ধর্মের উৎস
ধর্ম হচ্ছে আল্লাহতায়ালার হেদায়েত, যা তিনি প্রথমে মানুষের ফিতরাত তথা সহজাত প্রকৃতিতে ইলহাম করেছেন বা গেঁথে দিয়েছেন। এরপর তিনি এই হেদায়েতের যাবতীয় জরুরী বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ স্বীয় নবীগণের মাধ্যমে মানবজাতিকে দিয়েছেন। এই ধারাবাহিকতা তথা সিলসিলার শেষ নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। সুতরাং, ধর্মের একমাত্র উৎস এখন মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মহান ব্যক্তিসত্তা এবং সত্য ধর্ম এখন সেটাই, যেটাকে নবীজি নিজের কথা-কাজ এবং মৌনসম্মতি-অনুমোদনের[[1]] মাধ্যমে ধর্ম হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।
রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে এই ধর্ম তার সাহাবীদের ইজমা[[2]] এবং মৌখিক ও ব্যবহারিক তাওয়াতুরের[[3]] মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়েছে এবং দুটো পথ ধরে আমাদের কাছে পৌঁছেছে:
১। কুরআন মাজিদ
২। সুন্নাত
কুরআনের পরিচয়
কুরআন মাজিদ সেই কিতাব, যা আল্লাহতায়ালা তাঁর শেষ নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর নাজিল করেছেন এবং কুরআনের নাজিল হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এটা মুসলমানদের নিকট এই স্পষ্টতার সঙ্গে বিদ্যমান যে, এটাই সে কিতাব, যা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর নাজিল হয়েছিল এবং যেটাকে নবীর সাহাবিগণ তাদের ইজমা ও মৌখিক তাওয়াতুরের মাধ্যমে পূর্ণ সুরক্ষার সাথে সামান্যতম পরিবর্তন ছাড়াই দুনিয়ার কাছে স্থানান্তর করেছেন।
সুন্নাতের পরিচয়
সুন্নাত ইব্রাহিমি ধর্মের ঐ সকল ঐতিহ্য, যেগুলোকে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পুনরুজ্জীবিত করেছেন, সংস্কার[[4]] করেছেন; অতপর সেগুলোতে প্রয়োজনীয় সংযোজন আনার পর তার অনুসারীদের জন্য ধর্ম হিসেবে জারি করেছেন।
প্রামাণিকতার দিক থেকে সুন্নাত ও কুরআন মাজিদে কোনো পার্থক্য নেই। কুরআন যেভাবে সাহাবিদের ইজমা ও মৌখিক তাওয়াতুরের মাধ্যমে পাওয়া গেছে, সুন্নাতও ঠিক সেভাবে সাহাবিদের ইজমা ও ব্যবহারিক তাওয়াতুরের মাধ্যমে পাওয়া গেছে এবং কুরআনের মতোই প্রতিটি যুগে মুসলমানদের ইজমা দ্বারা সুন্নাত প্রমাণিত।
ধর্মের হাকিকত
এই ধর্মের হাকিকত যদি এক শব্দে বর্ণনা করা হয়, তবে কুরআনের পরিভাষায় তা হচ্ছে: আল্লাহর “ইবাদত”। এর অর্থ বিনয় ও নম্রতা। ইবাদত যদি আল্লাহতায়ালার সঠিক মারেফত তথা পরিচয়ের সাথে জন্ম নেয়, তবে তা পরম ভালোবাসা ও পরম ভয়ের সাথে আল্লাহর সামনে শেষ সীমা পর্যন্ত নিজেকে অবনত করার রূপ ধারণ করে। প্রকৃতপক্ষে, এটা মানুষের অন্তরের এক গভীর অনুভূতি। আল্লাহর জিকির, তাঁর শোকর, তাঁর অসন্তুষ্টির ভয়, তাঁর সাথে ইখলাস বজায় রাখা তথা একনিষ্ঠ হওয়া, তাঁর ওপর ভরসা করা এবং তাঁর দরবারে নিজেকে সমর্পন করা ও তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা — এগুলো এই অবস্থার অভ্যন্তরীণ প্রকাশ। মানুষের বাহ্যিক অস্তিত্বে এই জিনিসগুলো ইবাদতের প্রকাশ — অর্থাৎ রুকু ও সেজদা, তাসবিহ ও তাহমিদ (আল্লাহর পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা), দোয়া ও মোনাজাত এবং নজর ও নিয়াজ (মানত ও উৎসর্গের) সুরতে প্রকাশ পায়। মানুষ যেহেতু এই দুনিয়ায় নিজের একটি কর্মময় সত্তা রাখে, তাই এই বহিঃপ্রকাশ সামনে অগ্রসর হয়ে মানুষের সেই কর্মময় সত্তার সাথে সম্পৃক্ত হয় এবং ইবাদতের সাথে আনুগত্যও তখন ঐ সত্তায় শামিল হয়। এটা তখন মানুষের কাছে দাবি জানায় যে, জাহের ও বাতেন তথা প্রকাশ্য ও গোপন — উভয় অবস্থাতেই সে যেন আল্লাহর বান্দা হয়ে থাকে।
ধর্মের সংজ্ঞা
আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে আবদ ও মাবুদ তথা বান্দা ও প্রভুর এই সম্পর্কের জন্য এই ইবাদত যখন নিজের ভিত্তিমূল নির্ধারণ করে, রীতিনীতি স্থির করে এবং দুনিয়ায় এই সম্পর্কের দাবিসমূহ পূরণের জন্য সীমা ও বিধি-নিষেধ নির্ধারণ করে, তখন কুরআনের ভাষায় একে দ্বীন বা ধর্ম বলা হয়। ধর্মের যে রূপ আল্লাহতায়ালা তাঁর নবীদের মাধ্যমে মানুষের নিকট স্পষ্ট করেছেন, কুরআন সেটাকে “দ্বীনুল হক” বা সত্য ধর্ম বলে এবং এই সত্য ধর্মের ব্যাপারে কুরআন তাদেরকে হেদায়েত করে যে, তারা যেন এই সত্য ধর্মকে পরিপূর্ণ বিশুদ্ধতার সাথে মেনে চলে, নিজেদের জীবনে পূর্ণভাবে বহাল রাখে এবং এতে কোনো বিভেদ সৃষ্টি না করে।
ধর্মের বিষয়বস্তু
এই ইবাদতের জন্য ইমান ও আখলাকের যে ভিত্তিগুলো খোদাতায়ালার এই ধর্মে বর্ণিত হয়েছে, কুরআন সেগুলোকে ‘আল-হিকমা’ এবং এর রীতিনীতি ও সীমারেখাকে ‘আল-কিতাব’ বলে। ‘আল-কিতাব’-এর জন্য আরেকটি শব্দ “শরিয়ত”-ও রয়েছে। এর অর্থ সেটাই, যা আমরা ‘কানুন’ শব্দ দিয়ে প্রকাশ করি।
‘আল-হিকমা’ সর্বদা এক ও অভিন্ন, কিন্তু মানব সভ্যতার বিবর্তন ও পরিবর্তনের কারণে শরিয়তে অবশ্য অনেককিছু ভিন্নতর হয়েছে।
পূর্ববর্তী আসমানি সাহিত্য অধ্যয়ন করলে জানা যায় যে, তাওরাতে বেশিরভাগ শরিয়ত এবং ইনজিলে হিকমা বর্ণিত হয়েছে। যাবুর এই হিকমার মুখবন্ধ হিসেবে আল্লাহতায়ালার মহিমা কীর্তনের গীত এবং কুরআন এই উভয়ের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যকর্ম, সতর্কবাণী ও সুসংবাদ সংবলিত কিতাব হিসেবে নাজিল হয়েছে।
‘আল-হিকমা’ পরিভাষাটি যেসব বিষয়ের আলোচনার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে, তা মূলত দুইটি:
এক: ইমানিয়াত।
দুই: আখলাকিয়াত (নীতি ও নৈতিকতা)।
‘আল-কিতাব’-এর অধীনে যেসব বিষয় আলোচিত হয়েছে, সেগুলো হলো:
১। ইবাদতের বিধি-বিধান,
২। সামাজিক বিধি-বিধান,
৩। রাজনীতির বিধি-বিধান,
৪। অর্থনীতির বিধি-বিধান,
৫। দাওয়াতের বিধি-বিধান,
৬। জিহাদের বিধি-বিধান,
৭। হুদুদ ও তাজিরাত (দণ্ডবিধি),
৮। খাদ্য ও পানীয়,
৯। রসম-রেওয়াজ ও আদব-কায়দা,
১০। কসম এবং কসমের কাফফারা।
এগুলোই গোটা ধর্মের বিষয়বস্তু।
নবী ও রাসুল-এর সংজ্ঞা
আল্লাহতায়ালার যে বার্তাবাহকগণ এই ধর্ম নিয়ে এসেছেন, তাদেরকে নবী বলা হয়। কুরআন থেকে জানা যায় যে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ “নবুয়ত”-এর সাথে “রিসালাত”-এর মসনদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন।
“নবুয়ত” হচ্ছে: মানুষের মধ্য থেকে কোনো ব্যক্তি ওহি পেয়ে লোকদেরকে সত্য সম্পর্কে অবহিত করে এবং তার অনুসারীদেরকে কিয়ামতের দিনে উত্তম পরিণামের সুসংবাদ দেয় এবং তার অমান্যকারীদেরকে মন্দ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করেন। কুরআন এই বিষয়টাকে “ইনজার” ও “বাশারাত” দ্বারা ব্যক্ত করে।
“রিসালাত” হচ্ছে: নবুয়তের মসনদে অধিষ্ঠিত কোনো ব্যক্তি নিজের জাতির জন্য এমনভাবে খোদাতায়ালার আদালত হয়ে আসেন যে, তার জাতি যদি তাকে অস্বীকার করে, তবে খোদার ফয়সালা এই দুনিয়াতেই তাদের ওপর কার্যকর করেন এবং এভাবেই তিনি কার্যত ঐ জাতির ওপর সত্যের বিজয় প্রতিষ্ঠিত করেন।
রিসালাতের বহিঃপ্রকাশ যেভাবে ঘটে, সেটার প্রকৃতি এমন যে, আল্লাহতায়ালা এই রাসুলদেরকে নিজের পুরস্কার ও শাস্তির প্রকাশস্থল হিসেবে মনোনীত করেন এবং তাদের মাধ্যমে কিয়ামতের আগেই একটি ‘ছোট কিয়ামত’ এই দুনিয়াতেই ঘটিয়ে দেখান। রাসুলদেরকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তারা যদি খোদার সাথে নিজেদের অঙ্গীকারে অটল থাকেন, তবে তার পুরস্কার এবং অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হলে তার শাস্তি তারা দুনিয়াতেই পাবেন। এর ফল এটা দাঁড়ায় যে, রাসুলদের অস্তিত্ব মানুষের জন্য খোদার নিদর্শনে পরিণত হয় এবং মানুষ যেন রাসুলের সঙ্গে খোদাকেই জমিনে চলাফেরা করতে এবং বিচার-আচার করতে দেখতে পায়। এর পাশাপাশি রাসুলদেরকে আদেশ দেওয়া হয়, যে সত্যকে তারা চর্মচক্ষে দেখেছেন, সেটার প্রচার করেন এবং আল্লাহতায়ালার হেদায়েত কোনো কমবেশি ছাড়াই এবং পূর্ণ অকাট্যতার সাথে মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। কুরআনের পরিভাষা অনুযায়ী এটা “শাহাদাত”। শাহাদাত যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন দুনিয়া ও আখিরাত — উভয় ক্ষেত্রেই এটা খোদায়ি ফয়সালার ভিত্তিতে পরিণত হয়। সুতরাং আল্লাহতায়ালা এই রাসুলদেরকে বিজয় দান করেন এবং তাদের দাওয়াতের অস্বীকারকারীদের ওপর নিজের আজাব নাজিল করেন।
শাহাদাত-এর এই মসনদ রাসুলদের ছাড়াও সাইয়্যিদুনা ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর বংশধরদেরও প্রদান করা হয়েছে। কুরআন এটাকে সামনে রেখে তাদেরকে খোদার রাসুল ও তাঁর বান্দাদের মাঝে একটি জামাত হিসেবে গণ্য করেছে এবং জানিয়েছে যে, এই পদের জন্য তারা ঠিক সেভাবেই মনোনীত হয়েছে, যেভাবে মানুষদের মধ্য থেকে আল্লাহতায়ালা কিছু ব্যক্তিকে নবুয়ত ও রিসালাতের জন্য মনোনীত করেন।
আসমানি কিতাবসমূহের নাজিলের উদ্দেশ্য
নবী ও রাসুলদের সাথে আল্লাহতায়ালা সাধারণভাবে নিজের কিতাবসমূহও নাজিল করেছেন। এই কিতাবগুলোর নাজিলের উদ্দেশ্য কুরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, সত্য ও মিথ্যার জন্য এগুলো ‘মিজান’ (মানদণ্ড) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে — যাতে এগুলোর মাধ্যমে মানুষ তাদের মতপার্থক্য নিরসন করতে পারে এবং এভাবে সত্যের ব্যাপারে ঠিক ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
নবুয়তের সমাপ্তি এবং “ইনজার”-এর দায়িত্ব
নবুয়ত ও রিসালাতের এই সিলসিলা আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু হয়ে মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এ শেষ হয়েছে। নবীজির দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর ওহি ও ইলহাম তথা খোদায়ি অনুপ্রেরণার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে এবং নবুয়ত চিরতরে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। অতএব, মানুষকে ধর্মের ওপর কায়েম রাখার জন্য “ইনজার” তথা সতর্ক করার দায়িত্ব এখন কিয়ামত পর্যন্ত এই উম্মতের আলেমগণ পালন করবেন।
“ইসলাম” — এই ধর্মের নাম
এই ধর্মের নাম “ইসলাম”। এই ধর্ম সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা তাঁর কিতাবে বলেছেন যে, মানুষের কাছ থেকে তিনি এর বাইরে কখনোই অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করবেন না।
“ইসলাম” শব্দটি যেভাবে পুরো ধর্মের জন্য ব্যবহৃত হয়, তেমনি ধর্মের বাহ্যিক রূপকেও কোনো কোনো সময় এই ইসলাম শব্দ দ্বারা প্রকাশ করা হয়। নিজের এই বাহ্যিক রূপ অনুযায়ী ইসলাম এই পাঁচটি জিনিসের সমষ্টি:
১। এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রাসুল,
২। নামাজ কায়েম করা,
৩। যাকাত আদায় করা,
৪। রমজানের রোজা রাখা,
৫। বাইতুল্লাহ তথা কাবাঘরের হজ্জ করা।
ইমান — ধর্মের রুহানি দিক
ধর্মের বাতিন তথা রুহ হচ্ছে: ইমান। কুরআনে এর যে বিবরণ বর্ণিত হয়েছে, সে অনুযায়ী এটাও পাঁচটি জিনিসের সমষ্টি:
১। আল্লাহর ওপর ইমান,
২। ফেরেশতাদের ওপর ইমান,
৩। নবীদের ওপর ইমান,
৪। কিতাবসমূহের ওপর ইমান,
৫। প্রতিফল দিবসের ওপর ইমান।
ইমানের স্থায়ী শর্তসমূহ
এই ইমান যখন নিজের হাকিকত বা প্রকৃত রূপ অনুযায়ী অন্তরে গেঁথে যায় এবং অন্তর থেকে নিজের সত্যায়ন লাভ করে, তখন তা আপন অস্তিত্বের তাগিদে দুটি জিনিসের দাবি করে:
এক, আমলে সালেহ (সৎকর্ম),
দুই, ‘তাওয়াসি বিল হক’ (সত্যের উপদেশ) এবং ‘তাওয়াসি বিস সবর’ (ধৈর্যের উপদেশ)।
আমলে সালেহ বলতে সেসব কাজকে বোঝায়, যা চরিত্র সংশোধনের ফলে সৃষ্টি হয়। এর সমস্ত ভিত্তি বৃদ্ধিবৃত্তি ও মানুষের সহজাত প্রকৃতির ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং খোদার শরিয়ত এই আমলের দিকেই মানুষকে পথ দেখানোর জন্য নাজিল হয়েছে।
‘তাওয়াসি বিল হক’ এবং ‘তাওয়াসি বিস সবর’-এর অর্থ হলো: নিজের পরিবেশে একে অপরকে সত্যের এবং সত্যের ওপর অবিচল থাকার উপদেশ দেওয়া। কুরআন একে “আমর বিল মারুফ” এবং “নাহি আনিল মুনকার” হিসেবেও অভিহিত করেছে। অর্থাৎ যেসব বিষয় বৃদ্ধিবৃত্তি ও মানুষের সহজাত প্রকৃতির দৃষ্টিতে ‘মারুফ’ (ভাল), নিজের নিকট পরিমণ্ডলে মানুষকে সেগুলোর প্রতি উপদেশ দেওয়া এবং যা ‘মুনকার’ (মন্দ), সেগুলো থেকে মানুষকে বিরত রাখা।
ইমানের প্রাসঙ্গিক দাবিসমূহ
সাধারণ পরিস্থিতিতে ইমানের দাবি এগুলোই, তবে মানুষ যে পৃথিবীতে বাস করে, সে মোতাবেক তার সামনে যেসব অবস্থা দেখা দিতে পারে, সেগুলোর প্রেক্ষিতে এই বিষয়গুলো ছাড়াও আরও তিনটি দাবি ইমান থেকে সৃষ্টি হয়:
এক. হিজরত,
দুই. নুসরাত (সাহায্য),
তিন. কিয়াম বিল কিসত (ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা)।
কোনো মুমিন বান্দার জন্য যদি কোনো স্থানে নিজ প্রতিপালকের ইবাদতে অবিচল থাকা প্রাণান্তকর হয়ে উঠে, ধর্মের কারণে তাকে অতিষ্ঠ করা হয়, এমনকি নিজের ইসলাম প্রকাশ করাটা তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে তার এই ইমান তার কাছে দাবি জানায় যে, সে ওই স্থান ত্যাগ করে এমন কোনো স্থানে চলে যাবে, যেখানে সে প্রকাশ্যে নিজের ধর্ম পালন করতে পারে। কুরআন একে “হিজরত” বলে এবং নবীর পক্ষ থেকে হিজরতের দাওয়াতের পর নিজেকে এমন পরিস্থিতিতে দেখেও যারা এটাকে উপেক্ষা করে, তাদের জন্য কুরআন জাহান্নামের হুঁশিয়ারি শুনিয়েছে।
একইভাবে, ধর্মের প্রচার বা ধর্মের হেফাজতের জন্য যদি কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে ইমানের দাবি হলো: জান ও মাল দিয়ে ধর্মকে সাহায্য করা। কুরআনের পরিভাষা অনুযায়ী এটা খোদার “নুসরাত” (সাহায্য) এবং এটার দাবি হচ্ছে: কোনো সময় যদি ইমানের এই দাবি সামনে চলে আসে, তবে মুমিন বান্দার কাছে দুনিয়ার কোনো কিছুই এর চেয়ে বেশি প্রিয় হবে না।
অতঃপর, এই দুনিয়ায় মানুষের আবেগ, পক্ষপাত, স্বার্থ এবং কামনা-বাসনা যদি ধর্ম বা দুনিয়ার কোনো বিষয়ে তাকে ইনসাফের পথ থেকে বিচ্যুত করতে চায়, তবে এই ইমানই দাবি করে যে, মুমিন বান্দা কেবল সত্য ও ইনসাফের ওপর অবিচল থাকবে তাই নয়, বরং এগুলো যদি সাক্ষ্যের দাবি করে, তবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও এসবের দাবি পূরণ করবে। সে সত্য বলবে, সত্যের সামনে নিজের মাথা নত করবে। ইনসাফ করবে, ইনসাফের সাক্ষ্য দেবে এবং নিজের আকিদা ও আমলে ইনসাফ ছাড়া কখনো কিছু গ্রহণ করবে না। কুরআন এটার জন্য ‘কিয়াম বিল কিসত’ (ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা) পরিভাষা ব্যবহার করেছে।
ধর্মের উদ্দেশ্য
এই ধর্মের যে উদ্দেশ্য কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, তা কুরআনের পরিভাষায় তাজকিয়া। এর অর্থ হচ্ছে: মানুষের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনকে পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করে তার চিন্তা ও কর্মকে সঠিক পথে বিকশিত করা। কুরআন মাজিদে এই কথা বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে যে, মানুষের লক্ষ্য হচ্ছে: সুউচ্চ জান্নাতের বাদশাহি এবং সফলতার এই স্থানে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা কেবল তাদেরই জন্য, যারা এই দুনিয়ায় নিজেদের তাজকিয়া করে। সুতরাং তাজকিয়া-ই হচ্ছে ধর্মের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আল্লাহর নবীগণ এই উদ্দেশ্যেই প্রেরিত হয়েছেন এবং সমগ্র ধর্ম এই উদ্দেশ্য অর্জন ও এই লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর জন্য মানুষকে পথপ্রদর্শনের জন্যই নাজিল হয়েছে।
সঠিক ধর্মীয় মনোভাব
এই ধর্ম মোতাবেক আমল করার জন্য এর অনুসারীদের যে কর্মপন্থা অবলম্বন করা উচিত, তা হচ্ছে: “ইহসান”। ইহসান-এর অর্থ: কোনো কাজকে তার সর্বোত্তম পদ্ধতিতে সম্পাদন করা। এর রূপ এই যে, মানুষ আল্লাহতায়ালার ইবাদত এমনভাবে করবে যেন সে তাঁকে দেখছে; কারণ যদি সে তাঁকে দেখতে না-ও পায়, তবে তার প্রতিপালক তো তাকে দেখছেন।
[1] এর অর্থ হচ্ছে: ধর্ম হিসেবে কোনো কিছু নবীর সামনে ঘটেছে এবং তিনি তা থেকে নিষেধ করেননি।
[2] অর্থাৎ কোনো বিরোধ ছাড়াই, পূর্ণ ঐকমত্যের সঙ্গে।
[3] অর্থাৎ কোনো বিচ্ছিন্নতা ছাড়াই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে জিনিসের পঠন, লিখন, বিবরণ প্রদান চলমান এবং সেটার ওপর আমল করা চলমান।
[4] অর্থাৎ যা ভুলে যাওয়া হয়েছে, সেগুলোকে নতুন করে তাজা করা এবং যেগুলোতে ভুল রয়েছে, সেগুলোকে শুদ্ধ করার পর।
