নারীর সত্তা
[ড. মুহাম্মদ ফারুক খান (১৯৫১–২০১০): বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ এবং সোয়াত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য। লেখক হিসেবে তিনি ‘জিহাদ, কিতাল ও ইসলামি বিশ্ব’, ‘ইসলাম ও নারী’ এবং ‘আধুনিক মনের প্রশ্ন ও ইসলামের উত্তর’-সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের রচয়িতা। আল-মাওরিদের সাথে যুক্ত এই নির্ভীক লেখক ও গবেষক তার সংস্কারপন্থী চিন্তাধারার জন্য সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন এবং ২০১০ সালে আততায়ীর গুলিতে শাহাদাতবরণ করেন। তার এই অসামান্য সাহসিকতা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পাকিস্তান সরকার তাকে মরণোত্তর ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ সম্মানে ভূষিত করে।]
ইসলাম মনে করে, একজন নারী পুরুষের অনুগত কোনো সত্তা নয়, বরং সব দিক থেকে তার নিজস্ব স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ সত্তা রয়েছে। নিজের ধর্মীয় যোগ্যতাকে বিকশিত করা, ধর্মের সেবা করা, শিক্ষা অর্জন করা, চাকরি করা, ব্যবসা করা, কোনো কিছুর মালিক হওয়া এবং তা থেকে উপকৃত হওয়া ও কোনো উদ্যোগে নিজের সৃজনশীলতা প্রমাণ করার অধিকার পুরুষের মতো তার-ও রয়েছে। সে সব দিক থেকে নিজের ব্যক্তিত্বের মালিক। এই সত্যের ধর্মীয় দিকটি কুরআন মাজিদে এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
“মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী; ধৈর্যশীল পুরুষ ও নারী, বিনয়ী পুরুষ ও নারী, দানশীল পুরুষ ও নারী; রোজা পালনকারী পুরুষ ও নারী; নিজেদের সতীত্বের হেফাযতকারী পুরুষ ও নারী এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও নারী — তাদের সবার জন্য আল্লাহ ক্ষমা ও মহান প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।”
(কুরআন, সুরা আহজাব, ৩৩: ৫৫)
কুরআন মাজিদের উপরিউক্ত আয়াতে যে বৈশিষ্ট্যগুলোর কথা বলা হয়েছে, তার সংখ্যা দশ। এই বৈশিষ্ট্যগুলো ইসলাম, ইসলামি আচরণ এবং আল্লাহর হক ও মানুষের হকের সাথে সম্পর্কিত আচার-ব্যবহারের সব দিককে শামিল করে। উপরিউক্ত আয়াতটি স্পষ্ট করে যে, আল্লাহর ইবাদত, আনুগত্য এবং পরকালীন জীবনের মর্যাদার ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। মূলত লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো পার্থক্য নেই। কুরআন মাজিদ সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত নীতি নির্ধারণ করেছে:
“পুরুষরা যা উপার্জন করে, তার অংশ তাদের এবং নারীরা যা উপার্জন করে, তার অংশ তাদের।”
(কুরআন, সুরা নিসা, ৪: ৩২)
সুরা আন-নিসা মূলত অর্থ-সম্পদ সংক্রান্ত বিষয় এবং পরিবারে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর সম্পর্কের ফলে উদ্ভূত সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করে; উপরিউক্ত আয়াতের ঠিক পরেই উত্তরাধিকার আইনের একটি ধারা বর্ণিত হয়েছে এবং এরপর স্বামী ও স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্কের নির্দেশনা এসেছে। সুতরাং প্রেক্ষাপট এটা স্পষ্ট করে যে, উক্ত আয়াতটি পার্থিব জীবনের সাথে সম্পর্কিত এবং একজন নারীর শিক্ষা গ্রহণ, চাকরি বা ব্যবসা করা, সম্পত্তি কেনাবেচা করা এবং এমনকি নিজের ব্যক্তিত্ব গড়ার অধিকার পুরুষের মতোই রয়েছে।
আরও অনেক কুরআনিক আয়াত রয়েছে, যা স্পষ্ট করে: [‘পরিবার’ নামক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিবারের] দায়িত্ব বহনের ক্ষেত্র ছাড়া অন্য কোনো কারণে পুরুষ ও নারীর মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। উভয়ই মানুষ এবং উভয়েরই অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। আল্লাহ বলেন:
“আমি তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষ বা নারীর কর্মের প্রতিদান নষ্ট করব না। তোমরা একে অপরের বংশধর।”
(কুরআন, সুরা আলে-ইমরান, ৩: ১৯৫)
সুরা তওবার মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা সমস্ত মুসলিম পুরুষ ও নারীকে একে অপরের বন্ধু, সঙ্গী ও সাহায্যকারী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সুতরাং নারীরা কোনোভাবেই পুরুষের চেয়ে নিম্নতর নয়, বরং তারা পুরুষের বন্ধু এবং তাদের সমকক্ষ। (তবে, দায়িত্বের ক্ষেত্রে বিশেষ পরিস্থিতিতে শ্রেণিবিভাগ থাকতে পারে, যেমন একজন ডাক্তার এবং একজন শিক্ষক):
“মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু। তারা ভালো কাজের আদেশ দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে; তারা তাদের নামাজ আদায় করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের আনুগত্য করে। তাদের ওপর আল্লাহ অবশ্যই রহমত বর্ষণ করবেন। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”
(কুরআন, সুরা তওবা, ৯: ৭১)
এ কারণেই নবুয়তের যুগে নারীরা ধর্মীয় ও পার্থিব উভয় শিক্ষা অর্জন করতেন, কৃষিকাজ করতেন, ব্যবসা ও শিল্পে অংশগ্রহণ করতেন এবং নিজেদের ধন-সম্পদ ও সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা করতেন; নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রী আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বিষয়ে সবাই জানেন যে, তিনি ২২১০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। (সাদারাতুজ জাহাব: খণ্ড ১)
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম এমন পুরুষ ও নারী ফকিহ তথা আইনজ্ঞদের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছেন, যারা আইনের বিষয়ে মূল্যবান মতামত ব্যক্ত করেছেন এবং এই প্রেক্ষিতে ফয়সালাও দিয়েছেন। আমরা যদি সেই তালিকার দিকে তাকাই তবে অবাক হয়ে দেখব যে, তাদের মধ্যে বিশাল সংখ্যক নারী ছিলেন। এদের মধ্যে রয়েছেন আয়েশা, উম্মে সালমা, হাফসা, সাফিয়া, উম্মে হাবিবা, লায়লা বিনতে কাসিম, আসমা বিনতে আবু বকর, উম্মে শারিক, খাওলা বিনতে উম্মে দারদা, আতিকা বিনতে যায়েদ, সাহলা বিনতে সুহাইল, জুয়াইরিয়া, মাইমুনা, ফাতিমা বিনতে কাইস, উম্মে আইমান, উম্মে ইউসুফ, আসরা ইত্যাদি। (ইলামুল মুয়াক্কিন, খণ্ড ১)
আল্লাহর রাসুলের সঙ্গীদের যুগের ইতিহাস সংকলনের বইগুলো এমন অসংখ্য নারীর গল্প প্রকাশ করে, যারা ধর্মীয় জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন এবং অনেক বিশিষ্ট আলেম তাদের কাছ থেকে ইসলামের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। সেই যুগে এটা একটি সাধারণ রীতি ছিল যে, মানুষ ধর্মের বিষয়ে আল্লাহর রাসুলের স্ত্রীদের থেকে নির্দেশনা চাইতেন। আল্লাহর রাসুলের স্ত্রীদের ছাড়াও এমন কিছু নারী ছিলেন, যারা এই ক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। রাবি বিনতে মুয়াওভিয ছিলেন এমন একজন বিখ্যাত আলেমা এবং ইসলামের বিশিষ্ট আলেম, যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর তার ছাত্র ছিলেন। অনেক লোক তার রেফারেন্সে হাদিস বর্ণনা করেছেন। এদের মধ্যে সালমান ইবনে ইয়াসার, ইবাদ ইবনে ওয়ালিদ এবং নাফি বিন ওমর ইত্যাদি রয়েছেন। ইবনে মুসাইয়্যিব, উরওয়া ইবনে যুবায়ের এবং শাবির মতো বিশিষ্ট আলেমদের শিক্ষিকা ছিলেন ফাতিমা বিনতে কাইস। (আল-ইসতিআব ফিল আসমাউল আসহাব)
সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কন্যা আয়েশা একজন বিশিষ্ট আলেমা ছিলেন এবং তিনি ইমাম মালেক, আইয়ুব সাখতিয়ানি ও হাকাম বিন উতাইবার মতো আলেমদের শিক্ষা দিয়েছেন। (তাহজিবুত তাহজিব, খণ্ড ১২)
বিশিষ্ট ফকিহ ইমাম শাফেয়ি (রহ.) আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রপৌত্র হযরত হাসান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নাতনী সাইয়্যিদা নাফিসা (রহ.)-এর থেকে হাদিসের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। (ওয়াফিয়াতুল আয়ান লিইবনি খাল্লিকান, খণ্ড ২)
পার্থিব জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা ছিল। উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নারী সাহাবিদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন কবি, যেমন খানসা, সাওদা, সাফিয়া, আতিকা, মারিদিয়া, উম্মে আইমান এবং আরও অনেকে। চিকিৎসা ও শল্যচিকিৎসার ক্ষেত্রে রুফাইদা আসলামিয়াহ, উম্মে মুতা, উম্মে কাবশা, হামনা বিনতে জাহাশ, উম্মে আতিয়্যাহ, উম্মে সুলাইম এবং আরও অনেক নারী খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। (তাবাকাত ইবনে সাদ, ইসাবা ফি তাময়িযিস সাহাবা)
সেই দিনগুলোতে নারীদের পার্থিব জ্ঞান অর্জন করা ছিল একটি সাধারণ রীতি। যদি তাদের সংখ্যা খুব বেশি দৃষ্টিগোচর না হয়, তবে এর কারণ ছিল সুযোগ-সুবিধার অভাব। কিছু সাধারণ নারীও পড়তে ও লিখতে জানতেন এবং ছোটখাটো হিসাব-নিকাশ পরিচালনা করতে পারতেন। (তাবাকাত ইবনে সাদ, খণ্ড ৮) কিছু নারী লিখতেনও এবং চিঠির উত্তরও পাঠাতেন। (আল-আদাবুল মুফরাদ)
সেই সময়ে নারীরা কৃষিকাজ করতেন এবং নিজেদের ক্ষেত খামারের দেখাশোনা করতেন। হাদিস সংকলক বুখারিতে সাহল বিন সাদ একজন সাহাবি নারীর গল্প বর্ণনা করেছেন, যার নিজস্ব ক্ষেত ও বাগান ছিল। তিনি একটি খালের তীরে ‘সিলক’ (এক ধরনের সবজি) চাষ করতেন এবং প্রতি জুমুআ-তে সাহল বিন সাদ ও অন্যদের সাথে যখন দেখা করতে যেতেন, তখন তিনি তাদের সিলক ও যব দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। (বুখারি)
বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ-এর মতো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থগুলোতে জাবির বিন আব্দুল্লাহর বিবৃতি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে তিনি তার খালা সম্পর্কে বর্ণনা করেন। তিনি তালাকপ্রাপ্তা ছিলেন এবং ইদ্দত [তালাকের পর তিন মাসের অপেক্ষা, যে সময়ে নারী পুনরায় বিবাহ করতে পারেন না] পালন করছিলেন। তিনি তার জীবিকার জন্য বাগানের ফল বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। তিনি আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে পরামর্শ চাইলে তিনি তাকে তা করার পরামর্শ দেন, কারণ এতে তিনি সাদাকা দেওয়ার সুযোগ পেতেন এবং নিজের পরিত্রাণের জন্য কিছু করতে পারতেন। এটা পরিষ্কার করে যে, নবুয়তের যুগে নারীরা কৃষিকাজ ও ব্যবসা করতেন।
বুখারির মতে, প্রথম খলিফা আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কন্যা এবং যুবাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর স্ত্রী আসমা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তার বাড়ি থেকে প্রায় দুই মাইল দূরে ক্ষেতে কৃষিকাজে স্বামীকে সাহায্য করতেন।
সেই দিনগুলোতে নারীরা স্বাধীনভাবে বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারতেন। মুসলিম উম্মতের সবচেয়ে সম্মানিত নারী খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অনেক নারী সাহাবি, যেমন খাওলা, আল-খামিয়াহ, সাকাফিয়াহ এবং বিনতে মুকাররামাহ সুগন্ধির ব্যবসা করতেন। (ইসাবা ফি তাময়িযিস সাহাবা, খণ্ড ৪)
‘তাবাকাত ইবনে সাদ’-এ বর্ণিত বেশ কিছু ঘটনা এই সত্য প্রকাশ করে যে, নবুয়তের যুগে মুসলিম নারীরা স্বামীদের সহায়তা ছাড়াও কৃষিকাজ, ব্যবসা ও শিল্পকর্মে অংশগ্রহণ করতেন। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর স্ত্রী একজন দক্ষ কারিগর ছিলেন। একবার তিনি আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলেছিলেন যে, তিনি বিভিন্ন শিল্পকর্মে দক্ষ এবং তৈরি পণ্য বিক্রি করেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন যে, আয়ের টাকা স্বামী ও সন্তানদের ওপর খরচ করা যাবে কি না, যাদের আয়ের অন্য কোনো উৎস নেই। আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বলেছিলেন, তিনি যদি তা করেন, তবে আল্লাহর থেকে পুরস্কার পাবেন। এটা আল-ইসাবা ফি তাময়িযিস সাহাবা খণ্ড ৪-এ উদ্ধৃত হয়েছে।
একবার খাওলা বিনতে সালাবা নামক এক নারীর তার স্বামীর সাথে ঝগড়া হয়েছিল। দুজনেই আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে তাদের সমস্যা উপস্থাপন করলে তিনি স্বামীকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ না আসা পর্যন্ত স্ত্রীর থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন। তখন খাওলা আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললেন যে, স্বামী সেক্ষেত্রে টিকে থাকতে পারবে না, কারণ সে তার জীবিকার জন্য তার ওপর নির্ভরশীল।
কায়লা নামক এক নারী আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলেছিলেন যে, তিনি একজন ব্যবসায়ী এবং বাণিজ্যের বিষয়ে তার দিকনির্দেশনা চেয়েছিলেন।
আরেক নারী আমিরা বর্ণনা করেন যে, একদা তিনি তার দাসীকে নিয়ে বাজারে গিয়েছিলেন এবং একটি মাছ কিনেছিলেন। চতুর্থ খলিফা আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি তার কাছ থেকে সেই মাছটি কিনেছিলেন।
এমন আরও অনেক ঘটনা ‘তাবাকাত ইবনে সাদ’ খণ্ড ৮-এ রয়েছে, যা এই বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বই।
নবীর স্ত্রী সাওদা চর্মশিল্পের কাজে দক্ষ ছিলেন। বুখারিতে বর্ণিত আছে যে, একবার তার একটি ভেড়া মারা যায়, তিনি সেটার চামড়া ছাড়িয়ে তা ট্যানিং করেন এবং খেজুরের মাধ্যমে সেটাকে নরম করেন। (বুখারি)
সেই সময়ে নারীরা সামষ্টিকভাবেও বিভিন্ন কাজ আঞ্জাম দিতেন। বুখারির কিতাবুল ইতিসাম-এ বর্ণিত হয়েছে যে, একবার অনেক নারী আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে দেখা করতে যান এবং সপ্তাহে একদিন তাদের ধর্মীয় প্রশিক্ষণের জন্য সময় বরাদ্দ করার অনুরোধ করেন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের অনুরোধ মঞ্জুর করেন। আসমা বিনতে যায়েদ বাগ্মিতায় দক্ষ ছিলেন। একবার নারীরা তাকে তাদের প্রতিনিধি নিযুক্ত করে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে পাঠান কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার জন্য। (আল-ইসতিআব ফিল আসমাউল আসহাব)
নারীদের কিছু দায়িত্বশীল পদেও নিযুক্ত করা হয়েছিল এবং তারা তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) শিফা বিনতে আব্দুল্লাহকে বাজার তদারকির কর্মকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন।
ধর্মীয় অনুশাসন, নৈতিক আচরণ এবং মানবিক অধিকারের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ যে একে অপরের পরিপূরক ও সমান — এই সত্যটি আমাদের সামনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসার জন্ম দেয়। যেমন: আদম (আলাইহিস সালাম)-এর পাঁজরের হাড় থেকে প্রথম নারী হাওয়া (আলাইহাস সালাম)-কে সৃষ্টির তাৎপর্য কী? পরিবার ও সমাজে পুরুষের কর্তৃত্ব বা নেতৃত্ব বলতে কী বোঝায়? কিংবা ইসলামি আইনশাস্ত্র অনুযায়ী নারীর রক্তের বিনিময় বা আদালতের সাক্ষ্যের বিষয়টি কীভাবে নির্ধারিত হয়?
প্রবন্ধের কলেবর ও প্রসঙ্গের সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনায় রেখে, এখানে আমি কেবল প্রথম প্রশ্নটি অর্থাৎ সৃষ্টির উৎস সংক্রান্ত প্রচলিত ধারণার ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করব। বাকি বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিক অন্য কোনো আলোচনায় স্থান পাওয়ার দাবি রাখে।
কুরআন বলছে:
“হে মানুষ, তোমাদের রবের ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক সত্তা থেকে এবং সেই একই সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার জোড়াকে এবং এই উভয় থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী।”
(কুরআন, সুরা নিসা, ৪: ১)
“সেই একই সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার জোড়াকে” — এই বাক্যাংশের ব্যাখ্যায় দুটি সম্ভাবনা থাকতে পারে। প্রথমটি হলো, এই জোড়াকে সেই একই সত্তা থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং দ্বিতীয়টি হলো, এই জোড়াকে তার প্রজাতি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রথম সম্ভাবনাটি নিলে দাঁড়ায় যে, আদম (আলাইহিস সালাম)-কে আগে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং হাওয়া (আলাইহিস সালাম)-কে তার মধ্য থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি দেখায় যে, মানুষের একটি প্রতিচ্ছবি আগে তৈরি করা হয়েছে এবং সেই প্রতিচ্ছবি থেকেই আদম ও হাওয়াকে আলাদাভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে।
কুরআন সঠিকভাবে বোঝার জন্য একটি প্রতিষ্ঠিত নিয়ম রয়েছে: যদি কুরআনের কোনো আয়াত এক জায়গায় নিজের অর্থ স্পষ্ট না করে, তবে একই বিষয়ের ওপর অন্য সব আয়াত নিয়ে অধ্যয়ন করতে হবে, যাতে সঠিক বোধগম্যতা আসে। উদাহরণস্বরূপ, সুরা আন-নাহলের নিম্নলিখিত আয়াতটি দেখুন:
“আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের মাধ্যমেই তিনি তোমাদেরকে সন্তান ও পৌত্র দান করেছেন। তিনি তোমাদেরকে পবিত্র বস্তু থেকে রিজিক দিয়েছেন।”
(কুরআন, সুরা নাহল, ১৬: ৭২)
এই আয়াতটি এই অর্থ প্রকাশ করে যে, স্ত্রীদের সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের প্রজাতি থেকে, তাদের স্বামীদের পাঁজরের হাড় থেকে নয়। সুরা রুমের আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে:
“এবং তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করতে পারো। এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করে দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে।”
(কুরআন, সুরা রুম, ৩০: ২১)
যখন আমরা সুরা নিসার ১ নম্বর আয়াতের অর্থ ওপরের উদ্ধৃত আয়াতগুলোর আলোকে বোঝার চেষ্টা করি, তখন বিষয়টি একেবারে পরিষ্কার হয়ে যায়। কারণ কুরআনের কোনো অংশই অন্য অংশের পরিপন্থী নয়, বরং পুরো কিতাবটি একই অর্থ প্রদান করে।
এখন আমরা রেফারেন্স বা তথ্যসূত্রের বইগুলোর দিকে ফিরে তাকাই। হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সূত্রে একটি হাদিস রয়েছে এবং তা বুখারি কিতাবুন নিকাহ, কিতাবুল আহাদিসুল আম্বিয়া এবং মুসলিম কিতাবুর রিদা-তে রাখা হয়েছে। রেফারেন্সের শব্দগুলো সব জায়গায় ভিন্ন, যেমনটা খুবই স্বাভাবিক ছিল যে, একজন ব্যক্তি আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছ থেকে কিছু শুনেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের একজন ব্যক্তিকে তা বলেছেন এবং এভাবে চলতে থেকেছে। এভাবে এই হাদিসটি আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইন্তেকালের দুইশ বছর পর হাদিসের সংকলকের কাছে পৌঁছেছে। এটা স্পষ্ট যে, এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় বাণীর শব্দগুলো একই থাকে না। এই সবকিছুর পিছনে মূল উদ্দেশ্য হলো শ্রোতার বোঝা অর্থটি পৌঁছে দেওয়া। তাই এটা গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য যে, প্রতিটি হাদিসকে কুরআনের আলোকে বুঝতে হবে, যা ইসলামের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং মৌলিক দলিল। হাদিস অধ্যয়নের সময়, প্রাসঙ্গিক সব হাদিস মনে রাখতে হবে এবং কোনো সন্দেহের অবসানের জন্য কোনো হাদিস থেকে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন অর্থ গ্রহণ করা উচিত নয়।
এই সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর ওপরের আলোচিত হাদিসটি নিয়ে চিন্তা করা আমাদের জন্য সহজ হয়ে যায়। এই হাদিসটির একমাত্র বর্ণনাকারী হলেন আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। দেখে মনে হয় যেন আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষদের উপদেশ দিচ্ছিলেন যেন তারা তাদের স্ত্রীদের সাথে ভালো আচরণ করে এবং তাদের সাথে মানিয়ে চলে। তাদের কোনো কঠোর নিয়ম-কানুনের ছাঁচে ঢালার চেষ্টা করা উচিত নয় এবং তাদের সাথে প্রজ্ঞার সাথে কাজ করা উচিত। যদি তাদের স্ত্রীরা অভিযোগ করতে, সন্দেহ করতে এবং তাদের জন্য সমস্যা তৈরি করতে শুরু করে, তবুও তাদের ভালোবাসা ও নম্রতার সাথে বোঝানোর চেষ্টা করা উচিত। তাই আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নারীর মনস্তত্ত্বকে পাঁজরের হাড়ের সাথে তুলনা করেছেন। যদি এটাকে সোজা করার চেষ্টা করা হয়, তবে তা ভেঙে যেতে পারে। সুতরাং, যদি কোনো নারীকে কঠোর কোনো নিয়ম বা কোডের অধীনে রাখার জন্য চাপ দেওয়া হয়, তবে এর ফলে তালাক ঘটতে পারে।
স্পষ্টতই, মানুষদের বোঝানোর জন্য এটা একটি চমৎকার উদাহরণ। কুরআন ও হাদিস এমন উদাহরণে পরিপূর্ণ এবং সেগুলো সবসময় তাদের বাগধারাগত অর্থ প্রদান করে। তাই বিভিন্ন বর্ণনাকারী একই বক্তব্যকে ভিন্ন ভিন্ন শব্দে প্রকাশ করেছেন: “নারী পাঁজরের হাড়ের মতো।” মুসলিমের কিতাবুর রিদা-তে রেকর্ড করা এই রেফারেন্সটি মনে হচ্ছে মূল শব্দগুলোকেই প্রতিফলিত করছে। বাকি বর্ণনাকারীরা তাদের বোধ ও রুচি অনুযায়ী তা বর্ণনা করেছেন। যদি আমরা পুরো বিষয়টি নিয়ে অধ্যয়ন করি, তবে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এটা নিছক একটি উদাহরণ, কারণ কোনো রেফারেন্সেই হাওয়া বা নারী সম্প্রদায়কে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি হওয়ার কথা বলা হয়নি। প্রত্যেকেই এই সত্য জানে যে, নারীরা পুরুষের পাঁজরের হাড় থেকে জন্ম নেয় না, বরং তারা পুরুষের মতোই জন্মের সব ধাপ পার হয়ে আসে।
সুতরাং, ওপরের আলোচনা প্রমাণ করে যে, ইসলামে এমন কোনো ধারণা নেই যে নারী পুরুষের চেয়ে নিম্নতর এবং যেহেতু সে পুরুষের পাঁজর থেকে সৃষ্টি, তাই সে তার অনুগত বা অধীনস্থ।
