আল-ইসলাম

অধ্যায় 12

৫. দাওয়াতের বিধি-বিধান

জাভেদ আহমেদ গামিদি

ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হচ্ছে — যারা এই পৃথিবীতে সত্যকে গ্রহণ করবে, তারা তা গ্রহণের পর অন্যদেরও নিয়মিত সেই সত্যের উপদেশ ও নসিহত প্রদান করবে। ধর্মের এই দাবিটি সাধারণত ‘দাওয়াত ও তাবলিগ’ পরিভাষা দ্বারা প্রকাশ করা হয়। কুরআনে এর যে বিধি-বিধান বর্ণিত হয়েছে, তাতে ইমানদারদের বিভিন্ন মর্যাদা ও অবস্থানের আলোকে দাওয়াতের দায়িত্ব তাদের ওপর আলাদা আলাদাভাবে অর্পণ করা হয়েছে।

বিষয়টিকে আমরা নিম্নোক্ত শিরোনামগুলোর অধীনে বর্ণনা করতে পারি:

নবীদের দাওয়াত

আল্লাহতায়ালার যে সকল নবী পৃথিবীতে এসেছেন, তারা আল্লাহর দিকে দাওয়াত এবং ইনজার ও বাশারাত (সতর্কবাণী ও সুসংবাদ) প্রদানের জন্যই এসেছেন। নবীদের সতর্কবাণী ও সুসংবাদ দেওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যার প্রয়োজন রাখে না; তবে নবীদের মধ্য থেকে আল্লাহতায়ালা যাদেরকে ‘রিসালাত’-এর উচ্চমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন, তাদের সম্পর্কে কুরআন জানিয়েছে যে, তারা এই সতর্কবাণীকে তাদের জাতির সামনে ‘শাহাদাত’-এর পর্যায়ে পৌঁছে দিতে আদিষ্ট ছিলেন। কুরআনের পরিভাষায় ‘শাহাদাত’-এর অর্থ — সত্যকে মানুষের সামনে এমনভাবে স্পষ্ট করা যে, যাতে এরপর কারও জন্য সত্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার কোনো সুযোগ না থাকে। এর পদ্ধতি হচ্ছে, আল্লাহ এই রাসুলদেরকে তাঁর আদালত প্রকাশের জন্য মনোনীত করেন এবং কিয়ামতের আগে একটি ‘ছোট কিয়ামত’ (কিয়ামতে সুগরা) তাদের মাধ্যমে এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করেন। রাসুলদের জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তারা যদি আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকারে অটল থাকে, তবে এর জন্য পুরস্কার এবং তা থেকে বিচ্যুত হলে এর শাস্তি তারা দুনিয়াতেই পাবেন। এর ফলে রাসুলদের অস্তিত্ব মানুষের জন্য আল্লাহর একটি নিদর্শনে পরিণত হয় এবং মানুষ যেন আল্লাহকে রাসুলদের সাথে জমিনে চলাফেরা করতে এবং বিচার করতে দেখছে। এর সাথে তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়, যে সত্য তারা স্বচক্ষে দেখছেন, তা প্রচার করতে এবং আল্লাহর হেদায়াত কোনো প্রকার কমবেশি না করে পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে। এটাই হলো ‘শাহাদাত’। রাসুলদের দাওয়াতে ইনজার (সতর্কবাণী), ইনজারে আম (সাধারণ সতর্কবাণী), ইতমামে হুজ্জাত (চূড়ান্ত দলিল-প্রমাণ পেশ) এবং হিজরত ও বারাআত (সম্পর্কচ্ছেদ)-এর পর্যায়গুলো অতিক্রম করে যখন এই ‘শাহাদাত’ প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থানে খোদায়ি ফয়সালার ভিত্তিতে পরিণত হয়। ফলে আল্লাহ এই রাসুলদের বিজয় দান করেন এবং তাদের দাওয়াত অস্বীকারকারীদের ওপর এই দুনিয়াতেই নিজের আজাব নাজিল করেন।

ইব্রাহিমের বংশধরদের দাওয়াত

এই দাওয়াত মূলত সেই ‘শাহাদাত’, যার উল্লেখ উপরে হয়েছে। কুরআন জানিয়েছে যে, ইব্রাহিমের বংশধরদেরও আল্লাহ এই শাহাদাতের জন্য একইভাবে মনোনীত করেছেন এবং এর দাবি পূরণের জন্য সংগ্রামের নির্দেশ দিয়েছেন; ঠিক যেভাবে তিনি আদম সন্তানদের মধ্য থেকে কিছু মহান ব্যক্তিত্বকে নবুয়ত ও রিসালাতের জন্য মনোনীত করেন।

ইব্রাহিমের বংশধরদের এই মর্যাদার কারণে তারা যদি সত্যের ওপর অটল থাকে এবং তা কোনো প্রকার কমবেশি না করে পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে পৃথিবীর সব জাতির কাছে পৌঁছে দেয় — তবে অমান্যকারীদের মুকাবিলায় আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দান করেন; আর তারা যদি সত্য থেকে বিচ্যুত হয়, তবে অমান্যকারীদের মাধ্যমে তাদেরকে অপমান ও পরাধীনতার আজাবে পতিত করেন।

আলেমদের দাওয়াত

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরে সতর্ক করার এই দায়িত্ব এই উম্মতের আলেমদের নিকট স্থানান্তরিত হয়েছে। আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন যে, মুসলমানদের প্রতিটি দল থেকে যেন কিছু লোক বেরিয়ে আসে, ধর্মের জ্ঞান অর্জন করে এবং নিজের জাতির জন্য সতর্ককারী হয়ে তাদেরকে আখিরাতের আজাব থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে।

কুরআন থেকে জানা যায় যে, দাওয়াতের এই পদ্ধতিতে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই লক্ষ্য রাখা উচিত:

প্রথমত — এই কাজে যারা অগ্রসর হবেন, তারা যে সত্য নিয়ে দাঁড়াবেন, সেটার ব্যাপারে তাদের নিজেদের ইমান সুদৃঢ় হতে হবে। তারা যে কথা মানুষের সামনে পেশ করবেন, সে বিষয়ে তাদের নিজেদের মন-মস্তিষ্ক এমনভাবে সন্তুষ্ট হতে হবে, যেন তারা অনুভব করেন যে — এটা তাদের অন্তরের বাণী এবং আত্মার আওয়াজ, যা তাদের জবান দিয়ে বের হচ্ছে। তারা নিজেদের পুরো সত্তাকে প্রতিপালকের কাছে সঁপে দিয়ে এই ময়দানে নামবেন এবং মানুষকে যে বিষয়ে ডাকবেন, সে বিষয়ে সর্বপ্রথম নিজেরা ঘোষণা করবে — তারা পূর্ণ অন্তর ও পূর্ণ প্রাণ দিয়ে তা বিশ্বাস করেন।

দ্বিতীয়ত — তাদের কথা ও কাজে কোনো দিক থেকে যেন বৈপরীত্য না থাকে। তারা যে জিনিসের পতাকাবাহী হয়ে দাঁড়াবেন, সবার আগে নিজেরা তা গ্রহণ করবেন এবং যে সত্যের দিকে মানুষকে ডাকবেন, তাদের নিজেদের কাজও যেন তারই সাক্ষ্য দেয়।

তৃতীয়ত — তারা সত্যের বিষয়ে কোনো প্রকার আপস করবেন না। ধর্মের ছোট থেকে ছোট সত্যও যখন তাদের সামনে স্পষ্ট হবে, তারা তা মন থেকে গ্রহণ করবেন, জবান দিয়ে তার সাক্ষ্য দেবেন এবং নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া না করে তা হুবহু দুনিয়ার সামনে পেশ করবেন।

চতুর্থত — তাদের সতর্ক করার মাধ্যম হবে কুরআন মাজিদ। আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে কুরআন এই নির্দেশই দিয়েছে এবং এটার ভিত্তিতেই তিনি পুরো দুনিয়ার জন্য ‘সতর্ককারী’। আলেমগণ মূলত তার এই সতর্কবাণীই মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।

রাষ্ট্রীয় দাওয়াত

মুসলমানরা যদি কোনো ভূখণ্ডে রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন অর্জন করে, তবে তাদের দায়িত্ব হলো — নিজেদের মধ্য থেকে কিছু লোককে এই কাজে নিযুক্ত করা, যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে ডাকবে, মন্দ কাজে বাধা দেবে এবং ভালো কাজের উপদেশ দেবে। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এই ফরজ কাজ মুসলমানদের আরবাব-এ-হাল ও আকদ (রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল বা শাসনকর্তা)-দের ওপর বর্তায়। তাদের জন্য আবশ্যক হচ্ছে: রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যান্য স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তারা অবশ্যই এই দায়িত্ব পালন করবেন।

ব্যক্তির দাওয়াত

ব্যক্তির দাওয়াত হলো — নিজ পরিবেশ এবং নিজ কার্যপরিধিতে একে অপরকে ভালো কাজের উপদেশ দেওয়া এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। দাওয়াতের এই নিয়মে আহ্বানকারী এবং যাকে আহ্বান করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য। বরং প্রতিটি মানুষ একই সাথে উপদেশ দানকারী এবং উপদেশ গ্রহণকারী। এই ফরজ বাবার জন্য ছেলের প্রতি এবং ছেলের জন্য বাবার প্রতি; স্ত্রীর জন্য স্বামীর প্রতি এবং স্বামীর জন্য স্ত্রীর প্রতি; ভাইয়ের জন্য বোনের প্রতি এবং বোনের জন্য ভাইয়ের প্রতি; বন্ধুর জন্য বন্ধুর প্রতি এবং প্রতিবেশীর জন্য প্রতিবেশীর প্রতি — সহজ কথায়, প্রত্যেক মানুষকে তার পরিচিত বা কাছের মানুষদের কাছে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। সে যেখানে দেখবে যে, তার পরিচিত কেউ সত্যবিরোধী কোনো পথ অবলম্বন করেছে, তার উচিত নিজের জ্ঞান ও যোগ্যতা অনুযায়ী তাকে সঠিক পথ অনুসরণের নসিহত করা। এমন হতে পারে যে, সকালে আমরা কাউকে ভালো কাজের উৎসাহ দিচ্ছি, আর সন্ধ্যায় সে আমাদের ক্ষেত্রেও এই কাজ করছে। আজ আমরা কাউকে কোনো সত্য পৌঁছে দিচ্ছি, আর আগামীকাল সে আমাদেরকে সেই [ভালোকাজের] উপদেশ দিচ্ছে। মোটকথা, যখনই সুযোগ হবে, প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নিজের কর্মক্ষেত্রে এই কাজ অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়া। 

দাওয়াতের কৌশল

দাওয়াতের এই কৌশল দাওয়াতের প্রতিটি পর্যায়ের সাথে সংশ্লিষ্ট। কুরআন এটাকে একটি মূলনীতি হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা নিচের তিনটি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত:

প্রথমত — দাওয়াত সব সময় প্রজ্ঞা (হিকমত), উত্তম উপদেশ এবং সুন্দর বিতর্কের পদ্ধতিতে পেশ করতে হবে। ‘প্রজ্ঞা’ (হিকমত)-এর অর্থ: যুক্তি ও প্রমাণ এবং ‘উত্তম উপদেশ’-এর মানে: দরদভরা নসিহত ও স্মরণ করিয়ে দেওয়া। উদ্দেশ্য হচ্ছে — যিনি দাওয়াত দেবেন, তিনি যা-ই বলবেন, তা যুক্তি-প্রমাণ এবং জ্ঞান ও বুদ্ধি-বিবেকের আলোকে বলবেন; তার বলার ভঙ্গি আক্রমণাত্মক বা ধমক দেওয়ার মতো হবে না, বরং হবে শুভাকাঙ্ক্ষী এবং স্নেহ ও মমতার সাথে মনোযোগ আকর্ষণ করার মতো। এমনকি যদি আলোচনা ও বিতর্কের প্রয়োজনও পড়ে, তবে যেন পছন্দনীয় ও মার্জিত পথ বেছে নেওয়া হয়; আর এর জবাবে প্রতিপক্ষ যদি উস্কানি দেয়, তবে ‘ইটের বদলে পাটকেল’ না মেরে সত্যের আহ্বানকারী যেন সব সময় ভদ্র ও মার্জিত থাকেন।

দ্বিতীয়ত — দাওয়াত প্রদানকারীর দায়িত্ব শুধু দাওয়াত পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ কথা পৌঁছে দেওয়া, সত্যকে সব দিক থেকে স্পষ্ট করা এবং উৎসাহ ও উপদেশ দানে নিজের পক্ষ থেকে কোনো ত্রুটি না রাখা। তিনি যদি এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন, তবে তিনি তার দায়িত্ব থেকে মুক্ত হলেন। মানুষের হেদায়েত বা গোমরাহির বিষয়টি আল্লাহ তাঁর নিজের হাতে রেখেছেন। তিনি তাদেরও চেনেন, যারা পথভ্রষ্ট এবং তাদেরও জানেন, যারা হেদায়েতপ্রাপ্ত। অতএব, প্রত্যেকের সাথে তিনি সেই আচরণ করবেন, যার যোগ্য তারা। দাওয়াত প্রদানকারীর উচিত নয় মানুষের ব্যাপারে ‘দারোগা’ হওয়া বা তার শ্রোতাদের জন্য জান্নাত ও জাহান্নামের ফয়সালা করা। এসব বিষয় আল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট। সত্যের দাওয়াত প্রদানকারীর দায়িত্ব শুধু পৌঁছে দেওয়া; তার উচিত নিজের এই সীমানা কখনো অতিক্রম না করা।

তৃতীয়ত — দাওয়াতের শ্রোতারা যদি জুলুম-অত্যাচার এবং কষ্ট দেওয়ায় উদ্যত হয়, তবে দাওয়াত প্রদানকারীর নৈতিক সীমার মধ্যে থেকে ঠিক ততটুকু প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার আছে, যতটুকু কষ্ট তাকে দেওয়া হয়েছে; কিন্তু আল্লাহর কাছে ধৈর্য ধরাই পছন্দনীয়। এই ধৈর্যের অর্থ হচ্ছে: সত্যের আহ্বানকারী সব কষ্ট সহ্য করবেন, কিন্তু না প্রতিশোধের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেবেন, না বিপদ-আপদে ঘাবড়ে গিয়ে নিজের অবস্থানে পরিবর্তন আনবেন। এই পরিস্থিতিতে ধৈর্যশীলদের জন্য বড় পুরস্কারের ওয়াদা করা হয়েছে। এর প্রতিফল দুনিয়াতেও তাদের জন্য সর্বোত্তম হবে এবং খোদাতায়ালা চাইলে কিয়ামতেও তারা এর শ্রেষ্ঠ প্রতিদান দেখতে পাবেন।

GCIL Bangla

Visit us

Suite 230, 3620 N Josey Ln,

Carrollton, Dallas, TX 75007

Contact us via email

info@almawridus.org

Copyright 2025, Ghamidi Center of Islamic Learning. All Rights Reserved. GCIL is an initiative of Al-Mawrid U.S. A 501(c)(3) tax-exempt organization in the U.S. Federal EIN: 46-5099190.