“আল-মাওরিদ সংস্কৃতি” আমাদের পৃষ্ঠপোষক
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম।
সর্বাগ্রে, আমি আমার অনুভূতিগুলো অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সাথে ব্যক্ত করতে চাই। এই মুহূর্তে আমি প্রবল লজ্জাবোধ করছি, এমনকি এই বরকতময় অনুষ্ঠানে আমার সম্পর্কে যা শুনলাম, তাতে আমি লজ্জায় মিশে যাচ্ছি। যা বলা হয়েছে, তা আমাকে ইমাম গাজালি (রহ.)-এর একটি অমূল্য বাণী স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, যা আজ আমার অবস্থার সবচেয়ে সঠিক বর্ণনা: “নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা আমার দোষগুলো গোপন রেখেছেন এবং আমার মধ্যে অনেক ত্রুটি রয়েছে, যা তিনি তাঁর অনুগ্রহে ঢেকে রেখেছেন; তবে তিনি তাঁর করুণায় আমার একটি ভালো দিক প্রকাশ করেছেন, তাই সেটা প্রকাশ পেয়েছে।”
আল্লাহর কসম, এটাই আমার বাস্তবতা; আমার কতই না ত্রুটি ও বিচ্যুতি রয়েছে, যা আল্লাহর পর্দা ঢেকে রেখেছে এবং আমার কতই না অল্প গুণ রয়েছে, যা তাঁর অনুগ্রহ ও দান প্রকাশ করেছে। সুতরাং যা কিছু ভালো তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর যা কিছু ত্রুটি তা আমার পক্ষ থেকে এবং আমার দুর্বলতা।
প্রকৃতপক্ষে মানুষের সারসত্তা তার নৈতিক সত্তার মধ্যেই প্রকাশ পায়। আর এই নৈতিক অস্তিত্ব সর্বপ্রথম প্রকাশ পায় নিজের পরিবারের সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মীদের সাথে আচরণের মাধ্যমে। আমার স্ত্রী এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে এই প্রোগ্রামে অংশ নিচ্ছেন, তিনি আমার সম্পর্কে কিছু সৌজন্যমূলক ও কোমল শব্দ বলেছেন, অথচ বাস্তবতা এর ভিন্ন। তিনি প্রায়ই আমাকে সরাসরি বলেন, আর তিনি না বললেও আমি তার পক্ষ থেকে বলতাম: আপনি একজন ভালো মানুষ, কিন্তু আপনি একজন খারাপ স্বামী।
আমি স্পষ্টভাবে স্বীকার করছি যে, আমি আমার বিভিন্ন ভূমিকায় — সন্তান হিসেবে, ভাই হিসেবে এবং পিতা হিসেবে — যা করা উচিত ছিল, তা করতে পারিনি। এই নিকটাত্মীয়দের প্রতি যে শ্রম, যত্ন ও ত্যাগের প্রয়োজন ছিল, তা আমি যথাযথভাবে পালন করতে পারিনি। আজ যখন আমি ষাট বছরের কাছাকাছি, তখন আমি স্বীকার করছি যে, এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলোর হকের ব্যাপারে আমি ত্রুটি করেছি এবং যেভাবে হক আদায় করা উচিত ছিল, তা করতে পারিনি। এটা আমাকে অনুতপ্ত করে এবং আমি আল্লাহতায়ালার কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন এই ত্রুটিগুলো ক্ষমা করেন এবং আমার বিচ্যুতিগুলো মার্জনা করেন।
আজ আপনারা আমার যে কাজকে ‘সাফল্য’ বলছেন, যদি সত্যিই সেখানে কোনো সাফল্য থেকে থাকে, তবে সেটা একটি বিশেষ সংস্কৃতির ফল, যা মূলত “আল-মাওরিদ সংস্কৃতি”। তাই আমি এই ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’-টি আমার প্রতিষ্ঠান “আল-মাওরিদ”-কে উৎসর্গ করছি, যা আমাকে লালন করেছে, আগলে রেখেছে এবং আমার ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাগুলো প্রকাশের ও ধর্মের সেবায় তা নিয়োজিত করার সুযোগ করে দিয়েছে।
১৯৮৩ সালে “আল-মাওরিদ” প্রতিষ্ঠিত হয়, অতঃপর আল্লাহতায়ালার অশেষ মেহেরবানিতে ২০১৫ সালের পর এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং জার্মানিতে বিস্তৃত হয়েছে। এটা একটি অনন্য সংস্কৃতি বহন করে, যাকে আমি “আল-মাওরিদ সংস্কৃতি” বলতে পছন্দ করি। এই উপলক্ষে আমি এর কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে চাই।
১৯৮৮ সালে আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক জাভেদ আহমেদ গামিদি সাহেবের সাথে আমার পরিচয়ের সৌভাগ্য হয়। এর আগে আমি ধর্মীয় জ্ঞানের শিক্ষার্থী হওয়ার সংকল্প করেছিলাম, কিন্তু কোথা থেকে শুরু করব সেই প্ল্যাটফর্ম পাচ্ছিলাম না; কোনো ধর্মীয় মাদরাসায় যাওয়া আমার জন্য সম্ভব ছিল না, আবার ইসলামাবাদে আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াও সহজ বিকল্প ছিল না। সেই পরিস্থিতিতে যখন আমি ওস্তাদ গামিদির সাথে দেখা করলাম, তখন আমার সবচেয়ে বড় উপলব্ধি ছিল যে, “আল-মাওরিদ” এমন এক জায়গা, যা একজন ধর্মীয় জ্ঞানের শিক্ষার্থীকে তার সামর্থ্য ও আগ্রহ অনুযায়ী নিজেকে প্রকাশ করার এবং তার পছন্দের ক্ষেত্রে ধর্মের সেবা করার সুযোগ দেয়।
সেখানে কারো ওপর তাকলিদ (অন্ধ অনুকরণ) চাপিয়ে দেওয়া হয় না, চিন্তার ওপর কোনো বিধিনিষেধ নেই; বরং তাফসির, হাদিস, ফিকহ, ইতিহাস ও দাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের নিজের পছন্দমতো পথে চলার স্বাধীনতা রয়েছে। এটা আমাকে অনেক আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল, তাই আমি কুরআনকে আমার বিশেষ ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও অবদান রেখেছি। গত ৩৫ বছর ধরে আমি এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এটা সম্ভব হতো না, যদি প্রতিষ্ঠানটি আমার পথ সহজ না করত, সম্পদ সরবরাহ না করত এবং সেবার ক্ষেত্র নির্বাচনে আমাকে সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা না দিত।
আপনারা যদি পাকিস্তানের প্রচলিত সংস্কৃতির দিকে তাকান, তবে দেখবেন এমন একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পাওয়া বিরল, যা তার ছাত্রকে স্বাধীনভাবে নিজের আগ্রহ প্রকাশ করার সুযোগ দেয়, তার প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করে এবং তার মিশন পালনের জন্য উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেয়। আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি যে, তিনি আমাকে এই প্ল্যাটফর্ম দান করেছেন, যা আমার পথচলায় সবচেয়ে বড় নিয়ামত ছিল।
তাছাড়া, আমি ভুলতে পারি না যে, আমাদের প্রিয় ওস্তাদ গামিদি সাহেব সর্বদা আমাকে তার স্নেহ ও মমতা দিয়ে আগলে রেখেছেন। আমার মনে আছে, তিনি তার কিছু সিনিয়র ছাত্রকে বিশেষভাবে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, যাতে তারা তাদের সময় আমাকে শিক্ষাদানের জন্য বরাদ্দ করেন। আমি তাদের কাছ থেকে আরবি ও অন্যান্য শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জন করেছি এবং এটা আমার সংকল্পকে শক্তিশালী করতে এবং উদ্যমকে শাণিত করতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
একজন মানুষের সুযোগ পাওয়া হলো তার জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার, আর “আল-মাওরিদ” আমাকে সেই সুযোগ দিয়েছে। অনেক সময় মানুষের ভিতরে সত্যনিষ্ঠ ইচ্ছা থাকে কিন্তু সে পথ বা মাধ্যম খুঁজে পায় না। এখানে আগ্রহের সাথে সুযোগের মিলন ঘটেছে, আর আমার মতে এটাই আমাদের প্রতিষ্ঠানের অনন্য বৈশিষ্ট্য। “আল-মাওরিদ” আমাদের প্রত্যেক সহকর্মীর জন্য — যাদের কেউ এখানে উপস্থিত আছেন, কেউ ইন্টারনেটে যুক্ত আছেন — গবেষণা, শিক্ষা বা লেখালেখি, যে দিকেই তাদের ঝোঁক ছিল, সেখানে এগিয়ে যাওয়ার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে এবং সব ধরনের সমর্থন দিয়েছে। এই নিয়ামত শুধু আমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং যারা এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, তারা সকলেই এর সাক্ষী এবং আপনারা তাদের যে কাজগুলো দেখছেন তা-ই এর শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। তারা তাদের প্রিয় ক্ষেত্রে নিজেদের আগ্রহ প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন এবং এটাই হলো “আগ্রহের সংস্কৃতি”, যা আল-মাওরিদকে আলাদা করে।
দ্বিতীয় যে বৈশিষ্ট্যটি আমি এখানে পেয়েছি, তা হলো এই অনুভূতি জাগ্রত করা যে, মানুষের সারসত্তা তার আখলাক বা চরিত্র এবং ব্যক্তিত্বের শ্রেষ্ঠত্বের মাঝে নিহিত। চরিত্রের দুর্বলতা কোনো পরিমাণ শরিয়তি জ্ঞান দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। একজন মানুষকে আগে একজন নেককার মানুষ হতে হবে। এটাই আমাদের ওস্তাদ আমাদের বারবার শিখিয়েছেন, প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত মজলিসে। তিনি জোর দিয়ে বলতেন যে, ধর্মের মূল উদ্দেশ্য হলো: উত্তম চরিত্র এবং হৃদয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। এই অর্থটি আমাদের মনে এমনভাবে গেঁথে গিয়েছে যে, এটাই আমাদের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে, জ্ঞানের আগে ফজিলত (সদ্গুণ) এবং নৈতিক গঠনই হলো মূল ভিত্তি। একেই আমি “নৈতিক সংস্কৃতি” বলতে পছন্দ করি।
এই “নৈতিক সংস্কৃতি”-তে আমাদের নিজেদেরকে গঠন করতে হবে এবং নিজেদের অন্তরের গভীরে তাকাতে হবে, বাইরের দিকে নয়। যেমন বলা হয়: Don’t look outside, look within (বাইরে তাকিও না, নিজের ভেতরে তাকাও)। সক্রেটিসও এই দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন: নিজেকে জানো। এখান থেকেই প্রকৃত সংস্কার শুরু হয়, কারণ আত্ম-সমালোচনা ছাড়া কেউ তার অভ্যন্তরীণ মানবতাকে পরিশুদ্ধ করতে পারে না। একজন মানুষ নিজের হিসাব নেওয়ার ক্ষেত্রে যতটা সাহসী হবে, সে ততটাই নিজেকে সংশোধন ও মার্জিত করতে পারবে।
এই পথে কুরআন মাজিদের সাথে গভীর সম্পর্ক রাখা অপরিহার্য; কারণ অন্যের কর্মকাণ্ডে মগ্ন থাকা বা অন্যের ভুলকে নিজের দুর্বলতার অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করা কাম্য নয়, বরং নিজেদের ওপর মনোযোগ দিতে হবে। আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন:
“হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর তোমাদের নিজেদের দায়িত্ব। তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও, তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে, সে তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহর দিকেই তোমাদের সবার প্রত্যাবর্তন, অতঃপর তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন, যা তোমরা করতে।” (কুরআন, সুরা মায়েদা, ৫:১০৫)
আমাদের ওস্তাদ সর্বদা জোর দিতেন যে, প্রকৃত সফলতা হলো মানুষের অভ্যন্তরীণ পরিশুদ্ধির মাঝে এবং কুরআনই এই দায়িত্ব পালন করে। আমি তার কাছ থেকে এই মর্মে ইকবালের একটি পংক্তি শুনেছি:
“ইবলিসকে হত্যা করা কঠিন কাজ, কারণ সে হৃদয়ের গহীনে লুকিয়ে আছে। তার চেয়ে ভালো হবে তাকে মুসলমান (অনুগত) করে ফেলা, তাকে কুরআনের তলোয়ার দিয়ে কুপোকাত করা।”
এভাবে আমরা এই মাদ্রাসা থেকে শিখেছি যে, ইলম যদি চরিত্রের সাথে যুক্ত না হয়, তবে তা নুর না হয়ে বোঝায় পরিণত হয়। আত্ম-সমালোচনা, ক্রমাগত আত্ম-পর্যালোচনা এবং কুরআনের সাথে নিবিড় সম্পর্কই হলো উন্নতির সঠিক পথ। কুরআনই হলো উৎস, আর তাকওয়া ও আখলাক হলো প্রতিযোগিতার ময়দান: “আর এ বিষয়ে প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক।” যদি শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রতিযোগিতার কোনো ক্ষেত্র থাকে, তবে তা হলো তাকওয়া, আখলাক এবং আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্র; আর এখানেই আল্লাহর সান্নিধ্য ও তাওফিক লাভ হয়।
আমি আমার ওস্তাদের কাছ থেকে শিখেছি যে, আধার বা পাত্র যদি পবিত্র ও স্বচ্ছ হয়, তবে আল্লাহ তাতে তাঁর ইলম ঢেলে দেন; কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে তা যদি পবিত্র না হয়, তবে তাতে তাঁর নুর উপচে পড়বে না। এজন্য আমাদের নৈতিক অস্তিত্বের স্বচ্ছতা এবং অভ্যন্তরীণ পাত্রের পবিত্রতা রক্ষা করা আবশ্যক, কারণ এগুলোই ইলমের শর্ত এবং উপলব্ধির নুর। এটাই দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য যা আমি “আল-মাওরিদ সংস্কৃতি” থেকে শিখেছি।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি হলো “সংলাপ বা আলোচনার সংস্কৃতি”। ৩০ বা ৪০ বছর আগের প্রেক্ষাপটে এই মূল্যবোধটি রাখা হলে তা সম্পূর্ণ অদ্ভুত মনে হতো। এমনকি আজও পাকিস্তানের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবতা মূলত “অন্ধ অনুকরণ”-এর ওপর ভিত্তি করে চলে, যেখানে একজন শিক্ষার্থীর সামনে প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কথার কোনো আলোচনা বা পর্যালোচনা ছাড়াই পুনরাবৃত্তি করা ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না।
কিন্তু “আল-মাওরিদ”-এ আমরা একটি ভিন্ন পরিবেশ পেয়েছি, যেখানে দলিলের অবস্থান সবার উপরে এবং সংলাপের ভিত্তি হলো যুক্তি ও প্রমাণ। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আমরা কখনো ওস্তাদের সাথে একমত হয়েছি, আবার কখনো সরাসরি ও স্পষ্টভাবে দ্বিমত পোষণ করেছি; এবং এই সব কিছুই ছিল আদব ও সম্মানের কাঠামোর মধ্যে। “সংলাপ সংস্কৃতি” স্বভাবগতভাবেই যৌক্তিক আলোচনা এবং প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে মতপার্থক্য তৈরি করে।
প্রকৃতপক্ষে একমত বা দ্বিমত হওয়া স্বাভাবিক বিষয়, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মতপার্থক্যের আদব। আপনার আলোচককে সঠিক হওয়ার অধিকার দেওয়া এবং নিজেকে এমন অবস্থানে রাখা, যেখানে আপনিও ভুল করতে পারেন। এই চেতনার মাধ্যমেই এমনকী যারা আল্লাহতে বিশ্বাস করে না বা যারা ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে, তাদের সাথেও সংলাপ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
সংলাপের মূল ভিত্তি এটা নয় যে, অপর পক্ষ তার অবস্থান ছেড়ে আপনার অবস্থান গ্রহণ করবে, বরং আপনার কাছে যা সত্য বলে প্রতিভাত হয়েছে, তা তার সামনে তুলে ধরা এবং সে যা প্রাপ্ত হয়েছে তাকে শ্রদ্ধা করা, কেবল প্রভাবিত করাকে একমাত্র লক্ষ্য না বানিয়ে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, আমাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই চেতনা বিরল, যেখানে অনুকরণ প্রাধান্য পায়; বিপরীতে “আল-মাওরিদ”-এ আমরা দলিলের ভিত্তিতে সংলাপ পেয়েছি এবং এর বদৌলতে সহনশীলতা, ভিন্নমতাবলম্বীর প্রতি ধৈর্য এবং মতভেদের আদব শিখেছি।
চতুর্থ বৈশিষ্ট্যটি হলো “সমালোচনার সংস্কৃতি”। আমাদের ওস্তাদ সর্বদা বলতেন: আগে নিজেকে সমালোচনা করতে শুরু করো, তারপর অন্যের সমালোচনা উদার চিত্তে শোনো। সমালোচনাকে কখনোই তুচ্ছ বা সাময়িক বিষয় হিসেবে দেখবে না। সমালোচনা দুই প্রকার:
প্রথমটি হলো আত্ম-সমালোচনা, যা মানুষের প্রকৃত উন্নয়নের ভিত্তি। আপনি যদি আপনার ভুল বুঝতে পারেন, তবে কোনো দ্বিধা বা অজুহাত ছাড়াই তা সংশোধনে সচেষ্ট হোন।
আর দ্বিতীয়টি হলো সমাজ থেকে আসা সমালোচনা, তা প্রবন্ধের মাধ্যমে হোক বা গণমাধ্যম কিংবা অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। এটাও একটি মূল্যবান নিয়ামত, কারণ এটি আপনাকে নিজেকে পর্যালোচনা করার এবং পথ সংশোধনের সুযোগ দেয়। আমাদের ওস্তাদ প্রায়ই আমাদের জিজ্ঞেস করতেন: তোমরা কি সমালোচনাগুলো পড়েছ? এই বিষয়ে কী প্রকাশিত হয়েছে তা কি দেখেছ? যদি আমরা না দেখতাম তবে তার সাথে আমাদের আলোচনা অসম্পূর্ণ মনে হতো। তাই আমাদের জন্য আবশ্যিক ছিল প্রথমে সমালোচনা পড়া, তারপর ওস্তাদের সাথে তা নিয়ে আলোচনা করা।
এই পদ্ধতি অত্যন্ত ফলপ্রসূ; কারণ এটা মানুষকে অহংকার এবং এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে রক্ষা করে যে, সে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে গেছে বা কেবল সেই সঠিক। বরং এটা তাকে স্বীকার করতে বাধ্য করে যে, পৃথিবীতে বড় বড় মস্তিষ্ক ও গভীর চিন্তাধারা রয়েছে এবং সে-ই প্রথম নয় আর সে-ই শেষ নয়। মানুষের দায়িত্ব হলো কেবল সত্যের সন্ধানী হওয়া; সত্য যেভাবেই আসুক তা গ্রহণ করা এবং যে মানুষের পক্ষ থেকেই আসুক তা কবুল করা।
আমি যদি “আল-মাওরিদ সংস্কৃতি”-র একটি সামগ্রিক শিরোনাম দিতে চাই, তবে আমি “সত্যের সংস্কৃতি” বা সত্যের সন্ধানের সফরের চেয়ে নির্ভুল কিছু পাব না। এটা সত্য অন্বেষণের এক নিরন্তর যাত্রা, যেখানে মানুষ ভালো থেকে আরও ভালোর দিকে এবং সঠিক থেকে আরও সঠিকের দিকে ধাবিত হয়; যা সত্য প্রমাণিত হয়, তা গ্রহণ করে এবং যা হকের পরিপন্থী তা বর্জন করে।
“আল-মাওরিদ” সম্পর্কে আলোচনার সময় আমি এমন এক মহান ব্যক্তিত্বের কথা উল্লেখ না করে পারছি না, যার এই যাত্রায় গভীর প্রভাব ছিল। ১৯৮৩ সালে “আল-মাওরিদ” যাত্রা শুরু করে এবং ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত চলে, এরপর আর্থিক সংকটের কারণে এটা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। ১৯৮৮ সালে আমি ও আরও কিছু ভাই এতে কাজে যোগ দিই, এরপর আল্লাহ চাইলেন যে, এটা ১৯৯১ সালে পুনরায় প্রাণ ফিরে পাক। এটা সম্ভব হয়েছে আলতাফ মাহমুদ (রহ.)-এর বদৌলতে, যিনি কয়েক বছর আগে করোনা মহামারীর সময় ইন্তেকাল করেছেন।
আমি তার সেই অমর বাণীগুলো ভুলতে পারি না, যা আজও আমার মনে শিহরণ জাগায়। তিনি বলেছিলেন: “আমি সংকল্প করেছি যে, আমার আয়কে তিন ভাগে ভাগ করব: এক ভাগ ‘আল-মাওরিদ’-এর জন্য, এক ভাগ আমার ব্যবসার জন্য এবং এক ভাগ আমার পরিবারের জন্য। আমি একে একটি স্থায়ী নীতি বানিয়েছি; যদি কোনো সংকট আসে তবে প্রতিষ্ঠানটিকেই আমি সাহায্যের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেব।”
এই মহান চেতনা এবং ত্যাগের ফলে আমার প্রশাসনিক দায়িত্বের ২৫ বছরে (১৯৯০-২০১৫) কখনও বেতন দিতে একদিনও দেরি হয়নি। আজ আমরা প্রতিষ্ঠানের যে দৃঢ়তা ও প্রবৃদ্ধি দেখছি, তা তার দান ও নিষ্ঠারই ফল।
একই সাথে আমি আমাদের সেই প্রিয় ভাইদের কথা উল্লেখ না করে পারি না, যারা ইহধাম ত্যাগ করেছেন এবং আল-মাওরিদের পথে যাদের অনবদ্য ভূমিকা ছিল — আনিস মুফতি, ডক্টর ফারুক খান, রাশিদ ফারুকি এবং ইসহাক নাকি; আল্লাহ তাদের সবাইকে রহম করুন। তারা তাদের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে এই বরকতময় প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করেছেন, যেমনটা অন্যান্য ভাইদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
২০১৫ সালের পর আমাদের প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক প্রসারের স্তরে প্রবেশ করে, পাঁচটি দেশে এর শাখা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আমাদের চিন্তাটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। এটা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন; কারণ মুসলিম উম্মত দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যায় ভুগছে যে, তাদের অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি-কেন্দ্রিক ছিল, ফলে সেই ব্যক্তির মৃত্যুর সাথে সাথে প্রতিষ্ঠানও থেমে গেছে। কিন্তু আমরা একে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়ার কাজ করেছি, যাতে ব্যক্তির অনুপস্থিতিতেও কাজ সচল থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে অনেক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে, যার অন্যতম ফল হলো আজ আমাদের মাঝে সম্মানিত ওস্তাদ আছেন, যিনি আমেরিকায় আল-মাওরিদের বার্তা সততার সাথে পৌঁছে দিচ্ছেন। একইভাবে তার ভাইয়েরা কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন ও অন্যান্য দেশে এই আমানত বহন করছেন। এই সফরের বিশেষত্ব হলো এর সাথে যুক্ত সবাই স্বেচ্ছাসেবী, যারা কর্তব্যের সীমানা পেরিয়ে ত্যাগ ও পরিশ্রম করেছেন।
হে প্রিয়জনেরা, আমি এই কথাগুলো বললাম, কারণ আপনাদের মাঝে অনেকে দানশীল ও সফল ব্যক্তি রয়েছেন। আমি যদি ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’-এর জন্য একজনকে বেছে নিতে চাইতাম, তবে তালিকাটি দীর্ঘ হতো, কারণ আমাদের অনেক ভাই ও বোন এই সম্মানের যোগ্য। তা সত্ত্বেও প্রকৃত প্রশংসা হলো আল্লাহতায়ালার প্রশংসা; আর এই জীবনে সফলতার যে পথ আমাদের সামনে খুলে যায়, তা মূলত নিয়ামতের পরীক্ষা, যা আমাদের আরও বিনয়ী ও আল্লাহভীরু করে তুলবে।
পরিশেষে আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে, প্রকৃত সফলতা কোনো পদক বা পুরস্কারে নয়, বরং কুরআন মাজিদ যা ব্যক্ত করেছে:
“সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে-ই সফলকাম হবে।” (কুরআন, সুরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫)
প্রকৃত সফলতা হলো আল্লাহ আমাদের জাহান্নাম থেকে নাজাত দেবেন এবং জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আমরা আশা করি আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই সম্মান দান করবেন।
আর আমি যে সম্মাননা পেয়েছি, সে সম্পর্কে বলি — আমরা তা পাই বা না পাই, আমাদের স্থায়ী লক্ষ্য হওয়া উচিত একজন নেককার মানুষ হওয়া এবং মানবতার উচ্চ শিখরে আরোহণের চেষ্টা করা।
ইংরেজি কবি এমিলি ব্রন্টি (Emily Brontë) ঠিকই বলেছিলেন: “মানুষকে অন্তঃসারশূন্য, ক্রীতদাসসুলভ ও কপট ভাবাটা যথেষ্ট কষ্টের ছিল। কিন্তু তার চেয়েও খারাপ হলো নিজের মনের ওপর ভরসা করা এবং সেখানে একই কলুষতা খুঁজে পাওয়া।”
একইভাবে কবি বাহাদুর শাহ জাফর এই সত্যটি সংক্ষেপে বলেছেন: “যতক্ষণ আমি নিজের অবস্থা সম্পর্কে বেখবর ছিলাম, অন্যের ত্রুটি ও গুণ দেখতাম। যখন নিজের মন্দের ওপর নজর পড়ল, তখন নজরে আর কেউ মন্দ রইল না।”
শ্রেষ্ঠ সংস্কার হলো আত্ম-সংস্কার, আর এটাই আল-মাওরিদ সংস্কৃতি থেকে শেখা আমাদের সর্বোচ্চ বার্তা। আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন আমাদের উত্তম সমাপ্তি দান করেন এবং পরকালে সফল ও সম্মানিতদের অন্তর্ভুক্ত করেন।
জাজাকুমুল্লাহু খাইরান। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।






