ইমান একটি ধর্মীয় পরিভাষা। কোনো বিষয়কে অন্তরের পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে মেনে নেওয়াকে ইমান বলে। এর মূল হলো আল্লাহর ওপর বিশ্বাস। মানুষ যদি তার প্রতিপালককে এমনভাবে বিশ্বাস করে যে, পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও সন্তুষ্টির শেষ স্তরে পৌঁছে নিজের হৃদয় ও মস্তিষ্ককে তাঁর নিকট সোপর্দ করে, তবে কুরআনের পরিভাষায় সে মুমিন। ইমানের হাকিকত এটাই, যার ভিত্তিতে কুরআন দাবি করে যে, মানুষের কথা ও কাজকেও এর সাক্ষী হতে হবে। তাই কুরআন প্রতিটি নেক কাজ বা পুণ্যকে ইমানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবং মুমিনদের অপরিহার্য গুণ হিসেবে বর্ণনা করে।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আইনের দৃষ্টিতে সেই ব্যক্তিই মুমিন, যে মুখে ইসলামের স্বীকৃতি দেয়। (আইনি ক্ষেত্রে) তার এই ইমানকে কম বা বেশি বলে গণ্য করা যায় না। কিন্তু যেখানে প্রকৃত ইমানের সম্পর্ক, তা কখনোই কোনো স্থবির বা জড় বস্তু নয়। আল্লাহর জিকির, তাঁর আয়াতসমূহের তিলাওয়াত এবং মানুষের নিজ সত্তা ও বিশ্বজগতের নিদর্শনে আল্লাহর মহিমার বহিঃপ্রকাশ দেখার মাধ্যমে ইমান বৃদ্ধি পায়। কুরআন মাজিদ ইমানকে এমন একটি গাছের সাথে তুলনা করেছে, যার মূল মাটির গভীরে প্রোথিত এবং শাখা-প্রশাখা আসমানের বিশালতায় ছড়িয়ে আছে।
একইভাবে ইমান হ্রাস পাওয়ার বিষয়টিও সত্য। মানুষ যদি উপকারী জ্ঞান এবং সৎকাজের মাধ্যমে অনবরত নিজের ইমানকে বাড়ানোর পরিবর্তে এর চাহিদার বিপরীত কাজ করে, তবে ইমান কমতে থাকে; এমনকি কোনো কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে তা সম্পূর্ণ নিঃশেষ পর্যন্ত হয়ে যায়।
এর থেকে স্পষ্ট যে, ইমান এবং আমল একে অপরের পরিপূরক বা অবিচ্ছেদ্য। অতএব, ইমানের সাথে আমল যেমন জরুরি, তেমনি আমলের সাথে ইমানও জরুরি। পরকালীন মুক্তির জন্য কুরআন মাজিদ প্রতিটি স্থানে ইমানকেই প্রথম ও প্রধান শর্ত হিসেবে সাব্যস্ত করেছে।
এই ইমান মূলত পাঁচটি বিষয়ের সমন্বয়ে গঠিত:
১. আল্লাহর ওপর ইমান,
২. ফেরেশতাদের ওপর ইমান,
৩. নবীগণের ওপর ইমান,
৪. আসমানি কিতাবসমূহের ওপর ইমান,
৫. প্রতিফল দিবসের ওপর ইমান।
আল্লাহর ওপর ইমান
আল্লাহ এমন এক সত্তার নাম, যিনি আসমান-জমিন এবং সমস্ত সৃষ্টির স্রষ্টা। এই নাম শুরু থেকেই বিশ্বজগতের প্রতিপালকের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আগে জাহেলি আরবেও এটা এই অর্থেই ব্যবহৃত হতো। ইব্রাহিমি ধর্মের যে অবশিষ্টাংশ আরবরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল, এই শব্দটিও সেগুলোর অন্তর্ভুক্ত।
এই সত্তার স্বীকৃতি এমন একটি বিষয়, যা অনাদিকাল থেকেই মানুষের ফিতরাত তথা সহজাত প্রকৃতিতে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। কুরআনের বর্ণনা হলো, এই বিষয়টি একটি অঙ্গীকার ও চুক্তির আকারে হয়েছে। এই অঙ্গীকারের কথা কুরআন একটি বাস্তব ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে। মানুষকে এখানে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে, এই কারণে এই ঘটনা তো তার স্মৃতি থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এর হাকিকত তার অন্তরের পাতায় খোদিত এবং তার মস্তিষ্কের গহীনে প্রোথিত রয়েছে; কোনো কিছুই একে মুছে ফেলতে পারে না। ফলে পরিবেশে কোনো বাধা না হলে এবং মানুষকে এই বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলে, সে এর দিকে সেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, যেভাবে শিশু মায়ের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে; যদিও সে নিজেকে কখনো মায়ের পেট থেকে বের হতে দেখেনি এবং এই বিশ্বাস নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, যেন সে আগে থেকেই এটাকে জানে। সে অনুভব করে যে, খোদার এই স্বীকৃতি তার একটি ফিতরি বা সহজাত প্রয়োজনের দাবির জবাব, যা তার ভিতরেই বিদ্যমান ছিল। সে যখন এটাকে পেয়ে যায়, তখন তার মনোজগতের সকল চাহিদাও এর সাথেই নিজস্ব স্থান পেয়ে যায়। কুরআনের বক্তব্য হচ্ছে, মানব সত্তার এই সাক্ষ্য এতটাই অকাট্য যে, খোদার রবুবিয়াত তথা প্রতিপালনের ব্যাপারে প্রত্যেক ব্যক্তি কেবল এই সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে বাধ্য।
মানুষের অন্তরের এই পথ-নির্দেশনার সাথে তাকে এই যোগ্যতাও দেওয়া হয়েছে যে, নিজের বাহ্যিক ইন্দ্রিয় দিয়ে সে যা কিছু দেখে, শোনে ও অনুভব করে, তা থেকে এমন কিছু বাস্তবতা আহরণ করে, যা ইন্দ্রিয়-বহির্ভূত। এর একটি সহজ উদাহরণ হলো মহাকর্ষ সূত্র (Law of Gravitation)। আপেল গাছ থেকে ছিঁড়লে মাটিতে পড়ে। মাটি থেকে পাথর তুলতে হলে এর জন্য শক্তি ব্যয় করতে হয়। সিঁড়ি দিয়ে নামার চেয়ে উপরে উঠা কঠিন। চাঁদ এবং নক্ষত্র মহাকাশে আবর্তন করে। মানুষ এসব জিনিস শতাব্দী ধরে দেখছিল। হঠাৎ একদিন নিউটন উদ্ঘাটন করলেন যে, এসবই মহাকর্ষ বলের কারিশমা। এই নিয়ম স্বয়ং পর্যবেক্ষণযোগ্য নয়, কিন্তু বর্তমানে পুরো পৃথিবী একে একটি বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে স্বীকার করে। এর কারণ, এই তত্ত্ব সকল জানা সত্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে সমস্ত পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা হয়ে যায় এবং অন্য কোনো তত্ত্ব এখন পর্যন্ত সামনে আসেনি, যা বাস্তব ঘটনাবলির সাথে এই মাত্রায় সামঞ্জস্য রাখে।
এটা স্পষ্ট যে, যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য — তা থেকে ইন্দ্রিয়াতীত বিষয়েরও অনুমান করা যায়। মানুষ যখন নিজের এই যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে এবং নিজের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা মহাবিশ্ব নিয়ে গবেষণা করে, তখন তার এই গবেষণা তার অন্তরের গভীরে লুকিয়ে থাকা এই হাকিকতেরই সাক্ষ্য দেয়।
ফলে সে দেখতে পায়, এই দুনিয়ার প্রতিটি বস্তু সৃষ্টিশীল সৌন্দর্যের এক অলৌকিক বহিঃপ্রকাশ; প্রতিটি বস্তুর মধ্যে আছে সীমাহীন অর্থময়তা, অসাধারণ আয়োজন; আছে প্রজ্ঞা, পরিকল্পনা, উপকারিতা এবং বিস্ময়কর শৃঙ্খলা ও বিন্যাস; আছে অতুলনীয় জ্যামিতি ও গণিত — যার ব্যাখ্যা এটা ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না যে, এই মহাবিশ্বের একজন স্রষ্টা আছে এবং এই স্রষ্টা কোনো অন্ধ ও বধির শক্তি নন; বরং তিনি এক অসীম বুদ্ধিমত্তা। এর কারণ হলো: কোনো জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান সত্তা থেকে যদি শক্তির প্রকাশ না হয়, তবে তা নিছক জবরদস্তি হওয়াই উচিত; কিন্তু বাস্তবতা এমন নয়। বরং এর মধ্যে আছে সর্বোচ্চ মাত্রার সামঞ্জস্য, অপরিসীম সঙ্গতি; যা থেকে অসাধারণ সব উপকার ও আশ্চর্য-অদ্ভুত রূপান্তর — যা কোনো অন্ধ ও বধির শক্তি থেকে কখনোই সৃষ্টি হতে পারে না।
এই সাক্ষ্যগুলো যদিও যথেষ্ট ছিল, তবুও মানুষের ওপর ইতমামে হুজ্জাত বা সত্য চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আল্লাহতায়ালা আরও যে বিশেষ ব্যবস্থা করেছেন, তা হলো — মানবজাতির সূচনা তিনি এমন একজন মানুষ দিয়ে করেছেন, যে আল্লাহর কথা শুনেছে, তাঁর ফেরেশতাদের দেখেছে এবং এভাবে হাকিকতের সরাসরি পর্যবেক্ষণের সাক্ষ্য দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন, যাতে তার এই জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তার বংশধরদের কাছে স্থানান্তরিত হতে থাকে এবং খোদার ধারণা মানবজীবনের কোনো যুগে, জমিনের কোনো প্রান্তে, কোনো জনপদে, কোনো বংশে এবং কোনো প্রজন্মে কখনো অপরিচিত হয়ে না পড়ে।
শুধু এতটুকুই নয়, প্রথম মানুষ হিসেবে আদম ও হাওয়াকে দুনিয়ায় পাঠানোর পর দীর্ঘ একটা সময় পর্যন্ত এই ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল যে, বনি আদম বা আদম সন্তানেরা যদি নিজেদের ইমান ও আমল গ্রহণযোগ্য হয়েছে কি না — তা এই দুনিয়াতেই জানতে চায়, তবে সে তা জানতে পারত। এটা ছিল সেই যুগের প্রতিটি মানুষের জন্য সত্যকে অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া — যাতে তারা নিজেদের মা–বাবার সঙ্গে এই সাক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এটার পদ্ধতি এমন ছিল এই যে, মানুষ আল্লাহতায়ালার দরবারে কুরবানি পেশ করত, তারপর আকাশ থেকে আগুন নেমে আসত এবং কবুল হওয়ার নিদর্শন হিসেবে তা গ্রাস করত।
এ থেকে স্পষ্ট যে, আল্লাহর অস্তিত্ব একটি স্বতঃসিদ্ধ বাস্তবতা — যার ধারণা মানুষ তার পূর্বপুরুষদের থেকে নিয়ে এসেছে এবং যার সাক্ষ্য আত্মা ও বস্তু — উভয়ই তাদের অস্তিত্ব দিয়ে প্রদান করে। কিন্তু আল্লাহর যাত তথা সত্তা কী? তাঁর গুণাবলি কী? তাঁর সেই ‘সুনান’ কী — যেগুলো তিনি নিজের সত্তার জন্য স্থির করে রেখেছেন? মানুষ যদি নিজের প্রতিপালকের মারেফত অর্জন করতে চায়, তবে এসব প্রশ্ন তার মনে অবশ্যই আসবে। ইমানের জন্য এই মারেফত জরুরি। কুরআন যখন আল্লাহতায়ালার প্রতি ইমানের দাবি করেছে, তখন এসব প্রশ্নের উত্তরও সে দিয়েছে। সেই উত্তর কী? আমরা এখানে সেগুলোই ব্যাখ্যা করব।
যাত
আল্লাহতায়ালার যাত বা সত্তা সম্পর্কে কুরআন পূর্ণ স্পষ্টতার সঙ্গে জানিয়ে দিয়েছে যে, তিনি কোনোভাবেই মানুষের উপলব্ধির সীমার মধ্যে আসতে পারেন না। কারণ, উপলব্ধির মাধ্যমসমূহ যে সত্তা সৃষ্টি করেছেন, তিনি তো নিশ্চিতভাবেই সেগুলোকে পেতে পারেন এবং সেগুলোকে পরিবেষ্টনও করতে পারেন, কিন্তু এই মাধ্যমগুলো কোনোভাবেই তাঁকে পরিবেষ্টন করতে পারে না, যিনি নিজেই সেগুলোকে পরিবেষ্টন করে আছেন।
সিফাত
আল্লাহতায়ালার সিফাত বা গুণাবলি অবশ্য কোনো না কোনো পর্যায়ে মানুষের নাগালে আসে। এর কারণ, গুণাবলি সম্পর্কিত কিছু বিষয়, তা যতই তুচ্ছ হোক না কেন, মানুষের কাছেও আছে। আল্লাহতায়ালা তাঁর জ্ঞান ও সংবাদ, কুদরত, রবুবিয়াত (প্রতিপালন) এবং রহমত ও হিকমতের কিছু অংশ আমাদেরও দান করেছেন। সেগুলোর ওপর অনুমান করে খোদার এই গুণাবলি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা আমরা গড়ে তুলতে পারি। ফলে কুরআন যখন বলে, তিনি খালিক (স্রষ্টা), কাদির (সর্বশক্তিমান), রহমান ও রহিম, আলিম ও হাকিম (সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান), হাইয়্যু ও কাইয়্যুম (চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী ধারক), আউয়াল ও আখির (প্রথম ও শেষ) এবং জাহির ও বাতিন (প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য) — তখন এগুলোর মাধ্যমে খোদার গুণাবলি সম্পর্কে একটি ধারণা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই গুণাবলি বোঝার ক্ষেত্রে যেসব বিষয় লক্ষ্য রাখা উচিত, সেগুলোর মধ্যে একটি হলো: এগুলোর সৌন্দর্যের দিক। কারণ কুদরত তখনই প্রশংসার যোগ্য হয়, যখন তা রহমত, করম (অনুগ্রহ) ও ন্যায়বিচারের সাথে থাকে। রাগ, প্রতিশোধ এবং কঠোরতা ও ক্রোধের বহিঃপ্রকাশও যদি জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে হয়, তবে তা প্রশংসনীয়। রহমত, মাগফিরাত (ক্ষমা) এবং দানশীলতাও নিজ নিজ স্থানে প্রশংসার উপযুক্ত। কুরআন মাজিদে ‘গনি’-এর সাথে ‘হামিদ’, ‘আলিম’-এর সাথে ‘হাকিম’ এবং ‘আজিজ’-এর সাথে ‘গফুর’ গুণাবলি এই সৌন্দর্যের দিকের প্রতি নির্দেশ করতেই এসেছে।
একইভাবে এই বিষয়টিও লক্ষ্য রাখা উচিত যে, আল্লাহতায়ালার যে ধারণাই প্রতিষ্ঠা করা হোক না কেন, তা জালাল (প্রতাপ), জামাল (সৌন্দর্য) ও কামাল (পূর্ণতা) থেকে মুক্ত হতে পারে না। ফলে একাকী, অদ্বিতীয়, অটল আশ্রয়স্থল — উদাহরণস্বরূপ এগুলো হলো কামালের গুণাবলি। পবিত্র, শান্তিময়, নিরাপত্তা দানকারী হলো জামালের গুণাবলি এবং বাদশাহ, গালিব (পরাক্রমশালী), প্রবল প্রতাপশালী হলো জালালের গুণাবলি। মানুষের মনে জালালের গুণাবলি থেকে ভয়, ভক্তি ও প্রশংসার আবেগ সৃষ্টি হয় এবং জামালের গুণাবলি থেকে সৃষ্টি হয় হামদ, আশা ও মহব্বতের। আবার জালালের গুণাবলি ইন্দ্রিয়ের কাছে বেশি প্রকাশ্য এবং জামালের গুণাবলি আকল (বুদ্ধি-বিবেক) ও হৃদয়ের বেশি নিকটবর্তী হয়। প্রতিপালককে সামনে রাখা হলে জামালের গুণাবলির প্রাধান্য অনুভূত হয় এবং মানুষের নফস যখন চোখের সামনে থাকে, তখন জালালের দিকটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মানুষ খোদার ভয়ে খোদার দিকে ধাবিত হয় এবং তাঁর জামালের গুণাবলির আঁচলে আশ্রয় লাভের চেষ্টা করে। কুরআন মাজিদ যখন বলে, সমস্ত সুন্দর নাম তাঁরই, তখন এর অর্থ তাঁর নিকট এটাই হয় যে, খোদার জালাল ও জামাল এবং তাঁর কামালকে বর্ণনা করে এমন প্রতিটি নাম-ই সুন্দর এবং সে নামেই খোদাকে ডাকা যেতে পারে।
আল্লাহতায়ালার কামালের গুণাবলি এই দিক থেকে গুরুত্ববহ যে, সেগুলো থেকে তাঁর মাহাত্ম্য ফুটে ওঠে। মানুষ যখন এসব গুণের সঠিক ধারণা অন্তরে ধারণ করে, তখন এর ফলে সে এমন এক খোদার ওপর ইমান আনে — যিনি একক, অদ্বিতীয় এবং অতুলনীয়; সবার জন্য অটল আশ্রয়স্থল; আসমান-জমিন এবং এগুলোর মধ্যবর্তী সবকিছুর একচ্ছত্র মালিক; তাঁর বাদশাহিতে অন্য কোনো শরিক নেই, তাঁর কুদরতের কারখানায় অন্য কোনো অংশীদার নেই; দুনিয়ার কোনো কিছুই তাঁর চোখের আড়ালে নয়; জগতের কোনো বিষয় তাঁর হুকুমের বাইরে নয়; প্রতিটি জিনিস তাঁর মুখাপেক্ষী, কিন্তু তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন; জড়পদার্থ, উদ্ভিদ, জীবজন্তু — সবই তাঁর দরবারে সেজদাবনত এবং তাঁর তাসবিহ ও তাহলিলে মশগুল; তাঁর কুদরত সীমাহীন, তাঁর প্রশস্ততা অসীম এবং তাঁর ইচ্ছা মহাবিশ্বের অণু-পরমাণুতে কার্যকর; তিনি যখন চান এবং যে জিনিসকে চান ধ্বংস করেন এবং যখন চান তাকে পুনরায় সৃষ্টি করেন; ইজ্জত ও জিল্লত — সবই তাঁর হাতে; সবাই নশ্বর, তিনিই অবিনশ্বর; তিনি ধরাছোঁয়ার ঊর্ধ্বে, অথচ ধমনীর রগ থেকেও নিকটে; তাঁর জ্ঞান এবং তাঁর কুদরত প্রতিটি জিনিসকে পরিবেষ্টন করে আছে; তিনি হৃদয়ের গোপন রহস্য পর্যন্ত জানেন; তাঁর ইচ্ছা প্রতিটি ইচ্ছায় কার্যকর এবং তাঁর হুকুম প্রতিটি হুকুমের ঊর্ধ্বে; তিনি প্রতিটি ত্রুটি থেকে মুক্ত, প্রতিটি মন্দ থেকে পবিত্র এবং প্রতিটি কলঙ্ক থেকে মুক্ত।
এই কামালের গুণাবলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো: আল্লাহতায়ালার তাওহিদ (একত্ববাদ)। কুরআন মাজিদ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব ও স্পষ্টতার সাথে তাওহিদের বিষয়ে বর্ণনা করেছে। এমনকি এই আসমানি কিতাবের সর্বশেষ অধ্যায় আপন বিষয়বস্তুর দিক থেকে যে সুরার মাধ্যমে শেষ হয়েছে, তাতে আল্লাহতায়ালা তাঁর নবীকে নির্দেশ দিয়েছেন মানুষের সামনে প্রকাশ্য ঘোষণা দেওয়া হোক যে, আল্লাহ এক, সবার আশ্রয় তিনি, তিনি কারো পিতা নন, পুত্রও নন এবং তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই।
তাওহিদের এই গুরুত্বের কারণেই কুরআন স্পষ্ট করেছে যে, এটা ছাড়া মানুষের কোনো আমল কবুলযোগ্য নয় এবং তাওহিদ ঠিক থাকলে প্রতিটি ভুলের ব্যাপারে ক্ষমা লাভের আশা করা যায়। এর কারণ, তাওহিদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ইমান নিয়ে বান্দা না গুনাহের ব্যাপারে বিদ্রোহী হতে পারে, আর না গুনাহ করে ফেললে তওবা ও ইস্তিগফারের তাওফিক থেকে বঞ্চিত থাকতে পারে। সে অবশ্যই প্রতিপালকের দিকে ফিরে আসবে এবং এভাবে কিয়ামতের হাজিরার আগেই নিজের জন্য ক্ষমা ও মার্জনার যোগ্যতা তৈরি করে নেবে।
তাওহিদের যেসব দলিল কুরআনে এসেছে, সেগুলো অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী এবং জ্ঞান ও বুদ্ধির স্বীকৃত নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে এতটুকু কথা বলাই যথেষ্ট যে, খোদার খোদায়িতে অংশীদার সাব্যস্ত করার জন্য কারো কাছে কোনো দলিল নেই। কুরআন তাঁর শ্রোতাদের নিকট একাধিক স্থানে দাবি করেছে যে, আকল ও নকল অর্থাৎ বুদ্ধি ও প্রতিষ্ঠিত বর্ণনার ভিত্তিতে এর কোনো দলিল পেশ করতে পারলে অবশ্যই করো। খোদার কোনো শরিক আছে কি নেই, এটার জন্য আসল সাক্ষ্য স্বয়ং খোদার-ই হতে পারে এবং খোদার সাক্ষ্য জানার একমাত্র মাধ্যম হলো তাঁর নাজিলকৃত কিতাবসমূহ এবং সেই সব বর্ণনা ও নিদর্শন, যা তাঁর নবী ও রাসুলদের থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানবজাতির কাছে স্থানান্তরিত হয়েছে। সেগুলোতে শিরকের সমর্থনের জন্য কোনো সাক্ষ্য বিদ্যমান নেই।
সুনান
আল্লাহতায়ালা বান্দাদের সাথে যে আচরণ করেন এবং যেভাবে করেন, সেটাকে কুরআনে সুন্নাতে ইলাহি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহতায়ালার ইরশাদ এই যে, এই সুন্নাতসমূহ অপরিবর্তনীয়, এগুলোতে কখনো কোনো পরিবর্তন হয় না। সুতরাং খোদার মারেফাতের জন্য যেভাবে তাঁর গুণাবলির জ্ঞান জরুরি, একইভাবে এই সুন্নাতে ইলাহির জ্ঞানও জরুরি। এই সুন্নাতসমূহ নিচে দেওয়া হলো:
১. ইবতিলা (পরীক্ষা)
আল্লাহতায়ালা এই দুনিয়া পরীক্ষার জন্য তৈরি করেছেন। খোদার এক বিশ্বজনীন আইনের মর্যাদা হিসেবে এই পরীক্ষা সমগ্র মানবজাতিকে বেষ্টন করে আছে। মানুষের প্রকৃতিতে যা কিছু আমানত রাখা হয়েছে, তা এই পরীক্ষার মাধ্যমেই প্রকাশ পায়, নফসের রহস্যসমূহ এর মাধ্যমেই উন্মোচিত হয় এবং ইলম ও আমলের মর্যাদা এর মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়। কুরআনের ইরশাদ এই যে, জীবন ও মৃত্যুর এই কারখানা অস্তিত্বে এসেছে এই জন্য যে, এটার প্রতিপালক দেখে নেন কে অবাধ্যতা অবলম্বন করে, আর কে তাঁর পছন্দ অনুযায়ী জীবন অতিবাহিত করে। এতে সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ সব বিষয়ে জ্ঞান রাখেন, কিন্তু তিনি এই সুন্নাত নির্ধারণ করেছেন যে, মানুষের সাথে জাজা ও সাজা অর্থাৎ পুরস্কার ও শাস্তির ফয়সালা তিনি কেবল নিজের জ্ঞানের ভিত্তিতে করবেন না। এই পরীক্ষা এই উদ্দেশ্যেই জারি করা হয়েছে।
এই দুনিয়ায় দুঃখ ও সুখ, দারিদ্র্য ও সচ্ছলতা, কষ্ট ও আরামের যে অবস্থাগুলো মানুষের সামনে আসে, সেগুলো এই আইনের অধীন। এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা করেন এবং তাদের মধ্য থেকে আসল ও নকলের পার্থক্য করেন। তিনি কাউকে ধন-সম্পদ এবং সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে ভূষিত করেন, তখন তার শোকরের পরীক্ষা নেন, আর কাউকে অভাব-অনটন ও দারিদ্র্যের মধ্যে ফেলেন, তখন তার সবর তথা ধৈর্যের পরীক্ষা নেন।
২. হেদায়েত ও গোমরাহি
এই পরীক্ষায় মানুষের কাছে দাবি করা হয়েছে যে, সে গোমরাহি থেকে বাঁচবে এবং নিজের জন্য হেদায়েতের পথ গ্রহণ করবে। কুরআন জানিয়েছে যে, এই হেদায়েত তার ফিতরাতে আমানত হিসেবে রাখা আছে। তারপর বিবেক-বুদ্ধির পরিপক্বতার বয়সে পৌঁছার পর জমিন ও আসমানের নিদর্শনসমূহ তাকে এর দিকে মনোযোগী করে। মানুষ যদি এই হেদায়েতের মূল্যায়ন করে, এর থেকে উপকার গ্রহণ করে এবং আল্লাহতায়ালার এই নিয়ামতের জন্য তাঁর শোকরগুজার হয়, তবে খোদার সুন্নাত এই যে, তিনি এর আলো তার জন্য বাড়িয়ে দেন, তার ভিতরে আরও হেদায়েতের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করেন এবং এর ফলস্বরূপ নবীগণ (আলাইহিমুস সালাম) যে হেদায়েত নিয়ে এসেছেন, তা থেকে উপকৃত হওয়ার তাওফিক তাকে দান করেন।
মানুষ যদি এই ফিতরাতি তথা সহজাত প্রকৃতির হেদায়েত থেকে বিমুখ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, নিজের বিচার-বুদ্ধি খাটানো থেকে বিরত থাকে এবং জেনে বুঝে সত্য থেকে বিচ্যুত হয়, তবে কুরআনের পরিভাষায় এটা জুলুম ও ফিসক (পাপাচার); আর খোদা কোনো জালিম ও পাপীকে কখনো হেদায়েত দেন না, বরং তাকে গোমরাহির অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ানোর জন্য ছেড়ে দেন।
৩. তাকলিফ মা লা ইয়ুতাক (সাধ্য-সামর্থ্যের বাইরে কষ্ট)
নবী (আলাইহিমুস সালাম)-দের মাধ্যমে যে শরিয়ত মানুষকে দেওয়া হয়েছে, তাতে আল্লাহতায়ালা নিজের পক্ষ থেকে কখনো এমন কোনো হুকুম দেন না, যা মানুষের সহ্যশক্তির বাইরে। তাঁর সকল কাজে এই মানদণ্ড সবসময় থেকেই কায়েম আছে যে, মানুষের শক্তির চেয়ে বেশি কোনো বোঝা তাদের ওপর চাপানো হবে না; আর যে হুকুমই দেওয়া হবে, তা মানুষের ফিতরাতের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এবং তার সামর্থ্য মেপে দেওয়া হবে। অতএব ভুলে যাওয়া, ভুল বোঝা এবং অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য এই শরিয়তে কোনো জবাবদিহি নেই; আর মানুষের কাছে এর দাবি শুধু এই যে, প্রকাশ্য ও গোপনে পূর্ণ সত্যবাদিতা ও সততার সাথে তারা তাঁর হুকুম পালন করবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, বান্দারা যদি অবাধ্যতা অবলম্বন করে, সে অবস্থাতেও আল্লাহতায়ালা তাদের ওপর এমন কোনো কষ্টকর বোঝা চাপিয়ে দেন না। কুরআন থেকে জানা যায় যে, আদব ও প্রশিক্ষণের জন্য, শাস্তির জন্য অথবা মানুষের মন্দ কাজের ফল তাদের দেখানোর জন্য কিংবা খোদার মুকাবিলায় তাদের অক্ষমতা প্রকাশ করার জন্য এ ধরনের কষ্ট অবশ্যই দেওয়া হয়।
৪. আযল ও নাসব (জাতিসমূহের উত্থান-পতন)
পরীক্ষার যে আইন এর আগে বর্ণনা করা হয়েছে, তার অধীনে আল্লাহতায়ালা যেভাবে ব্যক্তিদেরকে সবর (ধৈর্য) বা শোকরের পরীক্ষার জন্য মনোনীত করেন, একইভাবে জাতিসমূহকেও মনোনীত করেন। এই নির্বাচনের ফলে যখন কোনো জাতি একবার মর্যাদা লাভ করে, তখন আল্লাহ তাদের সাথে তাঁর আচরণ ততক্ষণ পর্যন্ত বদলান না, যতক্ষণ না তারা ইলম-আখলাক তথা জ্ঞান ও চরিত্রের দিক থেকে নিজেদের অবনতিতে নামিয়ে দেয়। এটা খোদার অপরিবর্তনীয় সুন্নাত এবং নিজের এই সুন্নাত অনুযায়ী যখন কোনো জাতিকে বারবার সতর্ক করার পর তিনি জিল্লতি (লাঞ্ছনা) ও দুর্ভাগ্যের ফয়সালা করেন, তখন তাঁর এই ফয়সালা কেউ ঠেকাতে পারে না এবং দুনিয়ার কোনো শক্তিও খোদার মুকাবিলায় সেই জাতিকে কোনো সাহায্য করতে পারে না। মানুষের পুরো ইতিহাস বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতনের ক্ষেত্রে এই সুন্নাতের বহিঃপ্রকাশের সাক্ষ্য দেয়।
৫. নুসরাতে ইলাহি (আল্লাহর সাহায্য)
আল্লাহতায়ালা যখন নিজের কোনো মিশন কোনো ব্যক্তি বা জামাতের নিকট অর্পণ করেন এবং তাকে তা পূরণ করার হুকুম দেন, তখন তিনি তাকে সাহায্যও করেন। এই মিশন দাওয়াতেরও হতে পারে এবং জিহাদ ও কিতালেরও হতে পারে। এ ধরনের কোনো মিশন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ইমানদারদের সাহায্য করা আল্লাহ নিজের ওপর আবশ্যক করে রেখেছেন। এই সাহায্য উদ্দেশ্যহীনভাবে আসে না, বরং এর একটি নীতিমালা আছে। আল্লাহতায়ালা এই নীতিমালা কুরআনে বর্ণনা করেছে। তাঁর বান্দাদের এই সাহায্য সেই নীতিমালা অনুযায়ীই অর্জিত হয়।
৬. তওবা ও ইস্তিগফার
মানুষ যখন কোনো গুনাহ করে ফেলে, তখন তার জন্য তওবা ও ইস্তিগফারের সুযোগ রয়েছে। এই বিষয়ের নিয়ম হলো, সে যদি গুনাহ করার পরপরই তওবা করে, তবে আল্লাহতায়ালা তাকে অবশ্যই ক্ষমা করে দেন। কিন্তু তিনি সেইসব মানুষের তওবা কখনোই কবুল করেন না, যারা জীবনভর গুনাহে ডুবে থাকে এবং যখন দেখে মৃত্যু মাথার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তখন তওবার অজিফা পড়তে শুরু করে। একইভাবে জেনেবুঝে সত্য অস্বীকারকারীদের তওবাও কবুল হয় না, যদি তারা মৃত্যুর সময় পর্যন্ত এই অস্বীকারের ওপর অটল থাকে।
৭. জাজা ও সাজা (পুরস্কার ও শাস্তি)
মৃত্যুর পর পুরস্কার ও শাস্তির বিষয়টি এক অকাট্য বাস্তবতা, কিন্তু কুরআন থেকে জানা যায় যে, কখনো কখনো এটা এই দুনিয়াতেও দেওয়া হয়। কিয়ামতের দিন খোদার আদালত যেভাবে তার পরম পূর্ণতার সঙ্গে প্রকাশ পাবে, এটা তারই ভূমিকা। পুরস্কার ও শাস্তির যে রূপগুলো আল্লাহতায়ালা একেবারে নির্ধারিত পদ্ধতিতে বর্ণনা করেছেন, তা হলো:
প্রথমত, যারা দুনিয়া অন্বেষণকারী হয়, এরই জন্য বাঁচে, এরই জন্য মরে এবং আখিরাত থেকে একেবারে উদাসীন হয়ে জীবন অতিবাহিত করে, আল্লাহতায়ালা যাকে যতটুকু চান, সেটুকু দিয়ে তাদের হিসাব এই দুনিয়াতেই চুকিয়ে দেন এবং তাদের সমস্ত কর্মকাণ্ডের ফল তারা এখানেই পেয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, রাসুলদের মাধ্যমে ইতমামে হুজ্জাত তথা সত্যের চূড়ান্ত উপস্থাপনের তাদের অস্বীকারকারীদের ওপর এই দুনিয়াতেই আজাব নেমে আসে এবং বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহতায়ালা আসমান ও জমিনের বরকতের দরজা খুলে দেন।
তৃতীয়ত, সাইয়্যিদুনা ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর বংশধরদের জন্য আল্লাহতায়ালার ওয়াদা এই যে, তারা যদি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, তবে তারা জাতিসমূহের ইমামত (নেতৃত্ব) লাভ করবে এবং সত্য থেকে বিচ্যুতির পথ অবলম্বন করলে এই পদ থেকে অপসারিত করে তাদেরকে জিল্লতি (লাঞ্ছনা) ও পরাধীনতার আজাবে পতিত করা হবে।
ফেরেশতাদের ওপর ইমান
আল্লাহতায়ালা যে সত্তাগুলোর মাধ্যমে সৃষ্টিজগতের জন্য তাঁর হুকুম নাজিল করেন, তাদেরকে ফেরেশতা বলা হয়। কুরআনে তাদের জন্য ‘আল-মালাইকা’ শব্দটি এসেছে। এটা ‘মালাক’-এর বহুবচন, যার অর্থ বার্তাবাহক। অতএব, কুরআন থেকে জানা যায় যে, আলামে লাহুত (আধ্যাত্মিক জগৎ)-এর সাথে এই আলামে নাসুত (বস্তুজগৎ)-এর যোগাযোগ তাদের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই জগতের সমগ্র ব্যবস্থাপনা আল্লাহতায়ালা তাদের মাধ্যমেই পরিচালনা করেন। এই পরিচালনা ধরন এই যে, আল্লাহর দরবার থেকে যে হুকুম তাদের কাছে প্রেরণ করা হয়, তারা তা একেবারে অনুগত দাসের মতো আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে জারি করে। এতে তাদের কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত ইচ্ছা কাজ করে না। তারা আপাদমস্তক আনুগত্যের মূর্ত প্রতীক; সর্বদা নিজেদের প্রতিপালকের হামদ ও সানা (প্রশংসা)-তে মশগুল থাকে এবং তাঁর হুকুমের বিরুদ্ধে বিন্দু পরিমাণ অবাধ্যতাও করে না।
নবীগণের ওপর ইমান
বনি আদমের জন্য পরিপূর্ণ হেদায়েতের ব্যবস্থা আল্লাহতায়ালা যে সত্তাগুলোর মাধ্যমে করেছেন, তাদেরকে নবী বলা হয়। তারা মানুষই ছিলেন; কিন্তু আল্লাহ তাঁর ইলম ও হিকমতের ভিত্তিতে তাদেরকে এই মসনদের জন্য নির্বাচন করেছেন। এটা এক ঐশী দান; শিক্ষা-দীক্ষা, প্রশিক্ষণ কিংবা অর্জন-প্রচেষ্টার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কুরআন থেকে জানা যায় যে, এই মর্যাদায় তারাই নির্বাচিত হন, যারা নফস ও শয়তানের প্ররোচনা থেকে নিজেকে বাঁচান, গুনাহ থেকে নিরাপদ থাকেন এবং সব দিক থেকে নিজেদের জাতির সৎকর্মশীল ও উত্তম ব্যক্তি হন।
আল্লাহতায়ালা এই নবীদের প্রত্যেক জাতির নিকট পাঠিয়েছেন। আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে আল্লাহ ওয়াদা করেছিলেন যে, তার বংশধরদের পথপ্রদর্শনের জন্য তিনি নিজের পক্ষ থেকে হেদায়েত নাজিল করবেন। এই হেদায়েত এই নবীদের মাধ্যমেই বনি আদমকে দেওয়া হয়েছে। তারা আসমান থেকে ওহি লাভ করে মানুষকে সত্য জানাতেন, তার অনুসারীদের শুভ পরিণামের সুসংবাদ দিতেন এবং অবিশ্বাসীদের মন্দ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করতেন।
নবীদের প্রয়োজন এই জন্য ছিল না যে, মানুষ নিজের প্রতিপালককে চিনবে এবং তাকে ভালো-মন্দের পার্থক্য করার বোধ দেওয়া হবে। এগুলো তো তার সৃষ্টির অংশ এবং সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই তার ফিতরাতের আমানত হিসেবে রাখা আছে। অতএব, এই প্রয়োজন এসব বিষয়ে পরিচয় করানোর জন্য নয়, বরং দুটি কারণে দেখা দিয়েছে:
এক — ইতমামে হেদায়েত তথা হেদায়েতকে পূর্ণ করার জন্য। অর্থাৎ মানুষের ফিতরাতে যা কিছু সংক্ষেপে আমানত রাখা আছে এবং যা কিছু সে চিরকাল জানে, সেগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ও বিস্তারিত বিবরণসহ সেগুলো তার জন্য একেবারে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া।
দুই — ইতমামে হুজ্জাত তথা সত্যের চূড়ান্ত উপস্থাপনের জন্য। অর্থাৎ মানুষকে গাফিলতি থেকে জাগ্রত করা এবং ইলম-আকল তথা জ্ঞান ও বুদ্ধিবিবেকের সাক্ষ্যের পর এসব নবীর মাধ্যমে আরেকটি সাক্ষ্যও পেশ করা — যা হককে এমন মাত্রায় স্পষ্ট করে দেয় যে, কারও কাছে কোনো অজুহাত অবশিষ্ট না থাকে।
মুহাম্মদ রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রেরণের মাধ্যমে এই দুটো বিষয় বৈশ্বিক পর্যায়ে এবং একেবারে শেষ স্তরে অর্জিত হয়েছে; তাই নবুয়তের ধারাবাহিকতা চিরতরে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। কুরআন ঘোষণা করেছে যে, আপনি শেষ নবী। আপনার পরে আর কোনো নবী ও রাসুল আসবে না।
এই নবীদের চিনতে সুস্থ স্বভাবের কোনো ব্যক্তির অসুবিধা হয় না। মানুষের হৃদয় ও মস্তিষ্ক জাগ্রত থাকলে নবীদের চেহারা ও আওয়াজই মুজেজা (অলৌকিক নিদর্শন)। তবুও এর সাথে আল্লাহতায়ালা তাদেরকে এমন সুস্পষ্ট নিদর্শনও দান করেন যে, বিরোধীরা মুখে স্বীকার না করলেও — তাদের সত্যতার ওপর নিশ্চিত হওয়া ছাড়া তাদের জন্যও আর কোনো পথ অবশিষ্ট থাকে না। কুরআন থেকে জানা যায় যে, এই বাইয়্যিনাত (সুস্পষ্ট নিদর্শন) প্রত্যেক নবীকে তার জামানা ও পরিস্থিতির বিবেচনায় দেওয়া হয়। এর মধ্যে কয়েকটির উল্লেখ আমরা এখানে করব।
১. নবী সাধারণত তার পূর্ববর্তী নবীর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী এবং তারই সত্যায়নকারী হিসেবে আবির্ভূত হন। এ দিক থেকে তিনি কোনো অপরিচিত ব্যক্তিত্ব নন। মানুষ তার সাথে পরিচিত থাকে, এমনকি তার অপেক্ষায়ও থাকে। মসিহ (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে যে, সাইয়্যিদুনা ইয়াহইয়া তার নবুওয়ত প্রাপ্তির আগে জেরুজালেমে তার আগমনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুসংবাদ তাওরাত ও ইনজিল — উভয় কিতাবেই বর্ণিত হয়েছে, বরং সাইয়্যিদুনা মসিহ-এর আগমনের উদ্দেশ্যসমূহের মধ্যে একটি বড় উদ্দেশ্য হিসেবে এটা বর্ণনা করা হয়েছে যে, তিনি উম্মি-নবীর সুসংবাদ দেওয়ার জন্য এসেছিলেন। কুরআন নিজের সত্যতার জন্য এটাকে একটা অকাট্য প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছে যে, বনি ইসরাইলের আলেমগণ তাকে সেভাবেই চিনতেন, যেভাবে সন্তানের বিচ্ছেদে কাতর একজন পিতা নিজের প্রতিশ্রুত ও প্রতীক্ষিত পুত্রকে চিনে থাকে। এর অর্থ এই ছিল যে, তারা রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কেও খুব ভালোভাবেই চিনত।
২. নবী আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং আল্লাহর কালাম হিসেবে যা কিছু পেশ করেন, তাতে কোনো বৈপরীত্য ও বিরোধ থাকে না। দুনিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ের কোনো প্রতিভাধর ব্যক্তিও নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে এই দাবি করতে পারেন না — তিনি সক্রেটিস ও প্লেটো হোন অথবা কান্ট ও আইনস্টাইন, গালিব ও ইকবাল হোন কিংবা রাজি ও জামাখশারি যাই হোন না কেন। কিন্তু কুরআন নিজের সম্পর্কে এই কথা বলেছে এবং পূর্ণ জোরের সাথেই বলেছে যে, এতে চিন্তা ও ভাবের সামান্যতম বৈপরীত্যও খুঁজে পাওয়া যাবে না। পৃথিবীতে কি এমন কোনো মানুষ আছে, যে বছরের পর বছর বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এবং বিভিন্ন সময়ে এমন বিচিত্র বিষয়ে বক্তৃতা করেছে এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার এই সমস্ত বক্তৃতা যখন সংকলন করা হয়, তখন তা এমন এক সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সঙ্গতিপূর্ণ বক্তব্যের রূপ ধারণ করে, যাতে না চিন্তার কোনো সংঘাত থাকে, না বক্তার মন ও মস্তিকে সৃষ্ট হওয়া কোনো অবস্থার প্রতিফলন দেখা যায়, আর না মত ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কোনো চিহ্ন কোথাও পাওয়া যায়? এটা একমাত্র কুরআনের-ই বৈশিষ্ট্য।
৩. নবীকে আল্লাহতায়ালা মুজিজা ও অলৌকিক ক্ষমতা দান করেন। সাইয়্যিদুনা মুসা (আলাইহিস সালাম) এবং সাইয়্যিদুনা মসিহ-কে যে অসাধারণ মুজিজা দেওয়া হয়েছিল, সে সম্পর্কে স্বয়ং কুরআন স্পষ্টভাবে বলেছে যে, এই মুজিজাগুলো যেসব বিষয়ের প্রমাণ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে একটি ছিল এই নবীদের রিসালাত। এই মুজিজাসমূহকে কোনো ব্যক্তি জাদুবিদ্যা বা জ্ঞান ও শিল্পের উৎকর্ষ বলে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। কারণ, এ ধরনের জ্ঞান ও শিল্পের হাকিকত সেগুলোর বিশেষজ্ঞদের চেয়ে ভালো আর কেউ বুঝে না এবং তারাও এগুলোর সামনে নিজেদের অক্ষমতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এই হিসেবে যে মুজিজা দেওয়া হয়েছে, তা হচ্ছে: কুরআন। আরবি ভাষার অলংকারশৈলী এবং জ্ঞান ও সাহিত্যধারার সাথে পরিচিত সাহিত্যিক রুচিসম্পন্ন ব্যক্তিরা যখন কুরআন পড়েন, তখন স্পষ্টভাবে অনুভব করেন যে, এটা কোনো মানুষের বাণী হতে পারে না। ফলশ্রুতিতে একের অধিক স্থানে কুরআন নিজেই তার শ্রোতাদের চ্যালেঞ্জ করেছে যে, তারা যদি তাদের এই ধারণায় সত্যবাদী হয় যে, এটা খোদাতায়ালার কালাম নয়, বরং মুহাম্মদ এটাকে নিজের পক্ষ থেকে বানিয়ে পেশ করছেন, তবে এই কালামের যে মর্যাদা ও মান, ঠিক তেমন মর্যাদা ও মানের একটি সুরা তৈরি করে পেশ করুক। তাদের জাতির একজন ব্যক্তি যদি তাদের কথা মতো কোনো বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিক পটভূমি ছাড়াই এমনটি করতে পারে, তবে তাদেরও এতে কোনো অসুবিধা হওয়া উচিত নয়।
খোদাতায়ালার এই কিতাব এখনও আমাদের কাছে বিদ্যমান। এর ওপর কমবেশি চৌদ্দ শতাব্দী অতিবাহিত হয়েছে। এই সময়ের মাঝে দুনিয়া কী থেকে কী হয়েছে। আদম সন্তান তত্ত্ব ও চিন্তার কত প্রতিমা গড়েছে এবং আবার নিজেই ভেঙেছে। মানুষ ও মহাজগত সম্পর্কে মানুষের ধ্যান-ধারণায় কত পরিবর্তন এসেছে এবং সে গ্রহণ ও বর্জনের কত ধাপ অতিক্রম করেছে। মানুষ কত কত পথ পাড়ি দিয়েছে এবং পরিশেষে কোথায় পৌঁছেছে, কিন্তু এই কিতাব — যাতে এমন অনেক বিষয়ও বর্ণিত হয়েছে, যা এই গত শতাব্দীতে জ্ঞান ও গবেষণার বিশেষ বিষয়বস্তু ছিল — দুনিয়ার সমগ্র সাহিত্যে এই মুহূর্তে কুরআনই একমাত্র গ্রন্থ, যা আজও ঠিক তেমনি অনঢ় ও অটল, যেমনটি ছিল আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে। জ্ঞান ও বুদ্ধি কুরআনের সামনে ঐ সময় যেভাবে অক্ষমতা স্বীকারে বাধ্য ছিল, আজও ঠিক তেমনটি-ই আছে। কুরআনের প্রতিটি বর্ণনা আজও পূর্ণ মর্যাদার সাথে নিজের স্থানে প্রতিষ্ঠিত। দুনিয়া তার বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সত্ত্বেও কুরআনে কোনো সংশোধন ও পরিবর্তনের কোনো অবকাশ তৈরি করতে পারেনি।
৪. আল্লাহতায়ালা নবীদেরকে এমন কিছু বিষয়ে অবহিত করেন, যা জানা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এর একটি উদাহরণ ওহির মাধ্যমে প্রাপ্ত ভবিষ্যদ্বাণীসমূহ, যেগুলো বিস্ময়করভাবে পুরোপুরি সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু কুরআনে রয়েছে এবং কিছুর কথা রেওয়ায়েত তথা হাদিসের বর্ণনায় এসেছে। আরব ভূখণ্ডে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিজয়, মক্কা বিজয় এবং মানুষের দলে দলে আল্লাহর ধর্মে প্রবেশের ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে কুরআনের প্রতিটি শিক্ষার্থীই অবগত। ইরানিদের কাছে পরাজিত হওয়ার পর রোমানদের পুনরায় বিজয়ী হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণীটিও ছিল এমনই অনন্য সাধারণ।
এই ভবিষ্যদ্বাণী যখন করা হয়েছিল, তখন ‘রোমান সাম্রাজ্যের পতন’ [The Decline and Fall of the Roman Empire]-এর লেখক এডওয়ার্ড গিবন-এর ভাষায়: “এই আগাম সংবাদের বাস্তবায়ন অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছিল, কেননা হেরাক্লিয়াসের প্রথম বারো বছর রোমান সাম্রাজ্যের সমাপ্তির ঘোষণা দিচ্ছিল।” কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণী ঠিক নিজের সময়ে পূর্ণ হয় এবং ৬২৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে রোমান শাসক এমন শান-শওকতের সাথে কনস্টান্টিনোপলে ফিরে আসলেন যে, তার রথ চারটি হাতি টানছিল এবং অসংখ্য মানুষ রাজধানীর বাইরে চেরাগ ও জলপাইয়ের শাখা হাতে নিজেদের বীরকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য উপস্থিত ছিল।
৫. নবীদের মধ্যে যারা রাসুলের মসনদে অধিষ্ঠিত হন, তারা খোদার আদালত হয়ে আসেন এবং নিজের জাতির ফয়সালা করে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। এটার ধরন এমন যে, আল্লাহর এই রাসুলগণ যখন নিজেদের প্রতিপালকের অঙ্গীকারের ওপর কায়েম থাকেন, তখন তার পুরস্কার এবং যদি বিচ্যুতি ঘটান, তবে তার সাজা তারা দুনিয়াতেই পেয়ে যান। এর ফল এই দাঁড়ায় যে, তাদের অস্তিত্ব মানুষের জন্য একটি খোদায়ি নিদর্শনে পরিণত হয় এবং তারা যেন খোদাকে তাদের সাথে জমিনে চলাফেরা করতে এবং বিচার করতে দেখে। এটাই মূলত সে বিষয়, যা তাদের জাতিগুলোর জন্য দুনিয়া ও আখিরাত — উভয় জগতে খোদায়ি ফয়সালার ভিত্তিতে পরিণত হয়। ফলশ্রুতিতে, আল্লাহতায়ালা এই রাসুলদের বিজয় দান করেন এবং তাদের দাওয়াত অস্বীকারকারীদের ওপর নিজের আজাব নাজিল করেন।
এই নবীদের ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশ হলো, তাদের আনুগত্য করা হবে। আল্লাহতায়ালা এই কথা নিজের কিতাবে নিজেই স্পষ্ট করেছেন যে, নবী কেবল ভক্তির কেন্দ্র নন, বরং আনুগত্যেরও কেন্দ্র। তিনি এজন্য আসেন না যে, মানুষ তাকে নবী ও রাসুল হিসেবে মেনে নিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করবে। তার মর্যাদা কেবল একজন উপদেশ প্রদানকারী ও নসিহতকারীর নয়, বরং তার মর্যাদা একজন হেদায়েতকারীর, যার আনুগত্য করা আবশ্যক। তার আগমনের উদ্দেশ্যই এটা যে, জীবনের সমস্ত বিষয়ে তিনি যে হেদায়েত দেন, তা বিনা প্রশ্নে পালন করা হবে। আবার এই আনুগত্য কোনো আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়। কুরআনের দাবি হচ্ছে, এই আনুগত্য হতে হবে অনুসরণের আবেগ, পূর্ণ ইখলাস, পূর্ণ মহব্বত এবং চরম ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে।
আসমানি কিতাবসমূহের ওপর ইমান
মানুষের হেদায়েতের জন্য যেভাবে নবী পাঠানো হয়েছে, ঠিক সেভাবেই আল্লাহতায়ালা তাদের সঙ্গে নিজের কিতাবগুলোও নাজিল করেছেন। এই কিতাবগুলো এ জন্য নাজিল করা হয়েছে যে, খোদাতায়ালার হেদায়েত লিখিত আকারে এবং তাঁরই শব্দে মানুষের কাছে বিদ্যমান থাকে — যেন এই কিতাবগুলো হক ও বাতিল পার্থক্য নির্ণয়ে ‘মিজান’ (মানদণ্ড) হিসেবে গণ্য হয়; মানুষ এর মাধ্যমে নিজেদের মতপার্থক্যের ফয়সালা করতে পারে এবং এভাবে ধর্মের ব্যাপারে যথার্থ ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
বর্তমানে যে সহিফাসমূহ বাইবেল নামে বিদ্যমান, তা থেকে আপাতদৃষ্টিতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, এই কিতাবগুলো কোনো না কোনোভাবে সকল নবীকে দেওয়া হয়েছিল। কুরআন যেভাবে তাওরাত ও ইঞ্জিলের উল্লেখ করে, একইভাবে সহিফা-এ-ইব্রাহিমের কথাও উল্লেখ করে। এগুলো সবই খোদাতায়ালার কিতাব। অতএব, কোনো প্রকার পার্থক্য ছাড়াই কুরআন সাধারণভাবে এগুলোর ওপর ইমানের দাবি করে।
এই কিতাবগুলোর মধ্যে চারটি কিতাব অনন্য সাধারণ গুরুত্বের অধিকারী — তাওরাত, যাবুর, ইনজিল এবং কুরআন। তাওরাত মুসা (আলাইহিস সালাম), যাবুর দাউদ (আলাইহিস সালাম) এবং ইনজিল মসিহ (আলাইহিস সালাম)-এর ওপর নাজিল করা হয়েছে। কুরআন খোদার শেষ নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর নাজিল হয়েছে। দুনিয়ার ঐশী সাহিত্যের মধ্যে এখন একমাত্র এই কিতাবটি-ই আছে, যার ব্যাপারে এই কথা পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে বলা যায় যে, এটা যেভাবে দেওয়া হয়েছিল, কোনো সামান্য পরিবর্তন ছাড়াই ঠিক সেভাবে, সেই ভাষায় এবং সেই ক্রম অনুযায়ী আজও আমাদের কাছে বিদ্যমান।
প্রতিফল দিবসের ওপর ইমান
ধর্ম যে হাকিকতগুলো মানার দাবি করে, সেগুলোর মধ্যে প্রতিফল দিবসের বিষয়টি অনন্য সাধারণ। নবী (আলাইহিমুস সালাম)-দের দাওয়াতে এটাকে মৌলিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সমস্ত শরিয়ত, নেকি এবং কল্যাণের ভিত্তি এই আকিদাই। নবুয়ত ও রিসালাতের ভিত্তিও এটার ওপর প্রতিষ্ঠিত। নবী এজন্যই নবী যে, তিনি এই ‘নবা-এ-আজিম’ তথা মহাসংবাদের খবর দেন। রাসুল এজন্যই রাসুল যে, তিনি এটার পয়গাম নিয়ে আসেন। কুরআন এই প্রতিফল দিবসের-ই সতর্কবাণী ও সুসংবাদের একটি কিতাব। কুরআন মানুষকে জানায় যে, যেভাবে তোমরা ঘুমিয়ে উঠে পড়; যেভাবে মৃত জমিনে পানি বর্ষিত হয় এবং তা চোখের সামনে জীবিত হয়ে ওঠে; যেভাবে তোমরা কিছুই ছিলে না, অথচ এক ফোঁটা পানি থেকে জীবন্ত-জাগ্রত মানুষে পরিণত হয়েছ — ঠিক সেভাবেই তোমাদেরকে একদিন কবর থেকে উঠিয়ে জীবিত করা হবে। এটা করতে তোমাদের প্রতিপালকের সামান্যতম কষ্টও হবে না। কুরআনের শ্রোতারা এটাকে অসম্ভভ মনে করত এবং বলত — এই পচা-গলা, জীর্ণ হাড়গুলোকে কে জীবিত করবে? তখন খোদাতায়ালা জবাব দেন — তিনিই (জীবিত করবেন), যিনি প্রথমবার এগুলো সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর জন্য এটা ঠিক ততটাই সহজ, যতটা সহজ একটি শব্দ বলা।
প্রতিফল দিবসের শাওয়াহিদ (প্রমাণাদি), আলামত এবং আহওয়াল (ঘটনাপ্রবাহ) ও মাকামাত (স্থানসমূহ) খুবই স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
শাওয়াহিদ (প্রমাণাদি)
প্রথম বিষয় হলো, মানুষের ভিতর ভালো-মন্দের অনুভূতি বা চেতনা। এই চেতনার কারণেই তার বিবেকের মধ্যে একজন পাহারাদার প্রতি মুহূর্তে তার মন্দ কাজের ব্যাপারে তাকে সতর্ক করতে থাকে। এটা ছোট একটি আদালত, যা মানুষের ভিতর প্রতিষ্ঠিত এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের ব্যাপারে নিরপেক্ষ ফয়সালা শোনায়। মানুষ এই ফয়সালা মানুক বা না মানুক, সে চিন্তা ও ভাবনা এবং জ্ঞান ও কর্মের প্রতিটি বিচ্যুতি বা হোঁচট খাওয়ার পর এটা অবশ্যই শুনতে পায়, যতক্ষণ না তার প্রবৃত্তির তাড়না এতটাই বেড়ে যায় যে, কর্মের কালো ছায়া তার হৃদয়কে আবৃত করে সেটাকে একদম অন্ধ ও বধির করে দেয়। এটা মানুষের ব্যাপারে তার অন্তরের সাক্ষ্য, যাকে ‘নফসে লাওয়ামা’-এর সাক্ষ্য হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কুরআন এটাকে পেশ করে এবং মানুষকে জানায় যে, তুমি কোনো লাগামহীন উট নও যে, যা ইচ্ছা করবে এবং তোমাকে কোনো জবাবদিহি করতে হবে না। তোমার জেনে রাখা উচিত যে, যেভাবে এই ‘কিয়ামতে সুগরা’ (ছোট কিয়ামত) স্বয়ং তোমার ভিতরেই কায়েম আছে, ঠিক তেমনি পুরো মহাবিশ্বের জন্যও একটি কিয়ামত অবশ্যই কায়েম হবে, যেখানে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সামনে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হবে এবং যা কিছু তোমরা করেছ, সে অনুযায়ী তোমাদের জন্য পুরস্কার ও শাস্তির ফয়সালা হবে। তোমরা যদি এটাকে না মানো, তবে তোমরা নিজেদেরই অস্বীকার করো এবং নিজের বিবেকের সাথে প্রতারণা করো।
দ্বিতীয় বিষয় হলো, মানুষের ফিতরাত এটাই যে, সে ইনসাফ চায় এবং জুলুমকে ঘৃণা করে। এতে সন্দেহ নেই যে, এরপরও সে জুলুম করে। কিন্তু এর কারণ এটা নয় যে, মানুষ জুলুম ও ইনসাফের মধ্যে পার্থক্য করতে অক্ষম কিংবা জুলুমকে ভালোবাসে, বরং এটার কারণ: সে আবেগ ও আকাঙ্ক্ষার দ্বারা পরাজিত হয়ে নিজের নফসের ভারসাম্য হারিয়েছে। আমাদের মধ্যে সকলেই জানে যে, মানুষ অন্যের ঘরে সিঁধ কাটে, কিন্তু কখনো চায় না যে, অন্য কেউ তার ঘরে সিঁধ কাটুক; অন্যকে হত্যা করে, কিন্তু কখনো পছন্দ করে না যে, কেউ তার বা তার আত্মীয়-স্বজনের প্রাণ কেড়ে নিক; অন্যের জন্য ওজনে কম দেয়, কিন্তু নিজের বেলায় কম নিতে কখনো রাজি হয় না। এই চোর, খুনি এবং ঠকবাজদের জিজ্ঞাসা করলে তারাও স্বীকার করবে যে, এগুলোর প্রতিটি অপরাধ এবং এগুলো বন্ধ হওয়া উচিত। অতএব, কোনো মানুষ সুস্থ মস্তিষ্কে এই কথায় একমত হতে পারে না যে, সৎ মানুষ আর অপরাধীকে সমান মনে করা হবে এবং উভয়ের সাথে একই আচরণ করা হবে। কুরআন এই বাস্তবতাগুলো সামনে রাখে এবং কিয়ামত অস্বীকারকারীদের জিজ্ঞাসা করে যে, আমরা কি অনুগত ও অপরাধীদের সমান বিবেচনা করবো? তোমাদের কী হয়েছে? তোমরা কেমন ফয়সালা করছ?
তৃতীয় বিষয় হলো, মানুষ এবং মহাবিশ্ব — উভয়ের অপূর্ণতা। এদেরকে যে দিক থেকেই দেখুন না কেন, স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয় যে, একদিকে এদের প্রতিটি অণু-পরমাণু থেকে এদের স্রষ্টার মহান কুদরত ও মহান হিকমত প্রকাশিত হচ্ছে। প্রতিটি জিনিসে থাকা গভীর অর্থবহতা, অতুলনীয় শৃঙ্খলা ও বিন্যাস, অনন্য গণিত ও জ্যামিতি, অসাধারণ আয়োজন এবং অফুরন্ত সৃজনশীল সৌন্দর্য — জ্ঞান ও বুদ্ধিকে স্তম্ভিত করে। অন্যদিকে, সামগ্রিকভাবে এই দুটোকে বোঝার চেষ্টা করলে চরম হতাশাজনক অপূর্ণতা ও লক্ষ্যহীনতা সামনে চলে আসে। এরপর দুটি পথই খোলা থাকে:
এক — অস্তিত্বের এই কারখানাকে অনর্থক সাব্যস্ত করে এই ফয়সালা করা যে, এটা কোনো খেয়ালি সত্তার খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়।
দুই — এটাকে প্রতিফল দিবস (রোজ-এ-জাজা) এবং আল্লাহর সেই চিরস্থায়ী বাদশাহির সাথে মিলিয়ে বোঝা, যার ঘোষণা নবীগণ (আলাইহিমুস সালাম) দিয়েছেন।
জ্ঞান ও বুদ্ধি-বিবেকের ফয়সালা কী? যা প্রতিটি মানুষই বুঝতে পারে।
চতুর্থ বিষয় হলো, আল্লাহর গুণাবলি, যাঁর নিদর্শন মহাবিশ্বের প্রতিটি কণাতে প্রকাশ্য। রবুবিয়াত (প্রতিপালন) এবং রহমতের গুণাবলি এক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। জগতের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে মানুষের লালনপালনের যে অসাধারণ ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা দেখার পর কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি কীভাবে এটা বিশ্বাস করতে পারে যে, তার খালিক (স্রষ্টা) তাকে জবাবদিহিহীন অবস্থায় ছেড়ে দেবেন? রহমান ও রহিম খোদাতায়ালার কাছে এই প্রত্যাশা কীভাবে করা যায় যে, যারা দুনিয়াকে জুলুম ও অন্যায়ের আখড়া বানিয়েছে, তিনি তাদের কোনো শাস্তি দেবেন না? কুরআন এই কারণে বারবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে যে, কিয়ামত আল্লাহতায়ালার রহমত, রবুবিয়াত এবং কুদরত ও হিকমতের দাবি। আল্লাহকে মানার পর কোনো ব্যক্তি এটাকে অস্বীকার করতে পারে না।
পঞ্চম বিষয় হলো, দুনিয়াতে আল্লাহর ‘দিনুনাত’ বা খোদায়ি আদালতের বহিঃপ্রকাশ। এই আদালত সেই সত্তাদের অস্তিত্বের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে, যাদেরকে নবীদের মধ্য থেকে রাসুলের মসনদে অধিষ্ঠিত করা হয়েছিল। আল্লাহতায়ালা তাদেরকে অসাধারণ মুজিজা দিয়েছেন, রুহুল কুদ্দুস (জিব্রাইল)-এর মাধ্যমে তাদেরকে সাহায্য করেছেন, অতঃপর কিয়ামতের আগে তাদের মাধ্যমে একটি ‘কিয়ামতে সুগরা’ (ছোট কিয়ামত) এই দুনিয়াতেই কায়েম করেছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল: আখিরাত বা পরকালের ধারণাকেও সেই মানদণ্ডে প্রমাণ করা, যে মানদণ্ডে বৈজ্ঞানিক সত্যসমূহ ল্যাবরেটরির (laboratory) পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়।
এতে এটা স্পষ্ট যে, আল্লাহর দরবারে পেশ করার মতো কোনো ওজর বা অজুহাত কারো কাছে অবশিষ্ট থাকতে পারে না। এর পদ্ধতি এমন ছিল যে, এই রাসুলগণ হকের দাওয়াত পেশ করেছেন, অতঃপর ঘোষণা করেছেন যে, তারা নিজ জাতির জন্য আল্লাহর আদালত হয়ে এসেছেন। ইমান ও আমলের ভিত্তিতে পুরস্কার ও শাস্তির যে সংবাদ দেওয়া হয়েছে, তা তাদের জাতির সাথে এই দুনিয়াতেই ঘটবে। প্রাকৃতিক নিয়ম যেভাবে অনঢ় এবং সব অবস্থায় বাস্তবায়িত হয়, আল্লাহর নৈতিক আইনও রাসুলদের পক্ষ থেকে ইতমামে হুজ্জাত বা অকাট্য প্রমাণ পেশ করার পর একইভাবে বাস্তবায়িত হবে। অতএব, রাসুলদের জাতির যেসব লোক তাদের দাওয়াত গ্রহণ করবে, তারা দুনিয়া ও আখিরাত — উভয় জগতেই মুক্তি পাবে এবং তাদের বিরোধীদের ওপর তারা বিজয় লাভ করবে। অন্যদিকে, যারা এই দাওয়াত কবুল করবে না, তারা লাঞ্ছিত হবে এবং তাদের ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসবে।
এই ভবিষ্যদ্বাণী যে সময়ে এবং যে জাতির মাঝে ঘোষিত হয়েছে, তখন এটার চেয়ে অসম্ভব ও অবিশ্বাস্য আর কিছুই ছিল না; কিন্তু এটা প্রতিবারই পূর্ণ হয়েছে এবং এমনভাবে পূর্ণ হয়েছে যে, মানুষ খোদাতায়ালাকে বিচার করতে দেখেছে এবং আকাশ ও পৃথিবী তাঁর মহিমায় পরিপূর্ণ হয়েছে।
কুরআন জানিয়েছে যে, শেষবার এই ‘দিনুনাত’ তথা খোদায়ি আদালত সপ্তম শতাব্দীতে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। মানব ইতিহাসের এই বিস্ময়কর ঘটনা এই কারণে অনন্য গুরুত্বের অধিকারী যে, এটা ইতিহাসের আলোতে সংঘটিত হয়েছে। ফলে এর খুঁটিনাটি পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষিত এবং এর সব পর্যায় যেন চোখের সামনে দৃশ্যমান — যা কোনো ব্যক্তি যখন ইচ্ছা, ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখে নিতে পারে।
আলামত
এই দিন কবে আসবে? কুরআন স্পষ্ট করেছে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তা জানে না। এর সময় কেবল তাঁর জ্ঞানভাণ্ডারেই রয়েছে এবং তিনি তাঁর কোনো নবী বা ফেরেশতাকেও এ বিষয়ে অবহিত করেন না। অবশ্য এর আলামত ও লক্ষণসমূহ কুরআন, হাদিস এবং প্রাচীন সহিফাসমূহে বর্ণিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু আলামত সাধারণ প্রকৃতির এবং কিছু আলামত নির্দিষ্ট ঘটনা ও দুর্ঘটনার ন্যায়। প্রথম প্রকারের আলামতের কিছুই কুরআনে বর্ণিত হয়নি। এগুলোর উল্লেখ হাদিসে এসেছে। দ্বিতীয় প্রকারের আলামতের মধ্য থেকে কেবল একটি বিষয় কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এবং তা হচ্ছে: ইয়াজুজ মাজুজের আত্মপ্রকাশ। অতএব, নিশ্চিত আলামত এটাই। এটা ছাড়া সাধারণভাবে যেসব আলামতের কথা বলা হয়, সেগুলোর কিছু প্রকাশ পেয়েছে এবং বাকিগুলো অবশ্যই প্রকাশ পাবে — যদি রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দিকে সেগুলোর সম্পর্ক করার ক্ষেত্রে কোনো ভুল না হয়ে থাকে।
আহওয়াল (ঘটনাপ্রবাহ)
কিয়ামত কীভাবে সংঘটিত হবে? এর বিস্তারিত বিবরণ কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে। আসমান ও জমিনে ওপর দিয়ে কী অতিবাহিত হবে, চন্দ্র-সূর্য ও গ্রহ-নক্ষত্রের কী দশা হবে, পৃথিবীতে বসবাসকারী সৃষ্টিজগত কী পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে এবং মানুষ কীভাবে কবর থেকে উঠে তাদের পালনকর্তার সামনে সমবেত হবে — কুরআনের বহু স্থানে তারই চিত্র তুলে চিত্রিত হয়েছে। জাহেলি যুগের সাহিত্য অধ্যয়ন থেকে জানা যায় যে, আরবদের রুচি উপমার চেয়ে চিত্রায়ণের দিকে বেশি ছিল। কুরআন এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছে এবং কিয়ামতের সতর্কবার্তার জন্য এর ভয়াবহতার এমন এক চিত্র এঁকেছে যে, তার পাঠক যেন সেটাকে নিজের চোখের সামনে সংঘটিত হতে দেখছে। এই চিত্রায়ণ থেকে ঘটনাপ্রবাহের যে ক্রমধারা সামনে আসে, তা হলো:
১. মানুষ পূর্ণ নিশ্চিয়তার সাথে তাদের কাজকর্ম চালিয়ে যাবে। তাদের কেউ পথে থাকবে, কেউ বাজারে, কেউ কোনো মজলিসে, আবার কেউ তার ঘরে। কারও কল্পনাতেও থাকবে না যে, বিশ্বব্যবস্থা তছনছ হতে চলেছে; তখনই হঠাৎ শিঙায় ফুঁৎকার দেওয়া হবে এবং কিয়ামতের কম্পন শুরু হবে। এর ফলে পৃথিবীর জনপদে যা কিছু ঘটবে, তার নকশা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আঁকা হয়েছে। এ থেকে জানা যায় যে, যখন একের পর এক ভূমিকম্পের ঝটকা আসবে এবং পৃথিবীর অবস্থা এমন এক নৌকার মতো হবে, যা ঢেউয়ের আঘাতে টালমাটাল করে, তখন মানুষের হৃদয় কাঁপতে থাকবে, দৃষ্টি হবে আতঙ্কিত এবং মানুষ এমন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য ও মাতাল হয়ে পড়বে যে, দেখে মনে হবে আল্লাহর আজাবের ভয়াবহতা সবাইকে পাগল করে দিয়েছে।
২. এটাই সেই সময়, যখন বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়তে শুরু করবে। পুরো মহাবিশ্বে এমন এক প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্প হবে, যার ফলে পাহাড়গুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে, সমুদ্রগুলো উথলে উঠবে এবং সমস্ত গ্যালাক্সি ও মহাজাগতিক বস্তু নিজ নিজ কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে একে অপরের ওপর আছড়ে পড়বে। চারদিকে এমন এক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, যা কল্পনা করা বা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। এই ধারা এমন এক সময় পর্যন্ত জারি থাকবে, যা কেবল আল্লাহই জানেন।
৩. এরপর সেই পর্যায় শুরু হবে, যাকে কুরআনে ‘সৃষ্টির পুনরুক্তি’ বা পুনরায় সৃষ্টি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ফলে এই বিশৃঙ্খলা থেকেই ধীরে ধীরে এক নতুন প্রাকৃতিক ব্যবস্থা অস্তিত্ব লাভ করবে। সমস্ত মহাজাগতিক বস্তু — পৃথিবী, সূর্য, চাঁদ, নক্ষত্র এবং কোটি কোটি তারা ও গ্রহের সমন্বয়ে গঠিত গ্যালাক্সিগুলো নতুন নিয়ম-কানুন অনুযায়ী এক নতুন জমিন ও নতুন আসমানে পরিবর্তিত হবে। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, এই পর্যায়ে আরও একবার শিঙায় ফুঁৎকার দেওয়া হবে, যার ফলে সমস্ত মানুষ জীবিত হয়ে উঠবে এবং নিজ নিজ কবর থেকে বেরিয়ে বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের আদালতে হাজির হওয়ার জন্য উপস্থিত হবে।
মাকামাত (স্থানসমূহ)
মানুষ এই দিনের হাজিরার জন্য যে সকল পর্যায় অতিক্রম করে এবং এরপর তাকে যেসকল স্থানে রাখা হবে, তার বিস্তারিতও কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। মানুষ ক্রমশ সেদিকেই এগিয়ে চলছে। এই সফরের প্রথম পর্যায় হলো মৃত্যু। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের পর এই পর্যায়টি প্রত্যেক মানুষের ওপর অবধারিতভাবে আসবে। মৃত্যু থেকে পালানোর কোনো পথ নেই। এটা সকালেও আসতে পারে, সন্ধ্যাতেও আসতে পারে; মানুষ তার জন্মের আগে কিংবা জন্মের সাথে সাথেই এর মুখোমুখি হতে পারে। শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্য — যেকোনো সময়ে এটা চলে আসে এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে বাধ্য হয়ে এর সামনে মাথা নত করতে হয়। কুরআনে মৃত্যুর হাকিকত এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, মানুষের আসল সত্তা — যাকে কুরআনে ‘নফস’ বলা হয়েছে এবং যা তার জৈবিক জীবনের বাইরে এক স্বতন্ত্র অস্তিত্ব — সেটাকে শরীর থেকে আলাদা করা হয়। এর জন্য এক বিশেষ ফেরেশতা নিযুক্ত আছেন, যার অধীনে ফেরেশতাদের একটি পুরো কর্মীবাহিনী আছে। তিনি এসে নিয়মমাফিক প্রাণকে ঠিক সেভাবেই গ্রহণ করে, যেভাবে একজন সরকারি আমানতদার কোনো বস্তুকে নিজের দখলে নেন।
এই সময়ে মানুষের সাথে যে আচরণ করা হয়, তার উল্লেখও কুরআনে রয়েছে। নবী (আলাইহিমুস সালাম)-দের পক্ষ থেকে ইতমামে হুজ্জাত তথা সত্য অকাট্যভাবে পৌঁছে দেওয়ার পর, তাদের অস্বীকারকারীদের রুহ ফেরেশতারা প্রহার করতে করতে কবজ করেন এবং মৃত্যুর সময়ই জানিয়ে দেন যে, তাদের কৃতকর্মের কারণে এখন তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আজাব। অন্যদিকে, যারা রাসুলদের ওপর ইমান আনে এবং কুফর, শিরক ও জুলুম-অন্যায়ের যাবতীয় কলুষতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র থাকে, ফেরেশতারা তাদের সালাম দেন এবং জান্নাতের সুসংবাদ দান করেন।
এরপরের স্থানগুলোকে বারযাখ, হাশরের ময়দান, দোজখ এবং জান্নাত হিসেবে অভিহিত করা হয়।
[বারযাখ]
বারযাখ বলতে সেই অন্তর্বর্তীকালীন সীমাকে বোঝায়, যেখানে মৃতরা কিয়ামত পর্যন্ত অবস্থান করবে। রেওয়ায়েত বা হাদিসে ‘কবর’ শব্দটি রূপক অর্থে এই জগতের জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে। এতে মানুষ জীবিত থাকবে, কিন্তু এই জীবন হবে দেহহীন। আর রুহের চেতনা, অনুভূতি এবং পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার ধরন অনেকটা সে রকম হবে, যেমনটা স্বপ্নের অবস্থায় হয়। কুরআন থেকে জানা যায় যে, যাদের বিষয়টি সম্পূর্ণ স্পষ্ট হবে — চাই তারা আনুগত্যের চূড়ান্ত মানদণ্ডে সত্যের প্রতি তাদের দায়িত্ব পুরোপুরি আদায়কারী হোক অথবা অবাধ্যতা ও অহংকারের সাথে সত্য প্রত্যাখ্যানকারী পাপিষ্ঠ হোক — তাদের জন্য এক ধরনের আজাব ও সওয়াব এই জগত থেকেই শুরু হয়ে যাবে। এর কারণ, তাদের কাছ থেকে হিসাব নেওয়া বা তাদের ভালো-মন্দের ফয়সালা করার প্রয়োজন হবে না।
[হাশরের ময়দান]
এরপরের স্থান হলো হাশরের ময়দান। দ্বিতীয়বার শিঙায় ফুঁৎকার দেওয়ার পর সমস্ত মানুষ সেখানে জীবিত হয়ে উঠে দাঁড়াবে। এই জীবন রুহ ও দেহ উভয়ের সমন্বয়ে হবে। কুরআন এটাকে ‘দ্বিতীয়বারের জীবন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এতে মানুষের দুনিয়াবি শরীরকে এমন এক শরীরে রূপান্তরিত করা হবে, যা আল্লাহর চিরস্থায়ী রাজত্বে নিয়ামত বা শাস্তির যেকোন অবস্থায় থাকার উপযোগী হবে; কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব ঠিক তা-ই থাকবে, যা নিয়ে সে আজ জীবিত আছে।
সেদিন সমগ্র মানবজাতিকে তিনটি দলে ভাগ করা হবে:
প্রথমত, সত্যের পথে অগ্রগামী দল;
দ্বিতীয়ত, সাধারণ নেককার বান্দা, যাদের আমলনামা তাদের ডান হাতে দেওয়া হবে;
তৃতীয়ত, সেই অপরাধী দল, যাদের হাত বাঁধা থাকবে এবং পিছন থেকে তাদের আমলনামা তাদের বাম হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে।
এটাই সেই সময়, যখন হিসাব গ্রহণ করা হবে এবং সত্যকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণের জন্য সাক্ষী পেশ করা হবে। নবী (আলাইহিমুস সালাম)-দেরও সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকা হবে। মানুষের জিহ্বা, হাত, পা, কান, চোখ এমনকি দেহের লোম পর্যন্ত সাক্ষ্য দেবে। এরপর ফয়সালা শোনানো হবে এবং মানুষকে দোজখ ও জান্নাতে পাঠানো হবে।
[দোজখ]
দোজখ সম্পর্কে কুরআনের বর্ণনা হলো, এটা নিকৃষ্টতম আবাসস্থল। এতে আগুনের আজাব হবে। এই আগুন মুখমণ্ডল ঝলসে দেবে, চেহারা বিকৃত করবে, চামড়া তুলে ফেলবে এবং হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। অপরাধীদের গলায় থাকবে বেড়ি এবং পায়ে থাকবে জিঞ্জির; প্রতিটি বিষয় আক্ষেপে পরিণত হবে। সবচাইতে বড় বিষয় হলো, মানুষ সেখানে আল্লাহতায়ালার দিদার তথা দর্শন ও তাঁর রহমতের দৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হবে; তিনি এদের মধ্যে কিছু অপরাধীর দিকে তাকানোও পছন্দ করবেন না।
[জান্নাত]
এর বিপরীতে জান্নাত হলো নেককারদের আবাসস্থল। এর প্রশস্ততা পুরো মহাবিশ্বের সমান। এটা চিরস্থায়ী সুখের জায়গা, যেখানে জীবনের সাথে মৃত্যু, আনন্দের সাথে বেদনা, খুশির সাথে দুঃখ, প্রশান্তির সাথে অস্থিরতা, আরামের সাথে যন্ত্রণা এবং নিয়ামতের সাথে শাস্তির কোনো কল্পনাও নেই। এর আরাম চিরস্থায়ী, এর স্বাদ অন্তহীন, এর রাত-দিন চিরন্তন, এর নিরাপত্তা শাশ্বত, এর আনন্দ অক্ষয়, এর সৌন্দর্য চিরযৌবনা এবং এর পূর্ণতা অসীম। আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দাদের জন্য সেখানে এমন সব কিছু প্রস্তুত রেখেছেন, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের হৃদয়ে কখনও তার কল্পনাও আসেনি।
