ইসলাম ও মুসলিমদের ইতিহাস, মৌলিক বই ও বরেণ্য ব্যক্তিত্ব — নাইম আহমেদ বালুচ-এর একান্ত সাক্ষাৎকার

নাইম আহমেদ বালুচ

সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও অনুবাদ: মোহাম্মদ সিয়াম হোসেন

[উপমহাদেশের সমকালীন জ্ঞানচর্চার আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নাইম আহমেদ বালুচ। তিনি একাধারে ইতিহাসবিদ, গভীর জীবনবোধসম্পন্ন ইসলামি গবেষক এবং শক্তিমান উর্দু সাহিত্যিক। তার লেখনীর পরিধি যেমন বিস্তৃত, তেমনই গভীর। বিশেষ করে শিশুসাহিত্যের আঙিনায় তিনি এক অনন্য নাম; কোমলমতি শিশুদের মনস্তত্ত্ব ও নৈতিকতা গঠনে তিনি রচনা করেছেন ৩৫টিরও বেশি চমৎকার বই। এছাড়াও উপন্যাস, মৌলিক গবেষণা ও সম্পাদনা মিলিয়ে তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় অর্ধশত।

কেবল নিভৃতচারী গবেষক হিসেবেই নয়, একজন সফল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবেও তার দারুণ খ্যাতি রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি পাকিস্তানের বিভিন্ন মূলধারার টেলিভিশন চ্যানেলে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে গণমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। তার এই যুগান্তকারী গবেষণামূলক কর্মের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়’ এবং ‘ন্যাশনাল বুক কাউন্সিল’ কর্তৃক শ্রেষ্ঠ লেখকের মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি গামিদি সেন্টার অব ইসলামিক লার্নিং (GCIL)-এ ইতিহাস গবেষক হিসেবে কর্মরত আছেন।]


মোহাম্মদ সিয়াম: আসসালামু আলাইকুম। জনাব নাইম বালুচ, আমাদের এই বিশেষ সাক্ষাৎকারে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি। আজকের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হলো — ইসলামি ইতিহাস, এর মূল আকর গ্রন্থসমূহ এবং এই ক্ষেত্রে অবদান রাখা মহান ব্যক্তিত্বগণ।

আপনার কাছে আমার প্রথম প্রশ্ন — ‘ইসলামি ইতিহাস’ এবং ‘মুসলিম ইতিহাস’ — এই দুটির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী? একই সাথে, এই ইতিহাস অধ্যয়নের মৌলিক গ্রন্থগুলো সম্পর্কেও আপনার কাছ থেকে বিস্তারিত জানতে চাই।

ইসলামি ইতিহাস বনাম মুসলিম ইতিহাস

জনাব নাইম বালুচ: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমি প্রথমে ‘ইসলামি ইতিহাস’ এবং ‘মুসলিম ইতিহাস’-এর মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যটি ব্যাখ্যা করছি।

ইসলামি ইতিহাস হলো মূলত ইসলামের ইতিহাস। অর্থাৎ হযরত আদম (আলাইহিস সালাম) থেকে শুরু করে সর্বশেষ নবী আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পর্যন্ত সকল নবী-রাসুলগণের ইতিহাস, তাদের সিরাত (জীবনচরিত) এবং ইসলাম প্রচার ও প্রসারে তাদের অবলম্বন করা কর্মপন্থা ও কৌশলের বিবরণ। তাদের সময়কার পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট কেমন ছিল, তার বিস্তারিত আলোচনা এর অন্তর্ভুক্ত।

ইসলামি ইতিহাসের উৎস

এই ইতিহাসের প্রধান উৎস হলো কুরআন মাজিদ এবং বাইবেল। ইসলাম-পূর্ব নবীগণের ইতিহাস জানার জন্য বর্তমানে বাইবেল অন্যতম মাধ্যম হলেও একজন মুসলিম ও ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে এটা স্বীকৃত যে, বর্তমান বাইবেল মূলত একটি সংকলন মাত্র। এটা ইতিহাস, আসমানি কিতাব এবং বিভিন্ন পরিস্থিতির সংমিশ্রণ, যেখানে ঐশী শিক্ষার অংশটুকু খুবই সীমিত। তাই ইসলামি ইতিহাসের প্রকৃত উৎস হিসেবে কুরআনকেই মানদণ্ড ধরা হবে। নবীগণের ইতিহাসের বাকি অংশটুকু আমরা কুরআনের আলোকে যাচাই করব। যা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এবং ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পরিপন্থী নয়, তা গ্রহণ করতে আমাদের কোনো বাধা নেই। সুতরাং, কুরআন মাজিদ এবং বাইবেলে বর্ণিত নবীগণের ঘটনাবলিই হলো ইসলাম-পূর্ব ইসলামি ইতিহাসের মূল উপাদান।

এর পরবর্তী যে ইতিহাস, তাকে বলা হবে মুসলিম ইতিহাস। আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইন্তেকালের পর প্রথম যে ঘটনাটি ঘটেছিল — সাকিফা বনি সায়েদাতে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফতের সূচনা। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত মুসলমানদের যে অবস্থা, সাহাবায়ে কেরামের জীবনকাল, খুলাফায়ে রাশেদিন এবং পরবর্তীকালের মুসলিম শাসনব্যবস্থা ও তাদের কর্মকাণ্ড — এসবই ‘মুসলিম ইতিহাস’ হিসেবে গণ্য হবে; একে ‘ইসলামি ইতিহাস’ বলা যাবে না।

এই মৌলিক পার্থক্যটি অনেক সময় গুলিয়ে ফেলা হয়। মুসলিম শাসকদের সব কর্মকাণ্ডকে যদি আমরা ইসলামি ইতিহাস মনে করি, তবে তার দায়ভার ইসলামের উপর বর্তায় — যা সঠিক নয়। ইসলামের দায়ভার বা প্রতিনিধিত্ব কেবল নবী (আলাইহিস সালাম)-গণের সময়কাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। এরপর মুসলিম ইতিহাসে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, তার দায়ভার মুসলমানদের। সেখানে যেমন অনেক মহৎ কাজ রয়েছে, তেমনি অনেক বিষয়ে সমালোচনাও হতে পারে।

ইতিহাসের মৌলিক উৎস গ্রন্থ

মুসলিম ইতিহাসের যাত্রা শুরু হয় মূলত আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবনচরিত তথা সিরাত এবং ‘মাগাজি’ (নবীর সময়কার যুদ্ধের ঘটনাবলি)-র মাধ্যমে। এই শাস্ত্রের ভিত্তি স্থাপনকারী প্রধান উৎস গ্রন্থসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ইবনে ইসহাকের সংকলন: তিনি অত্যন্ত বিস্তৃতভাবে সিরাত ও মাগাজির বিবরণ সংকলন করে এই ধারার সূচনা করেন। তার সংকলনে প্রচুর কবিতা এবং নানা ধরনের বর্ণনা রয়েছে। তবে এটা আধুনিক নিয়মে সম্পাদিত ইতিহাস গ্রন্থ ছিল না, বরং তার কাছে নবীজির জীবন সম্পর্কে যে তথ্য পৌঁছেছিল, তিনি তারই একটি বিস্তারিত রূপ তুলে ধরেছেন।
  • সিরাত আন-নববিয়্যাহ (ইবনে হিশাম): এটা ইবনে ইসহাকের বিশাল কাজের একটি পরিমার্জিত রূপ ও সারসংক্ষেপ।
  • মাগাজি (ওয়াকিদি): যুদ্ধসংক্রান্ত ইতিহাসের ক্ষেত্রে এটা একটি বড় উৎস। তবে ওয়াকিদির বর্ণনার উপর অনেকে সমালোচনা করেন যে, সেখানে শিয়া মতাদর্শের প্রভাব এবং তথ্যের কিছুটা মিশ্রণ ঘটেছে।
  • তাবাকাতে কুবরা (ইবনে সাদ): এটা একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ গ্রন্থ, যেখানে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সিরাত ছাড়াও সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়িগণের জীবনবৃত্তান্ত বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
  • তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক (জারির তাবারি): সাধারণ বা বিশ্ব-ইতিহাসের ক্ষেত্রে এটা সবার আগে আসবে। ‘নবী ও রাজাদের ইতিহাস’ নামের এই অমর সৃষ্টিটি মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে মহান এবং মৌলিক উৎস গ্রন্থ। একে নিঃসংকোচে ‘উম্মাহাতুল কুতুব’ বা প্রধান উৎস গ্রন্থের তালিকায় শীর্ষে রাখা যায়।
  • ফুতুহুল বুলদান (বালাজুরি): ‘বিভিন্ন দেশ জয়ের ইতিহাস’ সংক্রান্ত এই গ্রন্থটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রামাণ্য। বিশেষ করে খুলাফায়ে রাশেদিনের সময়কার মুসলিম বিজয়সমূহ এবং তৎকালীন ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বোঝার জন্য এটা পাঠ করা অপরিহার্য।
  • তারিখে ইয়াকুবি (ইয়াকুবি): এটা একটি প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থ, তবে এতে শিয়া দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
  • মুকাদ্দিমা (ইবনে খালদুন): ইবনে খালদুন কেবল মুসলিম ইতিহাসেরই নন, বরং ইতিহাস দর্শনের একজন পথপ্রদর্শক। ইতিহাস কীভাবে লিখতে হয় এবং ইতিহাসের মূলনীতি কেমন হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে তার এই ‘ভূমিকা’ গ্রন্থটি একটি বিশ্বজয়ী মাস্টারপিস। এটা ছাড়া ইতিহাস বোঝা প্রায় অসম্ভব।
  • আল-কামিল ফিত তারিখ (ইবনে আসির): পরবর্তী সময়ের গ্রন্থগুলোর মধ্যে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা মূলত জারির তাবারির ধারাকেই সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

এছাড়াও এই সিলসিলায় ইমাম যাহাবি এবং ইবনে কাসির-এর নামও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এগুলোই হলো মুসলিম ইতিহাসের সেই সকল মৌলিক উৎস গ্রন্থ বা ‘উম্মাহাতুল কুতুব’, যা এই শাস্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছে।

মোহাম্মদ সিয়াম: আমরা যেহেতু ইতিহাসকে ‘ইসলামি ইতিহাস’ এবং ‘মুসলিম ইতিহাস’ — এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছি এবং পূর্ববর্তী আলোচনায় আপনি মুসলিম ইতিহাসের উৎস গ্রন্থগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন; তাহলে পবিত্র কুরআনের আলোকে ইসলামের যে ইতিহাস বা সিরাত, তার আকর গ্রন্থ ও উৎসগুলো কী কী? অনুগ্রহ করে এ বিষয়ে আমাদের বিস্তারিত জানাবেন।

জনাব নাইম বালুচ: পবিত্র কুরআনের আলোকে ইসলামের ইতিহাস এবং বিশেষ করে সিরাত রচনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাষায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক কাজ হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

 আরবি ভাষার গ্রন্থসমূহ

  • সিরাতুর রাসুল (মুহাম্মদ ইজ্জত দারওয়াজা): আরবি ভাষায় কুরআনের ভিত্তিতে সিরাত রচনার ক্ষেত্রে এটা প্রথম এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এটাই মূলত কুরআনের উপর ভিত্তি করে লেখা প্রথম পূর্ণাঙ্গ সিরাত গ্রন্থ, যা দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।
  • সিরাতুন নবী ফি জাবিল কুরআন ওয়াস সুন্নাত (মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আবু শুবহাহ): ‘দারুল কলম’ থেকে দুই খণ্ডে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি এ বিষয়ের আরেকটি আকর গ্রন্থ। প্রায় একই শিরোনামে আব্দুল মাহদি বিন আব্দুল কাদির বিন আব্দুল হাদিরও একটি চমৎকার গ্রন্থ রয়েছে।
  • ফিকহুস সিরাত (মুহাম্মদ আল-গাজালি): এটাকে পুরোপুরি কুরআনের ভিত্তিতে লেখা সিরাত গ্রন্থ না বলা গেলেও, এতে তাত্ত্বিক, দাওয়াতি এবং নৈতিক ফলাফল বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সিরাতের বর্ণনায় কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গিকে এখানে বিশেষভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

উর্দু ও ফারসি ভাষার গ্রন্থসমূহ

ফারসি ভাষার কাজ: ফারসি ভাষায় শিয়া ঘরানার আলেমদের এই নির্দিষ্ট বিষয়ে বেশ কিছু কাজ রয়েছে।

  • সিরাতুন নবী কুরআনের আলোতে / সিরাতুন নবী কুরআন কি রশনি মে (মাওলানা আব্দুল মজিদ দরিয়াবাদি): উর্দুতে এই নির্দিষ্ট বিষয়ে খুব বেশি কাজ না হলেও মাওলানা আব্দুল মজিদ দরিয়াবাদির এই কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যদিও বইটি খুব বেশি সুবিশাল বা বিস্তারিত নয়।
  • তালেব হোসেন করপালভির গ্রন্থসমূহ: সিরাত নিয়ে এই শিয়া লেখকের দুটি উল্লেখযোগ্য বই রয়েছে — ‘সিরাতুন নবী ফুরকানে হামিদের আলোকে’ এবং ‘সিরাতুন নবী কুরআন মাজিদের আলোকে’।
  • মাওলানা আবুল আলা মওদুদির সংকলন: মাওলানা মওদুদি সিরাতের ওপর আলাদা করে কোনো সুবিশাল গ্রন্থ লেখেননি। তবে তার ‘তাফহিমুল কুরআন’ এবং সিরাত বিষয়ক বিভিন্ন প্রবন্ধকে এক জায়গায় সংকলিত করা হয়েছে। এই সংকলনে নবীজির জীবনের কুরআনিক বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে; যা মূলত কুরআন ও রেওয়ায়েতের একটি সমন্বয় বা সংমিশ্রণ।

আধুনিক ও অগ্রসর কাজ

  • হায়াতে রাসুলে উম্মি (মাওলানা খালিদ মাসউদ): কুরআনের আলোকে সিরাত রচনার ক্ষেত্রে এটাকে সবচেয়ে অগ্রসর ও আধুনিক কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটা বর্তমানে ইংরেজিতে ‘The Life of the Holy Prophet’ নামেও অনূদিত হয়েছে।

মোহাম্মদ সিয়াম: ইসলামি ইতিহাস ও মুসলিম ইতিহাসের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য এবং এর আকর গ্রন্থগুলোর বিস্তারিত বিবরণের জন্য ধন্যবাদ। ইতিহাস পাঠ বা অধ্যয়নের বিশেষ কোনো মূলনীতি বা পদ্ধতি রয়েছে কি? যদি থাকে, তবে সেই নীতিগুলো কী এবং ইতিহাস পড়ার সময় আমরা কীভাবে এগুলো প্রয়োগ করতে পারি? এই বিষয়ে অনুগ্রহ করে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিন।

জনাব নাইম বালুচ: ইতিহাস অধ্যয়নের মূলত ৭টি মূলনীতি রয়েছে। এই নীতিগুলো অনুসরণ করলে আমাদের ইতিহাসবোধ অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য হবে এবং পঠিত ইতিহাস সত্যের কতটা কাছাকাছি, তা সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব হবে।

ইতিহাসের দুটি প্রধান ধরন

মূলনীতিগুলো আলোচনার পূর্বে এটা স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, ইতিহাসের ঘটনাবলি মূলত দুই প্রকার:

·  স্বীকৃত বা ধ্রুব ইতিহাস: যে বিষয় বা ঐতিহাসিক সত্যগুলো নিয়ে কোনো ধরনের দ্বিমত নেই।  যেমন — বাংলাদেশ আগে পাকিস্তানের অংশ ছিল এবং ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামে পরিচিত ছিল। ১৯৭১ সালে একটি নির্বাচনের ফলাফলের পর সেখানে একটি বিশেষ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এটা একটি ধ্রুব সত্য বা স্বীকৃত ইতিহাস।

·  ভিন্ন ভিন্ন ভাষ্য বা বর্ণনার ইতিহাস: যেখানে দৃষ্টিভঙ্গি ও আদেশভেদে একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন — উপরোক্ত ঘটনাটিকে বাংলাদেশের মানুষ ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলবেন; পক্ষান্তরে অন্য কোনো পক্ষ তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ভিন্ন শব্দ বা ব্যাখ্যা ব্যবহার করতে পারে। পশ্চিম পাকিস্তানের পাঠ্যপুস্তকে এই ঘটনার যে বিবরণ বা প্রেক্ষাপট পড়ানো হয়, বাংলাদেশে তার বিবরণ ভিন্ন। এটাই হলো বহুমুখী ভাষ্যের ইতিহাস।

ইতিহাস অধ্যয়নের ৭টি মূলনীতি

১. উৎস বা আকর (Sources)

ইতিহাস পর্যালোচনার প্রথম শর্ত হলো এর উৎস যাচাই করা। যিনি ঘটনাটি বর্ণনা করছেন, তিনি কি সেই সময়ের মানুষ নাকি অনেক পরের? যদি পরবর্তী সময়ের হন, তবে তিনি মূল সময়কাল থেকে কতটা কাছাকাছি সময়ের? তিনি কি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন? এছাড়া এই তথ্যের ভিত্তি কী — এটা কি কোনো সরকারি নথি, প্রাচীন শিলালিপি, মুদ্রা, চিঠি নাকি সমসাময়িক কোনো লোকগল্প? এই উৎসগুলোর প্রকৃতির ওপরই তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নির্ভর করে। যেমন — কয়েকশ বছর আগের কোনো শিলালিপির বরাত দিয়ে প্রাপ্ত তথ্য অত্যন্ত শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়।

২. বর্ণনাকারী বা ইতিহাসবিদ (Narrator/Historian)

দ্বিতীয় মূলনীতি হলো বর্ণনাকারীর নির্ভরযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা যাচাই করা। একজন মুসলিম যখন নিজের ইতিহাস লিখবেন, তিনি এক ধরনের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লিখতে পারেন। আবার একজন অমুসলিম বা প্রাচ্যবিদ (Orientalist) যখন একই বিষয় লিখবেন, তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ — ‘ক্রুসেড’ যুদ্ধের বর্ণনায় মুসলিম ইতিহাসবিদদের ভাষ্য আর খ্রিস্টান বা ইউরোপীয় ইতিহাসবিদদের ভাষ্য এক নয়। তাই বর্ণনাকারীর পরিচয়, উদ্দেশ্য ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করা আবশ্যক।

 ৩. তথ্যের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য (Internal Consistency) ও যৌক্তিকতা

বর্ণনায় কোনো স্ববিরোধিতা, অতিরঞ্জন বা অসম্ভব কোনো দাবি আছে কি না তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মুসলিম ইতিহাসে অনেক সময় এমন কিছু বিবরণ আসে যেখানে অবাস্তব বা অলৌকিক বিষয়ের অবতারণা করা হয়; যেমন — কোনো ব্যক্তি বাতাসে উড়ছেন কিংবা অতি সামান্য সৈন্য নিয়ে অবান্তর অসাধ্য সাধন করছেন। এসব ক্ষেত্রে ঘটনার প্রেক্ষাপট, স্ববিরোধিতা এবং প্রকৃত তথ্যের সাথে এর যৌক্তিকতা বিচার করা জরুরি। তথ্যের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যই এর সত্যতা নিশ্চিত করে।

৪. বাহ্যিক সাক্ষ্য (External Evidence)

আলোচিত বিষয়টি সম্পর্কে অন্য কোনো সমসাময়িক উৎস কী বলছে, তা খতিয়ে দেখা। যেমন — আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সিরাত রচনার ক্ষেত্রে কুরআন মাজিদ এবং অন্যান্য প্রামাণ্য বর্ণনা তো রয়েছেই, তবে সেই সময়কার কবিতাগুলোও বড় বাহ্যিক সাক্ষ্য হতে পারে। তৎকালীন আরব কবিতায় অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। কোনো ঐতিহাসিক তথ্যকে সংশোধন বা সত্যতা যাচাইয়ের জন্য এই বাহ্যিক সাক্ষ্যের ভূমিকা অপরিসীম।

৫. স্থান ও কালের প্রাসঙ্গিকতা

বর্ণিত ঘটনাটি ওই সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ভৌগোলিক অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা। উদাহরণস্বরূপ — কেউ যদি দাবি করে, একটি বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনা যখন ঘটেছিল তখন ওই অঞ্চলে প্রচণ্ড শীত ছিল, অথচ ভৌগোলিক তথ্য অনুযায়ী সেই নির্দিষ্ট মাসে সেখানে শীত থাকার কোনো সুযোগই নেই; তবে পুরো বর্ণনাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

৬. মূল পাঠ ও পরবর্তী ব্যাখ্যার পার্থক্য

অনেক সময় মূল ঘটনার সাথে পরবর্তী সময়ে নানা রকম ব্যক্তিসাপেক্ষ ব্যাখ্যা ও বিবরণ যুক্ত হয়। যেমন — ‘শাক্কুল কামার’ বা চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করার ঘটনা। এক বর্ণনাকারী মূল ঘটনাটি একভাবে বলছেন, আরেকজন তার নিজস্ব অনুভূতির মিশেলে অন্যভাবে বলছেন (যেমন — হাতের ইশারায় চাঁদ দুভাগ হয়ে দুই দিকে চলে গেল)। ইতিহাস পাঠের সময় মূল ঐতিহাসিক সত্য এবং পরবর্তীতে যুক্ত হওয়া বর্ণনামূলক ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে জানা জরুরি।

৭. ধ্রুব সত্য ও ধারণাপ্রসূত ইতিহাসের পার্থক্য

যে বিষয়টা নিশ্চিত ও প্রমাণিত, তা নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকে না (যেমন — বাংলাদেশের অভ্যুদয়)। কিন্তু এই ঘটনার প্রেক্ষাপট নিয়ে একেক জনের একেক রকম বিশ্লেষণ বা ধারণাপ্রসূত ব্যাখ্যা থাকতে পারে। যেমন — পাকিস্তানি পাঠ্যপুস্তকে দাবি করা হয় যে, তৎকালীন হিন্দু শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের মনে এক ধরনের বিশেষ চিন্তা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন অথবা রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্পর্কে ভিন্ন মূল্যায়ন করা হয় — এগুলো একেকটি দৃষ্টিভঙ্গি বা ধারণা। এই ব্যাখ্যাগুলোর সত্যতা বিশ্লেষণ করে প্রকৃত সত্যে পৌঁছানো এবং বিভ্রান্তি এড়ানোই ইতিহাস পাঠের মূল লক্ষ্য।

এই সাতটি মূলনীতি মূলত ইতিহাস পাঠ এবং ইতিহাস থেকে সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান গাইডলাইন বা পাথেয় হিসেবে কাজ করে।

মোহাম্মদ সিয়াম: ইসলামি ইতিহাস অধ্যয়নের মৌলিক নীতিসমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার জন্য ধন্যবাদ। আমার পরবর্তী প্রশ্ন হলো — শিয়াদের ইতিহাসের আকর গ্রন্থগুলো কি আলাদা? অর্থাৎ পূর্বে আপনি ইতিহাসের যে সকল আকর গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেছিলেন, সেগুলোর মধ্যেই কি শিয়াদের ইতিহাসও অন্তর্ভুক্ত, নাকি তাদের জন্য পৃথক কোনো আকর গ্রন্থ রয়েছে? সংক্ষেপে, শিয়া এবং সুন্নি — উভয় পক্ষের জন্যই ইতিহাসের প্রাথমিক আকর গ্রন্থগুলো অভিন্ন কি না, তা পরিষ্কার করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

শিয়া ইতিহাস ও দৃষ্টিভঙ্গি

জনাব নাইম বালুচ: শিয়া সম্প্রদায় ইতিহাসের বর্ণনার ক্ষেত্রে একটি বড় বৈসাদৃশ্য বজায় রেখে চলে। তারা কেবল আহলে বাইত এবং যারা হযরত আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর প্রতি সহমর্মী ও তার অনুসারী ছিলেন, তাদের বর্ণনাগুলোকেই নির্ভরযোগ্য মনে করে এবং কেবল তাদের থেকেই বর্ণনা গ্রহণ করেন।

আহলে বাইত ছাড়া অন্যান্য পক্ষ, বিশেষ করে হযরত ওসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও হযরত আমির মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) — যাদেরকে ‘শিয়ানে মুয়াবিয়া’ বলা হয় — তাদের কোনো বর্ণনা আসলে শিয়াপন্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করে। ইতিহাস গ্রহণের ক্ষেত্রে এটাই তাদের প্রধান অন্তরায়। এ কারণেই তারা ইবনে হিশাম বা ইবনে ইসহাকের মতো প্রাচীন ও বিখ্যাত ঐতিহাসিকদের পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান না করলেও এবং তাদের ইতিহাসের উৎস হিসেবে গণ্য করলেও, সেখান থেকে কেবল সেই অংশগুলোই গ্রহণ করে, যা তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সুন্নিদের ক্ষেত্রেও এমনটি দেখা যায়। যেসব ঐতিহাসিকের বর্ণনায় শিয়াপন্থী মনোভাব বা প্রভাব পাওয়া যায়, সুন্নি স্কলাররা তাদের কঠোর সমালোচনা করেন; যেমন — ওয়াকিদির বর্ণনা বা ইয়াকুবির ইতিহাস। এমনকি ইমাম তাবারি এবং বালাজুরির কোনো কোনো বর্ণনার ক্ষেত্রেও এই ভিন্নমত ও সমালোচনা দেখা যায়। সুতরাং ঐতিহাসিক ও বর্ণনা গ্রহণের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের মধ্যেই এই পার্থক্য বিদ্যমান।

শিয়াদের মৌলিক গ্রন্থসমূহ

শিয়াদের প্রধান ও মৌলিক ৪টি হাদিস ও ইতিহাসভিত্তিক কিতাবকে ‘কুতুবুল আরবা’ বলা হয়। সেগুলো হলো:

·    শেখ কুলাইনির ‘আল-কাফি’

·    শেখ সুদুকের ‘মান লা ইয়াহদুরুহুল ফকিহ’

·     শেখ তুসির ‘তাহজিবুল আহকাম’

·     শেখ তুসির ‘আল-ইস্তিবসার’

তবে শিয়ারা এই কিতাবগুলোর সব বিষয়কে অন্ধভাবে মেনে নেয় না; সেখানেও তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা ও মতপার্থক্য রয়েছে। এছাড়া তাদের অন্যান্য মৌলিক ও প্রসিদ্ধ কিতাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

·      শেখ মুফিদের ‘আল-ইরশাদ’

·      তাবারসির ‘ইলামুল ওয়ারা’

·      আল্লামা মাজলিসির ‘বিহারুল আনোয়ার’

·      মুনতাহাউল আমাল

ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পার্থক্য

শিয়া ও সুন্নিদের ইতিহাস চর্চার মূল পার্থক্যটি সংক্ষেপে মূল্যায়ন করলে দেখা যায় — শিয়ারা শুরু থেকেই মনে করেন, হযরত আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু), হযরত ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এবং হযরত ওসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) খিলাফত জবরদখল করেছিলেন এবং অন্য সাহাবিরা হযরত আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পক্ষ না নিয়ে তাদের সমর্থন দিয়েছিলেন। এখান থেকেই এক কেন্দ্রীয় ও বড় রাজনৈতিক-ধর্মীয় মতভেদের সৃষ্টি হয়।

শিয়ারা ইতিহাসকে তাদের ইমামত ও ইমামিয়া আকিদার আলোকে দেখে। তাদের মতে ইমামরা আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত এবং মাসুম বা নিষ্পাপ। অথচ সুন্নিরা হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছাড়া আর কাউকে মাসুম মনে করেন না। ফলে শিয়া ও সুন্নিদের ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি পার্থক্য রয়েছে, যা ইতিহাস পর্যালোচনার সময় সর্বদা বিবেচনায় রাখতে হবে।

মোহাম্মদ সিয়াম: আহলে তাশাইয়ু ও আহলে সুন্নাতের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য এবং তাদের কিতাবসমূহ সম্পর্কে চমৎকার ধারণা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। ইতিহাস সংক্রান্ত পরবর্তী প্রশ্নে যাওয়ার আগে হাদিস নিয়ে একটি বিষয় জানতে চাই। সুন্নিদের যে হাদিসগ্রন্থগুলো রয়েছে — তা সিহাহ সিত্তা হোক কিংবা অন্য কোনো কিতাব — মুসলিম ইতিহাসে সেগুলোর ভূমিকা কী? ধর্মতাত্ত্বিক বা আকিদাগত বিতর্ক ব্যতিরেকে, কেবল ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাসে হাদিসের ভূমিকা বা অবদান সম্পর্কে জানতে আগ্রহী।

হাদিস বনাম সাধারণ ইতিহাস সংকলন

জনাব নাইম বালুচ: হাদিস গ্রহণের মানদণ্ড অত্যন্ত শক্তিশালী, সূক্ষ্ম এবং বেশ কঠিন। বর্ণনাকারীর কাছ থেকে যখন কোনো হাদিস গ্রহণ করা হয়, তখন তা অত্যন্ত কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যায়। সাধারণ ইতিহাস গ্রন্থের মানদণ্ড হাদিসের এই কঠোরতার তুলনায় অনেকটাই শিথিল।

· বর্ণনাকারীর যোগ্যতা ও আদালত: হাদিস গ্রহণের ক্ষেত্রে বর্ণনাকারীর স্মৃতিশক্তি কেমন তা গভীরভাবে পরীক্ষা করা হয়। যে বর্ণনাকারীর সূত্র ধরে তিনি হাদিসটি বর্ণনা করছেন, তার সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ হওয়া আদৌ সম্ভব ছিল কি না — তা ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। এছাড়া তার বোধশক্তি, চরিত্র ও সামাজিক খ্যাতি — যাকে বর্ণনাকারীর ‘আদালত’ বলা হয় — সবকিছু কঠোরভাবে বিচার করে তবেই হাদিস গ্রহণ করা হয়।

· ইতিহাসের শিথিলতা: সাধারণ ইতিহাস গ্রন্থে কোনো একটি বিষয় বর্ণনা করা হলে ঐতিহাসিক যদি তা যৌক্তিক বা পরিস্থিতি অনুযায়ী সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেন, তবেই তা কিতাবে অন্তর্ভুক্ত করে নেন। কিন্তু হাদিসের ক্ষেত্রে সনদের ধারাবাহিকতা ও বর্ণনাকারীর সততা ছাড়া কোনো বিবরণ গৃহীত হয় না।

যেসব নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর কাছ থেকে মুহাদ্দিসগণ হাদিস গ্রহণ করেছেন, তাদের সূত্র থেকে যদি কোনো ঐতিহাসিক বিবরণও পাওয়া যায়, তবে তা ইতিহাসে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য বলে গণ্য করা হয়। মুহাদ্দিসগণ বর্ণনাকারীদের জীবনবৃত্তান্ত ও সত্যবাদিতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যে কঠোর পরিশ্রম ও সতর্কতা অবলম্বন করেছেন, বিশ্বে তার কোনো দ্বিতীয় নজির নেই।

ইমাম বুখারির কিতাবকে যে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও যাচাইকৃত গ্রন্থ বলা হয়, তা বর্ণনাকারীদের সূক্ষ্ম বিচার ও অনন্য মানদণ্ডের কারণেই সম্ভব হয়েছে। ইতিহাস ও হাদিস গ্রন্থের সংকলন প্রক্রিয়ার মধ্যে এটাই হলো সবচেয়ে মৌলিক পার্থক্য।

মোহাম্মদ সিয়াম: আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি ইতিপূর্বে মৌলিক গ্রন্থসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করে একটি চমৎকার তালিকা প্রদান করেছেন এবং ইবনে খালদুনের অবদান প্রসঙ্গে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ইতিহাসে ইবনে খালদুনের প্রকৃত অবদান এবং ইসলামি ইতিহাসে তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মুকাদ্দিমা’-র গুরুত্ব ও মর্যাদা কতটুকু, সে সম্পর্কে জানতে চাই।

এর পাশাপাশি আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন — ইবনে খালদুনের পর ইসলামি ইতিহাসে কি নতুন কোনো ‘নজরিয়া’ বা দৃষ্টিভঙ্গি ও তত্ত্ব সামনে এসেছে, নাকি ইবনে খালদুনই শেষ ব্যক্তিত্ব, যিনি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির অবতারণা করেছেন এবং তার পরে আর নতুন কোনো তত্ত্ব আসেনি? এ বিষয়ে অনুগ্রহ করে দিকনির্দেশনা দিন।

জনাব নাইম বালুচ: আপনার এই প্রশ্নের কয়েকটি অংশ রয়েছে। আমি প্রথম অংশটির উত্তর দিচ্ছি — অর্থাৎ ইবনে খালদুনের ‘মুকাদ্দিমা’ কেন এত বিখ্যাত এবং ইতিহাসে এর গুরুত্ব কতটুকু। মূলত ‘মুকাদ্দিমা’ তার একটি বিশাল ঐতিহাসিক গ্রন্থের ভূমিকা মাত্র, যা পরবর্তীতে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণে স্বতন্ত্রভাবে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা লাভ করে।

ইতিহাস চর্চায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন

ইবনে খালদুনের পূর্বে ইতিহাস চর্চার ধারাটি ছিল মূলত বাদশাহদের যুদ্ধবিগ্রহ, বংশলতিকা এবং বিভিন্ন ঘটনার একটি ধারাবাহিক তালিকা মাত্র। কিন্তু জাতিসমূহের উত্থান কেন ঘটে, তাদের চরম উৎকর্ষ বা ‘উরুজ’ কীভাবে হয়, বিশাল বিশাল সালতানাত কীভাবে গড়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে কোন কারণে তা বিলুপ্ত বা পতনশীল হয় — সে বিষয়ে পূর্ববর্তী ঐতিহাসিকগণ পদ্ধতিগত আলোচনা করেননি। সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, ভূগোল এবং নৈতিকতা — এই উপাদানগুলোর নিজস্ব ইতিহাস কী এবং এগুলো সামগ্রিক ইতিহাসের গতিপথের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা ইবনে খালদুনই প্রথম আবিষ্কার করেন।

এই যুগান্তকারী অবদানের কারণে তাকে ‘ইতিহাসের দর্শন’ (Philosophy of History), ‘সমাজবিজ্ঞান’ (Sociology) এবং ‘সাংস্কৃতিক গবেষণার’ (Cultural Studies) অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ মনে করা হয়। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো দেখিয়েছেন যে, কোনো সমাজ বা জাতিকে বুঝতে হলে এই সমস্ত বিষয়ের আন্তঃসম্পর্ক জানা অপরিহার্য। 

ইতিহাস পাঠ ও যাচাইয়ের বৈজ্ঞানিক মূলনীতি

ইবনে খালদুন ইতিহাসের ‘তানকিদ’ বা সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন। তার মতে, কোনো বর্ণনা পাওয়ামাত্রই তা সরাসরি গ্রহণ করা যাবে না, বরং তা কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য এবং অতিরঞ্জনকে আলাদা করার জন্য তিনি ‘মুকাদ্দিমা’-য় কতগুলো মৌলিক নীতি দিয়েছেন:

·  যুক্তি ও বাস্তব সম্ভাবনা: যেকোনো ঐতিহাসিক বর্ণনা বা ঐতিহ্যকে যুক্তি এবং বাস্তব সম্ভাবনার ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। দেখতে হবে সেটা মানব স্বভাব, সামাজিক নিয়ম এবং ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। উদাহরণস্বরূপ — কোনো ঐতিহাসিক যদি দাবি করেন, অমুক প্রাচীন শহরে কয়েক লক্ষ সৈন্য আক্রমণ করেছিল, তবে সমাজতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে খতিয়ে দেখতে হবে সেই শহরের আয়তন, জনসংখ্যা ও রসদ কি আদৌ এত বড় একটি বাহিনীর ভার বহন করার সক্ষমতা রাখত?

· ‘মতন’ বা মূল বক্তব্যের যৌক্তিকতা: মুহাদ্দিসগণ তথা হাদিস বিশারদগণ সাধারণত ‘সনদ’ বা বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতার ওপর বেশি জোর দেন। বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী হলে সনদের ধারাবাহিকতায় বর্ণনাটি গৃহীত হয়। কিন্তু ইবনে খালদুন জোর দিয়েছেন ‘মতন’ বা মূল বক্তব্যের যৌক্তিকতার ওপর। তিনি শিখিয়েছেন — শুধু ‘কে’ বলছেন তা দেখলে হবে না, ‘কী’ বলছেন সেটা বাস্তবতার নিরিক্ষে যৌক্তিক কি না তাও খতিয়ে দেখতে হবে।

·  পক্ষপাতদুষ্টতা চিহ্নিতকরণ: পক্ষপাত কেবল ধর্মীয় বা মতাদর্শিক (যেমন শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব) হয় না; এটা গোত্রীয়, রাজনৈতিক বা জাতীয়ও হতে পারে। একজন ঐতিহাসিকের উদ্দেশ্য কী এবং তিনি কেন এই ইতিহাস লিখছেন — তা জানা জরুরি। যেমন, কেউ যদি কোনো বাদশাহর কর্মচারী বা রাজঅনুগ্রহপ্রাপ্ত হন, তবে তার বর্ণনায় সেই শাসকের ত্রুটিগুলো স্বাভাবিকভাবেই ঢাকা পড়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে।

·   অতিরঞ্জন বর্জন: এটা ইতিহাসের মিথ্যাচারের সবচেয়ে বড় উৎস। মানুষ কেবল চিত্তবিনোদনের জন্য বা গল্পকে আকর্ষণীয় করতে ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে অদ্ভুত সব অতিরঞ্জিত বিবরণ যোগ করে দেয়। ইবনে খালদুন এই অতিরঞ্জন থেকে ইতিহাসকে মুক্ত করার তাগিদ দিয়েছেন, কারণ প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনাই কোনো না কোনো সামাজিক পরিবেশ ও প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে ঘটে থাকে।

আসাবিয়া এবং সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের জীবনচক্র

একটি জাতির আসাবিয়া (সামাজিক সংহতি বা গোত্রীয় ঐক্য), অর্থনীতি, ধর্ম, ভূগোল, পেশা এবং শহুরে বা গ্রামীণ জীবন — এসবের ওপর ভিত্তি করে ইবনে খালদুন তার ‘মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে আলাদা আলাদা অধ্যায় রচনা করেছেন। তিনি প্রতিটি বিষয়কে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতনের একটি সুনির্দিষ্ট জীবনচক্র বা সামাজিক আইন তুলে ধরেছেন।

১. উত্থান পর্ব: আদিম বা গ্রামীণ অবস্থায় একটি গোত্রের মধ্যে তীব্র ‘আসাবিয়া’ বা সামাজিক সংহতি থাকে। এই ঐক্যের শক্তিতে তারা কোনো দুর্বল বা বিলাসপ্রিয় সাম্রাজ্যকে আঘাত করে নিজেদের শাসন কায়েম করে এবং উন্নতির শিখরে পৌঁছায়।

২. বিকাশ ও স্থবিরতা:  শাসন ক্ষমতা স্থায়ী হওয়ার পর তাদের মধ্যে বিলাসিতা, প্রচুর ধন-সম্পদ ও নাগরিক সভ্যতার আগমন ঘটে। শাসকেরা তখন আরাম-আয়েশে মগ্ন হয়ে পড়েন।

৩. পতন পর্ব: প্রজাদের দমনের জন্য এবং বিলাসিতার খরচ মেটাতে শাসকেরা তখন জুলুম ও অতিরিক্ত করের আশ্রয় নেন, ফলে সামগ্রিক মানুষের চরিত্রের দৃঢ়তা ও নৈতিকতা কমে যায়। একপর্যায়ে শাসকরা যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার চেয়ে প্রাসাদে থাকাকেই বেশি পছন্দ করেন। এই চরম দুর্বলতার সুযোগে অন্য কোনো সংহতিপূর্ণ উদীয়মান শক্তি (নতুন আসাবিয়া) তাদের ওপর আক্রমণ করে এবং তাদের পরাজিত করে ক্ষমতা দখল করে নেয়।

সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে অতীত মূল্যায়নের গুরুত্ব

ইবনে খালদুনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হলো — অতীতের কোনো ঘটনাকে বর্তমানের মানদণ্ড বা আধুনিক চশমা দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। প্রতিটি যুগের নিজস্ব প্রয়োজন, সম্পদ, অভ্যাস এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা থাকে। আজ আমরা যে সামাজিক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থার (যেমন গণতন্ত্র) জয়গান গাইছি, তৎকালীন যুগে ঐতিহাসিক বাস্তবতায় সেটা হয়তো অকার্যকর কিংবা ক্ষতিকরও হতে পারত। তাই কোনো একজন ঐতিহাসিক চরিত্র বা শাসক কেন একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা সে সময়ের সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে।

একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ:

খিলাফতে রাশিদুনের সময়কালটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রথম তিনজন খলিফা — হযরত আবু বকর সিদ্দিক, হযরত ওমর ফারুক এবং হযরত ওসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) — সম্পূর্ণভাবে তাদের মহান চরিত্র, যোগ্যতা ও শুরা পদ্ধতির ভিত্তিতে নির্বাচিত হয়েছিলেন; সেখানে বংশগত কোনো উত্তরাধিকার কাজ করেনি। কিন্তু হযরত আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফত একটি চরম বিশৃঙ্খল ও উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে শুরু হয়।

পরবর্তীতে হযরত আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তার পুত্র হযরত হাসান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে এবং পরবর্তীতে হযরত মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তার পুত্র ইয়াজিদকে উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। তারা দুজনেই খিলাফতে রাশিদুনের সেই প্রচলিত রীতি থেকে বের হয়ে উত্তরাধিকার প্রথার দিকে গিয়েছিলেন।

এখন প্রশ্ন হলো — হযরত আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এবং হযরত মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কি ধর্মীয় বুঝ বা ইসলামের জ্ঞানের অভাবে এমনটি করেছিলেন, নাকি তারা স্রেফ বংশীয় শাসন কায়েম করতে চেয়েছিলেন? সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিষয়টি তেমন নয়। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় গোত্রীয় সংহতি ও বংশীয় প্রভাব এত তীব্র রূপ ধারণ করেছিল যে, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য উত্তরাধিকার প্রথাই ছিল একমাত্র কার্যকর উপায়। গোত্রীয় সংহতির এই বাধ্যবাধকতা ছাড়া সাধারণ মানুষ অন্য কোনো সাধারণ শাসককে সহজে মেনে নিচ্ছিল না।

আমরা যদি তৎকালীন সময়ের এই সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট না বুঝি, তবে আমরা এই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে ভুল বুঝব বা তাদের অভিযুক্ত করব। ইবনে খালদুন ইতিহাসের এই ধারাটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা আমাদের তৎকালীন ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে একটি গভীর, বস্তুনিষ্ঠ ও নতুন বোধ প্রদান করে। 

ইবনে খালদুনোত্তর যুগের স্থবিরতা ও তার গ্রন্থপঞ্জি

ইবনে খালদুনের সমস্ত ঐতিহাসিক মূলনীতিকে একটি বাক্যে প্রকাশ করলে দাঁড়ায় — ইতিহাসকে কেবল প্রথাগত বর্ণনা হিসেবে নয়; বরং যুক্তি, সমাজতত্ত্ব, রাজনীতি, অর্থনীতি, ভূগোল এবং মানুষের সামাজিক অভ্যাসের মানদণ্ডে বিচার করতে হবে।

ইবনে খালদুনের পর ইসলামি ইতিহাসে নতুন কোনো তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি বা ‘নজরিয়া’ সামনে আসেনি। মুসলমানরা তার তৈরি করে দেওয়া ভিত্তির ওপরই সন্তুষ্ট ছিল, তাকে আর এগিয়ে নেয়নি। জ্ঞানতাত্ত্বিক উন্নতি একটি মইয়ের মতো; প্রত্যেক পরবর্তী গবেষক যদি পূর্বসূরিদের গবেষণাকে ভিত্তি করে সামনে না এগোন, তবে জ্ঞানের উচ্চতা বৃদ্ধি পায় না। ইবনে খালদুন যখন আবির্ভূত হন, তখন মুসলমানদের রাজনৈতিক পতন শুরু হয়েছিল। তাতারিদের (মোঙ্গল) আক্রমণ থেকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করাই তখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে দর্শন, ইতিহাস বা নতুন কোনো জ্ঞানতাত্ত্বিক তত্ত্ব নিয়ে কাজ করার সুযোগ মুসলিম বিশ্বে সংকীর্ণ হয়ে পড়ে।

আল্লামা ইবনে খালদুনের প্রধান গ্রন্থসমূহ নিচে উল্লেখ করা হলো:

· কিতাবুল ইবার: এর পুরো নাম—‘আল-ইবার ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদা ওয়াল খবর ফি আইয়ামিল আরব ওয়াল আজম ওয়াল বারবার ওয়ামান আসরাহুম মিন যাউয়িস সুলতানিল আকবর’। এটা বিশ্ব ইতিহাসের এক বিশাল সংকলন। আমাদের আলোচিত বিখ্যাত ‘মুকাদ্দিমা’ মূলত এই বিশাল গ্রন্থের প্রথম খণ্ড বা ভূমিকা মাত্র, যা পরবর্তীতে স্বতন্ত্র গ্রন্থ হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়।

· আত-তারিফ বি ইবনে খালদুন ওয়া রেহলাতুহু গারবান ওয়া শারকান: এটা ইবনে খালদুনের নিজস্ব আত্মজীবনী ও ভ্রমণবৃত্তান্ত।

·  লুবাবুল মুহাস্সিল ফি উসুলুদ দিন: এটা মূলত ইমাম ফখরুদ্দিন রাজির ‘আল-মুহাস্সিল’ (ইলমুল কালাম ও আকাইদ সংক্রান্ত গ্রন্থ) গ্রন্থের একটি সারসংক্ষেপ।

·  শিফাউস সায়িল লি তাহযিবিল মাসায়িল: এটা তাসাউফ, আধ্যাত্মিকতা এবং আত্মশুদ্ধির ওপর রচিত তার একটি অত্যন্ত চমৎকার ও কৌতূহলোদ্দীপক গ্রন্থ।

মোহাম্মদ সিয়াম: আল্লামা ইবনে খালদুন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার জন্য ধন্যবাদ। এবার আমি আল্লামা শিবলি নুমানি সম্পর্কে জানতে চাই। উপমহাদেশে আধুনিক যুগে ইসলামি ইতিহাস নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছিল, সেগুলোর উত্তর তিনি কীভাবে দিয়েছেন এবং ইতিহাস শাস্ত্রে তার অবদান কী? এ বিষয়ে কিছু আলোকপাত করবেন কি?

জনাব নাইম বালুচ: আল্লামা শিবলি নুমানি সম্পর্কে আমি এক ঘণ্টারও বেশি সময়ের একটি দীর্ঘ প্রামাণ্যচিত্র (Documentary) তৈরি করেছি, যার চিত্রনাট্য ও নির্মাণ প্রক্রিয়ায় আমি সরাসরি যুক্ত ছিলাম। সেখানে শিবলি নুমানির ইতিহাস রচনার পদ্ধতি ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। সংক্ষেপে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে উল্লেখ করছি।

আল্লামা শিবলি নুমানিকে আধুনিক যুগের অন্যতম প্রধান মুসলিম স্কলার বা পণ্ডিত বললে ভুল হবে না। তিনি তার সময়ের প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে মুসলমানদের মধ্যকার গোষ্ঠীগত বিভেদ দূর করার পথ দেখিয়েছিলেন। একদিকে দেওবন্দি ধারা, অন্যদিকে আহলে হাদিস এবং ফিকহে হানাফি ধারা — তিনি নিজে ইমাম আবু হানিফার আদর্শের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও এই সমস্ত সংকীর্ণ গণ্ডি বা স্কুল অব থটস থেকে উপরে উঠেছিলেন। তিনি নিজেকে পুরো মুসলিম উম্মাহর এক বিশ্বজনীন পণ্ডিত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

শিবলি নুমানির ইতিহাস রচনার প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য

আল্লামা শিবলি নুমানির ইতিহাস রচনার মূল ভিত্তি ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ শাসন এবং প্রাচ্যবিদদের (Orientalists) ইসলাম সম্পর্কে ছড়ানো বিভ্রান্তি দূর করা। প্রাচ্যবিদরা ইসলামের বিরুদ্ধে যেসব ভ্রান্ত ধারণা প্রচার করেছিল, তা রাজনৈতিকভাবে পরাজিত ও অসহায় মুসলমানদের মধ্যে তীব্র হীনম্মন্যতা তৈরি করে। অনেক মুসলমান তখন মনে করতে শুরু করেছিলেন যে, হয়তো তাদের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক আদেশেই কোনো ত্রুটি রয়েছে। আল্লামা শিবলি নুমানি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই হীনম্মন্যতা থেকে উত্তরণের জন্য একটি যুক্তিনির্ভর, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ইতিহাসের প্রয়োজন।

তিনি অত্যন্ত মর্যাদা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে প্রাচ্যবিদ এবং আধুনিক শিক্ষিত সমাজকে উদ্দেশ্য করে নিজের গবেষণাধারার বিকাশ ঘটান। তিনি ইবনে খালদুনের চিন্তাধারা ও সমাজতাত্ত্বিক মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে ইতিহাসকে উপস্থাপন করেছিলেন, যা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনন্য মাইলফলক।

আল্লামা শিবলি নুমানির উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ:

· সিরাতুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম): স্যার সাইয়্যিদ আহমদ খানের একটি বড় স্বপ্ন ছিল প্রাচ্যবিদদের লেখা ইসলামবিদ্বেষী বইগুলোর উপযুক্ত জবাব তৈরি করা। প্রাচ্যবিদদের অবান্তর ও ভিত্তিহীন দাবির বুদ্ধিবৃত্তিক জবাব হিসেবে আল্লামা শিবলি নুমানি এই সিরাত গ্রন্থটি রচনা করেন। এর প্রথম খণ্ডে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পূর্ণাঙ্গ জীবনী স্থান পায়। পরবর্তী খণ্ডগুলো — যা সিরাতের ভিন্ন ভিন্ন তাত্ত্বিক দিকের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পিত ছিল — তা তার যোগ্য ছাত্র সাইয়্যিদ সুলাইমান নদভি সম্পন্ন করেন। এই গ্রন্থের ভূমিকাটি সিরাত গবেষণার এক অনন্য সারসংক্ষেপ।

· আল ফারুক: এটা হযরত ওমর ফারুক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সিরাত, খিলাফত, রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসনিক সংস্কার ও বিজয়ের ওপর লেখা একটি কালজয়ী গ্রন্থ।

·  আল মামুন: এটা আব্বাসীয় খলিফা মামুনুর রশিদের শাসনামল, তৎকালীন জ্ঞানবিজ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে কেন্দ্র করে এই ইতিহাস গ্রন্থটি রচিত।

·  সিরাতুন নুমান ও আল গাজালি: ‘সিরাতুন নুমান’ গ্রন্থে ইমাম আবু হানিফা এবং ‘আল গাজালি’ গ্রন্থে ইমাম গাজালির জীবন ও দর্শন আলোচিত হয়েছে।

·  ইলমুল কালাম ও মাকালাত (প্রবন্ধ সমগ্র): এই বই এবং প্রবন্ধগুলোতে কেবল সাধারণ ইতিহাসই নয়, বরং ইসলামি আকিদা, বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক এবং মুসলমানদের ইলমি ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নানা দিক নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। 

আধুনিক বিজ্ঞানের মুখোমুখি শিবলি নুমানি

ডারউইনের বিবর্তনের তত্ত্ব (Theory of Evolution) যখন সামনে আসে, তখন অনেক মুসলিম স্কলার দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। আল্লামা শিবলি নুমানি তখন ডারউইনের তত্ত্ব নিয়ে তার নিজস্ব দার্শনিক মতামত পেশ করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, বৈজ্ঞানিক বিবর্তন একটি অনিবার্য প্রক্রিয়া এবং এটা মৌলিক ইসলামি বা ধর্মীয় শিক্ষার পরিপন্থী নয়।

‘মুজাদ্দেদ’ বনাম ‘মুতাযাদিদ’: স্যার সাইয়্যিদ ও শিবলি নুমানি

আল্লামা শিবলি নুমানি দীর্ঘদিন আলিগড়ে স্যার সাইয়্যিদ আহমদ খানের সান্নিধ্যে গবেষক হিসেবে কাজ করেছিলেন। তবে একপর্যায়ে তিনি অনুভব করেন যে, স্যার সৈয়দের চিন্তাধারা ইসলামের মৌলিক দর্শন থেকে বিচ্যুত হচ্ছে এবং তিনি অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইসলামকে আধুনিক পশ্চিমা যুগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করছেন। শিবলির দৃষ্টিতে, স্যার সাইয়্যিদ ‘মুজাদ্দেদ’ (সংস্কারক) হওয়ার পরিবর্তে ‘মুতাযাদিদ’ (বিরোধী বা বিতর্কিত ধারার প্রবক্তা) হয়ে উঠছিলেন।

· মুতাযাদিদ: এমন ব্যক্তি, যিনি নিজের মনগড়া আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাসের তথ্য বা ব্যাখ্যাকে পরিবর্তন করেন।

·  মুজাদ্দেদ: যিনি সমসাময়িক পরিস্থিতি ও যুগের নিরিখে ইসলামের চিরন্তন সত্যগুলোকে নতুন আঙ্গিকে ও যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করে মানুষের সংশয় দূর করেন।

আল্লামা শিবলি ছিলেন প্রকৃত অর্থে একজন ‘মুজাদ্দেদ’। তার একটি বিখ্যাত বক্তব্য হলো:

“আমি ইসলামকে আজকের যুগের গোলকধাঁধা থেকে বের করে সেই সাহাবা ও আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগ পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাই, যখন ইসলাম তার আদি ও অকৃত্রিম রূপে ছিল; এবং পরবর্তী সময়ে মুসলমানদের মধ্যে যেসব অনৈসলামি চিন্তাধারা ও বিচ্যুতি ঢুকেছে, তা থেকে ধর্মকে পবিত্র রাখতে চাই।"

দাবিস্তানে শিবলি (শিবলির চিন্তাধারা) ও তার উত্তরাধিকার

আল্লামা শিবলি নুমানি কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় গণ্ডিতে আটকে না থেকে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান ও ইসলামি বিজ্ঞানকে ধারণ করতে চেয়েছিলেন। তার এই প্রগতিশীল ও সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ধারাটিকে ‘দাবিস্তানে শিবলি’ বলা হয়। তার এই চিন্তাধারার সার্থক উত্তরাধিকারী হলেন ইমাম হামিদুদ্দিন ফারাহি, ইমাম আমিন আহসান ইসলাহি এবং জাভেদ আহমেদ গামিদি। এছাড়া মাওলানা মওদুদি এবং আবুল কালাম আজাদের মতো যুগস্রষ্টা ব্যক্তিত্বদের ওপরও তার গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব ছিল।

মোহাম্মদ সিয়াম: আল্লামা শিবলি নুমানি (রহ.)-এর কাজকে তার সুযোগ্য ছাত্র মাওলানা সুলাইমান নদভি যেভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, সে বিষয়ে আমরা জেনেছি। শিবলি নুমানির পর ভারতীয় উপমহাদেশে এই ঐতিহাসিক ধারাকে আর কোন কোন ব্যক্তিত্ব জারি রেখেছেন এবং তাদের মৌলিক কিতাবসমূহ কী কী — সে সম্পর্কে সংক্ষেপে জানতে চাই। এর পাশাপাশি, শিবলির সমসাময়িক সময়ে উপমহাদেশের বাইরের ইতিহাসের ওপর কি উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ হয়েছে? হয়ে থাকলে সেই ধারার মৌলিক ব্যক্তিত্ব ও তাদের আকর গ্রন্থসমূহ সম্পর্কেও সংক্ষেপে আলোকপাত করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

জনাব নাইম বালুচ: আল্লামা শিবলি নুমানির পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশে ইতিহাস চর্চাকে যারা এগিয়ে নিয়েছেন, তারা মূলত উর্দু ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই অত্যন্ত মূল্যবান অবদান রেখেছেন। এই ধারার প্রধান প্রধান ইতিহাসবিদ এবং তাদের ঐতিহাসিক কাজের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

শিবলি-উত্তর যুগের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও তাদের গ্রন্থপঞ্জি

·  সাইয়্যিদ সুলাইমান নদভি: আল্লামা শিবলি নুমানির প্রধান ছাত্র হিসেবে তিনি এই সিলসিলায় সবচেয়ে বড় নাম। তিনি শিবলির অসম্পূর্ণ ‘সিরাতুন্নবী’ গ্রন্থটি সফলভাবে সমাপ্ত করেন। তার নিজস্ব মৌলিক কাজের মধ্যে ‘খুতবাতে মাদরাস’ এবং আরব ও হিন্দুস্তানের পারস্পরিক ঐতিহাসিক সম্পর্ক নিয়ে রচিত গ্রন্থসমূহ অন্যতম। এ ছাড়া শিবলি নুমানির জীবনীর ওপর তার লেখা গ্রন্থটি ইতিহাস চর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

·  মোহাম্মদ হাবিব: তিনি আলিগড় ঘরানার (Aligarh School of History) অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ঐতিহাসিক। তার গবেষণার মূল বিষয়বস্তু ছিল পবিত্র কুরআন, মধ্যযুগের হিন্দুস্তানি ইতিহাস, দিল্লি সালতানাত, সামাজিক ইতিহাস এবং হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক।

·  কে. এ. নিজামি: তিনি মূলত ইংরেজি ভাষায় মধ্যযুগের ইতিহাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে:

o    The Life and Times of Shaikh Nizam-ud-din Auliya

o    Some Aspects of Religion and Politics in India During the Thirteenth Century

o    History and Historians of Medieval India

·  এস. এম. ইকরাম: ইংরেজি ভাষায় তার রচিত ‘History of Muslim Civilization in India and Pakistan’ একটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ আকর গ্রন্থ, যার সংক্ষিপ্ত রূপটি পরবর্তীতে ‘Muslim Civilization in India’ নামে প্রকাশিত হয়।

·  তারা চাঁদ: তিনি একজন অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও নিরপেক্ষ ও বড় মাপের ঐতিহাসিক হিসেবে সমাদৃত। তিনি মূলত ইংরেজি ভাষায় ভারতের ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছেন।

·  ইশতিয়াক আহমেদ কোরেশি: পাকিস্তানের এই প্রথিতযশা ঐতিহাসিকের বিখ্যাত গ্রন্থ হলো ‘The Muslim Community of the Indo-Pakistan Subcontinent’।

· মোহাম্মদ মুজিব: উপমহাদেশীয় মুসলিম সমাজের বিবর্তনের ওপর লেখা তার ‘The Indian Muslims’ বইটি অত্যন্ত বিখ্যাত।

·  আজিজ আহমেদ: তিনি উর্দু ও ইংরেজি উভয় ভাষায় দক্ষ হলেও ইংরেজিতে তার কাজের পরিধি ব্যাপক। তার উল্লেখযোগ্য দুটি বই:

o    Studies in Islamic Culture in the Indian Environment

o    An Intellectual History of Islam in India

· ইরফান হাবিব: তিনি একজন মার্ক্সবাদী ঐতিহাসিক এবং মোগল আমলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের ওপর তার বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তার বিখ্যাত গ্রন্থ হলো ‘The Agrarian System of Mughal India’।

·  রমিলা থাপার: প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত সুপরিচিত নাম। অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তিনি সম্পূর্ণ ধর্মীয় বিদ্বেষমুক্ত হয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে ইতিহাস চর্চা করেছেন।

· ড. মোবারক আলি: পাকিস্তানের এই আধুনিক ঐতিহাসিক উর্দু ভাষায় বিপুল কাজ করেছেন। রাষ্ট্র ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে জনগণের ইতিহাস ধারাকে তিনি জনপ্রিয় করেন। তার রচিত অসংখ্য বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

o    ‘তারিখ ও আওরাত’ (ইতিহাস ও নারী)

o    ‘তারিখ ও সিয়াসত’ (ইতিহাস ও রাজনীতি)

o    ‘তারিখ কা নায়া জাবিয়া’ (ইতিহাসের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি)

o    ‘আলমিয়া-ই-তারিখ’ (ইতিহাসের বিয়োগান্তক)

o    ‘তারিখ কি পৈদাইশ’ (ইতিহাসের জন্ম)

দেশভাগ-উত্তর ইতিহাস চর্চা এবং রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতিত্ব

উপমহাদেশে শিবলি নুমানির পরবর্তী সময়ে যে প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমিক ইতিহাস চর্চা হয়েছে, তার সিংহভাগই মূলত ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বিকশিত হয়েছে। এই পর্যায়টিকে কেন্দ্র করে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মূল্যায়ন করা আবশ্যক।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ন্যারেটিভ ও ইতিহাস বিকৃতি

দেশভাগের পর পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্রয়োজনে (বিশেষ করে মুসলিম লীগের আদর্শিক অবস্থান ধরে রাখতে) ইতিহাসকে একটি নির্দিষ্ট ছক বা কাঠামোর মধ্যে সাজানোর চেষ্টা করা হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে ইতিহাসের ভুল ধারণা তৈরি করেছে। এই প্রক্রিয়ায় খোদ আল্লামা শিবলি নুমানির মতো ব্যক্তিত্বকেও রেহাই দেওয়া হয়নি; তার ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে (যেমন আতিয়া ফয়জির প্রসঙ্গ তুলে) নানা অপবাদ বা বিতর্ক তৈরি করে তার সামগ্রিক অবদানকে খাটো করার চেষ্টা করা হয়েছে।

এই চরম রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতের বিপরীতে ড. মোবারক আলি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার কাজ করেছেন। তিনি এই সরকারি বিকৃতি ও একপেশে বর্ণনা থেকে মুক্ত থেকে ইতিহাসকে বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করেছেন। তবে রাষ্ট্রীয় প্রচারণার প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হওয়া আধুনিক উদারপন্থী ঐতিহাসিকদের একাংশের মধ্যেও এক ধরনের সূক্ষ্ম পক্ষপাতিত্ব লক্ষ্য করা যায়, যা পদ্ধতিগতভাবে সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। 

ভারতীয় ইতিহাসের সামগ্রিক যুগবিভাগ এবং অধ্যয়নের দৃষ্টিভঙ্গি

উপমহাদেশের সামগ্রিক ইতিহাসকে প্রধানত কয়েকটি ঐতিহাসিক যুগে বিভক্ত করে অধ্যয়ন করা যেতে পারে:

১. প্রাক-মুসলিম যুগ (বৈদিক ও আর্য আমল): মুসলমানদের আগমনের পূর্ববর্তী সময়কাল, যেখানে আর্যদের আগমন ও আদি বৈদিক সভ্যতা নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে একাধিক ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ ও বিশ্লেষণ বিদ্যমান।

২. প্রাচীন বৈদেশিক আক্রমণ ও যোগাযোগের যুগ: মুসলমানদের আগমনের পূর্বে আলেকজান্ডারের আক্রমণসহ গ্রিক এবং ইরানিদের সাথে ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংস্পর্শের ইতিহাস।

৩. আরব ও মুসলিম শাসনকাল: সিন্ধু বিজয় ও সুলতানি আমল থেকে শুরু করে মোগল সাম্রাজ্যের পতন পর্যন্ত দীর্ঘ মুসলিম শাসনব্যবস্থার যুগ।

৪. ব্রিটিশ উপনিবেশকাল: ইংরেজদের আগমন, শাসন এবং এর ফলে সৃষ্ট আধুনিক রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের ইতিহাস।

ইংরেজদের আগমনের পর উপমহাদেশে ইতিহাস রচনার বৈজ্ঞানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারা সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও, তাদের ইতিহাসেও ঔপনিবেশিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট গভীর পক্ষপাত ছিল, যদিও অনেক তথ্যগত সত্যও সেখানে পাওয়া যায়।

পরবর্তীতে ভারত ও পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাওয়ার পর, পাকিস্তানের নিজস্ব এক ধরনের রাজনৈতিক পক্ষপাত তৈরি হয়েছে এবং বর্তমান হিন্দুস্তানেরও নিজস্ব রাজনৈতিক ও আদর্শিক পক্ষপাত তৈরি হয়েছে। ফলশ্রুতিতে, উভয় দেশেই আজ ইতিহাসকে অত্যন্ত বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

ইতিহাসের এই তীব্র মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে আমাদের অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। ইতিহাসের কোনো বিবরণ বা কোনো ব্যক্তির বক্তব্যকেই অন্ধভাবে গ্রহণ করা যাবে না; বরং প্রত্যেকটি বিষয়কে অকাট্য দলিল, ধ্রুপদী উৎস এবং পূর্বে আলোচিত ইতিহাস পাঠের ৭টি মৌলিক নীতির (যেমন: উৎসের যাথার্থ্য, যৌক্তিকতা ইত্যাদি) মানদণ্ডে কঠোরভাবে বিচার করতে হবে।

মোহাম্মদ সিয়াম: ভারতবর্ষের বাইরে — অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্য, তুরস্ক, ইরানসহ অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোতে আধুনিক যুগে মুসলিম ইতিহাসের ওপর বিশেষ কোনো কাজ হয়েছে কি না? এমন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিত্ব বা আকর গ্রন্থ কি আছে, যা মুসলিম ইতিহাস চর্চার এই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে? এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

জনাব নাইম বালুচ: প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী উত্তর-ঔপনিবেশিক (post-colonial) যুগে বিশ্বরাজনীতির পাশাপাশি ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন এবং আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের (Nation-state) উত্থানের পর মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস চর্চা মূলত ৪টি প্রধান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে: 

আধুনিক মুসলিম ইতিহাস চর্চার ৪টি প্রধান দিকবদল

  • জনমুখী ইতিহাস: ইতিহাস এখন কেবল রাজতন্ত্র, সুলতান বা বাদশাহদের যুদ্ধবিগ্রহের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে সমাজের সাধারণ মানুষের দিকে ধাবিত হয়েছে। আধুনিক ঐতিহাসিকদের কাজের মূল উপজীব্য হলো — সাধারণ মানুষ, নারী, শ্রমিক, কৃষক, সংখ্যালঘু এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সামাজিক অনুষঙ্গ।
  • আর্থ-সামাজিক কাঠামোর বিশ্লেষণ: রাজনৈতিক ইতিহাসের পরিবর্তে এখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা, ভূমি ও কর ব্যবস্থা, সেনাবাহিনী, বাণিজ্য, শিক্ষা, আইন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে পদ্ধতিগত ইতিহাস রচিত হচ্ছে।
  • জাতীয়তাবাদের প্রভাব: ইউরোপীয় সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে মুসলিম বিশ্বে ‘জাতি-রাষ্ট্র’ (Nation-state) ধারণার বিকাশ ঘটে। এর ফলে ইতিহাস চর্চায় ইরানিয়ানা (ইরানি জাতীয়তাবাদ), তুর্কিয়ানা, আরব জাতীয়তাবাদ, ফিলিস্তিনি পরিচয়, বারবার (Berber) পরিচয় এবং আঞ্চলিক মুসলিম পরিচয়ের মতো বিষয়গুলো প্রধান নিয়ামক হিসেবে সামনে এসেছে।
  • ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার সমালোচনা: উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগে পূর্ববর্তী ঔপনিবেশিক শাসনের স্বরূপ, তাদের শোষণ, জুলুম ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনামূলক ঐতিহাসিক সাহিত্য ও পর্যালোচনা রচিত হচ্ছে।

ভৌগোলিক পরিমণ্ডল ও জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রভাব

উপদেশের বাইরে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক অবদানের ক্ষেত্রে এই ধারার শীর্ষে রয়েছে ইরান। এরপর পর্যায়ক্রমে তুর্কি, মিসরীয় ও সামগ্রিক আরব বিশ্বের স্কলারদের নাম উল্লেখ করা যায়। পাশাপাশি মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও লেবাননের প্রেক্ষাপটেও উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে।

আধুনিক একাডেমিক পরিমণ্ডলে মুসলিম ইতিহাস নিয়ে যে কাজগুলো হচ্ছে, তাতে যেমন মার্ক্সবাদ ও ঐতিহাসিক নির্ধারণবাদের (Historical Determinism) প্রভাব রয়েছে, তেমনি দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিকগণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার (Capitalism) আলোকেও মুসলিম সমাজের বিবর্তনকে খতিয়ে দেখছেন। এই আলোচনার ধারাগুলো গতানুগতিক বা প্রথাগত ইসলামি ইতিহাসের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন হলেও মুসলিম ইতিহাসের বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এদের প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।

মোহাম্মদ সিয়াম: আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতে নীতিগত দিকনির্দেশনার জন্য ধন্যবাদ। এবার আমি ফারাহি ঘরানা (Farahi School) সম্পর্কে কিছু জানতে চাই। এই ঘরানায় অনেক বড় বড় মনীষীর জন্ম হয়েছে। ইতিহাস সম্পর্কে ইমাম হামিদুদ্দিন ফারাহি এবং ইমাম আমিন আহসান ইসলাহির দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল?

এর পাশাপাশি আল্লামা খালিদ মাসউদের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হায়াতে রাসুলে উম্মি’-র প্রেক্ষাপট, মূল বিষয়বস্তু এবং এতে উঠে আসা নতুন ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

জনাব নাইম বালুচ: প্রথমে মাওলানা হামিদুদ্দিন ফারাহি এবং মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহির অবদান প্রসঙ্গে আলোচনা করা যাক।

ইতিহাস চর্চায় মাওলানা হামিদুদ্দিন ফারাহির অবদান

মাওলানা হামিদুদ্দিন ফারাহির মূল আলোচনার বিষয় ইতিহাস ছিল না; বরং পবিত্র কুরআন এবং কুরআনের ভাষা-শৈলীই ছিল তার প্রধান গবেষণার ক্ষেত্র। তবে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার গুরুত্বপূর্ণ কাজসমূহ নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • আর-রাইউস সহিহ ফি মান হুয়াজ জাবিহ: আল্লাহর পথে কুরবানি হওয়ার জন্য মনোনীত নবী কে ছিলেন — হযরত ইসমাইল (আলাইহিস সালাম) নাকি হযরত ইসহাক (আলাইহিস সালাম)? এই জটিল ও ঐতিহাসিক বিষয়ের ওপর এটা একটি অত্যন্ত উচ্চমানের মৌলিক গবেষণাগ্রন্থ। মূল আরবিতে লেখা এই কিতাবটির উর্দু অনুবাদ করেছেন মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহি। এই গ্রন্থটি বাইবেলীয় ঐতিহ্যের ওপর মাওলানা ফারাহির গভীর পাণ্ডিত্যের অকাট্য প্রমাণ।
  • বাইবেল ও আহলে কিতাব সংক্রান্ত গবেষণা: ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং বাইবেলের ঐতিহাসিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তিনি বেশ কিছু মূল্যবান প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তার ‘রিসালায়ে নবুওয়াত’ ও ‘রিসালায়ে রিসালাত’ প্রবন্ধ ২টি এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
  • নসব নামা: এটা একটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও দুর্লভ পুস্তিকা। এখানে তিনি আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বংশ পরিচয় বা নসব নামা সংক্রান্ত প্রচলিত ঐতিহাসিক ধারণাগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। বাইবেলের বিবরণ এবং হাদিস শাস্ত্রের তথ্যের তুলনামূলক পর্যালোচনার মাধ্যমে তিনি অনেকগুলো নতুন ঐতিহাসিক দিক উন্মোচন করেছেন [যেমন: হযরত ইব্রাহিম অবয়বে হযরত ইসমাইল ও হযরত হাজেরাকে যখন আরবের নির্জন প্রান্তরে রেখে আসেন, তৎকালীন সময়ে ইসমাইল (আলাইহিস সালাম)-এর প্রকৃত বয়স ও পরিস্থিতি কেমন ছিল]। আমি নিজে আমার সিরাত গ্রন্থে মাওলানা ফারাহির এই ‘নসব নামা’ ও ‘মান হুয়াজ জাবিহ’ গ্রন্থের গবেষণালব্ধ তথ্য ব্যবহার করেছি।

মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহির ভূমিকা

মাওলানা ইসলাহি ইতিহাসের ওপর স্বতন্ত্র কোনো বিশেষ কাজ করেননি। তিনি মূলত মাওলানা ফারাহির বইগুলোর অনুবাদ করেছেন এবং তার বিখ্যাত ‘তাদাব্বুর-ই-কুরআন’ তাফসিরটি লিখেছেন, যার মধ্যে ইতিহাসের বেশ কিছু অনুষঙ্গ প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে এসেছে। এই তাফসির রচনার সময় তিনি তার ছাত্রদের, বিশেষ করে খালিদ মাসউদ সাহেবের সাহায্য নিয়েছিলেন এবং কিছু কিছু বিষয়ে জাভেদ আহমেদ গামিদি সাহেবের কাছ থেকেও পরামর্শ নিয়েছেন। তবে সিরাতের ওপর কুরআনিক পদ্ধতিতে কাজের ক্ষেত্রে মাওলানা ইসলাহিই খালিদ মাসউদ সাহেবকে ব্যক্তিগতভাবে পথ দেখান এবং উৎসাহিত করেন।

‘হায়াতে রাসুলে উম্মি’ এবং মাওলানা খালিদ মাসউদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি

মাওলানা খালিদ মাসউদ ছিলেন আমার শ্বশুর। এই বইটির পাণ্ডুলিপির কাজ ও প্রুফ সংশোধনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার কারণে এর মূল থিসিসটি খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।

  • মূল থিসিস: এই বইটির প্রধান দাবি হলো — সিরাতের প্রধান ও অকাট্য আকর উৎস হলো পবিত্র কুরআন; নিছক রেওয়ায়েত বা প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা নয়।
  • কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি: প্রচলিত রেওয়ায়েত বা বর্ণনায় এমন অনেক অনুষঙ্গ আসতে পারে যা সরাসরি নবুয়ত বা রিসালাতের কার্যাবলির সঙ্গে যুক্ত নয় (যেমন তার তৎকালীন ব্যবসা-বাণিজ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ)। আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ২টি সত্তা ছিল — প্রথমত তিনি একজন মানুষ ছিলেন এবং দ্বিতীয়ত তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসুল ছিলেন। পবিত্র কুরআন রিসালাতের দায়িত্ব বা সিরাত সংশ্লিষ্ট কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা বাদ দেয়নি। মাওলানা খালিদ মাসউদ রিসালতের এই সামগ্রিক বিষয়বস্তু বোঝার জন্য কুরআনকেই প্রধান ঐতিহাসিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

সম্পূর্ণ কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রচিত এটাই প্রথম পূর্ণাঙ্গ সিরাত গ্রন্থ। বর্তমানে আমার নিজের সিরাত গ্রন্থটির কাজও সমাপ্তির পথে। আমার এই কাজটি মাওলানা খালিদ মাসউদের বই থেকে অনুপ্রাণিত হলেও আমি তার গবেষণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, যেখানে ‘আল-মাওরিদ’ এবং গামিদ সেন্টার অব ইসলামিক লার্নিং-এর হাদিস ও সিরাত সংক্রান্ত আধুনিক গবেষণালব্ধ বিভিন্ন তথ্যকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও পরিমার্জন করে যুক্ত করা হয়েছে।

মোহাম্মদ সিয়াম: আল-মাওরিদের বর্তমান ইতিহাস সংক্রান্ত কাজ এবং এই শাস্ত্রে ওস্তাদ জাভেদ আহমেদ গামিদি সাহেবের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি কেমন — সে বিষয়ে জানতে চাই। একই সাথে, আল-মাওরিদ এবং ওস্তাদ জাভেদ আহমেদ গামিদি সাহেবের ইতিহাস সংশ্লিষ্ট প্রধান কাজগুলো সম্পর্কে যদি বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিতেন।

জনাব নাইম বালুচ: জাভেদ আহমেদ গামিদি সাহেব পবিত্র কুরআন, ইসলাম এবং এর সামগ্রিক ইতিহাসের একনিষ্ঠ গবেষক। তিনি ‘ইসলামি ইতিহাস’ এবং ‘মুসলিম ইতিহাস’ — উভয় ধারার ওপর গভীর পাণ্ডিত্য রাখেন। তিনি তার বিভিন্ন লেকচারে ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে আলোকপাত করেছেন। সম্প্রতি তিনি হযরত আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এবং হযরত আমির মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মধ্যকার মতপার্থক্য ও সংঘাতের প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং এই বিষয়ে তার নিজস্ব তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।

জাভেদ আহমেদ গামিদির প্রধান গ্রন্থসমূহ

জাভেদ আহমেদ গামিদির ইতিহাস, আকিদা ও চিন্তামূলক গবেষণার একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:

·   আল-বায়ান: এটা পবিত্র কুরআনের ওপর রচিত তার অনন্য তাফসির গ্রন্থ।

·  মিজান: এই গ্রন্থে তিনি ইসলাম সম্পর্কে তার দীর্ঘ গবেষণালব্ধ মূল ভাবধারা ও দর্শন উপস্থাপন করেছেন। তিনি কুরআন ও সুন্নাত থেকে প্রাপ্ত ধর্মের প্রকৃত চেতনাকে আধুনিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরেছেন। তিনি একজন ‘মুজাদ্দিদ’ (সংস্কারক) হিসেবে ধর্মকে কোনো ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই এর অকৃত্রিম রূপে এখানে বিন্যস্ত করেছেন।

·  আল-ইসলাম: এটা মূলত ‘মিজান’ গ্রন্থের একটি চমৎকার ও সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ।

·  বুরহান: বিভিন্ন সময়ে তার সম্পাদিত সাময়িকী ‘ইশরাক’ অথবা অন্যান্য পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত গঠনমূলক সমালোচনা ও প্রবন্ধগুলো এই গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে।

· মাকামাত: এই গ্রন্থে ওস্তাদের ইতিহাস বিষয়ক পর্যালোচনা, আত্মজীবনীমূলক আলাপ এবং বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রশ্নের উত্তর সংকলিত হয়েছে।

·  খেয়াল ও খামা: এটা তার রচিত একটি উচ্চমানের কাব্যগ্রন্থ।

আল-মাওরিদের বর্তমান তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রকল্পসমূহ

·  আপত্তি ও প্রশ্নোত্তর সিরিজ: হাসান ইলিয়াস সাহেবের সঙ্গে জাভেদ আহমেদ গামিদির বহু ঘণ্টার তাত্ত্বিক আলোচনা ও প্রশ্নগুলো এখন গ্রন্থাকারে সংকলিত হচ্ছে। সাইয়্যিদ মনসুরুল হাসান এটা উর্দু ভাষায় সম্পাদনা করছেন এবং ড. ইরফান শেহজাদও এই প্রকল্পে যুক্ত আছেন। মনসুর সাহেব ইতোমধ্যেই ‘শাক্কুল কামার’ (চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়া) এবং কিরাত বা পঠনরীতি সংক্রান্ত ভিন্নমতের ঐতিহাসিক পর্যালোচনার ওপর বইগুলো প্রকাশ করেছেন।

·  হাদিস প্রজেক্ট: জাভেদ আহমেদ গামিদির তত্ত্বাবধানে বর্তমানে একটি বৃহৎ হাদিস প্রকল্পের কাজ চলছে, যার প্রথম খণ্ড ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে।

ইসলামের জ্ঞানতাত্ত্বিক ইতিহাসে যদি শীর্ষস্থানীয় মনীষীদের তালিকা করা হয়, তবে সাহাবিগণের পরবর্তী সময়ের ইতিহাসে জাভেদ আহমেদ গামিদি সাহেবের নাম অন্যতম প্রধান হিসেবে বিবেচিত হবে।

মোহাম্মদ সিয়াম: ওস্তাদ জাভেদ আহমেদ গামিদি হযরত আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এবং হযরত আমির মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মধ্যকার ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব ও বিতর্কের যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেছেন, সে বিষয়ে তার নিজস্ব মূল্যায়ন বা অভিমতটি কী? আহলে সুন্নাত বা আহলে তাশাইয়ু (শিয়া)-দের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে কি তিনি ভিন্ন কোনো মত পোষণ করেন?

আলি-মুয়াবিয়া দ্বন্দ্ব: জাভেদ আহমেদ গামিদির বিশ্লেষণ

জনাব নাইম বালুচ: জাভেদ আহমেদ গামিদি সাহেব মূলত আহলে সুন্নাতের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির খুব কাছাকাছি অবস্থান করেন, যা বিশেষভাবে ইবনে তাইমিয়া বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ তিনি হযরত আমির মুয়াবিয়ার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে অধিকতর যৌক্তিক মনে করেন।

খিলাফতের পরিস্থিতি: জাভেদ আহমেদ গামিদির মতে, হযরত আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফতের সূচনা হয়েছিল একটি চরম বিশৃঙ্খলা ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে, যেখানে মুসলিম উম্মাহর সর্বজনীন ঐক্যমত্য (consensus) পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত ছিল না। বিদ্রোহ ছড়ানোর প্রেক্ষাপটে তিনি মূলত পরিস্থিতিগত কারণে বা ‘বাই ডিফল্ট’ খলিফা মনোনীত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে মানুষ অবশ্য তাকে মেনে নিয়েছিল; কিন্তু যোগ্য ও পরামর্শক ব্যক্তিবর্গের নিয়মতান্ত্রিক পরামর্শের ভিত্তিতে যেভাবে একটি আদর্শ সরকার গঠিত হওয়া উচিত, হযরত আলির প্রশাসন সেভাবে গঠিত হতে পারেনি। তিনি তাকে ‘খলিফায়ে রাশেদ’ হিসেবে মান্য করলেও তা পরিস্থিতিগত বা ‘বাই ডিফল্ট’ হিসেবে দেখেন; হযরত আবু বকর, হযরত ওমর ও হযরত ওসমানের স্বাভাবিক খিলাফত প্রাপ্তির মতো করে দেখেন না। অন্যদিকে, তিনি হযরত আমির মুয়াবিয়াকেও খিলাফতে রাশেদার একজন খলিফা হিসেবে গণ্য করেন।

· খিলাফত স্থানান্তরের আইনি শূন্যতা: তার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মত হলো — মুসলিম উম্মাহ নিজেদের মধ্যে খিলাফত বিলুপ্ত করার বা কোনো খলিফাকে অপসারণ করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা বা নীতিমালা তৈরি করেনি। কুরআন মাজিদে ‘শূরা’ বা পরামর্শ সভার মূলনীতি থাকলেও তার প্রায়োগিক পদ্ধতি (practical application) কেমন হবে, তার কোনো সুস্পষ্ট সাংবিধানিক বিধান তখনকার ইতিহাসে সুনির্দিষ্ট ছিল না।

· উত্তরাধিকার বা রাজতন্ত্রের সূচনা: হযরত আলি যখন তার পুত্র হযরত হাসানকে এবং হযরত আমির মুয়াবিয়া যখন তার পুত্র ইয়াজিদকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন, তা ছিল মূলত তৎকালীন সমাজ ও গোত্রীয় বাস্তবতার এক নির্মম বাধ্যবাধকতা। কারণ হযরত আলি এবং হযরত আমির মুয়াবিয়ার পর সাহাবিদের মধ্যে এমন কোনো সর্বজনীন ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, যাকে মানুষ কোনো বিরোধ ছাড়া খলিফা হিসেবে মেনে নিত। ফলে তৎকালীন বিশ্বের রাজতান্ত্রিক রেওয়াজ ও ক্ষমতার শূন্যতা পূরণের তাগিদে তারা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। এ ক্ষেত্রে তিনি হযরত আমির মুয়াবিয়াকে অত্যন্ত মর্যাদার আসনে রাখেন, কারণ আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী উম্মাহকে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ করার ঐতিহাসিক কৃতিত্ব তার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছিল।

মোহাম্মদ সিয়াম: এবার আপনার নিজস্ব ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক প্রজেক্ট সম্পর্কে জানতে চাই। বর্তমানে আপনি ইতিহাসের কোন কোন বিষয়ের ওপর কাজ করছেন এবং আপনার প্রকাশিত বা অপ্রকাশিত বই ও প্রামাণ্যচিত্রগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি কী?

জনাব নাইম বালুচ: আমি নিজেকে ধর্মের একজন শিক্ষানবিস ছাত্র মনে করি। আমার গবেষণার মূল আগ্রহের জায়গা দুটি: প্রথমত মুসলিমদের ইতিহাস (তারিখে মুসলিমিন) এবং দ্বিতীয়ত ফিকশন বা কথাসাহিত্য।

১। ইতিহাস ও জীবনীভিত্তিক প্রকল্প (ডকুমেন্টারি ও সিরাত)

আমি পূর্বেই একটি পূর্ণাঙ্গ সিরাত গ্রন্থ রচনা করেছি। বর্তমানে আমি বিভিন্ন বিশিষ্ট ইসলামি ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্মের ওপর প্রামাণ্যচিত্র (Documentary) নির্মাণের কাজ করছি।

· ইতোমধ্যেই আমি মাওলানা ওয়াহিদুদ্দিন খান, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং আল্লামা শিবলি নুমানির ওপর প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছি।

·  বর্তমানে মাওলানা মওদুদির জীবনের ওপর প্রামাণ্যচিত্রের প্রথম খণ্ডের কাজ শেষ করে গ্রাফিক্সের কাজ চলছে; এরপর দ্বিতীয় খণ্ডের কাজ শুরু হবে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো — ‘দাবিস্তানে শিবলি’ বা শিবলির চিন্তাধারার অনুসারী যত বড় স্কলার আছেন, তাদের সবার ওপর প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করা।

· বর্তমানে আমি ডালাসে অবস্থিত GCIL (গামিদি সেন্টার অব ইসলামি লার্নিং)-এর সাথে যুক্ত আছি এবং তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকেই এই সমস্ত কাজ পরিচালনা করছি।

· ইমাম আমিন আহসান ইসলাহির জীবনী: ইমাম ইসলাহি তার জীবদ্দশায় আমাকে তার জীবনী লেখার নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। এই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক গ্রন্থটির কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী ২–৩ মাসের মধ্যে এটা প্রকাশিত হবে।

২। ফিকশন, শিশুসাহিত্য ও সিনেমার স্ক্রিপ্ট

সমাজতাত্ত্বিকভাবে আমি মনে করি, ধর্মকে মানুষের সামনে তুলে ধরার কয়েকটি স্তর রয়েছে। আলেমদের বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরের বাইরে সমাজের প্রায় ৮০ শতাংশ সাধারণ মানুষ ধর্ম বা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ধারণা মূলত ফিকশন, সিনেমা, টিভি, থিয়েটার কিংবা তথ্য-বিনোদনমূলক (Infotainment) মাধ্যম থেকে গ্রহণ করে। এই জায়গায় কাজ করার উদ্দেশ্যে আমার কিছু বিশেষ প্রকল্প রয়েছে:

শিশুসাহিত্য: শিশুদের উপযোগী আমার লেখা প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি বই বাজারে রয়েছে। লাহোরের ‘আল-মাওরিদ’-এ আমার লেখা প্রায় ৩০টি বই জমা আছে, যা আমি নবী-রাসুলদের ইতিহাসের ওপর গল্পচ্ছলে লিখেছিলাম। এই গবেষণার ভিত্তিতেই ইউটিউবে আমার ও আমার ছেলে দানিয়ালের নবীদের ইতিহাস বিষয়ক আলোচনাগুলো প্রচারিত হয়েছে।

উপন্যাস ও সিনেমার স্ক্রিপ্ট: বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লেখা আমার দুটি উপন্যাসের কাজ সমাপ্তির পথে। এর মধ্যে একটি উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু হলো ‘জিহাদ’, যা ৯/১১-এর রাজনৈতিক পটভূমিতে রচিত। এখানে গল্পের ছলে জিহাদের প্রকৃত ইসলামি ধারণা, ৯/১১-এর পর মুসলিমদের সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি, আধুনিক আমেরিকার সাথে ইরানের দ্বন্দ্ব এবং মুসলমানদের মধ্যকার বিভিন্ন সমসাময়িক ন্যারেটিভের একটি বিশদ তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে আমি ডক্টর রেহান আহমেদ ইউসুফি, যিনি মূলত আবু ইয়াহিয়া নামে উর্দু সাহিত্যের জগতে সর্বাধিক পরিচিত, তার লিখা বিখ্যাত উপন্যাস ‘জব জিন্দেগি শুরু হোগি’ অবলম্বনে নির্মিতব্য সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখছি। এই সিনেমায় অভিনয় করবেন বিশিষ্ট অভিনেতা হামজা আলি আব্বাসি।

GCIL Bangla

Visit us

Suite 230, 3620 N Josey Ln,

Carrollton, Dallas, TX 75007

Contact us via email

info@almawridus.org

Copyright 2025, Ghamidi Center of Islamic Learning. All Rights Reserved. GCIL is an initiative of Al-Mawrid U.S. A 501(c)(3) tax-exempt organization in the U.S. Federal EIN: 46-5099190.