আল-ইসলাম

অধ্যায় 13

৬. জিহাদের বিধি-বিধান

জাভেদ আহমেদ গামিদি

শান্তি ও আজাদি (স্বাধীনতা) মানব সভ্যতার এক অপরিহার্য প্রয়োজন। ব্যক্তির অবাধ্যতা থেকে সমাজকে রক্ষা করার জন্য শাসন ও দণ্ডবিধি রয়েছে; কিন্তু কোনো জাতি যদি বিদ্রোহী হয়ে ওঠে, তখন প্রত্যেকে জানে যে, তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। উপদেশ ও অনুশাসন যতক্ষণ কার্যকর থাকে, ততক্ষণ অস্ত্র ধারণ করাকে কেউ বৈধ মনে করে না। কিন্তু কোনো জাতির বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা এই পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, উপদেশ ও অনুশাসনের মাধ্যমে তাদেরকে সঠিক পথে আনা সম্ভব নয়, তখন মানুষের অধিকার রয়েছে যে, সে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে; আর ততক্ষণ পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখবে, যতক্ষণ না পৃথিবীতে শান্তি ও স্বাধীনতার পরিবেশ ফিরে আসে। কুরআনের নির্দেশ হলো — অস্ত্র ধরার এই অনুমতি যদি না দেওয়া হতো, তবে জাতিগুলোর অবাধ্যতা এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যেত যে, সভ্যতার ধ্বংসের কথা তো বাদই, এমনকি ইবাদতখানাগুলো পর্যন্ত জনশূন্য করা হতো এবং সেই জায়গাগুলোতে কেবল ধুলো উড়ত — যেখানে এখন রাত-দিন বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহর নাম নেওয়া হয় এবং তাঁর ইবাদত করা হয়।

ইসলামি শরিয়তে জিহাদ[[1]] এই উদ্দেশ্যে-ই করা হয়। জিহাদ না প্রবৃত্তির লালসার জন্য, না ধন-সম্পদের জন্য, না দেশ জয় বা রাজ্য শাসনের জন্য, না খ্যাতি ও নাম-ডাকের জন্য এবং না আত্মমর্যাদা, গোষ্ঠীপ্রীতি কিংবা শত্রুতার কোনো আবেগ চরিতার্থ করার জন্য। মানুষের স্বার্থপরতা ও পাশবিকতার সাথে এই জিহাদ ও লড়াইয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা আল্লাহর যুদ্ধ, যা তাঁর বান্দারা তাঁর আদেশে এবং তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর পথে লড়াই করে। এই যুদ্ধে তাদের অবস্থান কেবল হাতিয়ার ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতো। এতে তাদের নিজস্ব কোনো উদ্দেশ্য নেই, বরং আল্লাহর উদ্দেশ্যসমূহ পূর্ণ করাই তাদের কর্তব্য। অতএব, তারা নিজেদের এই অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্রও বিচ্যুত হতে পারে না।

এর আইনগুলো নিম্নরূপ:

১. জিহাদের হুকুম

জিহাদ ও লড়াইয়ের নির্দেশ মুসলমানদেরকে সামষ্টিক সত্তা [অর্থাৎ জামাত] হিসেবে দেওয়া হয়েছে। কুরআনে এ বিষয়ে যত আয়াত এসেছে, মুসলমানরা তাদের ব্যক্তিগত পর্যায়ে সেগুলোর উদ্দেশ্য নয়। বরং হুদুদ ও দণ্ডবিধির মতোই এই আয়াতগুলোর উদ্দেশ্য মুসলমানদের সামষ্টিক সত্তা (জামাত)। অতএব, এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার কেবল তাদের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের-ই রয়েছে। তাদের ভিতরের কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোনোভাবেই এই অধিকার রাখে না যে, তাদের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেবে।

২. জিহাদের উদ্দেশ্য

কুরআনে জিহাদের নির্দেশ মূলত ‘ফিতনা’ নির্মূলের জন্য এসেছে। এর অর্থ — কোনো ব্যক্তিকে জুলুম ও জবরদস্তির মাধ্যমে তার ধর্ম থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করা। এটাকে ইংরেজি ভাষায় Persecution শব্দ দ্বারা প্রকাশ করা হয়। জান ও মাল এবং বুদ্ধি-বিবেক ও মতামত প্রকাশের বিরুদ্ধে সব ধরনের অন্যায় হস্তক্ষেপ এর অন্তর্ভুক্ত। অতএব, জুলুম ও অবিচার যে রূপেই হোক না কেন — তার বিরুদ্ধে জিহাদ করা যেতে পারে।

৩. জিহাদের ফরজ হওয়া

জিহাদ মুসলমানদের ওপর ততক্ষণ পর্যন্ত ফরজ হয় না, যতক্ষণ না শত্রুর মুকাবিলায় তাদের সামরিক শক্তি একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত পৌঁছায়। অতএব, জিহাদ ও লড়াইয়ের এই দায়িত্ব পালনের জন্য এটা জরুরি যে, তারা কেবল নিজেদের নৈতিক অস্তিত্ব সুদৃঢ় করার চেষ্টাই করবে না, বরং নিজেদের সামরিক শক্তিও সেই স্তর পর্যন্ত অবশ্যই বৃদ্ধি করবে, যার নির্দেশ কুরআন রিসালাত-যুগের মুসলমানদের তখনকার পরিস্থিতি অনুযায়ী দিয়েছিল এবং তাদের ও তাদের শত্রুদের মধ্যে ১:২ (এক অনুপাত দুই) অনুপাত নির্ধারণ করে দিয়েছিল।

৪. জিহাদে অংশগ্রহণ

জিহাদে বাস্তবে অংশ না নেওয়া কেবল তখনই অপরাধ, যখন কোনো মুসলমান সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ যুদ্ধ ঘোষণার পরেও ঘরে বসে থাকে। তখন এটা নিঃসন্দেহে মুনাফিকির মতো বড় অপরাধে পরিণত হয়। এই পরিস্থিতি না থাকলে জিহাদ একটি ফজিলত, যা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা প্রত্যেকের মধ্যে থাকা উচিত। কিন্তু এর মর্যাদা ফজিলতের আওতায়-ই থাকবে; এটা ঐ ফরজের অন্তর্ভুক্ত নয়, যা পালন না করলে মানুষ অপরাধী সাব্যস্ত হবে।

৫. জিহাদ থেকে পলায়ন

জিহাদ ও লড়াইয়ের জন্য ময়দানে নামার পর কাপুরুষতা দেখানো এবং রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া হারাম। কোনো ইমানদারের কখনোই এমনটি করা উচিত নয়। এটা আল্লাহতায়ালার সাহায্যের ওপর আস্থাহীনতা, পরকালের চেয়ে দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং জীবন-মৃত্যুকে নিজের কৌশলের ওপর নির্ভরশীল মনে করার অপরাধ — যার কোনো স্থান ইমানের সাথে থাকতে পারে না।

৬. নৈতিক সীমা

নৈতিক সীমা লঙ্ঘন করে জিহাদ করা সম্ভব নয়। নৈতিকতা সর্বাবস্থায় এবং সব কিছুর ওপর অগ্রাধিকার পায়। যুদ্ধ-বিগ্রহের সময়ও আল্লাহতায়ালা নৈতিক সীমা থেকে বিচ্যুত হওয়ার অনুমতি কাউকে দেননি। এই নির্দেশের অধীনে কুরআনে বর্ণিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হেদায়াত হচ্ছে: অঙ্গীকার বা চুক্তি পালন করা। বিশ্বাসঘাতকতা ও চুক্তি ভঙ্গ করাকে আল্লাহতায়ালা নিকৃষ্টতম গুনাহ হিসেবে গণ্য করেছেন। অতএব, কোনো চুক্তিবদ্ধ জাতি যদি মুসলমানদের ওপর জুলুমও করে, তবে চুক্তির লঙ্ঘন করে (আক্রান্তদের) সাহায্য করা যাবে না। একইভাবে, যারা যুদ্ধের সময় কোনো কারণে নিরপেক্ষ থাকতে চায়, তাদের বিরুদ্ধেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার অনুমতি নেই।

জিহাদের জন্য বের হওয়ার সময় অহংকার ও লোকদেখানোর মানসিকতা রাখা উচিত নয়। দম্ভ এবং জাঁকজমক কোনো মুমিনের জন্য শোভনীয় নয়। রণক্ষেত্র হোক বা সাধারণ সভা — খোদাতায়ালার বান্দাদের মধ্যে সর্বাবস্থায় দাসত্বের বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ পাওয়া উচিত।

৭. ঐশী সাহায্য (নুসরত-এ-ইলাহি)

মুসলমানরা এই যুদ্ধ আল্লাহর ওপর ভরসা করে লড়ে, কিন্তু কুরআন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এতে আল্লাহর সাহায্য লাভের জন্য সবচেয়ে মৌলিক বিষয় হলো ‘সবর ও সুদৃঢ়তা’। মুসলমানদের কোনো জামাতের জন্য আল্লাহর সাহায্যের অধিকার ততক্ষণ তৈরি হয় না, যতক্ষণ না তারা এই গুণ নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি করে।

৮. যুদ্ধবন্দী

যুদ্ধের বন্দীদের মুসলমানরা মুক্তিও দিতে পারে, অথবা তাদের থেকে মুক্তিপণও নিতে পারে। কিন্তু তাদের হত্যা করা, অথবা দাস-দাসী বানিয়ে রাখার পথ কুরআন মাজিদ চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে।

৯. গনিমতের মাল

গনিমতের মাল মূলত সামষ্টিক উদ্দেশ্যের জন্য নির্দিষ্ট। আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মুজাহিদদের কোনো চিরস্থায়ী অধিকার এতে প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি যে, মুসলমানদের সরকার তা সর্বাবস্থায় [তাদেরকে] প্রদান করতে বাধ্য থাকবে। সরকার তার পরিস্থিতি এবং সামাজিক প্রয়োজনের নিরিখে এ বিষয়ে যে পদ্ধতি চাইবে, গ্রহণ করতে পারে।



[1] জিহাদের শাব্দিক অর্থ: কোনো প্রচেষ্টায় নিজের পূর্ণ শক্তি ব্যয় করা। কুরআনে এই শব্দটি যেমন আল্লাহর পথে সাধারণ প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি এটা ‘কিতাল ফি সাবিলিল্লাহ’ বা আল্লাহর পথে যুদ্ধের অর্থেও এসেছে। এখানে এর এই দ্বিতীয় অর্থ (অর্থাৎ যুদ্ধ) উদ্দেশ্য।

GCIL Bangla

Visit us

Suite 230, 3620 N Josey Ln,

Carrollton, Dallas, TX 75007

Contact us via email

info@almawridus.org

Copyright 2025, Ghamidi Center of Islamic Learning. All Rights Reserved. GCIL is an initiative of Al-Mawrid U.S. A 501(c)(3) tax-exempt organization in the U.S. Federal EIN: 46-5099190.