Al-Ishraq June 2026
অন্যান্য

ধারাবাহিক বই : বাইবেলে মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসন্ধান

মুশফিক সুলতান

১. ভূমিকা

কুরআন অনুযায়ী, ধর্মীয় সত্যের ভিত্তি দুটি মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: (১) সহজাত নৈতিক অন্তর্দৃষ্টি তথা ফিতরাত, যার মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষ প্রবৃত্তিগতভাবে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে — যুক্তি এবং পর্যবেক্ষণমূলক অভিজ্ঞতার সহায়তায় — এবং (২) ঐশী হেদায়েত, যা এই সহজাত সত্যগুলোর বাহ্যিক সমর্থন, বিস্তার এবং প্রয়োগ হিসেবে কাজ করে। আর এই নবুয়তি সাক্ষ্যের চূড়ান্ত রূপ ও পূর্ণতা হিসেবে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে।[1] কুরআন প্রথমোক্ত স্তম্ভটিকে ব্যবহার করে আল্লাহর অস্তিত্ব এবং পরকালের মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে প্রতিষ্ঠা করে। আর দ্বিতীয় স্তম্ভটি, অর্থাৎ অতীতের ভবিষ্যদ্বাণীসমূহ এবং তার পরবর্তী বাস্তবায়নের উল্লেখের মাধ্যমে নবুয়তের ঐতিহ্য নিজেই নিজেকে যাচাই করে। এই পদ্ধতিটি নবুয়তের মিশনের ধারাবাহিকতাকে তুলে ধরে, যেখানে পরবর্তী নবীরা তাদের পূর্বসূরিদের ঘোষণাগুলো বাস্তবায়ন করেন। এর মাধ্যমে ঐশী বার্তার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হয় এবং ইতিহাসের পাতায় একটি অখণ্ড ও ঐক্যবদ্ধ ঐশী ইচ্ছার প্রকাশ ঘটে। ইসলামি বিশ্বাসের একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হলো — কুরআনে যেমনটি বলা হয়েছে — কোনো ভেদাভেদ ছাড়া সব নবীকে মেনে নেওয়া; একজনের প্রত্যাখ্যান মানেই সবার প্রত্যাখ্যান। কুরআন প্রকাশ করে, ইতিহাসের প্রতিটি সম্প্রদায়ের মধ্যে আল্লাহ নবী প্রেরণ করেছেন, যারা তাদেরকে সত্যের পথে পরিচালিত করেছেন। যদিও কুরআন আমাদের এই নবীদের মধ্যে কয়েকজনের নাম জানিয়েছে, তবে এদের অধিকাংশেরই নাম এর ভেতরে উল্লেখ নেই।[2] এটা ইঙ্গিত দেয় যে, উৎস বা ঐতিহ্য নির্বিশেষে সত্য যেখানেই পাওয়া যাক না কেন, তাকে স্বীকার করা ও গ্রহণ করার গুরুত্ব অপরিসীম।

এই গবেষণায় বাইবেলের নবী ইশাইয়া (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি আরোপিত একটি ভবিষ্যদ্বাণী এবং ইসলামি ঐতিহ্যের আলোকে নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আগমনের পূর্বাভাস হিসেবে এর ব্যাখ্যা অন্বেষণ করা হয়েছে। এই অনুসন্ধানটি একটি প্রাথমিক প্রবন্ধের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল, যেখানে আমি ইশাইয়া ৪২-এ বর্ণিত চরিত্রের সঙ্গে নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সাদৃশ্য বিশ্লেষণ করেছিলাম। পরবর্তীতে সমসাময়িক মুসলিম চিন্তাবিদ জাভেদ আহমেদ গামিদি-র কাজের সাথে আমার সম্পৃক্ততা আমাকে সকল ঐশী রাসুলদের মিশনের পিছনে বিদ্যমান একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঐশী নীতি সম্পর্কে আলোকিত করে, যা কুরআনের কাঠামোর মধ্যেই বোঝা যায়। এই নীতিটি, যাকে প্রায়ই কানুনে ইতমামে হুজ্জাত [সত্যের চূড়ান্ত প্রমাণ উপস্থাপনের নীতি) বা কানুন রিসালাত (বা রিসালাতের বিশেষ আইন) — যা আল্লাহর সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত[3] — বলা হয়, তা মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে ক্রমবর্ধমান মনোযোগের বিষয় হয়ে উঠেছে। এই বিষয়টি নিয়ে আগে থেকেই কিছু আলোচনা বা কাজ থাকলেও, এটাকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামো ও পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার মূল কৃতিত্ব মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের বিশিষ্ট কুরআন গবেষক ইমাম হামিদুদ্দিন ফারাহি (মৃত্যু ১৯৩০)-এর। এই ধারণাটি তার ছাত্র ইমাম আমিন আহসান ইসলাহি (মৃত্যু ১৯৯৯) আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন এবং পরবর্তীতে তার ছাত্র জাভেদ আহমেদ গামিদি একে আরও পরিশীলিত করেন। ইশাইয়া ৪২-এর ওপর এই ব্যাখ্যামূলক নীতি প্রয়োগ করার মাধ্যমে ভবিষ্যদ্বাণীটির একটি নতুন মূল্যায়ন সম্ভব হয়েছে, যা আগে থেকে উপেক্ষিত কাঠামোগত ও ধর্মতাত্ত্বিক মাত্রাগুলোকে উন্মোচিত করেছে এবং আরও সূক্ষ্ম ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এই বইটি এই বাইবেলীয় ভবিষ্যদ্বাণী ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে পাঠকদের সামনে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে রচিত।

 

মুশফিক সুলতান

সহকারী ফেলো, আল-মাওরিদ

 

১.১ ইশাইয়া ৪২ এবং মুসলিম ঐতিহ্য

কুরআন নিশ্চিত করে যে, বিদ্যমান ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থগুলোতে নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আগমনের স্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে এবং এই ধর্মাবলম্বীদেরকে নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে গ্রহণ ও সমর্থন করার আহ্বান জানানো হয়েছে। কুরআনের অনেক আয়াতে এই দাবির উদাহরণ পাওয়া যায়।[4] কুরআন, ৭:১৫৭-এ যেমন দাবি করা হয়েছে যে, নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সমসাময়িক ইহুদি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায় তাদের পবিত্র গ্রন্থগুলোতে তাঁকে খুঁজে পেতেন, এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দেয়: নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সমসাময়িকরা কোথায় এমন তথ্য খুঁজে পেয়েছিলেন? বেশ কিছু রেওয়ায়েত রয়েছে, যা এই বিষয়ে কিছু ধারণা দেয়। নিচে প্রাসঙ্গিক কিছু রেওয়ায়েত উল্লেখ করা হলো:

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, তাওরাতে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিবরণ কেমন? তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। আল্লাহর কসম, তিনি তাওরাতে এমন কিছু গুণাবলিতে বর্ণিত হয়েছেন, যা কুরআনেও তার সম্পর্কে বলা হয়েছে, যেমন: ‘হে নবী! আমি আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে ...’ (কুরআন, ৪৮:৮) এবং নিরক্ষরদের অভিভাবক হিসেবে। আপনি আমার বান্দা এবং আমার রাসুল। আমি আপনার নাম রেখেছি ‘আল-মুতাওয়াক্কিল’ (যে আল্লাহর ওপর নির্ভর করে)। আপনি অসৌজন্যমূলক বা কঠোর নন এবং বাজারে হইচই সৃষ্টিকারীও নন। আপনি মন্দের প্রতি মন্দ দিয়ে প্রতিদান দেন না, বরং ক্ষমা ও দয়া দিয়ে তাদের সাথে আচরণ করেন। আল্লাহ তাকে (অর্থাৎ নবীকে) ততক্ষণ পর্যন্ত মৃত্যু দেবেন না, যতক্ষণ না তিনি বক্র মানুষদের সোজা করবেন এই বলানোর মাধ্যমে যে: ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই’, যার মাধ্যমে অন্ধ চোখ, বধির কান এবং আবৃত হৃদয় খুলে যাবে।[5]

আদ-দারিমি আতা থেকে, তিনি ইবনে সালাম থেকে এবং একইভাবে কাব থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি ছিলেন একজন ইহুদি পণ্ডিত, যিনি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর ইমান এনেছিলেন:

কাব বলেন: [তাওরাতের] প্রথম লাইনে আছে: মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল, আমার মনোনীত বান্দা। তিনি কঠোর নন, পাষাণ হৃদয়ের নন এবং বাজারে হইচই করেন না। তিনি মন্দের বদলে মন্দ করেন না, বরং ক্ষমা ও উপেক্ষা করেন। তার জন্মস্থান মক্কায়, তার হিজরত তাইবাহতে (অর্থাৎ মদিনা) এবং তার শাসন হবে আশ-শামে (অর্থাৎ বৃহত্তর সিরিয়া)।

এবং দ্বিতীয় লাইনে আছে: মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল। তার অনুসারীদের মধ্যে তারাই অন্তর্ভুক্ত, যারা ক্রমাগত আল্লাহর প্রশংসা করে। তারা সুখ ও দুঃখে আল্লাহর প্রশংসা করে। তারা প্রতিটি স্থানে আল্লাহর প্রশংসা করে এবং প্রতিটি উচ্চ স্থানে তাঁর বড়ত্ব ঘোষণা করে। তারা সূর্যের ওপর ভিত্তি করে নামাজ আদায় করে, যখন নামাজের সময় হয় — এমনকি যদি তারা ময়লার স্তূপের ওপরেও থাকে। তারা তাদের কোমরে কাপড় বাঁধে এবং তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধুয়ে ওজু করে। রাতে আকাশে তাদের কণ্ঠস্বর মৌমাছির গুঞ্জনের মতো শোনা যায়।[6]

এই হাদিসের উল্লেখগুলোতে, বিশেষ করে একজন মনোনীত বান্দার বর্ণনায় — যিনি কঠোর আচরণ করেন না, রাস্তায় উচ্চস্বরে কথা বলেন না এবং বিরোধীদের সাথে ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে আচরণ করেন — আমরা ইশাইয়া ৪২-এর শুরুর আয়াতগুলোর এক বিস্ময়কর প্রতিধ্বনি দেখতে পাই। ইশাইয়ার ভবিষ্যদ্বাণীতে আমরা ঐশীভাবে নিযুক্ত এমন একজন ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎ পাই, যাকে ‘বান্দা’ (প্রায়শই ‘প্রভুর বান্দা’ হিসেবে অভিহিত) বলা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, তিনি বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন এবং তবুও তিনি ‘চিৎকার করবেন না বা রাস্তায় নিজের কণ্ঠস্বর উঁচুতে তুলবেন না’ (ইশাইয়া ৪২:২)। সুর ও বিষয়বস্তু উভয় ক্ষেত্রেই এই সাদৃশ্যগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী: সেই বান্দাকে তার বিরোধীদের প্রতি মৃদু ও ধৈর্যশীল হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মানুষকে সত্যের দিকে পরিচালিত করার। প্রাথমিক যুগের মুসলমানরা, বিশেষ করে আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম[7] এবং কাব আল-আহবার[8]-এর মতো ইহুদি ধর্মান্তরিত ব্যক্তিরা, সম্ভবত এই অভিন্ন গুণাবলিগুলো শনাক্ত করেছিলেন। এটা যুক্তিসঙ্গত যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবিরা এই উদ্ধৃতিগুলোর জন্য তারগুমের[9] প্রচলিত আরবি ভাবানুবাদগুলোর সাহায্য নিয়েছিলেন। চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যগুলোর এই সামঞ্জস্য ইঙ্গিত দেয় যে, ইশাইয়া ৪২ সেই প্রাথমিক শাস্ত্রীয় পাঠ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল, যার মাধ্যমে তারা ইহুদি ঐতিহ্যে নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে শনাক্ত করেছিলেন।

বেশ কিছু হাদিস বর্ণনায়, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবিরা তুলে ধরেছেন যে, নবীর দয়া ও করুণার ওপর গুরুত্বারোপ, অবিচারের নিন্দা এবং একেশ্বরবাদের প্রতি অবিচল আনুগত্য কীভাবে ইশাইয়াতে বর্ণিত সেই ‘বান্দা’-র বাইবেলীয় চিত্রের সাথে মিলে যায়, যাকে বিচার প্রতিষ্ঠা এবং একটি বক্র জাতিকে সংশোধন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। হাদিসের বক্তব্যগুলো কেবল ইশাইয়ার বর্ণিত নৈতিক আচরণের সাথেই মেলে না — তিনি ‘একটি জখম হওয়া নল ভাঙবেন না’ (ইশাইয়া ৪২:৩) — বরং একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোর ঐক্যকারী হিসেবে নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ভূমিকাকেও সুদৃঢ় করে, যা ‘দ্বীপপুঞ্জ’ বা দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর জন্য হেদায়েতের প্রতিশ্রুতি পূরণ করে। প্রাথমিক যুগের মুসলিম গবেষকদের দৃষ্টিতে এই মিলগুলো দেখে অনেকের মনেই দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে, নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আগমন আসলে এই প্রাচীন হিব্রু ভবিষ্যদ্বাণীরই বাস্তবায়ন।

ইতিহাস জুড়ে মুসলিম পণ্ডিতরাও এই ভবিষ্যদ্বাণীকে নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দিকে নির্দেশিত বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে ইশাইয়া ৪২-এর ভবিষ্যদ্বাণী এবং নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবনে এর বাস্তবায়নের ওপর আমার এই বিশ্লেষণ মূলত কুরআনের একটি বিশেষ ধারনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে—আর তা হলো আল্লাহর মনোনীত রাসুলদের বিষয়ে আল্লাহর সুনির্দিষ্ট রীতি বা আল্লাহর সুন্নাত[10]। ইশাইয়া ৪২-এর মূল টেক্সট (মূলপাঠ)-এর গভীরে থাকা এই ধারণাটি বুঝতে পারলে, সেখানে বর্ণিত সেই মহামানবের মূল দায়িত্বটি পরিষ্কার হয়ে যায়। এই ভিত্তি থেকেই আমি ইশাইয়া ৪২-এর প্রতিটি আয়াতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরার চেষ্টা করব। আমার এই বিশ্লেষণে কুরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসের আলোকে নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবন ও মিশনের সাথে এই ভবিষ্যদ্বাণীর যে গভীর মিল রয়েছে, তা তুলে ধরার প্রয়াস পাব।

১.১ টেক্সট (মূলপাঠ) সংক্রান্ত প্রমাণ

এই অংশে আমরা হিব্রু বাইবেলের প্রধান পাণ্ডুলিপিগুলো নিয়ে আলোচনা করব। বিশেষ করে মাসোরেটিক টেক্সট (MT), সেপটুয়াজিন্ট (LXX) এবং তারগুমকে আমরা মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে টেক্সট (মূলপাঠ)-এর সাক্ষ্য বা প্রমাণ যাচাই করব। হিব্রু বাইবেলের বিদ্যমান উৎসগুলো সম্পর্কে ‘দ্য কেমব্রিজ কম্প্যানিয়ন টু দ্য হিব্রু বাইবেল/ওল্ড টেস্টামেন্ট’-এ যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:

এই অংশে আমরা হিব্রু বাইবেলের মূল পাণ্ডুলিপিগুলো নিয়ে আলোচনা করব। এখানে আমরা মূলত মাসোরেটিক টেক্সট (MT), সেপটুয়াজিন্ট (LXX) এবং তারগুমকে মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে টেক্সট (মূলপাঠ)-এর সত্যতা যাচাই করব। হিব্রু বাইবেলের এই উৎসগুলো সম্পর্কে The Cambridge Companion to the Hebrew Bible/Old Testaments বইয়ে যা বলা হয়েছে, তা নিচে দেওয়া হলো:

১.১.১ মাসোরেটিক টেক্সট (MT)

“হিব্রু বাইবেলের প্রথাগত বা প্রচলিত টেক্সট (মূলপাঠ)-কে বলা হয় মাসোরেটিক টেক্সট। বাইবেলের মূল টেক্সট (মূলপাঠ) যেন নির্ভুলভাবে সংরক্ষিত থাকে এবং সঠিকভাবে পড়া যায়, সেজন্য ‘মাসোরেট’ নামে পরিচিত ইহুদি বিশেষজ্ঞরা একসময় এতে বিভিন্ন নির্দেশিকা ও টীকা যুক্ত করেছিলেন। এই টেক্সট (মূলপাঠ) মূলত দুটি অংশে বিভক্ত: একটি হলো ব্যঞ্জনবর্ণের অংশ, যা প্রাচীন পাণ্ডুলিপি থেকে এসেছে; আর অন্যটি হলো স্বরবর্ণ, উচ্চারণ চিহ্ন, সুর করার চিহ্ন ও অন্যান্য নোট, যা পরবর্তীকালে বিশেষজ্ঞরা যুক্ত করেছেন। এমটি (MT)-এর প্রাচীনতম অনুলিপি বা এর অংশগুলো নবম ও দশম শতাব্দীর দিকে পাওয়া যায়। এর উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নবীদের কায়রো কোডেক্স ৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে, আলেপ্পো কোডেক্স (যা বর্তমানে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত) ৯২৫ খ্রিস্টাব্দে এবং লেনিনগ্রাদ কোডেক্স (সম্পূর্ণ বাইবেল) ১০০৯ খ্রিস্টাব্দে অনুলিপি করা হয়েছিল।”

“মধ্যযুগ থেকে এটাই সারা বিশ্বের ইহুদিদের প্রধান বাইবেল হিসেবে স্বীকৃত। এই টেক্সট (মূলপাঠ)-কে নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ করার জন্য বিশেষজ্ঞরা যে পরিশ্রম করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। যদিও মাসোরেটিক টেক্সটের নির্ভুলতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, তবুও গবেষকরা মনে করেন যে, বাইবেলের প্রতিটি বইয়ের ক্ষেত্রে এই টেক্সট (মূলপাঠ)-এর মান সমান কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, যাত্রাপুস্তক (Exodus)-এ এটা খুব প্রাচীন ও নির্ভুল রূপ ধরে রাখলেও, স্যামুয়েলের বইগুলোতে এর কিছু ভিন্নতা দেখা যায়।”[11]

১.১.২ সেপটুয়াজিন্ট (LXX)

“খ্রিস্টপূর্ব শেষ তিন শতাব্দীতে ইহুদি পণ্ডিতরা হিব্রু বাইবেলের বইগুলোকে গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন, যা সেপটুয়াজিন্ট (LXX) নামে পরিচিত। এই অনুবাদের কাজ ঠিক কবে শুরু হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে প্রচলিত আছে যে, রাজা দ্বিতীয় টলেমি ফিলাডেলফাসের শাসনামলে ফিলিস্তিন থেকে ৭২ জন পণ্ডিত মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় গিয়ে মাত্র ৭২ দিনে আইনের বইগুলো গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন।”

“খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দের দিকে গ্রিক অনুবাদের কিছু উদ্ধৃতি পাওয়া যায়, যার মানে হলো — এই অনুবাদ প্রক্রিয়া তার আগেই শুরু হয়েছিল। সেপটুয়াজিন্ট-এর প্রাচীনতম রূপটিকে ‘ওল্ড গ্রিক’ বলা হয়, যা পরবর্তীতে হিব্রু টেক্সট (মূলপাঠ)-এর সাথে মিল রেখে কয়েকবার সংশোধন করা হয়েছে। মজার বিষয় হলো, সেপটুয়াজিন্ট-এর কিছু পাণ্ডুলিপি মাসোরেটিক টেক্সটের প্রাচীনতম অনুলিপিগুলোর চেয়েও পুরনো। এটা হিব্রু উৎস থেকেই অনূদিত হয়েছিল, কিন্তু সব ক্ষেত্রে সেই হিব্রু টেক্সট (মূলপাঠ)-কে নিশ্চিতভাবে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।”[12]

১.১.৩ তারগুমসমূহ

“‘তারগুম’ শব্দটির অর্থ হলো অনুবাদ। দ্বিতীয় মন্দির যুগে ইহুদি সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে আরামীয় ভাষা খুব প্রচলিত ছিল, তাই তারা হিব্রু বাইবেলের বইগুলোকে আরামীয় ভাষায় অনুবাদ করেছিল। তারগুমের শুরুর দিকের ইতিহাস সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য না পাওয়া গেলেও, ‘মৃত সাগরের পাণ্ডুলিপি’ (Dead Sea Scrolls)-র মধ্যে এগুলোর লিখিত রূপ খুঁজে পাওয়া গেছে। এটা প্রমাণ করে যে, খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকেই তারগুমের লিখিত টেক্সট (মূলপাঠ) প্রচলিত ছিল। গুরুত্বপূর্ণ তারগুমগুলোর মধ্যে তারগুম সিউডো-জোনাথন, নিওফাইটি, ফ্র্যাগমেন্ট তারগুম, অনকেলোস এবং নবীদের জন্য ‘তারগুম জোনাথন’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।”

“মূলপাঠ বা টেক্সট গবেষণার ক্ষেত্রে তারগুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো হিব্রু টেক্সট (মূলপাঠ)-এর ওপর ভিত্তি করেই লেখা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাখ্যার ইতিহাসের ক্ষেত্রেও এদের ভূমিকা অনেক, কারণ অনেক সময় তারগুমগুলো শুধু অনুবাদই করেনি, বরং মূল টেক্সট (মূলপাঠ)-কে সহজ করতে বা বুঝাতে গিয়ে সেটাকে আরও বিস্তৃত করেছে কিংবা কিছুটা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে।”[13]

১.২ বর্তমান কাজের কাঠামো

ইশাইয়া ৪২-এর এই গবেষণায় আমরা মাসোরেটিক টেক্সট (MT), সেপটুয়াজিন্ট (LXX) এবং তারগুম জোনাথনের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করব। আমরা মূলত এমন কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য বা ভিন্নতার দিকে নজর দেব, যা টেক্সট (মূলপাঠ) বোঝার ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এই গবেষণায় প্রামাণিক হিব্রু পাঠ্য হিসেবে এমটি (MT)-কে প্রধান উৎস হিসেবে ধরা হবে। পাশাপাশি এলএক্সএক্স (LXX)-এর মাধ্যমে আমরা ভিন্ন একটি টেক্সট ঐতিহ্যের পরিচয় পাব এবং তারগুমের মাধ্যমে দ্বিতীয় মন্দির যুগে ইহুদিরা কীভাবে বাইবেলের পাঠ ও অর্থ গ্রহণ করত, তা বোঝার চেষ্টা করব। এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টির বিশ্লেষণকে আরও সমৃদ্ধ ও গভীর করতে আমরা এই উৎসগুলোকে সতর্কতার সাথে সমন্বয় করব।

 

 

 


[1] এই দ্বৈত জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো — সহজাত নৈতিক স্বীকৃতি [ফিতরাত] এবং ঐশী হেদায়েতের সমর্থন — কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। প্রথমটি মানুষের সহজাত প্রকৃতি তথা ফিতরাতের সাথে সম্পর্কিত, যা এর ভেতরে কার্যকর যুক্তি ও পর্যবেক্ষণমূলক ক্ষমতার সাথে যুক্ত; আর দ্বিতীয়টি হলো নবুয়তের ইতিহাসের মাধ্যমে প্রমাণিত ঐশী হেদায়েত। কুরআন, ১১:১৭ এই সংশ্লেষণটি তুলে ধরে:

“সুতরাং, যে ব্যক্তি তার রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং তাঁর পক্ষ থেকে একজন সাক্ষী তা অনুসরণ করে, আর এর পূর্বে মুসার কিতাব পথপ্রদর্শক ও রহমত হিসেবে বর্তমান — তারা কি এই কুরআনকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে? [কখনোই না!] এরূপ লোকেরাই এর ওপর ইমান আনে ...”

اَفَمَنۡ کَانَ عَلٰی بَیِّنَۃٍ مِّنۡ رَّبِّہٖ وَ یَتۡلُوۡہُ شَاہِدٌ مِّنۡہُ وَ مِنۡ قَبۡلِہٖ  کِتٰبُ مُوۡسٰۤی اِمَامًا وَّ  رَحۡمَۃً ؕ اُولٰٓئِکَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِہٖ…

কুরআনের সকল ইংরেজি অনুবাদ জাভেদ আহমেদ গামিদি ও ড. শেহজাদ সেলিম অনূদিত ‘দ্য কুরআন ট্রান্সলেটেড’ (লাহোর: আল-মাওরিদ, ২০২১) থেকে নেওয়া হয়েছে; অবশ্য অন্য কোনো অনুবাদ ব্যবহৃত হলে তা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

[2] “আপনার পূর্বেও আমি অনেক রাসুল পাঠিয়েছি। তাদের মধ্যে এমনও আছে, যাদের কাহিনী আমি আপনার কাছে বর্ণনা করেছি এবং এমনও আছে, যাদের কাহিনী আমি আপনার কাছে বর্ণনা করিনি ...” (কুরআন, ৪০:৭৮)

وَ لَقَدۡ اَرۡسَلۡنَا رُسُلًا مِّنۡ قَبۡلِکَ مِنۡہُمۡ مَّنۡ  قَصَصۡنَا عَلَیۡکَ وَ مِنۡہُمۡ مَّنۡ لَّمۡ نَقۡصُصۡ عَلَیۡکَ …

[3] দেখুন পরিশিষ্ট খ: অপরিবর্তনীয় ঐশী রীতি (আল্লাহর সুন্নাত)।

[4] “যারা অনুসরণ করে এই রাসুলের — নবী উম্মির, যাকে তারা তাদের কাছে থাকা তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায় ...” (কুরআন, ৭:১৫৭)

اَلَّذِیۡنَ یَتَّبِعُوۡنَ الرَّسُوۡلَ النَّبِیَّ الۡاُمِّیَّ الَّذِیۡ یَجِدُوۡنَہٗ مَکۡتُوۡبًا عِنۡدَہُمۡ فِی التَّوۡرٰىۃِ وَ الۡاِنۡجِیۡلِ …

[শৈলী ও পরিভাষার জন্য জাভেদ আহমেদ গামিদি এবং শেহজাদ সেলিম অনূদিত ‘দ্য কুরআন ট্রান্সলেটেড’ থেকে কিছুটা পরিমার্জিত।]

[5] বুখারি, সহিহ আল-বুখারি, অনুবাদ: মুহাম্মদ মুহসিন খান (রিয়াদ: দারুস সালাম, ১৯৯৭), খণ্ড ৩, ১৯৪ (রেওয়ায়েত ২১২৫); খণ্ড ৬, ৩১১ (রেওয়ায়েত ৪৮৩৮)।

[6] আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান আল-দারিমি। মুসনাদ আল-দারিমি, যা সুনান আদ-দারিমি নামেও পরিচিত। সম্পাদনায়: হুসাইন সেলিম আসাদ আদ-দারানি। প্রথম সংস্করণ। রিয়াদ: দার আল-মুগনি লি-ন-নাশরি ওয়া-ত-তাওজি, ২০০০। ১: রেওয়ায়েত ৬-৭।

عَنْ كَعْبٍ: فِي السَّطْرِ الْأَوَّلِ: «مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ، عَبْدِي الْمُخْتَارُ، لَا فَظَّا، وَلَا غَلِيظًا وَلَا صَخَّابًا فِي الْأَسْوَاقِ، وَلَا يَجْزِي بِالسَّيِّئَةِ السَّيِّئَةَ، وَلَكِنْ يَعْفُو وَيَغْفِرُ، مَوْلِدُهُ، بِمَكَّةَ، وَهِجْرَتُهُ بِطَيْبَةَ، وَمُلْكُهُ بِالشَّامِ» وَفِي السَّطْرِ الثَّانِي: «مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ، أُمَّتُهُ الْحَمَّادُونَ يَحْمَدُونَ اللَّهَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ، يَحْمَدُونَ اللَّهَ فِي كُلِّ مَنْزِلَةٍ، وَيُكَبِّرُونَهُ عَلَى كُلِّ شَرَفٍ، رُعَاةُ الشَّمْسِ يُصَلُّونَ الصَّلَاةَ، إِذَا جَاءَ وَقْتُهَا، وَلَوْ كَانُوا عَلَى رَأْسِ كُنَاسَةٍ، وَيَأْتَزِرُونَ عَلَى أَوْسَاطِهِمْ، وَيُوَضِّئُونَ أَطْرَافَهُمْ، وَأَصْوَاتُهُمْ بِاللَّيْلِ فِي جَوِّ السَّمَاءِ كَأَصْوَاتِ النَّحْلِ.

[7] আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম ইবনে হারিস। ইহুদি রাব্বি যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। পূর্বে হোসেন নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি ইহুদি গোত্র বনু কাইনুকার সদস্য ছিলেন। তিনি ৪৩ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন।

[8] ইয়েমেনের ইহুদি রাব্বি যিনি আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফতের শেষের দিকে অথবা উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফতের প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ইহুদি কিংবদন্তি তথা ইসরাইলিয়াতের প্রধান বর্ণনাকারী ছিলেন।

[9] তারগুম: আরামীয় ভাষায় হিব্রু বাইবেলের বা এর কোনো অংশের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা। সামনের অনুচ্ছেদ দেখুন।

[10] দেখুন পরিশিষ্ট খ: অপরিবর্তনীয় ঐশী রীতি (আল্লাহর সুন্নাত)।

[11] জেমস সি. ভ্যান্ডারক্যাম, "Texts, Titles, and Translations," in The Cambridge Companion to the Hebrew Bible/Old Testament, ed. Stephen B. Chapman and Marvin A. Sweeney (New York: Cambridge University Press, 2016), 9–10।

[12] ভ্যান্ডারক্যাম, "Texts, Titles, and Translations," 10–12।

[13] ভ্যান্ডারক্যাম, "Texts, Titles, and Translations," 13-14।

GCIL Bangla

Visit us

Suite 230, 3620 N Josey Ln,

Carrollton, Dallas, TX 75007

Contact us via email

info@almawridus.org

Copyright 2025, Ghamidi Center of Islamic Learning. All Rights Reserved. GCIL is an initiative of Al-Mawrid U.S. A 501(c)(3) tax-exempt organization in the U.S. Federal EIN: 46-5099190.