মানুষকে আল্লাহতায়ালা যে ফিতরাতের ওপর সৃষ্টি করেছেন, তার একটা অনিবার্য পরিণতি এটাও যে, সে সভ্যতা চায় এবং তারপর এই সভ্যতাকে নিজের ইচ্ছা ও স্বাধীনতার অপব্যবহার থেকে বাঁচানোর জন্য অবিলম্বে হোক বা বিলম্বে নিজের মধ্যে একটি সামাজিক শৃঙ্খলা তৈরি করতে বাধ্য হয়। মানব ইতিহাসে রাজনীতি ও সরকার, মানুষের এই আকাঙ্ক্ষা ও এই বাধ্যবাধকতার গর্ভ থেকেই জন্ম নিয়েছে এবং মানুষ যতক্ষণ মানুষ আছে, ততক্ষণ সে চাইলেও এখান থেকে নিষ্কৃতি লাভে সফল হতে পারবে না। তাই বুদ্ধি-বিবেকের দাবি এটাই যে, এই দুনিয়ায় রাষ্ট্রহীন কোনো সমাজ ও সভ্যতার স্বপ্ন দেখার পরিবর্তে মানুষের উচিত নিজের জন্য এমন একটি সামাজিক চুক্তি অস্তিত্বে আনার চেষ্টা করা, যা সামাজিক ব্যবস্থাকে পরিশুদ্ধ করে তার জন্য একটি ন্যায়নিষ্ঠ সরকারের ভিত্তি প্রদান করবে।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মানুষের ফিতরাত তাকে সাধারণভাবে এই পথ দেখিয়েছে এবং এই পথেই সংগ্রামের জন্য তাকে প্রস্তুত করেছে, কিন্তু এ পর্যন্ত যে ফলাফল এসেছে এবং যা প্রত্যেকে এই জগতে নিজ চোখে দেখতে পারে — শুধু সেটাই এই বাস্তবতাকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণের জন্য যথেষ্ট যে, জীবনের অন্যসব বিষয়ের মতো মানুষের বুদ্ধি-বিবেকের পক্ষেও এই বিষয়ে আসমানি হেদায়েত ছাড়া কিছু মৌলিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে নেয়া সম্ভব নয়। আল্লাহতায়ালা এই ভিত্তিতেই রাজনীতির বিধি-বিধান মুসলমানদের দিয়েছেন। এটা নিম্নোক্ত পাঁচটি দফার ওপর ভিত্তিশীল:
১. মৌলিক নীতি
আল্লাহ ও রাসুল যেসব বিষয়ে কোনো হুকুম সকল সময়ের জন্য দিয়েছেন, সেগুলোতে মুসলমানদের ‘উলিল আমর’ — চাই তারা রাষ্ট্রপ্রধান হন বা পার্লামেন্টের সদস্য — নিজের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই। ফলে মুসলমানরা তাদের রাষ্ট্রে এমন কোনো আইন তৈরি করতে পারবে না, যা আল্লাহ ও রাসুলের হুকুমের পরিপন্থী হয় বা যাতে তাঁদের হেদায়েতকে উপেক্ষা করা হয়। তবে এর অধীনে তারা অবশ্য বাধ্য যে, ‘উলিল আমর’-এর পক্ষ থেকে যে হুকুমই দেওয়া হবে, তা পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে শুনবে এবং মানবে।
২. আসল দায়িত্ব
এই নীতির ভিত্তিতে যে সামাজিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, তার আসল দায়িত্ব হচ্ছে: জাতির আমানতসমূহ যোগ্যতার ভিত্তিতে মানুষের কাছে সোপর্দ করা এবং আদল ও ইনসাফকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং ন্যায়বিচারকে তার চূড়ান্তরূপে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখা।
৩. ধর্মীয় ফরজসমূহ
নামাজ কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, ভালোর উপদেশ দেওয়া এবং মন্দ থেকে বিরত রাখা — এগুলো সামাজিক ব্যবস্থার জন্য ধর্মীয় ফরজ। এগুলো পূরণ করার জন্য যে হেদায়েত কুরআন ও সুন্নাতে দেওয়া হয়েছে, তার আলোকে:
ক. রাষ্ট্রের মুসলমান নাগরিকদের থেকে দাবি করা হবে যে, নিজেদের ইমান ও ইসলামের সাক্ষ্য হিসেবে নামাজ কায়েম করবে।
খ. জুমার নামাজের খুতবা এবং তার ইমামতি রাষ্ট্রের রাজধানীর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে রাষ্ট্রপ্রধান, প্রদেশগুলোতে গভর্নর এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ইউনিটে তাদের কর্মচারীগণ করবেন।
গ. প্রত্যেক মুসলমান, যার ওপর যাকাত ধার্য হয়েছে, সে নিজের সম্পদ, গবাদিপশু এবং উৎপাদিত ফসলে নির্ধারিত অংশ নিজের মূলধন থেকে আলাদা করে বাধ্যতামূলকভাবে সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে; এবং সরকার অন্যান্য খাতের সঙ্গে প্রাপ্ত যাকাত থেকে নিজের অভাবী নাগরিকদের প্রয়োজনসমূহ — তাদের ফরিয়াদের আগেই — তাদের দরজায় পৌঁছে পূরণ করার চেষ্টা করবে।
ঘ. ভালোর উপদেশ দেওয়া এবং মন্দ থেকে বিরত রাখার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিছু লোক নিয়মিতভাবে নিয়োগ করা হবে, যারা নিজেদের জন্য নির্ধারিত সীমানা অনুযায়ী এই কাজ সম্পন্ন করতে সবসময় সক্রিয় থাকবে।
৪. নাগরিকত্বের অধিকার
রাষ্ট্রের মুসলমান নাগরিকরা যদি নামাজের ব্যবস্থা করে এবং যাকাত আদায় করতে থাকে, তবে তারা সেসব অধিকার লাভ করবে, যা একজন মুসলমান হিসেবে তাদের রাষ্ট্রে তাদের পাওয়া উচিত। তারা পরস্পরের ভাই হবে, আইনি অধিকারসমূহের দিক থেকে সমান হবে। ধর্মের ইতিবাচক দাবিগুলোর মধ্যে নামাজ ও যাকাত ছাড়া অন্য কিছু আইনের শক্তি দিয়ে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না; এবং রাষ্ট্র তাদের জান, মাল, ইজ্জত এবং বুদ্ধি-বিবেক ও মতের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের কোনো জবরদস্তি করতে পারবে না।
৫. শাসনব্যবস্থা
রাষ্ট্রের আমির (রাষ্ট্রপ্রধান) ও শাসক নির্বাচন এবং সরকার গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনা মানুষের রায় ও পরামর্শের মাধ্যমে হবে এবং ক্ষমতা গ্রহণের পরেও তাদের এই অধিকার থাকবে না যে, সামষ্টিক বিষয়ে তারা মুসলমানদের ঐকমত্য বা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতকে উপেক্ষা করবে।
