্রতি ইমানের দাওয়াত দেয়, তার বিপরীতে সবসময় সেই সব মানুষ ছিল, যারা আমাদের এই মহাবিশ্বকেই মানুষের স্রষ্টা মনে করে। এটাকেই নাস্তিকতা বলা হয়। সপ্তদশ শতাব্দীর পূর্বে ধর্ম ও ধর্মীয় চিন্তার রাজনৈতিক আধিপত্য বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত ছিল। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আগমনের পর কম-বেশি এক হাজার বছর পর্যন্ত এই আধিপত্য একইভাবে কায়েম ছিল। আসমানি কিতাবসমূহে এর মেয়াদ এমনই বর্ণনা করা হয়েছে।[] এটা খোদার প্রেরিতদের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, তাই অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হয়েছে, আর এখন এই আধিপত্য পুরো পৃথিবী থেকে শেষ হয়েছে। এর ফলে যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তাতে নাস্তিকতার পতাকাবাহীরা বিপুল সংখ্যায় প্রকাশ্যে চলে এসেছে এবং ধর্মের বিরুদ্ধে নিজেদের যুক্তি পূর্ণ বিশ্বাস ও দৃঢ়তার সাথে পেশ করছে। এই যুক্তি যেসব আপত্তির সুরতে পেশ করা হচ্ছে, সেগুলো মৌলিকভাবে চারটিই। এগুলোর উত্তর কুরআন যেভাবে দিয়েছে, আমরা এখানে সেটার ব্যাখ্যা করব:
প্রথম আপত্তি — খোদার ধারণা মানুষের চিন্তাগত বিবর্তনের ফল। সুতরাং আমরা দেখতে পাই যে, কুরআন যে খোদার পরিচয় করায়, তাঁর কোনো চিহ্ন মানুষের আদি ইতিহাসে পাওয়া যায় না। একে যে দিক থেকেই দেখুন, [মানুষের] আদি ইতিহাসের সব জায়গায় শিরকের নিদর্শন বিদ্যমান আছে, কিন্তু তাওহিদ কোনো জায়গায় নজরে আসে না। সুতরাং বাস্তবতা এটাই যে, এক খোদার ধারণা এই ইতিহাসে ক্রমান্বয়ে প্রকাশ পেয়েছে, আর সেটাও তার প্রবক্তাদের অবস্থার প্রেক্ষিতে কোনো জায়গায় বাদশা, কোনো জায়গায় ঈর্ষান্বিত স্বামী এবং কোনো জায়গায় গরিবদের দরদি কোনো ধর্মীয় নেতার রূপে। শুধু তাই নয়, পৌত্তলিক ধর্মগুলোর ইবাদতের রীতিনীতিও সে এই সফর থেকে নিজের সাথে নিয়ে এসেছে এবং প্রতিটি যুগে এগুলোকেই নিজের জন্য নির্দিষ্ট করার দাবি করে এসেছে। এরপর কীভাবে সম্ভব যে, মানুষের তৈরি করা এই খোদাকে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি নিজের স্রষ্টা, মালিক ও উপাস্য হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত হবে?
এই আপত্তির উত্তরে বলা যায় যে, বিবর্তনের এই রূপকথা নিছকই রূপকথা। এর কোনো ভিত্তি বাস্তব জগতে খুঁজে পাওয়া যায় না। মানুষের ধর্মীয় চিন্তার ইতিহাস সম্পর্কিত যে তথ্য এখন পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে, সে অনুযায়ী একে বড়জোর পাঁচ হাজার বছর পর্যন্ত পিছনে নিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু পৃথিবীতে মানুষের বয়সও কি এটাই? এ সংক্রান্ত যে গবেষণা এখন পর্যন্ত হয়েছে, তার আলোকে এর ন্যূনতম আন্দাজও যদি করা হয়, তবে এটা তারও হাজার হাজার বছর আগের ঘটনা। এরপর কোন জিনিসটি কুরআনের এই বক্তব্যকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতে পারে যে, মানুষ শুরুতে একই ধর্মের ওপর ছিল? এর নির্দেশনা তাদের স্বয়ং তাদের প্রতিপালক দিয়েছিলেন। তাদের ধর্মীয় চিন্তায় বিচ্যুতি এর পরে কোনো এক সময়ে প্রবেশ করেছে, যার ফলে মতভেদের সৃষ্টি হয়েছে। শিরক এই সময়েরই জিনিস। সুতরাং এটাই বাস্তবতা যে, ধর্মীয় চিন্তার সফর শিরক থেকে তাওহিদের দিকে নয়, বরং তাওহিদ থেকে শিরকের দিকে হয়েছে। বলা হয়েছে:
وَمَا كَانَ النَّاسُ إِلَّا أُمَّةً وَاحِدَةً فَاخْتَلَفُوا ۚ وَلَوْلَا كَلِمَةٌ سَبَقَتْ مِن رَّبِّكَ لَقُضِيَ بَيْنَهُمْ فِيمَا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ
“বাস্তবতা এই যে, মানুষ একই উম্মত ছিল, তারা পরবর্তীতে মতভেদ করেছে, আর যদি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে একটি কথা[] আগে নির্ধারণ করা না হতো, তবে তাদের মধ্যে সেই বিষয়ের ফয়সালা করা হতো, যাতে তারা মতভেদ করছে।”
(কুরআন, সুরা ইউনুস, ১০: ১৯)
গত দুই হাজার বছরের ইতিহাসও এই বাস্তবতার সাক্ষ্য দেয়। জ্ঞানীগণ জানেন যে, এই ইতিহাসের শুরু খোদাতায়ালার দুই মহিমান্বিত রাসুল — ইসা মসিহ ও মুহাম্মদ — এর পক্ষ থেকে তাওহিদের প্রচারের মাধ্যমে হয়েছিল। কিন্তু এরপর দেখে নিন যে, দর্শন ও তাসাউফ তথা সুফিবাদের মিশ্রণ তাদের শিক্ষাগুলোতে কী কী বিচ্যুতি সৃষ্টি করেছে, এমনকি স্বয়ং ইসা মসিহ (আলাইহিস সালাম)-এর অনুসারীরা তাকে খোদার পুত্র এবং তার মাতাকে খোদার মাতা বানিয়ে তাদের কাছে দোয়া ও প্রার্থনা করতে দেখা যায়, আর মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অনুসারীদের মধ্যেও এমন লোক সৃষ্টি হয়েছে, যারা আহমদের আবরণে আহাদকে দেখে এবং উচ্ছ্বাস ও আবেগের অবস্থায় বলে ওঠে:
وہی جو مستوی عرش تھا خدا ہوکر
اتر پڑا ہے مدینے میں مصطفیٰ ہوکر
ওহি জো মুস্তাবি আরশ থা খুদা হোকার
উতার পড়া হ্যায় মদিনে মে মোস্তফা হোকার
“যিনি খোদা হয়ে আরশে সমাসীন ছিলেন,
তিনিই মোস্তফা হয়ে মদিনায় নেমে এসেছেন।”
এরপর এই বাস্তবতা দলিলের মুখাপেক্ষী থাকে না যে, ইবাদতের রীতিনীতিও মূলত খোদার পক্ষ থেকে এবং খোদার জন্যই নির্ধারিত করা হয়েছিল। কিন্তু শিরক যখন উপাস্য সৃষ্টি করল, তখন কিছু পরিবর্তনের সাথে সেগুলোকেই নিজের সেই উপাস্যদের জন্য গ্রহণ করে নিল। সুতরাং যখন নবীদের আগমন হলো, তখন মানুষের কাছে তাদের দাওয়াতের সবচেয়ে বড় দাবি এটাই ছিল যে — হে মানুষ, এই ইবাদতের রীতিনীতি শুধু খোদার জন্য নির্দিষ্ট এবং তাঁর জন্যই নির্দিষ্ট থাকা উচিত; কারণ একমাত্র তিনিই তোমাদের প্রতিপালক, তিনিই মহাবিশ্বের বাদশা এবং তিনিই উপাস্য, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
রইল এই বিষয়টি যে, আসমানি কিতাবসমূহে খোদার ধারণা আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন ভিন্ন মনে হয় — বস্তুত, এর কারণ নিছকই ভুল বুঝাবুঝি। এই কিতাবসমূহ উচ্চমানের সাহিত্যের সর্বোত্তম নমুনা। সুতরাং প্রতিটি স্থানে এগুলোর আয়াতসমূহকে এগুলোর সংকলকদের ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে আলাদা করে দেখানো যেতে পারে যে, মানুষ কতই না অল্প জ্ঞান, অল্প চিন্তাভাবনা এবং কতই না রুচিহীনতার সাথে এগুলো বোঝার ও বোঝানোর চেষ্টা করেছে; আর এভাবে তারা এগুলোর সমস্ত সৌন্দর্য নিজেদের ব্যাখ্যা দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। এরপর কেবল এটাই বলা যেতে পারে: شعر مرابہ مدرسہ کہ برد [শের-এ-মারা বে মাদ্রাসা কে বর্দ — আমার [প্রাণবন্ত] কবিতাকে [শুষ্ক] মাদ্রাসায় কে নিয়ে গেল!]।
দ্বিতীয় আপত্তি — ধর্মকে মানুষ যেভাবে বুঝেছে এবং তার ফলে যে ধর্মীয় চিন্তা অস্তিত্বে এসেছে, তা এক বৈপরীত্যের সমষ্টি। তাতে না খোদার ধারণায় কোনো ঐক্য আছে, না তাঁর গুণাবলি ও কার্যাবলিতে; না মানুষের সাথে তাঁর আচরণের পদ্ধতিতে, না তাঁর আদেশ ও নির্দেশনায়; না মানুষের কাছে তাঁর দাবির বিষয়ে, আর না মানুষ ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে তাঁর ধারণা বা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে। বিষয়টি যেন অনেকটা এমন যে: لائے ہیں بزم ناز سے یار خبر الگ الگ [লায়ে হ্যায় বজমে নাজ সে ইয়ার খবর আলাগ আলাগ — প্রিয়জনরা নাজের মজলিস থেকে ভিন্ন ভিন্ন খবর নিয়ে এসেছে)। এরপর কোনো বুদ্ধিমান মানুষের কাছে কি এই প্রত্যাশা করা যায় যে, এই বৈপরীত্যের সমষ্টিকে সে বিন্দুমাত্র মনোযোগের যোগ্য মনে করবে কিংবা এর ওপর ইমান আনবে?
এই আপত্তির উত্তর এই যে — অস্তিত্বশীল বাস্তবতার উপলব্ধি এবং সেগুলো থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও যুক্তিনির্ভর অনুমানের যে যোগ্যতা মানুষকে দেওয়া হয়েছে, এই মতভেদগুলো তারই অনিবার্য ফল। মানুষ এই দুনিয়ায় এখন পর্যন্ত যেসব উৎকর্ষ দেখিয়েছে, সেগুলো সবই এই যোগ্যতারই অবদান। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এর অপব্যবহারে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে; কিন্তু লক্ষ্য করুন — মানুষের আসল মর্যাদা এই যোগ্যতা-ই। মানুষ এরই কারণে মানুষ। তার স্রষ্টা তাকে এভাবেই সৃষ্টি করেছেন এবং সামনেও এরই সাথে অনন্ত জীবনের সুসংবাদ দিয়েছেন। এরপর কীভাবে আশা করা যায় যে, নিজের হেদায়েত বোঝার ক্ষেত্রে ঐক্য সৃষ্টির জন্য তিনি মানুষের থেকে এই যোগ্যতা কেড়ে নেবেন? কখনোই নয়; বরং তিনি পরিষ্কার ফয়সালা শুনিয়ে দিয়েছেন যে, لَا٘ اِكْرَاهَ فِي الدِّيْنِ (লা ইকরাহা ফিদদ্বীন)[], ধর্মের ব্যাপারে কারো ওপর কোনো জোরজবরদস্তি করা হয়নি এবং ভবিষ্যতেও কখনো করা হবে না।
তবুও এর অর্থ এই নয় যে, এর ফলে মানুষকে মতভেদের গোলকধাঁধায় দিশেহারা থাকার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কুরআন জানিয়েছে যে, খোদার ধর্ম তো একটাই এবং এর নামও সবসময় ‘ইসলাম’-ই ছিল; কিন্তু তা বোঝার ক্ষেত্রে যখনই এই পরিস্থিতি বা মতভেদ সৃষ্টি হয়েছিল, খোদা প্রতিটি জাতিতে নিজের নবী পাঠাতে শুরু করলেন এবং তাদের সাথে নিজের কিতাবও নাজিল করেছিলেন। এই কিতাবসমূহ সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যের জন্য মিজান (দাঁড়িপাল্লা) ও ফুরকান (পার্থক্যকারী) হিসেবে নাজিল করা হয়েছে, যাতে মানুষ এগুলোর মাধ্যমে নিজেদের মতভেদের ফয়সালা করতে পারে এবং এভাবে সত্যের ব্যাপারে সঠিক ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। বলা হয়েছে:
كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللَّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ ۚ وَمَا اخْتَلَفَ فِيهِ
“মানুষ একই উম্মত ছিল, অতঃপর (তাদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হলো তো) আল্লাহ নবী পাঠালেন, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে এবং তাদের সাথে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নিজের কিতাব নাজিল করলেন, যাতে মানুষের মধ্যে তা তাদের মতভেদের ফয়সালা করে দেয়।”
(কুরআন, সুরা বাকারা, ২: ২১৩)
এই ধারার সর্বশেষ কিতাব কুরআন মাজিদ। পৃথিবীর আসমানি সাহিত্যের মধ্যে এখন একমাত্র এই কিতাবই আছে, যার ব্যাপারে পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে এই কথা বলা যেতে পারে যে — যেভাবে দেওয়া হয়েছিল, সামান্যতম পরিবর্তন ছাড়াই ঠিক সেভাবে, সেই ভাষায় এবং সেই ক্রম অনুযায়ী এই মুহূর্তে আমাদের কাছে বিদ্যমান আছে। এর এই তাওয়াতুর [অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা] নিজেই একটি মুজিজা; কারণ এটা পৃথিবীর একমাত্র কিতাব, যা এই মুহূর্তেও লক্ষ লক্ষ মুসলমান اَلْحَمْد (আলহামদু) থেকে وَالنَّاس (ওয়ান-নাস) পর্যন্ত নিছক স্মৃতির সাহায্যে মুখস্থ শোনাতে পারে। ইতিহাস বলে, গত চৌদ্দশ বছরে কুরআনের বর্ণনার এই ধারা একদিনের জন্যও বিচ্ছিন্ন হয়নি। এর থেকে বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, কুরআনের সংরক্ষণের এই ব্যবস্থা স্বয়ং বিশ্ব-প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সম্পন্ন হয়েছে। কুরআনের সংরক্ষণের যেসব দিকের প্রতি স্বয়ং কুরআন জায়গায় জায়গায় মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, উস্তাদে ইমাম আমিন আহসান ইসলাহির ভাষায় সেগুলো হলো:
“প্রথমত, কুরআনের নাজিল হওয়ার সময়ে আল্লাহতায়ালা এই বিষয়ের বিশেষ ব্যবস্থা করেছিলেন যেন কুরআনের ওহিতে শয়তানরা কোনো হস্তক্ষেপ করতে না পারে। এমনিতে তো এই মহাবিশ্বের ব্যবস্থায় এটা একটি স্থায়ী নিয়ম যে, শয়তানরা ঊর্ধ্বজগতের কথা শুনতে পায় না; কিন্তু ... কুরআন নাজিলের সময়ে এই ব্যবস্থা বিশেষভাবে ছিল যেন শয়তানরা আসমানি ওহিতে কোনো হস্তক্ষেপ করতে না পারে, যাতে তাদের পক্ষে কুরআনের সামনে থেকে (مِنْۣ بَيْنِ يَدَيْهِ)[] কিছু ঢুকিয়ে দেওয়ার সুযোগ না মেলে।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহতায়ালা এই কাজের জন্য নিজের যে ফেরেশতাকে নির্বাচিত করেছেন, কুরআনে তার গুণ বর্ণনা করা হয়েছে — ذِيْ قُوَّةٍ (শক্তিশালী), মান্যবর, প্রবল, বিশ্বস্ত এবং عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِيْنٍ [আরশের অধিপতির নিকট মর্যাদাশীল] হিসেবে। অর্থাৎ সেই ফেরেশতা এমন শক্তিশালী যে, অপবিত্র আত্মাগুলো তাকে পরাভূত করতে পারে না, তিনি সমস্ত ফেরেশতাদের সর্দার, তিনি কোনো কিছু ভুলতে পারেন না। আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে যে আমানত তার হাতে সোপর্দ করা হয়, তিনি তা একেবারে ঠিকঠাক আদায় করেন। সাধ্য নেই যে, তাতে জের-জবরেরও পার্থক্য ঘটে যাবে। তিনি আল্লাহতায়ালার নিকট অত্যন্ত নিকটবর্তী, যা এই কথার দলিল যে — তিনি নিজের যোগ্যতার বিচারে সমস্ত সৃষ্টিজগত থেকে শ্রেষ্ঠ। স্বাভাবিকভাবেই এই ব্যবস্থাও এজন্যই করা হয়েছে যেন কুরআনে তার উৎসের দিক থেকে কোনো বাতিলের অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা বাকি না থাকে।
তৃতীয়ত, আল্লাহতায়ালা এই আমানত বহনের জন্য যে মানুষকে নির্বাচিত করেছেন, প্রথমত তিনি প্রতিটি দিক থেকে নিজেই সৃষ্টির সেরা ছিলেন, দ্বিতীয়ত কুরআন মনে রাখা এবং এর সংরক্ষণ ও বিন্যাসের দায়িত্ব আল্লাহতায়ালা কেবল তার ওপর দেননি, বরং এই দায়িত্ব নিজের ওপর নিয়েছেন। সুতরাং সুরা কিয়ামা-তে বলা হয়েছে: لَا تُحَرِّكْ بِهٖ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهٖ. اِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهٗ وَقُرْاٰنَهٗ. فَاِذَا قَرَاْنٰهُ فَاتَّبِعْ قُرْاٰنَهٗ. ثُمَّ اِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهٗ (আর তুমি এই কুরআন হাসিল করার জন্য তোমার জিহ্বাকে দ্রুত চালিও না, আমাদের ওপর রয়েছে এর সংকলন ও এর শোনানোর দায়িত্ব। তো যখন আমরা একে শুনিয়ে দেব, তখন এই শোনানোর অনুসরণ করো, এরপর আমাদের জিম্মায় রয়েছে এর ব্যাখ্যা)[]। রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত যে, যতটুকু কুরআন নাজিল হতো, তা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তার নিকটবর্তী সাহাবিরা মনেও রাখতেন এবং প্রতি রমজানে হযরত জিব্রাইলের সাথে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার পুনরাবৃত্তিও করতেন যাতে কোনো ভুল বা বিস্মৃতির আশঙ্কা না থাকে; আর এই পুনরাবৃত্তি সেই ক্রম অনুযায়ী হতো, যে ক্রমে আল্লাহতায়ালা কুরআনকে বিন্যস্ত করা পছন্দ করেছেন। এটাও বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার পবিত্র জীবনের শেষ রমজানে এই পুনরাবৃত্তি দুইবার করেছিলেন। এরপর এই ক্রম ও এই তিলাওয়াত অনুযায়ী পুরো কুরআন লিপিবদ্ধ করা হয় এবং পরবর্তীতে খুলাফায়ে রাশেদিন এর প্রতিলিপিগুলো সাম্রাজ্যের অন্যান্য শহরগুলোতে পাঠিয়ে দেন। এই ব্যবস্থা পূর্ববর্তী সহিফাগুলোর কোনোটির ভাগ্যেই জোটেনি। এমনকি তাওরাত সম্পর্কে তো এই জ্ঞানও কারো নেই যে, এর বিভিন্ন সহিফা কোন যুগে এবং কাদের হাতে সংকলিত হয়েছে।
চতুর্থত, কুরআন তার শব্দের প্রাঞ্জলতা ও অর্থের সাবলীলতার বিচারে মুজিজা; যার কারণে বাইরের কারো কালাম [বা কথা] এর সাথে যুক্ত হতে পারে না। এমনকি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিজের কালামও কুরআনের মোকাবিলা করতে পারে না, যদিও তিনি এই কুরআনের বাহক এবং আরব ও অনারবদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বাগ্মী। এই কারণে এই বিষয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই যে, বাইরের কারো কালাম এর সাথে মিশ্রিত হতে পারবে। সুতরাং যেসব দাবিদার কুরআনের চ্যালেঞ্জের জবাব দেওয়ার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল, তাদের সেই অসার কথার নমুনা সাহিত্য ও ইতিহাসের কিতাবগুলোতে বিদ্যমান আছে। আপনি সেগুলোকে কুরআনের বিপরীতে রেখে তুলনা করে দেখুন, দুটির মধ্যে রত্ন ও সাধারণ পাথরের [মতো আকাশ-পাতাল] পার্থক্য নজরে আসবে। এভাবে যেন পিছন থেকেও (وَمِنْ خَلْفِهٖ)[] কুরআনে অনধিকার প্রবেশের পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
পঞ্চমত, কুরআনের সংরক্ষণের সাথে সাথে আল্লাহতায়ালা কিয়ামত পর্যন্ত কুরআনের ভাষার সংরক্ষণেরও ওয়াদা করেছেন। অন্যান্য আসমানি কিতাবগুলোতে সেগুলোর মূল ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কারণে অনুবাদের মাধ্যমে অসংখ্য বিকৃতি সেগুলোতে ঢুকে পড়েছে, যেগুলোর আসল রূপের সন্ধান এখন অসম্ভব; কিন্তু কুরআনের মূল ভাষা সংরক্ষিত আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে। এই কারণে অনুবাদ ও তাফসিরের মাধ্যমে কুরআনে কোনো বাতিলের ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা নেই। যদি তাতে কোনো বাতিলকে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তবে বিজ্ঞজনেরা মূলের সাথে যাচাই করে তা ছেঁটে আলাদা করতে পারেন।”
(তাদাব্বুরে কুরআন, ৭/২১১)
তৃতীয় আপত্তি — ধর্ম যে খোদাকে মানার দাওয়াত দেয়, তাঁর আচরণ অত্যন্ত নিষ্ঠুর। তিনি শিশুদের পর্যন্ত রোগ ও কষ্টে কাঁদিয়ে কাঁদিয়ে মেরে ফেলেন, লক্ষ লক্ষ ও কোটি কোটি প্রাণীকে প্রতিদিন মানুষের মাধ্যমে জবাই করান এবং অন্য প্রাণীদের দিয়ে ছিঁড়ে খাওয়ান, তিনি কোনো খুনি ও জালেমের হাত ধরেন না, বরং তাদের জুলুম ও অন্যায়ের সুযোগ দেন, অসংখ্য সৃষ্টি কেবল এই জন্য তৈরি করেন যেন মানুষ তাদের পোষ মানায় এবং নিজেদের অনুগত বানায়, আর তাদের প্রতিটি জিনিসকে নিজেদের কাজে লাগায়, এমনকি স্বয়ং মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিগ্রহে উদ্বুদ্ধ করেন এবং তার ওপর পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। শুধু তাই নয়, তাঁর বানানো এই দুনিয়াও প্রতিটি বিচারে নিখুঁত নয়। এতে ভূমিকম্প আছে, বজ্রপাত আছে, দুর্ভিক্ষ আছে, দুঃখ-বেদনা আছে, আর শুধু তাই নয়, কিছু কিছু জায়গায় ত্রুটিও দেখানো যেতে পারে। এরপর কীভাবে মানা যায় যে, তিনি কোনো পরম দয়ালু ও পরম করুণাময় এবং সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময় সত্তা, যাঁর চিন্তা সীমাহীন এবং ক্ষমতা অসীম?
এই আপত্তির উত্তর কুরআন এইভাবে দিয়েছে যে, খোদার পূর্ণতা ও তাঁর প্রতাপ ও সৌন্দর্যের গুণাবলির প্রকাশ মূলত যে জগতে হতে হবে, তা এখনও অদৃশ্যের অন্তরালে রয়েছে এবং মানুষকে সেই জগতের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। এই মুহূর্তে যে বিশাল মহাবিশ্ব এবং তার কোটি কোটি ছায়াপথ, আপাতদৃষ্টিতে রুক্ষ-শুষ্ক মানুষের সামনে ছড়িয়ে আছে, এসবই সেই জগতের নির্মাণ সামগ্রী এবং নির্মাণ সামগ্রীর মতোই অসীম শূন্যতায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কুরআন বলেছে যে, সেই দিন আর বেশি দূরে নয়, যখন একে অন্য এক জমিন ও আসমানে বদলে দেওয়া হবে এবং সবাই একক ও প্রবল প্রতাপশালী আল্লাহর সামনে বেরিয়ে আসবে।[] এরপর একটি নতুন জগত অস্তিত্বে আসবে, যার বিস্তৃতি হবে পুরো মহাবিশ্বের বিস্তৃতির সমান। সেটা খোদার রাজত্ব এবং রহমত ও অনুগ্রহের জগত। আমরা যে জগতে চেতনার চোখ খুলি, এটা তারই ভূমিকা। একে না বিচারের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, আর না পূর্ণতার প্রকাশের জন্য। এর উদ্দেশ্য কেবল পরীক্ষা। এমনকি জিন ও ইনসান (মানুষ) সবাই পরীক্ষার ময়দানে আছে। বলা হয়েছে:
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا ۚ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ
“তিনিই সেই সত্তা, যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যেন তোমাদের পরীক্ষা করেন যে, তোমাদের মধ্যে কে আমলে বেশি ভালো। আর তিনি পরাক্রমশালীও এবং ক্ষমাশীলও বটে।”
(কুরআন, সুরা মুলক, ৬৭: ২)
সুতরাং এরই ফল যে, জীবন মৃত্যু থেকে, সুখ দুঃখ থেকে, আনন্দ বেদনা থেকে, তৃপ্তি অস্থিরতা থেকে, স্বস্তি কষ্ট থেকে এবং নেয়ামত এই দুনিয়ায় কখনো আপদ থেকে আলাদা হয় না। এগুলোকে জোড়ার মতো একে অপরের সাথে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এটা অতীতের অনুশোচনা এবং ভবিষ্যতের আশঙ্কার জগৎ। মানুষকে যা কিছু জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করা হয়েছে, তা এই বাস্তবতাকে বোঝার জন্যই দেওয়া হয়েছে। কুরআনের বক্তব্য হলো: আসল হিকমত এটাই এবং যে এই হিকমতকে পেল, সে মূলত প্রভূত কল্যাণের এক ভাণ্ডার পেল।[] কারণ, এরই মাধ্যমে মানুষ নিজের জ্ঞানের সীমা চিনতে পারে এবং খোদাকে দায়ী করার পরিবর্তে তাঁর সামনে অক্ষমতা স্বীকারের সাথে সাথে তাঁর পরিকল্পনা বোঝার চেষ্টা করে এবং প্রতিটি মুহূর্ত প্রার্থনারত থাকে যে: رَبِّ زِدْنِيْ عِلْمًا (হে প্রতিপালক, আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দেন)[]। বিজ্ঞান ও দর্শনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এই প্রজ্ঞা থেকে বঞ্চিত হওয়া। খোদার ওপর এই আপত্তি এরই কারণে তৈরি হয় এবং মানুষকে চিরদিনের জন্য সেই অন্ধকারের হাতে সোপর্দ করে দেয়, যার সামনে আর কোনো আলো নেই।
চতুর্থ আপত্তি — মানুষের শৈশবকালে হয়তো তার ধর্মের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু এখন সে বিবেকবান ও প্রাপ্তবয়স্ক; সে অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, অনুসন্ধান ও তথ্য উপাত্তের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তিতে নিজের জ্ঞান এবং বিজ্ঞানের মাধ্যমে প্রতিটি সমস্যা সমাধানের চাবিকাঠি আবিষ্কার করেছে। সে নিজের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা মহাবিশ্বকেও অনেকটা বুঝতে শুরু করেছে, আর সে সমাজের সুশৃঙ্খল বিন্যাস এবং রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রয়োজনে অত্যন্ত উচ্চ আদর্শের ওপর ভিত্তি করে সামাজিক কাঠামো তৈরি করেছে এবং [এমন সব] প্রতিষ্ঠান গড়েছে, যেগুলো দেখে আন্দাজ করা যায় যে — মানুষের নিজের জ্ঞান সেই শরিয়তগুলোর মুকাবিলায় কতটা উচ্চ ও উন্নত, যার বেড়ি সে ধর্মের নামে শত শত বছর ধরে নিজের গলায় দিয়ে রেখেছিল। এরপর কে আছে, যে এই শরিয়তগুলোকে কোনোভাবেই গ্রহণ করতে প্রস্তুত হবে?
এই আপত্তির উত্তরে বলা যায় যে, এ ধরনের তুলনা কেবল তারাই করতে পারে, যারা ধর্ম সম্পর্কে একেবারেই অনভিজ্ঞ। কারণ, ধর্মের হেদায়েত এগুলোর কোনোটির জন্যই কখনো দেওয়া হয়নি। ধর্মের হেদায়েত এজন্য নাজিল করা হয়নি যে, মানুষকে বিজ্ঞানের সূত্র বোঝাবে; এজন্যও নয় যে, তার চিকিৎসাগত প্রয়োজন পূরণ করবে; আর এজন্যও নয় যে, সমাজের সুশৃঙ্খল বিন্যাস এবং রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রয়োজনে তাকে সামাজিক কাঠামো তৈরি করা বা প্রতিষ্ঠান বানানো শেখাবে। সুতরাং মানুষ এই দুনিয়ায় এসে যা কিছু করেছে, তা মানুষকেই করতে হতো; তার স্রষ্টা এর জন্য তাকে অসাধারণ শক্তি ও যোগ্যতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।
ধর্মের উদ্দেশ্য হলো: মানুষের জ্ঞান ও আমল এবং তার ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনের পরিশুদ্ধি (তাজকিয়া)।
ধর্মের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর মধ্যে ‘শরিয়ত’ পরিভাষাটি যেসব বিষয়ের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো হলো — ইবাদত, দেহ পবিত্র করার বিধান, পানাহারের পবিত্রতা এবং চরিত্র পরিশুদ্ধির নির্দেশনা। আর এসব জিনিসও মূলত এই দুনিয়ার জন্য নয়, বরং আখিরাতের [সাফল্যের] জন্য কাম্য।
খোদার ফয়সালা হচ্ছে — তাঁর জান্নাত কেবল সেই মানুষের জন্য, যারা [নিজেদের মাঝে] এই পরিশুদ্ধি অর্জন করবে।
এর বাইরে ধর্মের অন্য কোনো বিষয়ে কোনো আগ্রহ নেই। এই কারণে, খোদার শরিয়তকে বুঝতে হলে শরিয়তের এই উদ্দেশ্য এবং এই লক্ষ্য অনুসারেই বুঝতে হবে। এর প্রয়োজনীয়তার ফয়সালাও অবশ্যই এই বিচারে হতে হবে এবং দুনিয়াবি জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এর মর্যাদা ও গুরুত্বও এই নিরিখেই নির্ধারিত হবে। সুতরাং দেখুন, বলা হয়েছে:
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ
“তিনিই উম্মিদের মাঝে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ করেন, আর এর জন্য তাদেরকে কানুন ও হিকমত শিক্ষা দেন। বাস্তবতা এই যে, এর আগে এই লোকগুলো স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় ছিল।”
(কুরআন, সুরা জুমুআ, ৬২: ২)






