নারীরা পুরুষের তুলনায় কম বোধশক্তি-সম্পন্ন
সাধারণত নিচের রেওয়ায়েতটিকে এই মতের সমর্থনে উপস্থাপন করা হয় যে, নারীরা পুরুষের তুলনায় কম বোধশক্তি-সম্পন্ন:
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي أَضْحَى أَوْ فِطْرٍ إِلَى الْمُصَلَّى فَمَرَّ عَلَى النِّسَاءِ فَقَالَ …مَا رَأَيْتُ مِنْ نَاقِصَاتِ عَقْلٍ وَدِينٍ أَذْهَبَ لِلُبِّ الرَّجُلِ الْحَازِمِ مِنْ إِحْدَاكُنَّ قُلْنَ وَمَا نُقْصَانُ دِينِنَا وَعَقْلِنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ أَلَيْسَ شَهَادَةُ الْمَرْأَةِ مِثْلَ نِصْفِ شَهَادَةِ الرَّجُلِ قُلْنَ بَلَى قَالَ فَذَلِكِ مِنْ نُقْصَانِ عَقْلِهَا أَلَيْسَ إِذَا حَاضَتْ لَمْ تُصَلِّ وَلَمْ تَصُمْ قُلْنَ بَلَى قَالَ فَذَلِكِ مِنْ نُقْصَانِ دِينِهَا.
আবু সাইদ আল-খুদরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেছেন: একবার নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহার দিনে ঈদগাহে যাচ্ছিলেন। তিনি নারীদের একটি দলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন: ... তোমাদের চেয়ে অন্য কাউকে দেখিনি, যারা একজন দৃঢ়চেতা পুরুষের জ্ঞানবুদ্ধি হরণ করতে পারে, অথচ তোমরা ‘নাকিসাতু আকলিন ওয়া দ্বিন’ (কম বুদ্ধি ও কম ধর্মসম্পন্ন)। নারীরা বলল: হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের এই ধর্ম ও বুদ্ধির ঘাটতি জিনিসটা কী? তিনি বললেন: একজন নারীর সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক নয়? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি বললেন: এটা তাদের জাগতিক বিষয়ে ঘাটতি। তিনি আবার বললেন: এটা কি সত্য নয় যে, যখন তারা ঋতুস্রাবের সময়ে থাকে, তখন তারা নামাজ পড়ে না এবং রোজাও রাখে না? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি বললেন: এটা তাদের ধর্মীয় বিষয়ে ঘাটতি।
এই ভুল ধারণাটি আরবি শব্দগুচ্ছ نَاقِصَاتِ عَقْلٍ وَدِينٍ (নাকিসাতু আকলিন ওয়া দ্বিন)-এর ভুল অনুবাদের কারণে তৈরি হয়েছে। উর্দু অর্থের দিকে খেয়াল রেখে ‘নাকাস’-এর অনুবাদ সাধারণত ‘ত্রুটিপূর্ণ’ করা হয়েছে। অথচ আরবিতে ‘নাকাসা’ ক্রিয়াটির অর্থ হলো ‘কমানো বা লাঘব করা’। আর এখানে ‘আকল’ বলতে ‘জাগতিক বিষয়’ বোঝানো হয়েছে, যেহেতু এটা ‘দ্বিন’ তথা ধর্ম শব্দের সাথে যুক্ত হয়ে ব্যবহৃত হয়েছে। এই দুটি দিক বিবেচনায় নিলে, প্রসঙ্গ অনুযায়ী সঠিক অনুবাদ হলো, নারীদের জাগতিক ও ধর্মীয় বিষয়ে একটি অবকাশ বা ছাড় দেওয়া হয়েছে।
এই রেওয়ায়েতে উল্লিখিত জাগতিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে ছাড় হলো, নারীদের নির্দিষ্ট কিছু কাজে ও ময়দানে টেনে আনা হয়নি। যেমন, কুরআন পুরুষদের আইনি নথিপত্রে সাক্ষ্য দেওয়ার তাগিদ দিয়েছে, যাতে নারীদের আদালতে উপস্থিত হওয়া এবং তাদের মূল্যবান সময় এমন বিষয়ে নষ্ট করা থেকে মুক্তি দেওয়া যায়, যা অন্যরা সামলাতে পারে। যদি পুরুষরা উপলব্ধ না থাকে, কেবল তখনই কোনো সমাজ নারীদের এমন বিষয়ে সম্পৃক্ত করতে পারে।
ধর্মীয় বিষয়ে নারীদের যে ছাড় দেওয়া হয়েছে তা হলো, এই রেওয়ায়েত অনুযায়ী মাসিক ঋতুস্রাবের সময়ে তাদের নামাজ ও রোজা পালন করতে হয় না।
সুতরাং যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে, তা হলো, দুটি ভিন্ন ভাষায় একটি শব্দের অর্থ সবসময় একই থাকে না। উদাহরণস্বরূপ, আরবিতে ‘গালিয’ শব্দের অর্থ হলো ‘দৃঢ়’, অথচ উর্দুতে এর অর্থ হলো ‘নোংরা’। এ কারণেই কুরআন (৪:২১)-এ বিবাহকে ‘মিসাকান গালিযা’ (দৃঢ় অঙ্গীকার) বলা হয়েছে।
অধিকন্তু, যারা এই রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে মনে করে, নারীরা পুরুষের চেয়ে কম বোধশক্তি সম্পন্ন, তারা বোঝে না যে, রেওয়ায়েতটিতে কেবল এটাই বলা হচ্ছে না যে, নারীরা ‘নাকিসাতু আকল’ (বুদ্ধি কম), বরং এটাও বলা হচ্ছে, তারা ‘নাকিসাতু দ্বিন’। যদি ‘নাকিসাতু আকল’-এর অর্থ হয়: তাদের আকল বা বুদ্ধিতে কোনো ত্রুটি আছে, তবে একই যুক্তিতে ‘নাকিসাতু দ্বিন’-এর অর্থ হওয়া উচিত: তাদের পালন করা ধর্মেও কোনো ঘাটতি আছে! এটা অবশ্যই অযৌক্তিক এবং যেমনটি উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, মূলত এটা উর্দু অর্থকে বিবেচনায় রাখার ফলেই সৃষ্টি হয়েছে।
নারীর জন্য মাহরামসহ সফর করা
অধিকাংশ আলেমদের মতে, নারীদের জন্য মাহরাম (এমন আত্মীয়, যাদের সাথে বিবাহ হারাম) ছাড়া একা ভ্রমণ করা নিষেধ। এমনকি হজ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ সফরের ক্ষেত্রেও তারা মাহরামের উপস্থিতি অপরিহার্য মনে করেন। এই মতামতের সপক্ষে তারা নিচে উল্লিখিত হাদিসগুলোকে দলিল হিসেবে পেশ করেন:
لَا يُحِلُّ لِاِمْرَأَةٍ تُؤْمِنُ باِللهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ تُسَافِرُ مَسِيْرةَ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ إِلاَّ مَعَ ذِيمَحْرَمٍ عَلَيْهَا
আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: ‘আল্লাহ ও পরকালের ওপর বিশ্বাসী কোনো নারীর জন্য মাহরাম ছাড়া একদিন ও এক রাতের দূরত্বে সফর করা বৈধ নয়।’
نُهِىَ أَنْ تُسَافِرَ المَرْأَةَمَسِيْرَةَ يَوْمَيْنِ إِلَّا وَمَعَهَا زَوْجَهَا أَوْ ذُوْ مَحْرَمٍ
আবু সাঈদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: ‘নারীকে দুই দিনের দূরত্বে সফর করতে নিষেধ করা হয়েছে, যদি না তার সাথে তার স্বামী অথবা কোনো মাহরাম থাকে।’
আমাদের এটা বুঝতে হবে যে, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনেক সময় মুসলমানদের কল্যাণের কথা চিন্তা করে বিশেষ কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তবে পরিস্থিতি বদলে গেলে এমন অনেক নির্দেশনা সময়ের প্রয়োজনে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। নারীদের ভ্রমণের এই নির্দেশনাটিও ঠিক এমনই একটি বিষয়।
তৎকালীন আরব সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের সম্মান রক্ষা করা ছিল অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। সে সময়ের অস্থিতিশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে নারীরা যেন নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারেন, সেজন্যই রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের মাহরাম সাথে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আজকেও যদি কোথাও ভ্রমণের ক্ষেত্রে সেই একই ঝুঁকি বা নিরাপত্তাহীনতা থাকে, তবে অবশ্যই সেই শর্ত মেনে চলা উচিত।
কিন্তু বর্তমান যুগে যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এখনকার অনেক ভ্রমণ পথ ও মাধ্যম আগের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ। তাই আধুনিক ও নিরাপদ যাতায়াতের ক্ষেত্রে মাহরামের সেই শর্তটি আর বাধ্যতামূলক থাকে না। ভ্রমণটি কতটা নিরাপদ, তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি এখন সংশ্লিষ্ট নারীর নিজের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায়।
পুরুষ নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ
অনেকে মনে করেন, কুরআন অনুযায়ী পুরুষ নারীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তারা তাদের এই ধারণার পক্ষে সাধারণত নিচের আয়াতগুলো তুলে ধরে:
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ.
“পুরুষরা নারীদের অভিভাবক, কারণ আল্লাহ তাদের একজনকে অন্যজনের ওপর বিশেষ ক্ষমতা বা দায়িত্ব দিয়েছেন এবং কারণ পুরুষরা তাদের সম্পদ থেকে ব্যয়ভার বহন করে।”
(কুরআন, সুরা নিসা, ৪: ৩৪)
وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ
“আর স্ত্রীদের ওপর তাদের (তথা স্বামীদের) এক ধাপ মর্যাদা রয়েছে।”
(কুরআন, সুরা বাকারা, ২: ২২৮)
আমাদের এটা বুঝতে হবে যে, কুরআন (যেমন: ৩:১৯৫ ও ৪:১) অনুযায়ী মানুষ হিসেবে নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদার অধিকারী। তবে পরিবার পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাদের ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব দিয়েছেন, যার কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে একে অপরের ওপর এক ধরনের শ্রেষ্ঠত্ব বা বিশেষত্ব তৈরি হয়েছে।
কুরআনের ৪:৩৪ আয়াতে স্বামীর যে ‘শ্রেষ্ঠত্বের’ কথা বলা হয়েছে, তা মূলত পরিবারের প্রধান বা অভিভাবক হিসেবে তার নির্দিষ্ট দায়িত্বের দিকে ইঙ্গিত করে। সুরা বাকারার ২২৮ নম্বর আয়াতে ‘স্ত্রীদের ওপর স্বামীদের এক ধাপ শ্রেষ্ঠত্ব’ বলতেও মূলত এই দায়িত্বের ধাপ-কেই বোঝানো হয়েছে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে নারীরা তাদের শারীরিক, জৈবিক ও মানসিক গঠনের কারণে পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ ও শ্রেষ্ঠ।
সুতরাং, ৪:৩৪ আয়াতে বলা শ্রেষ্ঠত্বটি কেবল পরিবার প্রধানের দায়িত্ব ও অধিকারের সাথে সম্পর্কিত একটি বিশেষ ক্ষেত্র, এটাকে নারী-পুরুষের সামগ্রিক শ্রেষ্ঠত্বের কোনো সাধারণ নিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কুরআনের ৪:৩৪ আয়াতে স্বামীদের এই অভিভাবকত্বের মর্যাদার পিছনে মূলত দুটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে:
প্রথমত, সাধারণত শারীরিক ও স্বভাবগত সামর্থ্যের কারণে তারা এই দায়িত্ব পালনে বেশি উপযুক্ত; এবং দ্বিতীয়ত, পরিবারের ভরণপোষণের মূল দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি — ইসলাম নারীদের উপার্জন করতে নিষেধ করেনি। ইসলাম কেবল তাদের উপার্জনের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত রেখেছে, যা মূলত স্বামীদের দায়িত্ব। আবার, স্ত্রী উপার্জন করুক বা না করুক, পরিবারের যাবতীয় খরচ বহনের দায়িত্ব স্বামীর ওপরই বর্তায়। অর্থাৎ পরিবারের প্রধান হিসেবে স্বামীর মর্যাদাটি তার উপার্জনের দায়িত্বের সাথে সরাসরি যুক্ত। কোনো নারী চাইলে উপার্জন করতে পারেন, তবে যেহেতু পারিবারিক ব্যয়ভার তার ওপর ন্যস্ত নয়, তাই পরিবার প্রধানের বিশেষ অধিকারটিও তাকে দেওয়া হয়নি।
অনেকে মনে করেন, পুরুষ নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ — এই ভুল ধারণার পিছনে একটি হাদিসও কাজ করে। অনেকে মনে করেন, নারীকে পুরুষের পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করার অর্থ হলো, হাওয়া (আলাইহাস সালাম) আদমের (আলাইহিস সালাম)-এর পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি হয়েছেন বলে তিনি পুরুষের তুলনায় গৌণ বা দুর্বল সত্তা। হাদিসটির মূল অংশটি হলো:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه قال قال رسول اللَّهِ صلى الله عليه وسلم اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ فإن الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ من ضِلَعٍ وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ في الضِّلَعِ أَعْلَاهُ فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ وَإِنْ تَرَكْتَهُ لم يَزَلْ أَعْوَجَ فَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ.
আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। কারণ নারীকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। পাঁজরের সবচেয়ে বাঁকা অংশ হলো এর ওপরের দিকের হাড়। যদি তুমি তা জোর করে সোজা করতে যাও, তবে তা ভেঙে যাবে; আর যদি তুমি সেটাকে সেভাবেই রেখে দাও, তবে তা বাঁকাই থেকে যাবে। তাই নারীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি — কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী কিন্তু হাওয়াকে আদমের পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়নি। সুরা নিসার প্রথম আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আল্লাহতায়ালা প্রথম পুরুষ ও নারীকে (আদম ও হাওয়া) সরাসরি সৃষ্টি করেছেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবের ভয় করো, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এক সত্তা থেকে এবং সেই সত্তা থেকেই সৃষ্টি করেছেন তার জোড়াকে। আর এই উভয়ের মাধ্যমে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন অসংখ্য পুরুষ ও নারী। আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাকো এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর পর্যবেক্ষক।”
(কুরআন, সুরা নিসা, ৪: ১)
অনেকে এই আয়াতের অনুবাদ এভাবে করেন যে, ‘তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এক সত্তা (আদম) থেকে এবং তার থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রী (হাওয়া)-কে।’ এরপর তারা দাবি করেন যে, হাওয়াকে আদমের পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। মূলত এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে আরবি শব্দ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا (এবং সৃষ্টি করেছেন তা থেকে তার জোড়াকে)-এর আক্ষরিক অর্থ করার কারণে।
প্রকৃতপক্ষে, এখানে ‘মিন-হা’ (তা থেকে) শব্দটি দিয়ে এটা বোঝানো হয়নি যে, হাওয়াকে সরাসরি আদমের শরীর থেকে তৈরি করা হয়েছে। বরং এর অর্থ হলো, হাওয়াকে আদমের মতোই একই জাতি বা উৎস থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। কুরআনের অন্য একটি আয়াতও এই বিষয়টিকে-ই সমর্থন করে:
وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا
“আল্লাহই তোমাদের জন্য তোমাদের প্রজাতি থেকে স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন।”
(কুরআন, সুরা নাহল, ১৬: ৭২)
এই আয়াতে ‘মিন আনফুসিকুম’ (তোমাদের থেকে) শব্দটির আক্ষরিক অর্থ করলে দাঁড়ায় — ‘আল্লাহই তোমাদের জন্য তোমাদের ভেতর থেকে স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন।’ যদি আমরা সুরা নিসার আয়াতের মতো এখানেও আক্ষরিক অর্থ ধরি, তবে এর অর্থ দাঁড়াবে — প্রতিটি স্ত্রীকে তার স্বামীর শরীর থেকেই তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এটি অবশ্যই ভুল। আসলে এই আয়াতে ‘আনফুস’ (নফসের বহুবচন) শব্দটি দিয়ে কোনো শারীরিক অংশ বোঝানো হয়নি, বরং এর অর্থ হলো ‘একই প্রজাতি’ বা ‘একই সত্তা’। অর্থাৎ মানুষ হিসেবে নারী ও পুরুষ একই প্রকৃতির।
আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণিত হাদিসটির ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি — আরবি ভাষায় ‘থেকে সৃষ্টি’ বা ‘থেকে তৈরি’ কথাটি সবসময়ই যে কোনো বস্তুর মূল উপাদান বোঝায়, তা নয়; বরং অনেক সময় তা কোনো কিছুর স্বভাব বা প্রকৃতিকেও ইঙ্গিত করে। যেমন কুরআনে বলা হয়েছে, ‘মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাড়াহুড়ো করার প্রবণতা থেকে।’ (কুরআন, সুরা আম্বিয়া, ২১: ৩৭)। এর মানে এই নয় যে, মানুষের শরীরের উপাদান তাড়াহুড়ো; বরং এটা মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যের কথা বলছে।
দ্বিতীয়ত, হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, এখানে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নারীর স্বভাবকে পাঁজরের হাড়ের বাঁকানো অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই উপমাটি মূলত নারীর নাজুক, কোমল এবং আবেগপ্রবণ স্বভাবের ইঙ্গিত দেয়। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পুরুষদের উপদেশ দিয়েছেন, নারীর এই স্বভাবের দিকে খেয়াল রেখে তাদের সঙ্গে কৌশলী ও ধৈর্যশীল আচরণ করতে। কোনো বিষয় জোর করে চাপিয়ে না দিয়ে বরং বোঝাপড়া ও সহমর্মিতার মাধ্যমে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক সুন্দর রাখার পরামর্শই এখানে দেওয়া হয়েছে।
বহুবিবাহ
অনেকে মনে করেন, ইসলামে চারজন পর্যন্ত বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে কেবল পুরুষের শারীরিক ও মানসিক চাহিদা মেটানোর জন্য। কিন্তু এই ধারণাটি সঠিক নয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একটি পরিবার একজন পুরুষ ও একজন নারীর বিয়ের মাধ্যমেই গঠিত হয়। কুরআনের সুরা নিসার ১ নম্বর আয়াতে একটি চমৎকার ইঙ্গিত রয়েছে — আল্লাহ যখন প্রথম মানব আদমকে সৃষ্টি করেছিলেন, তখন তার সঙ্গী হিসেবে হাওয়াকে এককভাবেই সৃষ্টি করেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই, পুরুষের জন্য যদি একাধিক স্ত্রী অপরিহার্য হতো, তবে আল্লাহ আদমকে কেবল একজন স্ত্রী না দিয়ে শুরুতেই একাধিক স্ত্রী দিতেন।
এ প্রসঙ্গে এটা বোঝা জরুরি যে, বহুবিবাহের বিষয়টি ইসলামে কোনো নতুন নিয়ম ছিল না; বরং তৎকালীন সমাজের একটি বড় সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে এটা এসেছে। সে সময় বিভিন্ন যুদ্ধে অনেক পুরুষ শহিদ হওয়ায় অনেক পরিবার অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিল এবং অসংখ্য এতিম শিশু অসহায় হয়ে পড়েছিল। কুরআন তৎকালীন পুরুষদেরকে এতিম শিশুদের মায়েদের বিয়ে করার আহ্বান জানায়, যাতে তাদের অসহায়ত্ব দূর হয়। কারণ, মায়েদের পাশে দাঁড়ালে এতিম শিশুদের সঠিক লালন-পালন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হয়। সহজ কথায়, বহুবিবাহ তখন থেকেই প্রচলিত ছিল, কিন্তু কুরআন এই প্রথাকে এতিমদের কল্যাণে ব্যবহারের একটি সুযোগ তৈরি করে দেয়। কুরআন এ বিষয়ে বলছে:
وَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تُقْسِطُوا فِي الْيَتَامَىٰ فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَلَّا تَعُولُوا ﴿٣﴾ وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً ۚ فَإِن طِبْنَ لَكُمْ عَن شَيْءٍ مِّنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَّرِيئًا ﴿٤﴾
“যদি তোমরা মনে করো যে, এতিমদের অধিকার রক্ষায় তোমরা সুবিচার করতে পারবে না, তবে তাদের মায়েদের মধ্য থেকে যাদের ভালো লাগে — এমন দুই, তিন বা চারজনকে বিয়ে করতে পারো। কিন্তু যদি ভয় হয় যে, তোমরা তাদের সবার সাথে সমান আচরণ করতে পারবে না, তবে কেবল একজনকেই বিয়ে করো অথবা তোমাদের অধীনস্থদের মধ্য থেকে করো। এটাই অবিচার এড়ানোর সহজ ও সঠিক পথ। আর নারীদের তাদের মোহরানা খুশি মনে প্রদান করো; তবে তারা যদি নিজের ইচ্ছায় মোহরানার কিছু অংশ তোমাদের ছেড়ে দেয়, তবে তা সানন্দে গ্রহণ করতে পারো।”
(কুরআন, সুরা নিসা, ৪: ৩-৪)
আমাদের এটা বুঝতে হবে যে, বহুবিবাহের অনুমতি মূলত তৎকালীন সমাজের নানা সামাজিক, মানসিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে এসেছিল। বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন সময়ে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে এই প্রথার প্রয়োজন ছিল। আল্লাহতায়ালা তাঁর শরিয়তে এই প্রথাকে সরাসরি নিষিদ্ধ করেননি; বরং আলোচ্য আয়াতগুলোতে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন এই প্রথাকে ব্যবহার করে সেই সময়কার বিশেষ সামাজিক সমস্যাগুলো সমাধান করা হয়।
তবে একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে মনে রাখা জরুরি — কুরআন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি নিজের স্ত্রীদের মধ্যে সমান অধিকার ও সুবিচার বজায় রাখতে না পারে, তবে তার একাধিক বিয়ে করা একেবারেই উচিত নয়; এমনকি এতিমদের সাহায্য করার মতো মহৎ উদ্দেশ্যেও নয়। মানুষের সহজাত প্রকৃতি অনুযায়ী কোনো নির্দিষ্ট স্ত্রীর প্রতি কারো মন বেশি টানতে পারে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে সব স্ত্রীর সাথে সমান ও ন্যায্য আচরণ করা বাধ্যতামূলক। কুরআন এই বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে বলেছে:
وَلَن تَسْتَطِيعُوا أَن تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ ۖ فَلَا تَمِيلُوا كُلَّ الْمَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ ۚ وَإِن تُصْلِحُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا ﴿١٢٩﴾ وَإِن يَتَفَرَّقَا يُغْنِ اللَّهُ كُلًّا مِّن سَعَتِهِ ۚ وَكَانَ اللَّهُ وَاسِعًا حَكِيمًا ﴿١٣٠﴾
“তোমরা শত চেষ্টা করলেও স্ত্রীদের মধ্যে সব দিক থেকে সমান ইনসাফ বা ন্যায়বিচার বজায় রাখতে পারবে না। তাই তোমরা কোনো একজনের প্রতি পুরোপুরি ঝুঁকে পড়ে অন্যজনকে এমন অবস্থায় ফেলে রেখো না যে, সে না বিয়ের বন্ধনে পুরোপুরি আবদ্ধ থাকে, না ছাড়া পায়। যদি তোমরা নিজেদের সংশোধন করো এবং আল্লাহকে ভয় করে চলো, তবে জেনে রেখো — আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল ও অতি দয়ালু। আর যদি (সব চেষ্টার পরও) তাদের মাঝে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, তবে আল্লাহ তাঁর অসীম দয়া ও প্রাচুর্য দিয়ে উভয়কেই অভাবমুক্ত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও প্রজ্ঞাময়।”
(কুরআন, সুরা নিসা, ৪: ১২৯-১৩০)
নারীরা প্রায়ই প্রশ্ন করেন যে, পুরুষদের একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অনুমতি থাকলেও তাদের কেন একাধিক স্বামী রাখার অনুমতি নেই। এর পেছনে একটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে। একটি পরিবার সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য একজন অভিভাবক থাকা জরুরি। যেমন — একটি রাষ্ট্রে একাধিক শাসক থাকলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তেমনি একটি পরিবারে একাধিক অভিভাবক থাকলে সেখানেও চরম অরাজকতা দেখা দেবে। ইসলামি পারিবারিক কাঠামোতে স্বামীকে পরিবারের অভিভাবক বা দায়িত্বশীল করা হয়েছে। সুতরাং, একজন স্ত্রীর যদি একাধিক স্বামী থাকত, তবে তাকে একই সঙ্গে অনেকের কর্তৃত্বের অধীনে থাকতে হতো, যা পারিবারিক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা ও জটিলতা সৃষ্টি করত।
