মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহি (রহ.) — এক অনন্য জ্ঞানসাধকের স্মরণে স্মৃতিচারণে: আব্দুর রশিদ সিদ্দিকি

ড. শেহজাদ সেলিম·১/১/২০২৪

কুরআন গবেষণার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহি। ১৫ ডিসেম্বর ১৯৯৭ তারিখে পাকিস্তানের লাহোরে ৯৩ বছর বয়সে তার ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে জ্ঞানাকাশের এক বিশাল অধ্যায়ের অবসান ঘটে। তবে আসমানি কিতাবের বিষয়বস্তুর অভ্যন্তরীণ বিন্যাস ও সামঞ্জস্য তথা নাজম তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে বিকশিত তার অনন্য পদ্ধতির জন্য তিনি দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ঐতিহাসিকভাবে কুরআনের সামঞ্জস্যের ধারণাটি প্রাচীন ও আধুনিক বিভিন্ন স্কলারদের লেখায় সব সময়ই বিদ্যমান ছিল; কিন্তু আধুনিক যুগে ইসলাহির প্রখ্যাত শিক্ষক ও বরেণ্য মনীষী ইমাম হামিদুদ্দিন ফারাহি (রহ.) প্রথম এটাকে তার গবেষণার মূল কেন্দ্রে পরিণত করেন এবং এই বিষয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করেন।

ফারাহির অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র এবং পরবর্তীতে শিবলী নুমানি ও ফারাহির সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘মাদরাসাতুল ইসলাহ’-এর প্রধান শিক্ষক আমিন আহসান ইসলাহি কুরআনের অভ্যন্তরীণ বিন্যাস ও সামঞ্জস্য সম্পর্কে ফারাহির ধারণাটি পূর্ণাঙ্গভাবে আয়ত্ত করেন এবং এই ঘরানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। যেখানে শিক্ষক কিছু বিচ্ছিন্ন লেখা রেখে গিয়েছিলেন — যার অধিকাংশই ছিল আরবিতে এবং সাধারণ পাঠকদের নাগালের বাইরে — সেখানে তার মেধাবী শিষ্য তার বিশাল নয় খণ্ডের উর্দু তাফসির ‘তাদাব্বুরে কুরআন’-এর মাধ্যমে এই বিষয়টি বিকশিত, বিশদ এবং ব্যাখ্যা করেছেন।

মাওলানা ইসলাহি ১৯০৪ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের আজমগড় জেলার ভামহুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রচলিত ধর্মীয় ব্যবস্থার অধীনে কুরআন, হাদিস এবং আরবি ভাষা ও সাহিত্যে তার ইসলামি শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তার সমসাময়িক অনেক স্কলারের মতো তিনিও ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং কিছু সময়ের জন্য স্থানীয় কংগ্রেস পার্টির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অন্যান্য ওলামাদের মতো তার কাছেও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ থেকে ভারতের এবং ফলশ্রুতিতে মুসলমানদের স্বাধীনতা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৩০-এর দশকের শুরুতে মাওলানা মওদুদি কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ দ্বারা প্রতিনিধিত্বকারী ‘জাতীয়তাবাদী’ রাজনীতির একটি সমালোচনা তৈরি করেন এবং ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে তুলে ধরতে একটি নিবেদিত ইসলামি দল গঠনের আহ্বান জানান। এর ফলে ১৯৪১ সালে জামায়াতে ইসলামি গঠিত হয় এবং ইসলাহি ছিলেন এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। যখন কিছু মানুষ সামান্য মতপার্থক্যের কারণে জামায়াত ত্যাগ করেন, তখন ইসলাহি মন্তব্য করেছিলেন বলে জানা যায়: ‘মওদুদীর দাড়ির দৈর্ঘ্য নিয়ে ইসলামের ভবিষ্যৎ বিপন্ন করার মতো গোঁড়ামি আমার নেই।’

জামায়াতের মাঝে ইসলাহির অবস্থান ছিল মওদুদির ঠিক পরেই; এবং তাকে সাধারণত মওদুদির উত্তরসূরি হিসেবে গণ্য করা হতো। একজন সুবক্তা হিসেবে ইসলাহি জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিলেন, কিন্তু তার মন কখনোই রাজনীতিতে ছিল না। এমনকি তার সবচেয়ে সক্রিয় দিনগুলোতেও তিনি রাজনীতি উপভোগ করেননি। কিছু নীতিগত পার্থক্যের কারণে ১৯৫৮ সালে তিনি জামায়াত ত্যাগ করেন।

তিনি নির্বাচনী প্রচারণাকে ইসলামি পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে একটি নিরর্থক অনুশীলন বলে মনে করতেন। তার মতে, রাজনীতিবিদরা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না; তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো যেকোনো উপায়ে ক্ষমতা লাভ করা। আর যদি কিছু লোক ইসলামের নাম ব্যবহার করে, তবে তারা তা করে তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য।

ইসলাহি লিখেছেন, ইসলামি দাওয়াত তাবলিগ এবং শাহাদাত (সাক্ষ্য— অর্থাৎ অন্যের নিকট যা প্রচার করা হয় এবং নিজে সেটার উপর আমল করা)-এর ওপর নির্ভর করে, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান হাতিয়ার হলো তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার।

‘প্রোপাগান্ডা’ এবং ‘তাবলিগ’ শব্দের পার্থক্য কেবল শব্দার্থের নয়, বরং তাদের আদর্শের দিক থেকেও তারা আসমান-জমিন তফাত। তাবলিগের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর বাণীকে বিশ্বস্ততার সাথে তার সঠিক রূপে পূর্ণাঙ্গভাবে পৌঁছে দেওয়া, আর প্রোপাগান্ডার লক্ষ্য হলো সঠিক বা ভুল সব উপায়ে আন্দোলনকে সফল করা। প্রোপাগান্ডা হলো আধুনিক রাজনৈতিক আন্দোলন দ্বারা বিকশিত একটি শিল্প এবং এর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, সেই সমস্ত নৈতিক বাধ্যবাধকতার প্রতি উদাসীনতা, যা আল্লাহর নবীগণ সর্বদা ইসলাম এবং ইসলামি জীবনধারা প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

যদিও ইতিহাসে কেবল মিস্টার গোয়েবলস তার প্রোপাগান্ডা দক্ষতার জন্য কুখ্যাত, তবে ন্যায়বিচারের খাতিরে আমরা দেখি যে, রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায় সবাইকেই তার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হয়; এবং কেউ রাজনীতির ব্যানারে তা করুক বা ধর্মের নাম ব্যবহার করুক বা ময়দানে প্রবেশের সময় ইসলামের কালিমা পাঠ করুক না কেন, এতে খুব একটা পার্থক্য হয় না।

তিনি পরামর্শ দেন যে, যারা ইসলামের পুনর্জাগরণের জন্য কাজ করতে চান, তাদের উচিত ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, ভোট অর্জন বা রাজনৈতিক চালবাজি ছাড়াই নিঃস্বার্থভাবে মানুষের মাঝে কাজ করা। তাদের উচিত মানুষের কাছে পৌঁছানো কেবল তাদের সেবা করার জন্য, তাদের শিক্ষিত করার জন্য এবং তাদের জীবনকে নৈতিক ও ইসলামিভাবে সংশোধন করতে সাহায্য করার জন্য।

তার দৃষ্টিতে পাকিস্তানি সমাজ ছিল একটি ভেঙে পড়া ও বিচ্ছিন্ন সমাজ, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক ব্যাধি: মুনাফেকি (ভণ্ডামি)-তে আক্রান্ত। সেই হিসেবে তিনি এই মতের সাথে দ্বিমত পোষণ করতেন যে, যদি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, তবে সাধারণ মানুষ ইসলাম এবং ইসলামি দলগুলোকে ভোট দেবে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই যখন এর নেতারা একে একটি আদর্শ ইসলামি রাষ্ট্র বানানোর প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছিলেন বলে মনে হচ্ছিল, তখন ইসলাহি লিখেছিলেন: ‘মুনাফেকি একটি মারাত্মক রোগ এবং প্রতিটি যুগে ও সমাজে কিছু লোক এতে আক্রান্ত ছিল, কিন্তু আমরা ইতিহাসে এমন একটি জাতিরও দেখা পাই না, যাদের নেতারা একে জাতীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং একেই তাদের সকল সমস্যার সমাধানের চাবিকাঠি হিসেবে মনে করেছেন। ইতিহাসে সম্ভবত এমন একটি জাতিই আছে, আর দুর্ভাগ্যবশত সেটি আমাদের জাতি।’

তার ‘পাকিস্তানি আওরাত দো রাহে পার’ বইতে তিনি পাকিস্তানি নেতৃত্বের এ ধরনের দ্বিমুখী সামাজিক নীতির অন্তর্নিহিত বিপদগুলো ব্যাখ্যা করেছেন, যা নারী এবং মুসলমানদের পারিবারিক ব্যবস্থার প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকাশ পায় — যা সম্ভবত তাদের মুনাফেকির সেরা উদাহরণ। ‘আমাদের দৃষ্টিতে, সুস্থ জাতীয় জীবনের জন্য এটা অপরিহার্য যে, নেতাদের উচিত তাদের জনগণকে দৃঢ়ভাবে এবং একাগ্রচিত্তে সেই নীতিগুলোর দিকে আহ্বান করা, যা তারা অনুসরণ করতে চায়; কিন্তু বাস্তবে এক পথ অনুসরণ করা এবং বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথের সৌন্দর্য বর্ণনা করা একটি অত্যন্ত বোকামি পূর্ণ নীতি, যা থেকে ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।’

তার সামাজিক বিশ্লেষণের আলোকে ইসলাহি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, বর্তমান পাকিস্তানি সমাজকে একটি প্রাণবন্ত এবং প্রগতিশীল ইসলামি রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার জন্য কোনো ভাসা-ভাসা সংস্কার প্রচেষ্টা সফল হবে না। তার আগে মওদুদির মতো তিনিও মনে করতেন যে, কুরআনি শিক্ষার আলো ও নির্দেশনায় একটি ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক রূপান্তর যেকোনো প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য অপরিহার্য পূর্বশর্ত।

ইসলাহি নিজে দেখেছিলেন কীভাবে মওদুদির জামায়াত — যেকোনো প্রকৃত ইসলামি পরিবর্তনের জন্য একটি প্রয়োজনীয় শর্ত হিসেবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখায় একটি পূর্ণাঙ্গ বুদ্ধিবৃত্তিক রূপান্তরের প্রাথমিক ও স্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও — খুব শীঘ্রই পাকিস্তানি রাজনীতির আবর্তে পড়ে যায়।

তিনি এই বিপদ সম্পর্কে সতর্ক ছিলেন এবং জামায়াত ছাড়ার কিছুকাল পরেই তিনি মওদুদির অসমাপ্ত বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ সম্পন্ন করার জন্য একাগ্রচিত্তে মনোনিবেশ করেন। তার সমস্ত সময় এবং শক্তি ব্যয় হয়েছিল অধ্যয়ন, একদল শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদান এবং তার শ্রেষ্ঠ কাজ ‘তাদাব্বুরে কুরআন’ সম্পন্ন করার পিছনে। এটা কুরআনের একটি তাফসির, যা তিনি ইসলামের ভবিষ্যতের যেকোনো কাজের জন্য কেন্দ্রীয় রেফারেন্স হিসেবে বিবেচনা করতেন।

১৬ বছর সময় দেওয়ার পর জামায়াত ত্যাগ করা ছিল একটি বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। কিন্তু তিনি সেই ইসলামি আদর্শের প্রতি তার প্রতিশ্রুতিতে অটল ছিলেন, যা তাকে শুরুতে জামায়াতে নিয়ে গিয়েছিল। এখন তিনি তার নিজের অবস্থান ও প্রতিভা এবং সমাজের প্রয়োজনগুলো পুনরায় মূল্যায়ন করার একটি নতুন সুযোগ পেয়েছেন এবং তিনি তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে করা বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেন: কুরআনের বাণীকে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা যাতে বিশ্বব্যাপী প্রকৃত ইসলামি রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণের পথ প্রশস্ত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার চিন্তা ও পদ্ধতি তার নিজের দেশ এবং দেশের বাইরে (পাশ্চাত্যসহ) শিক্ষিত শ্রেণির মনোযোগ আকর্ষণ করতে সফল হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে তার মূল্যায়ন সঠিক ছিল।

যখন এই লেখক ১৯৬৩ সালে লাহোরে ইসলাহির স্টাডি সার্কেলে যোগ দেন, তখন তাকে মনে হচ্ছিল তিনি যেন খুব তাড়াহুড়োর মধ্যে আছেন; কাজের জন্য কতটা সময় বাকি আছে তা নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন না এবং চিন্তিত ছিলেন পাছে তার মহান শিক্ষকের কাছ থেকে পাওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক আমানত চিরতরে হারিয়ে না যায়। তিনি প্রায়ই বলতেন: ‘মনোযোগ দিয়ে শোনো, পরে চিন্তা করার জন্য অনেক সময় পাবে।’

মাওলানা ইসলাহি সম্পূর্ণভাবে কুরআন অধ্যয়নে নিমগ্ন ছিলেন। তার ছাত্ররা ছিল তার এই কঠোর পরিশ্রমের সুফলভোগী। তার নসিহত ছিল: ‘একটি সুরা বারবার অধ্যয়ন করো, যতক্ষণ না চোখ বন্ধ করলে তুমি তোমার মনের চোখে এর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পূর্ণ জৌলুস স্পষ্ট দেখতে পাও।’

তার অধীনে সাত বছর অধ্যয়নকালে আমি মাওলানা ইসলাহিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল, বিনয়ী এবং যত্নশীল, স্পষ্টভাষী কিন্তু যুক্তিপূর্ণ এবং আন্তরিক ও স্নেহশীল হিসেবে পেয়েছি। যে কেউ তার সাথে দেখা করতে এলে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করত এবং তার পূর্ণ মনোযোগ পেত; তিনি মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করতেন না। সাহিত্য, কবিতা, সামাজিক বিজ্ঞান এবং মানব মনোবিজ্ঞানের ওপর তার অগাধ জ্ঞান যেকোনো সাধারণ আলোচনা বা আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন প্রশ্নকেও একটি চমৎকার শিখন অভিজ্ঞতায় পরিণত করত, যার রেশ দীর্ঘকাল থেকে যেত।

১৯২৫ সালে ইসলাহি প্রখ্যাত কুরআন গবেষক ইমাম হামিদুদ্দিন ফারাহি (রহ.)-এর সান্নিধ্যে আসেন, যা তার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। পরবর্তী পাঁচ বছরে তিনি তার শিক্ষকের কাছ থেকে কুরআনের অভ্যন্তরীণ বিন্যাস ও সামঞ্জস্যের বিষয়টি আয়ত্ত করেন এবং কুরআন ও এতে নিহিত হিকমত বা প্রজ্ঞা বোঝার কৌশল ও পদ্ধতি রপ্ত করেন। ফারাহির মতে যার মূল ভিত্তি ছিল এর অনন্য সামঞ্জস্য ও সুসংহতি।

কুরআন এবং এর অংশগুলোর মধ্যে বিন্যাসের উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। এই ঐতিহ্য সরাসরি আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পর্যন্ত পৌঁছায়, যার কাছে প্রতি রমজানে জিব্রাইল (আলাইহিস সালাম) আসতেন এবং তার সাথে পুরো কুরআন তিলাওয়াত করতেন। একইভাবে যখনই কোনো ওহি নাজিল হতো, আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার সাহাবিদের নির্দেশ দিতেন সেটা কিতাবের কোথায় রাখতে হবে। সেই হিসেবে কুরআন যে একটি সুবিন্যস্ত কিতাব এবং এর একটি নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রয়েছে, তা মোটামুটিভাবে স্বীকৃত ছিল।

যাইহোক, প্রতিটি যুগে এটি অন্বেষণ এবং ব্যাখ্যা করা একটি কঠিন ও শ্রমসাধ্য কাজ। ফারাহি এবং ইসলাহি উভয়েই বিশ্বাস করেন যে, পূর্ববর্তী লোকেরা কুরআনের এই দিকের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দেননি, যা তাদের বুঝ অনুযায়ী কুরআনের সহজাত হিকমত ও বাণীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একবার যখন তারা এর গুরুত্ব অনুধাবন করেন, তখন ফারাহি এবং ইসলাহি কুরআনের বিস্ময়গুলো অধ্যয়ন ও ব্যাখ্যা করার জন্য তাদের জীবন উৎসর্গ করেন।

হামিদুদ্দিন ফারাহি (রহ.) আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালীন প্রথম এই বিশেষ দিকটির প্রতি আগ্রহী হন। তিনি এই বিষয়ে আরবিতে লিখেছেন এবং এই নীতিগুলোর আলোকে কিছু ছোট সুরার তাফসিরও লিখেছেন। এর মধ্যে কিছু পরবর্তীতে ইসলাহি উর্দুতে অনুবাদ করেন এবং ‘মাজমুআয়ে তাফাসিরে ফারাহি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

ফারাহির লেখাগুলো মূলত ইসলামি স্কলারদের উদ্দেশ্যে ছিল এবং এমন পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষায় লেখা ছিল, যা অধিকাংশ পাঠকের নাগালের বাইরে ছিল। ইসলাহি-ই তার মহান শিক্ষকের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করেন তার পদ্ধতি ও নীতির ওপর ভিত্তি করে পুরো কুরআনের একটি তাফসির লিখে। তিনি ১৯৫৮ সালে তার উর্দু তাফসির ‘তাদাব্বুরে কুরআন’ শুরু করেন এবং ১৯৮০ সালে তা শেষ করেন। তার ২৩ বছরের এই গবেষণায় প্রায় ছয় হাজার পৃষ্ঠা রয়েছে।

তার তাফাসিরে ইসলাহি বারবার তার শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন এবং বলেছেন যে, এটা সম্পূর্ণ তার কাছ থেকে শেখা বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এবং এর সমস্ত কৃতিত্ব ফারাহির। তবে বাস্তবতা হলো ইসলাহি তার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জ্ঞানের সাথে অনেক কিছু যোগ করেছেন। ফারাহি কিছু মৌলিক ধারণা ও নীতি দিয়েছিলেন কিন্তু তার দর্শনকে বাস্তবে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাননি।

ইসলাহির অসামান্য কীর্তি নিহিত রয়েছে তার ভাষা ও শৈলীতে, যা একই সাথে পাণ্ডিত্যপূর্ণ এবং একজন শিক্ষিত পাঠকের কাছে সহজবোধ্য। কাজের জটিলতা বিবেচনা করলে এটা কোনো ছোট অর্জন নয়। তার শিক্ষকের প্রতি ঘনঘন রেফারেন্স প্রদান কেবল তার প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাই প্রকাশ করে না, বরং এটা তার নিজের অকপট সততা ও বিনয়ও ফুটিয়ে তোলে।

ইসলাহির তাফসির তার কাজে কুরআন নিয়ে তার এবং তার শিক্ষকের এক শতাব্দীর চিন্তাভাবনা ও পরিশ্রমকে ধারণ করে। আলিগড়ে তার গবেষণামূলক অধ্যয়ন শুরু করে ফারাহি তার মৃত্যু পর্যন্ত পরবর্তী ৩০-৩৫ বছর তা চালিয়ে যান। একইভাবে ইসলাহি আমাদের বলেন যে, গত ৫৫ বছর ধরে কুরআন তার নিজস্ব চিন্তা ও অধ্যয়নের কেন্দ্রে রয়েছে। সুতরাং বইটি উভয়ের এক শতাব্দীর কঠোর পরিশ্রমের এক জীবন্ত দলিল।

ইসলাহির পদ্ধতি সরাসরি কুরআনের ওপর ভিত্তি করে। ফারাহি এবং ইসলাহি উভয়েই কুরআনকে কুরআনের সাহায্যেই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তারা কুরআনের ভাষা, নাজিল হওয়ার সময়ের প্রচলিত আরবি বাগধারা (ধ্রুপদী আরবি সাহিত্য), কিতাবের ভেতরে থাকা অভ্যন্তরীণ প্রমাণ এবং কুরআন যে বিভিন্ন রূপে ও প্রেক্ষাপটে নিজের অর্থ নিজেই ব্যাখ্যা করে — সেসবের ওপর গুরুত্বারোপ করেন:

‘এটা একটা কিতাব, যার আয়াতসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত [সুস্পষ্ট অর্থবহ] - অতঃপর প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ সত্তার পক্ষ থেকে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।’ (কুরআন, সুরা হুদ, ১১:১)

সর্বোপরি এই পদ্ধতিটি কুরআনের অভ্যন্তরীণ বিন্যাসকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় এবং পুরো তাফসিরের মূল উদ্দেশ্য হলো একে স্পষ্ট করা।

কুরআনের সামঞ্জস্য সম্পর্কে ইসলাহির ধারণা অনুযায়ী সমস্ত সুরা জোড়ায় জোড়ায় বিন্যস্ত, যেমনটা জীবনে জোড় রয়েছে। প্রতিটি সুরা একটি সুবিন্যস্ত ইউনিট, যার একটি নির্দিষ্ট থিম বা বিষয়বস্তু রয়েছে, একটি ভূমিকা রয়েছে, যা এর বাণী ও যুক্তির ব্যাখ্যার দিকে নিয়ে যায় এবং একটি উপযুক্ত উপসংহারের মাধ্যমে শেষ হয়। যেমন একটি সুরার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকে এবং এর সমস্ত আয়াত একে অপরের সাথে সম্পর্কিত ও চমৎকার সম্পর্কযুক্ত, তেমনি কুরআনের সুরাগুলোর মধ্যেও সামঞ্জস্য রয়েছে। ইসলাহি কুরআনে সুরার সাতটি পৃথক গ্রুপের কথা উল্লেখ করেছেন, যার প্রতিটির একটি নির্দিষ্ট থিম এবং নিজস্ব স্বাদ রয়েছে এবং সেখানে নিজ নিজ থিমের অত্যন্ত সাবলীল ব্যাখ্যা রয়েছে।

ইসলাহি মনে করেন যে, কুরআনকে সাতটি পৃথক গ্রুপে ভাগ করার বিষয়টি কুরআনের স্পষ্ট প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে। তিনি এই সাতটি কুরআনি গ্রুপের উপস্থিতির প্রমাণ হিসেবে কুরআনের বিখ্যাত একটি আয়াত (সুরা হিজর ১৫:৮৭) উল্লেখ করেন। তার মতে এই আয়াতটি ‘সাতটি বারবার পঠিত আয়াত’-এর পরিবর্তে এই সাতটি গ্রুপকে নির্দেশ করে। এটা তার কুরআন অধ্যয়নের পদ্ধতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হওয়ায় ইসলাহি তার এই মহৎ কর্ম জুড়ে কুরআনের সামঞ্জস্য ব্যাখ্যা করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রতিটি সুরার শুরুতে এর বিশেষ থিমের ব্যাখ্যা এবং বিষয়বস্তুর বিশ্লেষণ দেওয়া হয়েছে।

ইসলাহি বিশ্বাস করেন যে, তার তাফসিরে বর্ণিত নীতিগুলো বৈজ্ঞানিক, যুক্তিসঙ্গত এবং কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন, যা ছাড়া কুরআনের প্রকৃত বাণী ও সৌন্দর্য বোঝা বা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। নবম খণ্ডের ভূমিকায় তিনি বলেন যে, তিনি এই তাফসির কোনো বই লেখার আকাঙ্ক্ষা থেকে লেখেননি, বরং নিছক এবং কেবল কর্তব্যের আহ্বানে লিখেছেন।

‘যদিও আমাদের কাছে কুরআন আছে, কিন্তু এর প্রকৃত জ্ঞান নেই। কুরআন বরং সওয়াব হাসিল বা অন্যের জন্য দোয়ার মাধ্যমে পরিণত হয়েছে; একে একটি বাণিজ্যিক বস্তুতে রূপান্তর করা হয়েছে। যারা এটা নিয়ে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠে কথা বলে, তারাই এর জ্ঞান সম্পর্কে বেশি অজ্ঞ এবং এটা থেকে দূরে... কিন্তু এই উম্মতকে যদি একটি জীবন্ত জাতি হিসেবে টিকে থাকতে হয়, তবে কেবল ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার পুনরাবৃত্তি যথেষ্ট হবে না, কিংবা কুরআনের নামের পুনরাবৃত্তিও কোনো কাজে আসবে না। বরং এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কুরআনের সঠিক বোধ ও জ্ঞান ব্যাখ্যা করা এবং প্রচার করা। যাদের কাছে এর প্রকৃত জ্ঞান থাকবে, তারাই সঠিকভাবে আমল করতে পারবে এবং কেবল তাদের প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই উম্মত তার সমস্ত রোগের প্রতিকার খুঁজে পাবে।’

যারা নিয়মিত কুরআন অধ্যয়নে তার পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন, তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে দ্বিধাহীনভাবে বলা যায় যে, ইসলাহি কুরআনের সামঞ্জস্য এবং অভ্যন্তরীণ বিন্যাস ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে এর অফুরন্ত ভাণ্ডার উন্মোচনের চাবিকাঠি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। তিনি আমাদের আল্লাহর কিতাব অধ্যয়ন ও বোঝার জন্য এবং এর প্রজ্ঞা অন্বেষণ ও আত্মস্থ করার জন্য একগুচ্ছ নিয়ম ও নীতি প্রদান করেছেন। ইসলাহি একজন প্রথযশা লেখক ছিলেন; তার ১৬টিরও বেশি কালজয়ী গ্রন্থ রয়েছে।

১৯৫১ সালে পাঞ্জাবে কাদিয়ানি বিরোধী আন্দোলনের সময় মাওলানা ইসলাহি, মাওলানা মওদুদি এবং মিয়া তোফায়েল মুহাম্মদের সাথে জেলজীবন অতিবাহিত করেন। ১৯৫৬ সালে যখন পাকিস্তান সরকার ইসলামি আইন কমিশন গঠন করে, তখন মাওলানা ইসলাহি — যিনি ইসলামি আইনের একজন বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ ছিলেন — সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যতক্ষণ না ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর কমিশনটি বিলুপ্ত হয়।

মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহি মৃত্যুকালে দুই পুত্র ও দুই কন্যা রেখে গেছেন। তিনি একদল নিবেদিতপ্রাণ শিষ্যও রেখে গেছেন, যারা তার মহৎ মিশনকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে সংকল্পবদ্ধ। তার এই বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার উম্মতের জন্য এক অনন্য আমানত।

GCIL Bangla

Visit us

3624 Market St, Suite 5E

Philadelphia, PA 19104

Contact us via email

info@almawridus.org

Follow us

Copyright 2025, Ghamidi Center of Islamic Learning. All Rights Reserved. GCIL is an initiative of Al-Mawrid U.S. A 501(c)(3) tax-exempt organization in the U.S. Federal EIN: 46-5099190.