ইমাম হামিদুদ্দিন ফারাহি (রহ.): জাভেদ আহমেদ গামিদি-র দৃষ্টিতে
ভারতবর্ষ যুগে যুগে চিন্তা, জ্ঞান ও কর্মের ক্ষেত্রে বহু মহান ও সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের জন্ম দিয়েছে। ইমাম হামিদুদ্দিন ফারাহি (রহ.) (১৮৬৯-১৯৩০) ছিলেন জ্ঞান ও গবেষণায়, বিশেষ করে কুরআন গবেষণায় এক সৃজনশীল মহাপুরুষ। যা তাকে এক অনুপ্রেরণাদায়ী মুফাসসিরে পরিণত করেছিল। তিনি একটি স্বতন্ত্র চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠা করেন, যার নিজস্ব ও চমৎকার পদ্ধতি রয়েছে; যা পরবর্তীতে ভারতীয় উপমহাদেশে তার নামানুসারে ‘ফারাহি ঘরানা’ নামে পরিচিতি পায়। ইমামের বহু সুযোগ্য ছাত্র ও কুরআন গবেষণায় দক্ষ পণ্ডিত ছিলেন, যাদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগণ্য ছিলেন শায়খ আমিন আহসান ইসলাহি (রহ.) (১৯০৪-১৯৯৭), যিনি উর্দু ভাষায় ‘তাদাব্বুরে কুরআন’ তাফসিরের রচয়িতা। তিনি তার এই তাফাসিরে তার মহান শিক্ষকের পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। ইসলাহি (রহ.)-এর ছাত্রদের মধ্যে চিন্তাবিদ জাভেদ আহমেদ গামিদি আত্মপ্রকাশ করেন এবং তার খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে; তার মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফারাহি ঘরানা পরিচিতি লাভ করে। জাভেদ আহমেদ গামিদি তার উর্দু গ্রন্থ ‘মাকামাত’-এ ইমাম হামিদুদ্দিন ফারাহি (রহ.)-এর জীবন, কর্ম ও চিন্তাধারার ওপর নিজস্ব শৈলীতে এবং অত্যন্ত সংক্ষেপে আলোকপাত করেছেন। আমরা এখানে বাংলা পাঠকদের জন্য তার মতামত ও প্রভাবের কিছু সংক্ষিপ্ত উদ্ধৃতি তুলে ধরছি। শায়খ শিবলী নুমানির চিন্তাধারা এবং ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামি চিন্তা-যাত্রায় এর গভীর প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন:
“এই ঘরানায় যে ব্যক্তিটিকে ‘যুগের ইমাম’ বলার যোগ্যতা রাখেন, তিনি কেবল হামিদুদ্দিন ফারাহি (রহ.)। তিনি ছিলেন এই জমিনে আল্লাহতায়ালার নিদর্শণসমূহের মধ্যে একটি নিদর্শন। সাইয়্যিদ সুলাইমান নদভি (রহ.)-এর কথা শুনুন, যিনি তার ইন্তেকালে শোকগাথা লিখেছিলেন:
“الصلوٰۃ علیٰ ترجمان القرآن (আস-সালাতু আলা তরজুমানিল কুরআন: কুরআনের মুফাসসিরের জানাজা) — এটা সেই আহ্বান, যা আজ থেকে সাড়ে ছয়শ বছর আগে মিসর ও শাম থেকে চীনের প্রাচীর পর্যন্ত ইবনে তাইমিয়া (রহিমাহুল্লাহু তায়ালা)-এর জানাজার জন্য ধ্বনিত হয়েছিল। সত্য হলো, এই আহ্বান আজ আবার ধ্বনিত হওয়া উচিত এবং অন্তত হিন্দুস্তান থেকে মিসর ও শাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া উচিত যে, এই যুগের ইবনে তাইমিয়া ১১ নভেম্বর ১৯৩০-এ এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, তার মতো এমন প্রজ্ঞা ও পূর্ণতার অধিকারী দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তিত্ব ভবিষ্যতে ইসলামি বিশ্বে আর সৃষ্টি হবে না। যার মধ্যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জ্ঞানের এমন এক বিরল সমন্বয় ঘটেছিল, যা এই যুগের এক বিস্ময়। আরবির অনন্য পণ্ডিত এবং ইংরেজির গ্র্যাজুয়েট, তাকওয়া ও পরহেজগারির প্রতিচ্ছবি, জ্ঞান ও পূর্ণতার মূর্ত প্রতীক, ফারসির বুলবুল-ই শিরাজ, আরবির সুক-ই উকাজ — একক ব্যক্তিত্ব কিন্তু এক মহাজ্ঞানী। মারিফাতের এক ভুবন, জ্ঞানের এক জগৎ, নির্জনে থাকা এক পূর্ণতার আধার, এক নিঃস্ব শিল্পের সুলতান, সাহিত্যিক জ্ঞানে অনন্য, আরবি জ্ঞানের খাজানা, যুক্তিনির্ভর জ্ঞানের সমালোচক, ধর্মীয় জ্ঞানের ভাণ্ডার, কুরআনের বিদ্যার রহস্যজ্ঞানী, কুরআনের রহস্যের বোদ্ধা, দুনিয়ার সম্পদ থেকে বিমুখ, দুনিয়াদারদের থেকে অমুখাপেক্ষী, মানুষের গ্রহণ-বর্জন ও বিশ্বের প্রশংসা থেকে নির্লিপ্ত, জ্ঞানের মসজিদে ইতিকাফকারী এবং নিজের দুনিয়ার নিজেই বাদশা। সেই মহান সত্তা, যিনি পূর্ণ ত্রিশ বছর একমাত্র কুরআনের গভীর ধ্যানে ও জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন থেকে পার্থিব অন্য সবকিছু থেকেই প্রায় অপরিচিত হয়ে গিয়েছিলেন। আফসোস যে তার জ্ঞান তার সিনা থেকে বইপত্রে খুব কমই স্থানান্তরিত হতে পেরেছে। পাণ্ডুলিপির দপ্তর রেখে গেছেন, কিন্তু আফসোস যে, তা ছাপানো এবং সাজানোর মতো মেধা এখন কোথায়। যে কয়টি রিসালা বা পুস্তিকা ছাপা হয়েছে, তা আরবিতে, যার কদর সাধারণ মানুষ তো বটেই, আলিম সমাজও বোঝেননি। তার জীবন আমাদের জন্য আস্থার পুঁজি ছিল এবং তার অস্তিত্ব ছিল “দারুল মুসান্নিফিন”-এর জন্য অবলম্বন। আফসোস যে, সেই আস্থা ও অবলম্বন হারিয়ে গেল এবং এখন কেবল তারই আস্থা ও অবলম্বন বাকি রইল, যার ছাড়া আর কারো আস্থা ও অবলম্বন নেই। এর চেয়েও বড় আফসোস এই যে, এই মহান সত্তা এলেন এবং চলে গেলেন, কিন্তু দুনিয়া তার কদর চিনতে পারল না এবং তার মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্বের স্বরূপ থেকে বঞ্চিত রইল:
আকাশ থেকে মসিহের মতো নেমে তুমি এলে, ফিরে গেলে — হায়! তোমার কদর চিনল কে, বলো — কে?”
একমাত্র তিনিই এই দুর্লভ সম্মানের অধিকারী হয়েছিলেন যে, একবার পথ চলা শুরু করার পর তিনি আর লক্ষ্যচ্যুত হননি। ফলে এই পথের যাত্রীদের মধ্যে একমাত্র তিনিই গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। আমিন আহসান ইসলাহি এই যুগশ্রেষ্ঠ প্রতিভারই স্থলাভিষিক্ত। তিনি তার উস্তাদের চেয়ে এগিয়ে না গেলেও পেছনেও থাকেননি। হামিদুদ্দিন যে স্থানে পৌঁছেছিলেন, ইসলাহির সারা জীবন তারই রহস্য ও গূঢ় তত্ত্বের ব্যাখ্যায় কেটেছে। তার “তাদাব্বুরে কুরআন” তাফসিরের কিতাবগুলোর মধ্যে জ্ঞান ও গবেষণার এক অতুলনীয় শিল্পকর্ম। তার কলমে পঞ্চাশ বছরের লড়াইয়ের কাহিনী শুনুন, উরফির ভাষায়:
তার বর্শাই বলে — যুদ্ধ হোক, শান্তি হোক যার, আমি গেছি খুলতে গিঁট — খাকানের জুব্বার দ্বার।
তিনি জীবনভর যাদের মধ্যে ছিলেন, তার জ্ঞান ও পূর্ণতা চেনার মতো জহুরি বা সমঝদার সেখানে খুব অল্পই ছিলেন। আমি তার মজলিসে ইতিহাসের বহু জটিল জট মুহূর্তের ব্যবধানে খুলতে দেখেছি এবং বহুবার স্বীকার করেছি যে:
বিদ্যুতের এক ঝলকেই পথ পেরিয়ে যায়, আমরা বেখবর প্রদীপেরই আলো — কবে জ্বলবে — চাই।
এখন দেখুন, প্রথম দলের সময় ফুরিয়ে এসেছে। এর উদাহরণ এখন সেই জরাজীর্ণ দালানের মতো, যা নতুন নির্মাণের সময় নিজেই পরিত্যক্ত হয়। দ্বিতীয় দল যদিও এখনো ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির প্রাসাদে আধিপত্য বিস্তার করে আছে, কিন্তু ইতিহাসের ফয়সালা এটাই যে, পুরোনো ভ্রষ্টতাগুলোর মতো এই ভ্রষ্টতাও কিছুকাল পর কেবল ইতিহাসের পাতাতেই অবশিষ্ট থাকবে। আগামী যুগের ইমামতি “শিবলি ঘরানা”-র জন্যই নির্ধারিত। ইতিহাসের মঞ্চে এখন পর্দার আড়ালে এরই আত্মপ্রকাশের প্রস্তুতি চলছে।
নতুন পৃথিবী এখনো ভাগ্যের পর্দায় ঢাকা, আমার চোখে তার প্রভাত — আজই যেন উন্মুক্ত ভোরটাই দেখা।
(মাকামাত, পৃষ্ঠা: ৬৮)
জাভেদ আহমেদ গামিদি তার উস্তাদ শায়খ আমিন আহসান ইসলাহি (রহ.) সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে আরও বলেন, যিনি আবার তার ওস্তাদ শায়খ হামিদুদ্দিন ফারাহি (রহ.) সম্পর্কে বর্ণনা করতেন:
“নিজের ব্যাপারে উস্তাদের এই আস্থার কথা তিনি এভাবেই শোনাতেন। একবার জানালেন যে, কিছু লোক ইমাম ফারাহির কাছে অভিযোগ করল: “আমিন তো বলে যে, আরবি কবিতাও কি কোনো কবিতা হলো! কিছুই বোঝা যায় না যে, কবি উটনীর প্রশংসা করছে নাকি প্রেমিকার।” ইমাম ফারাহি বললেন: “ওকে হয়তো কেউ ভালো করে কবিতা বোঝাতে পারেনি।” এরপর আমি যখন দরসে গেলাম, তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন এবং আমিও সেই অভিযোগের কথা স্বীকার করলাম। উস্তাদে ইমাম বললেন: “একটি কবিতা পড়ো।” আমি ইমরুল কায়েসের মুয়াল্লাকাতের প্রথম পঙক্তিটি পড়লাম:
قفا نبک من ذکري حبیب و منزل
(কিফা নাবকি মিন জিকরি হাবিবিও ওয়া মানজিলি)
ইমাম বললেন: “এর তরজমা করো।” সাধারণ মাদরাসাগুলোতে যেভাবে [অনুবাদ] করা হয়, সেভাবেই অনুবাদ করলাম। ইমাম বললেন: “না, এভাবে নয়; অনুবাদটি এমনভাবে করো যেন তার অর্থ দাঁড়ায় —
থামো, থামো — হে বন্ধুগণ! একটু থামতে দাও, প্রিয়তম আর প্রিয়তমের আবাসের কাছে দু’ফোঁটা অশ্রু ঝরাতে দাও।
আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম: “নিঃসন্দেহে এটাই কবিতা, এখন এটা সার্থক কবিতা হয়েছে।” তিনি বলতেন, এরপর থেকেই আরবি কবিতা আমার সবচেয়ে প্রিয় বিষয় হয়ে ওঠে।
ফারাহির কথা যখন তার মুখে আসত, তখন তার চোখে এক অদ্ভুত দ্যুতি খেলত। জ্ঞানের এই সিনাই চূড়ার গল্প তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা করতেন, তবুও তৃপ্ত হতেন না। কিছু ঘটনা তিনি এমন হৃদয়গ্রাহী ভঙ্গিতে শোনাতেন যে, মনে হতো তিনি কোনো দেবতার গল্প করছেন। তিনি বলতেন: “আমি ‘সাবআ মুয়াল্লাকাত’ পড়ছিলাম। এক জায়গায় ‘লা’ (لا) শব্দের অর্থ বুঝতে পারছিলাম না। সব ভাষ্যগ্রন্থ দেখলাম, আদিবুল হিন্দ উপাধিপ্রাপ্ত মৌলভি ফয়জুল হাসান সাহারানপুরির ব্যাখ্যাও পড়লাম, কিন্তু কোনোটাতেই মন ভরল না। বই নিয়ে ইমাম ফারাহির কাছে গেলাম। তিনি তার পাঠাগারের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি সমস্যাটি খুলে বললাম। তিনি মুহূর্তের জন্য থামলেন, পকেট থেকে পেনসিল বের করে আমার বইয়ের ওপর লিখে দিলেন: لا، هي نادرة (লা হিয়া নাদিরা — এটা বিরল ‘লা’)। এরপর বললেন — মিঞা, তোমরা যেমন বলো না যে, ‘সেই মুহূর্তটি যেন না আসে, যখন আমার মৃত্যু হবে’, এটাও ঠিক তেমনই একটি ‘লা’। ভাষার সূক্ষ্ম রহস্য পর্যন্ত পৌঁছানোর এই ক্ষমতা কেবল উস্তাদেরই ছিল।”
ফারাহির শেষ জীবনে ভারতের এক বড় আলেম তার কোনো এক লেখার ওপর কুফরি ফতোয়া দেয়। এতে পুরো অঞ্চলে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। মাদরাসাতুল ইসলাহ-এর ছাত্র ও শিক্ষক সবাই চিন্তিত হয়ে পড়ে। আমার কাছেও এটা ছিল এক বড় দুর্ঘটনা। এই ব্যাকুলতা নিয়ে আমি ফারাহিকে খুঁজতে খুঁজতে তার পাঠাগারের দিকে ছুটি। দেখলাম উস্তাদে ইমাম সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি দৌড়ে তাকে বিষয়টি জানালাম। আমি যে অস্থিরতায় ছিলাম, তার থেকেও তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া আশা করছিলাম। তিনি সিঁড়িতে এক মুহূর্তের জন্য থামলেন, তারপর এটুকু বলেই এগিয়ে গেলেন: “আচ্ছা, তুমি যার কথা বলছ, তিনি তো আমাকে চেনেন না।” আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। এই ফতোয়ার ওপর এর চেয়ে জুতসই মন্তব্য বোধ হয় আর হতে পারে না। তিনি অত্যন্ত আবেগভরে বলতেন: “ফারাহি ছিলেন এমনই, এমন মহৎ হৃদয়ের মানুষ, এখন তোমরা আর কোথায় পাবে?”
(পূর্বোক্ত উৎস, পৃষ্ঠা: ৮৪)






