এই বইটি কাদের জন্য?
যারা আল্লাহতায়ালার ওপর ইমান রাখেন এবং জ্ঞানগর্ভ তাত্ত্বিক আলোচনা ও দলিল-প্রমাণের ভার ছাড়াই ইসলামকে সহজভাবে জানতে চান — এই বইটি তাদের জন্যই লেখা।
আজ থেকে প্রায় ১৪শ বছর আগে আরবের বুকে মুহাম্মদ (সা.) নামে এক ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহতায়ালার সর্বশেষ বার্তাবাহক হিসেবে দাবি করেন। তিনি তৎকালীন আরবকে জানিয়ে দেন যে, তিনি খোদার আদালত হিসেবে দুনিয়ায় এসেছেন। তাই যারা তাকে মেনে নেবে, তারা দুনিয়ায় বিজয়ী হবে; আর যারা খোদায়ি বার্তাকে অস্বীকার করবে, তাদেরকে দুনিয়া থেকে মিটিয়ে দেওয়া হবে। এ ধরনের হুঁশিয়ারি প্রথম দিকে সবাইকে বিস্মিত করে। অধিকাংশ মানুষ একে অসংলগ্ন কথা বলে মনে করে। কারণ, এমন দাবি বিশ্বাস করার মতো কোনো জাগতিক উপায়-উপকরণ তখন ছিল না — যদি না ঐ ব্যক্তি সত্যিই আল্লাহতায়ালার প্রেরিত হন।
অন্যায়, অবিচার, অপবাদ ও নির্যাতন চলতে থাকে। এক পর্যায়ে তিনি নিজ শহর ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেন। মূলত এখান থেকেই ঘটনাপ্রবাহ বদলাতে শুরু করে। সত্যিই আল্লাহতায়ালার আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়; খোদাদ্রোহীরা পরাজিত ও নিশ্চিহ্ন হয়; আর বিজয়ীর বেশে আল্লাহর রাসুল মক্কায় প্রবেশ করেন। যে কথা ২৩ বছর আগে প্রলাপ বলে উপহাস করা হয়েছিল, তা বাস্তবে পরিণত হয়। শুধু এখানেই শেষ নয় — আরব উপদ্বীপ থেকে শুরু করে সুদূর মরক্কো থেকে উপমহাদেশ পর্যন্ত এক বিশাল ভূখণ্ড করায়ত্ত হয়, ইমানের পুরস্কার হিসেবে খোদাতায়ালার অনুসারীদের জন্য।
এটাই ছিল ইসলামের শেষ নবী ও রাসুল মুহাম্মদ (সা.) এবং তার সাথিদের উপাখ্যান। তিনি দুনিয়ায় এক ধরনের “ছোট কিয়ামত” ঘটিয়ে দেন — যা ইতিহাসে অমোচনীয়। তার হাত ধরেই দুনিয়ায় খোদায়ি আদালতের সর্বশেষ বাস্তব চিত্রায়ণ সম্পন্ন হয়। শেষ হয় একটি অধ্যায়; শেষ হয় নবুয়তের ধারাও।
খোদার পক্ষ থেকে দুনিয়ায় তাঁর নির্বাচিত মানুষ পাঠিয়ে হেদায়েতের সিলসিলা যেহেতু শেষ করে দেওয়া হয়েছে, তাই যুক্তির অনিবার্য দাবি হলো — খোদাতায়ালার হেদায়েত আমাদের কাছে এমনভাবে সংরক্ষিত থাকবে, যেন তা চিরকাল অবিকৃত থাকে এবং সকলের নাগালযোগ্য হয়।
খোদাতায়ালা যে হেদায়েতের প্যাকেজ আমাদেরকে দিয়েছেন, তা এমনভাবে সাজানো যে, মানুষের জন্মগত স্বভাব অর্থাৎ মানুষের সহজাত প্রকৃতির সঙ্গে তা সামঞ্জস্যশীল। সহজভাবে বললে, মানুষের সহজাত প্রকৃতি যদি ৫০ হয়, তবে হেদায়েতের এই প্যাকেজ বাকি ৫০; এই দুইয়ে মিলে ১০০ — অর্থাৎ পূর্ণতা। তাই হেদায়েত সংরক্ষণের প্রক্রিয়াও এমনভাবে হয়েছে, যা মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াটি কী?
একবার ভাবুন — মরক্কো থেকে উপমহাদেশ পর্যন্ত কত কোটি মানুষ। তারা সবাই একটি বইকে খোদায়ি বই হিসেবে মানে এবং বিরাট একটি অংশ সেটাকে লাইন-বাই-লাইন মুখস্থ করে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এভাবেই তা লিখে, পড়ে, মুখস্থ করে, সঞ্চারিত হচ্ছে। কোথাও এমন হয়নি যে, এক অঞ্চলের মানুষ বলছে — আমাদের কাছে যে বই আছে সেটাই খোদায়ি; আর বাকিদের কাছে যা আছে তা ভুল। আবার এমন ঘটনাও ঘটেনি যে, কিছু লোক মিলে এ বইয়ে জালিয়াতির ষড়যন্ত্র করল এবং কোটি কোটি মানুষকে বোকা বানিয়ে সে ষড়যন্ত্র সফলও হলো। বাস্তবে এটা সম্ভবও নয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে কোনো বিষয় যখন নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলে আসে, তখন একদল মানুষের পক্ষে যোগসাজশ করে তাতে জালিয়াতি করা এবং পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর তা চাপিয়ে দেওয়া অসম্ভব। একেই আরবিতে বলা হয় ‘তাওয়াতুর’।
খোদায়ি হেদায়েতের এই প্যাকেজই ইসলাম। এই ইসলাম আমরা তাওয়াতুরের মাধ্যমে মূলত দুইভাবে পেয়েছি।
প্রথমত, গোটা জনগোষ্ঠি একটি গ্রন্থকে খোদায়ি গ্রন্থ হিসেবে মেনে সেটাকে হুবহু মুখস্থ করে, লিখে, পড়ে — প্রজন্মের পর প্রজন্মে তা স্থানান্তর করে। এটাই হলো কুরআন।
দ্বিতীয়ত, বিশ্বের যেখানেই মুসলমানদের সমাজ রয়েছে, তারা কিছু ব্যবহারিক কাজ ধর্ম হিসেবে পালন করে — যা সর্বত্র এক ও অভিন্ন। আজান হলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রমজান মাস এলে রোজা, জিলহজ্জ মাস এলে সামর্থ্যবানদের হজ্জ — এ ধরনের বহু ধর্মীয় অনুশীলন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলে এসেছে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মানুষের মধ্যে কোনো একটি চক্র এসবের কোনো একটিতে জালিয়াতি করে তা সবার ওপর চাপিয়ে দেবে — এমনটি বাস্তবসম্মত নয়। এটাই ‘ব্যবহারিক তাওয়াতুর’। এই ব্যবহারিক তাওয়াতুরের মাধ্যমে আমরা যে ধর্মীয় বিধি-বিধান পেয়েছি, পারিভাষিক ভাষায় তাকে বলা হয় ‘সুন্নাত’।
মোট কথা, কুরআন ও সুন্নাত মিলেই ইসলাম। এই দুই বিষয়ে আমরা পূর্ণ নিশ্চয়তার সঙ্গে বলতে পারি — এটাই সেই ইসলাম, যা আমাদেরকে দিয়ে গেছেন জমিনে আল্লাহর আদালত হয়ে আসা শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)।
এটা মুদ্রার এক পিঠ। এবার মুদ্রার অন্য পিঠে আসি।
মরক্কো থেকে উপমহাদেশ, চীন, সুমাত্রা — দূর বহুদূর পর্যন্ত ইসলাম বিস্তার লাভ করেছে। নানা কৃষ্টি-সংস্কৃতির সঙ্গে মিশেছে; ইতিহাসের উত্থান-পতন, ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে আধুনিক যুগে এসে পৌঁছেছে। ইসলামের নামে শত শত দল-উপদল হয়েছে। একদল আরেকদলকে ইসলাম থেকে বের করে দিতে চায়। সবাই নিজেকে “সঠিক ইসলামের দল” বলে। এমন নয় যে, এসব দলের কোথাও আলেম-ওলামা নেই — বরং প্রায় সবখানেই আছেন। এই টালমাটাল বাস্তবতায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে: আমি কীভাবে সেই ইসলামকে খুঁজে নেব, যা নিয়ে এসেছিলেন জমিনে আল্লাহর আদালত হয়ে আসা শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)?
এই প্রশ্নের উত্তর আপনি কীভাবে দেন — কোন পদ্ধতিতে এই প্রশ্নের মুকাবিলা করেন — তার ওপরই নির্ভর করে আপনার উদ্দেশ্য। এবং এটাই আল্লাহর অন্যতম একটি পরীক্ষা।
আগেই বলেছি, খোদায়ি হেদায়েতের এই প্যাকেজ মানুষের সহজাত প্রকৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল। মানুষের সহজাত প্রকৃতিকে আরবিতে বলা হয় ‘ফিতরাত’। ফলে ইসলাম হলো ফিতরাতের ধর্ম। খোদাতায়ালা এর সংরক্ষণব্যবস্থাও করেছেন মানুষের ফিতরাতের উপযোগী করেই। তাই যখন আপনি তাওয়াতুরের মাধ্যমে প্রাপ্ত ইসলামকে আলাদা করে বুঝতে পারবেন, তখনই আপনি পেয়ে যাবেন সেই ইসলাম — যা নিয়ে এসেছিলেন জমিনে আল্লাহর আদালত হয়ে আসা শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)।
ঠিক এই কাজটিই করেছেন বিখ্যাত পণ্ডিত ও যুগের অনন্য মনীষী জাভেদ আহমেদ গামিদি। তিনি প্রায় দুই দশকের নিরলস পরিশ্রমে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এ কাজ সম্পন্ন করেন এবং “মিজান” নামে একটি বই লেখেন। উদ্দেশ্য সেই ইসলামকে তুলে ধরা, যা নিয়ে এসেছিলেন জমিনে আল্লাহর আদালত হয়ে আসা শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)। তবে “মিজান” গ্রন্থটি কলেবরে বড় এবং জ্ঞানগর্ভ তাত্ত্বিক আলোচনা ও দলিল-প্রমাণে সমৃদ্ধ। তাই সাধারণ পাঠকদের জন্য তিনি এমন একটি সংস্করণ তৈরি করেন, যা তাত্ত্বিক আলোচনা ও দলিল-প্রমাণের ভারে ভারী নয় — বরং কেবল মূল বিষয়বস্তুর সরল উপস্থাপনা। আর সেটাই হলো আপনাদের হাতে থাকা এই বই — “আল-ইসলাম”।
বইটি মূলত উর্দু ভাষায় রচিত। বাংলায় অনুবাদের ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব সাবলীল ও পাঠযোগ্যভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। অনুবাদে বাংলা একাডেমির বানানরীতি অনুসরণ করা হয়েছে; তবে কিছু ক্ষেত্রে প্রচলিত ও গ্রহণযোগ্য রূপ বজায় রাখতে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে — যেমন: ঈদ, নবী। ‘আল্লাহ’ এবং আল্লাহ-সংশ্লিষ্ট সর্বনামের ক্ষেত্রে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করা হয়েছে, অন্য সব ক্ষেত্রে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করা হয়নি। ভাবার্থের পূর্ণতা ও সাবলীলতার প্রয়োজনে যেসব স্থানে বাড়তি কথা যুক্ত করা হয়েছে, সেখানে তৃতীয় বন্ধনী [ ] ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো লেখকের মূল বক্তব্যের অংশ না হওয়ায় এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন পাঠকের পাঠপ্রক্রিয়ায় কোনো বিভ্রান্তি তৈরি না হয়। অনুবাদে ভুলত্রুটি থেকে যাওয়াই স্বাভাবিক। আশা করি পাঠকগণ সেগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
বইটি প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়ায় গামিদি সেন্টার অফ ইসলামিক লার্নিং (Ghamidi Center of Islamic Learning)-কে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই। মহান আল্লাহ এই কাজটিকে কবুল করুন।
— ইমদাদ হোসেন
লেখক ও অনুবাদক
