ইমানের পর ধর্মের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো — তাযকিয়ায়ে আখলাক তথা নৈতিক পরিশুদ্ধি। এর অর্থ হচ্ছে: স্রষ্টা এবং সৃষ্টি — উভয়ের সাথে মানুষের যে আচরণ ও কর্ম সম্পৃক্ত রয়েছে, সেটাকে পরিশুদ্ধ করা। এই জিনিসকেই ‘আমলে সালেহ’ তথা সৎকর্ম বলা হয়। সম্পূর্ণ শরিয়ত এরই একটি শাখা। সভ্যতার পরিবর্তনের সাথে শরিয়ত নিঃসন্দেহে পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু ইমান ও আমলে সালেহ (সৎকর্ম)-ই আসল ধর্ম হওয়ায় এই দুটোতে কখনো কোনো পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হয়নি। কুরআন এই বিষয়ে একেবারে স্পষ্ট, যে ব্যক্তি এই দুটো জিনিস (তথা ইমান ও আমলে সালেহ) নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হবে, তার জন্য থাকবে জান্নাত এবং সেখানে সে চিরকাল অবস্থান করবে।
এর সাথে কুরআন এই কথাও স্পষ্ট করেছে যে, আল্লাহতায়ালা যেমন মানুষকে দেখার জন্য চোখ ও শোনার জন্য কান দিয়েছেন, ঠিক তেমনি ভালো ও মন্দকে আলাদা করে চেনার জন্য একটি নৈতিক বোধও দান করেছেন। মানুষ কেবল একটি প্রাণী ও যুক্তিবাদী সত্তা নয়, বরং এর পাশাপাশি সে একটি নৈতিক সত্তাও বটে। এর তাৎপর্য হচ্ছে: ভালো ও মন্দের পার্থক্য এবং ভালোকে ভালো ও মন্দকে মন্দ হিসেবে অনুভবের ক্ষমতা মানুষের সৃষ্টির সময়ই তার মন ও মস্তিষ্কে ইলহাম (তথা সঞ্চারিত) করা হয়েছে। [ভালো ও মন্দের] এই পার্থক্যবোধ সার্বজনীন বাস্তবতা। ফলে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তিও যখন পাপ করে, তখন সে প্রথম দিকে গোপনের চেষ্টা করে। নেক কাজের বিষয়টিও এমন। মানুষ এটাকে ভালোবাসে, এটার জন্য নিজের মাঝে সম্মান ও শ্রদ্ধার অনুভূতি খুঁজে পায় এবং যখনই কোনো সমাজ তৈরি করে, তাতে সত্য ও ইনসাফের জন্য অবশ্যই কোনো না কোনো ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। এটা এই সত্যের পরিষ্কার প্রমাণ যে, ভালো ও মন্দের এই পার্থক্য মানুষের ফিতরাতের অন্তর্গত। এতে সন্দেহ নেই যে, মানুষ কখনো কখনো মন্দের পক্ষে অজুহাত বানায়। কিন্তু যখন সে অজুহাত বানায়, তখনই সে জানে যে, এই অজুহাত সে নিজের ফিতরাতের বিরুদ্ধে বানাচ্ছে। কারণ, ঐ একই মন্দ কাজ যদি কেউ তার সাথে করে, তবে বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়াই সেটাকে সে মন্দ বলবে এবং সেটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হবে।
[ভালো ও মন্দের পার্থক্যকরণের] এই অন্তর্নিহিত জ্ঞানের ব্যাখ্যায় অবশ্য ব্যক্তি, সময় ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে অনেক পার্থক্য হতে পারত। আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহ যে, তিনি সেটারও অবকাশ রাখেননি এবং যেখানে বড় কোনো মতপার্থক্যের আশঙ্কা ছিল, সেখানে তাঁর নবীদের মাধ্যমে ভালো ও মন্দকে সম্পূর্ণরূপে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। এই নবীদের হেদায়েত এখন কিয়ামত পর্যন্ত কুরআন মাজিদে সংরক্ষিত। মানুষ নিজের মধ্যে যা কিছু পায়, এই হেদায়েত তার সত্যতা নিশ্চিত করে। মানুষের সহজাত জ্ঞান, এমনকি অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান, জীবন-আচার ও অবস্থা থেকে আহরিত জ্ঞান এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান — সবই এর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। ফলে নৈতিক গুণাবলি ও মন্দ বিষয়াদি এর মাধ্যমে পরিপূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে নির্ধারিত হয়ে যায়।
মৌলিক নীতিমালা
এই অধ্যায়ে যে জিনিসটি মৌলিক নীতির মর্যাদা রাখে, তা হচ্ছে, আল্লাহতায়ালা মানুষকে আদল ও ইহসান করার এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন, আর ফাওয়াহিশ (অশ্লীলতা), মুনকার (মন্দ কাজ) এবং অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করেন। এই বিষয়গুলো সম্পূর্ণ ফিতরি বা মানবীয় প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যশীল, আর তাই আল্লাহর ধর্মে এগুলো সব সময় স্বীকৃত ছিল। তাওরাতের দশ নির্দেশ [Ten Commandments] এগুলোর ওপরই ভিত্তিশীল এবং কুরআনও নিজের সকল নৈতিক বিধানে এগুলোরই বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে। আমরা এখানে এগুলোর ব্যাখ্যা প্রদান করব।
প্রথম বিষয়: আদল। এর অর্থ, যার ওপর যে হক ওয়াজিব তথা আবশ্যকভাবে অর্পিত হয়েছে, তা সামান্য হেরফের এবং পক্ষপাত ছাড়া আদায় করা — হোক সে হকদার দুর্বল বা শক্তিশালী এবং আমরা তাকে পছন্দ করি বা না করি।
দ্বিতীয় বিষয়: ইহসান। এটা আদলের চেয়েও উচ্চতর একটি বিষয় এবং সমস্ত নৈতিকতার সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতা। এটার অর্থ শুধু অধিকার আদায় করা নয়, বরং পারস্পরিক সমঝোতা ও উদারতার আচরণ করা। অন্যের প্রাপ্য হক থেকে তাকে কিছু বেশি দেওয়া এবং নিজের প্রাপ্য হক থেকে কিছুটা কম নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা। এই গুণটি সমাজে প্রীতি ও ভালোবাসা, ত্যাগ ও একাগ্রতা, কৃতজ্ঞতা, উদারতা ও কল্যাণকামিতার মূল্যবোধ গড়ে তোলে এবং জীবনে মাধুর্য ও সুখ বয়ে আনে।
তৃতীয় বিষয়: আত্মীয়-স্বজনের জন্য ব্যয় করা। এটা ইহসানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা এবং ইহসানের একটি বিশেষ রূপ নির্ধারণ করে। এটার অর্থ: আত্মীয়-স্বজন কেবল এতটুকুর হকদার নয় যে, তাদের সাথে আদল ও ইহসানের আচরণ করা হবে, বরং তারা এটারও হকদার যে, মানুষ তাদের সম্পদে আত্মীয়-স্বজনের অধিকার স্বীকার করবে, কোনো অবস্থাতে তাদের ভুখা-নাঙ্গা অবস্থায় ফেলে রাখবে না এবং নিজ সন্তান-সন্ততির পাশাপাশি তাদের প্রয়োজনকেও যথাসম্ভব উদারতার সাথে মেটানোর চেষ্টা করবে।
এগুলোর বিপরীতে তিনটি বিষয় রয়েছে, যেগুলোর ব্যাপারে নিষেধ করা হয়েছে।
প্রথমটি ফাওয়াহিশ। এর অর্থ: ব্যভিচার, সমকামিতা এবং এগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি।
দ্বিতীয়টি মুনকার। যেসব কাজকে মানুষ সাধারণভাবে মন্দ জানে, সব সময় মন্দ বলে এসেছে এবং যেগুলোর মন্দ হওয়াটা এতই স্পষ্ট যে, এর জন্য কোনো যুক্তির প্রয়োজন হয় না — সেগুলোই মুনকার। ধর্ম ও জাতি, তাহজিব-তামাদ্দুন তথা সমাজ-সংস্কৃতির প্রতিটি ভালো ঐতিহ্যে এগুলোকে মন্দ বিবেচনা করা হয়। কুরআন এগুলোর জন্য এক জায়গায় ‘মুনকার’ এবং অন্য জায়গায় ‘ইছম’ শব্দ ব্যবহার করে স্পষ্ট করেছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য ঐ সমস্ত কাজ, যা অন্যের অধিকার হরণ করে।
তৃতীয়টি অবাধ্যতা। অর্থাৎ ব্যক্তি নিজের শক্তি, ক্ষমতা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি ব্যবহার করে অবৈধ ফায়দা লুটা, সীমালঙ্ঘন করা এবং অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করা — হোক তা স্রষ্টার বা সৃষ্টির অধিকার।
নৈতিকতার গুণাবলি ও মন্দ দিকসমূহ
[উপরে বর্ণিত] মৌলিক নীতির সংক্ষিপ্ত বর্ণনাকে কুরআন এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছে যে, কোনটি নৈতিক গুণাবলি এবং কোনটি নৈতিক মন্দ দিক, তা সুনির্দিষ্টভাবে স্পষ্ট হয়ে যায়। এগুলো যেখানে বর্ণিত হয়েছে, সেখানে আলোচনার ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছে শিরকের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এবং এটার সমাপ্তি ঘটেছে এই একই বিষয়ে পুনরায় জোর দেওয়ার মধ্য দিয়ে। কোনো বিষয়ের গুরুত্ব তুলে ধরতে কুরআনে এই বাচনভঙ্গিটি ব্যবহৃত হয়। এর উদ্দেশ্য: মাঝখানে যে বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর জন্য তাওহিদের এই বিশ্বাসটি যেন এক প্রকার সুরক্ষা প্রাচীর — যার অস্তিত্বে শহর টিকে থাকে এবং যাতে ফাটল ধরলে সমগ্র শহর বিপদের মুখে পড়ে। এতে সন্দেহ নেই যে, নৈতিক গুণাবলির ক্ষেত্রে তাওহিদের মর্যাদা এমনই। এটা সেই আদলের সবচেয়ে বড় এবং মৌলিক দাবি, যার নির্দেশ কুরআন দিয়েছে। মূলত, এই কারণেই শিরককে ‘জুলমে আজিম’ (মহাপাপ) বলা হয়েছে এবং এর এই পরিণতির কথাও কুরআন পূর্ণ স্পষ্টতার সাথে জানিয়ে দিয়েছে যে, আল্লাহতায়ালার কাছে এটা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ, যার শাস্তিস্বরূপ মানুষ বিতাড়িত ও লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
এই ‘শিরক’ কী? যখন আল্লাহতায়ালার সাথে কাউকে ইলাহ (উপাস্য) বানানো হয়, তখন সেটাকে কুরআন তার পরিভাষায় ‘শিরক’ বলে অভিহিত করে। এটার অর্থ: কাউকে খোদার সত্তা থেকে অথবা খোদাকে কারো সত্তা থেকে উদ্ভূত মনে করা, কিংবা সৃষ্টিকর্ম বা সৃষ্টির ব্যবস্থাপনায় কারো অংশী স্বীকার করা কিংবা এভাবে কোনো না কোনো পর্যায়ে কাউকে আল্লাহতায়ালার সমান মর্যাদা দেওয়া।
প্রথম প্রকারের উদাহরণ: সাইয়্যিদুনা ঈসা মসিহ, সাইয়্যিদা মরিয়ম কিংবা ফেরেশতাদের ব্যাপারে খ্রিস্টান ও মুশরিক আরবদের বিশ্বাস। সুফি মতাদর্শের ওহদাতুল ওজুদ নামক ধারণাও এই শ্রেণিভুক্ত।
দ্বিতীয় প্রকারের উদাহরণ: হিন্দুদের ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব; এবং মুসলমানদের সমাজে গাউস, কুতুব, আবদাল, দাতা, গরিব নেওয়াজ প্রভৃতি ব্যক্তিত্বের প্রতি থাকা বিশ্বাস। এছাড়া অপশক্তির প্রভাব, গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব ও শয়তানদের প্রভাব-প্রতিপত্তিকেও এরই অন্তর্ভুক্ত মনে করা উচিত।
এছাড়া এই অধ্যায়ে যেসব বিধান এসেছে, সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ:
আল্লাহর ইবাদত
প্রথম নির্দেশ হচ্ছে, যখন আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ (উপাস্য) নেই, তখন কেবল তাঁরই ইবাদত হওয়া উচিত। এই ইবাদতের বিষয়ে আমরা ইতিপূর্বে বর্ণনা করেছি যে, ইবাদতের প্রকৃত স্বরূপ: বিনয় ও নম্রতা, যার প্রাথমিক প্রকাশ ঘটে উপাসনার মাধ্যমে। এরপর মানুষের ব্যবহারিক সত্তার বিবেচনায় এই উপাসনার মধ্যে আনুগত্যও অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
প্রথম অবস্থার প্রকাশ: তাসবিহ [আল্লাহর মাহাত্ম বর্ণনা] ও তাহমিদ [আল্লাহর গুণকীর্তন করা], দোয়া ও মোনাজাত, রুকু ও সেজদা, নজর [মানত করা], নিয়াজ [উৎসর্গ করা], কুরবানি ও ইতিকাফ।
দ্বিতীয় অবস্থায়, মানুষ কাউকে খোদায়ি কর্তৃত্বের অধিকারী মনে করে এবং স্বতন্ত্র বিধানদাতা ও শাসক হিসেবে তার প্রতিটি আদেশের নিকট মাথা নত করে।
বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর সিদ্ধান্ত হচ্ছে: এর মধ্যে কোনো একটি বিষয়ও তিনি ছাড়া অন্য কারো জন্যে হতে পারবে না। অতএব, কেউ যদি কারো তাসবিহ ও তাহমিদ করে, কিংবা তার কাছে দোয়া ও মোনাজাত করে, অথবা তার জন্য রুকু ও সেজদা করে, কিংবা তার উদ্দেশ্যে নজর-নিয়াজ বা কুরবানি পেশ করে, বা তার জন্য ইতিকাফে বসে, অথবা খোদায়ি কর্তৃত্বের অধিকারী মেনে নিয়ে তার আনুগত্য করে, তবে এর অর্থ দাঁড়াবে: ঐ ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার এই ফয়সালাকে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার
দ্বিতীয় নির্দেশ হলো, পিতামাতার সাথে সদাচরণ করা। এই শিক্ষা সকল ইলহামি তথা ঐশী গ্রন্থে দেওয়া হয়েছে। এতে সন্দেহ নেই যে, মানুষের ওপর পিতামাতার হকই সবচেয়ে বড়। তাই আল্লাহর ইবাদতের পর সর্বপ্রথম এটা আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর কারণ, পিতামাতাই হলেন মানুষের জন্য তার অস্তিত্বে আসা ও লালিত-পালিত হওয়ার মাধ্যম। আল্লাহতায়ালা পিতামাতা উভয়ের ব্যাপারে যে উপদেশ দিয়েছেন, তা হলো: নিজের প্রতিপালকের পরে মানুষ যেন তাদের প্রতিই সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। এই কৃতজ্ঞতা কেবল মুখে প্রকাশ করলেই হয় না, বরং এর কিছু অপরিহার্য দাবি রয়েছে, যেগুলো কুরআনে বর্ণিত হয়েছে।
প্রথম কথা এটা বলা হয়েছে যে, পিতামাতার সাথে এমন ব্যবহার করতে হবে যেন প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে তাদের সম্মান করা হয়, তাদের বিরুদ্ধে মনে কোনো বিরক্তি সৃষ্টি না হয়, তাদের সামনে অমর্যাদাকর কোনো কথা বলা না হয়; বরং [তাদের সাথে আচরণের বেলায়] কোমলতা, ভালোবাসা, ভদ্রতা ও সৌজন্যতার পন্থা অবলম্বন করতে হবে। তাদের কথা মান্য করতে হবে এবং বার্ধক্যের অসহায়ত্বে তাদেরকে সান্ত্বনা ও সহানুভূতি প্রদান করতে হবে।
দ্বিতীয় কথা এটা বলা হয়েছে যে, পিতামাতার সামনে আনুগত্য ও বাধ্যতার বাহু সকল অবস্থাতেই নত থাকবে এবং এই আনুগত্য ও বাধ্যতা সম্পূর্ণ স্নেহ-ভালোবাসা, দয়া ও মমতার অনুভূতি থেকে হবে। পিতামাতা পাখির মতো তাদের সন্তানকে যেভাবে নিজেদের ডানায় আগলে রাখেন, সন্তানদেরও উচিত বৃদ্ধ বয়সে একইভাবে নিজেদের ভালোবাসা ও আনুগত্যের ডানায় তাদেকে আগলে রাখা। কারণ, পিতামাতার মমতার হক যদি কিছুটা পরিশোধ করা সম্ভব হয়, তা কেবল এই অনুভূতি থেকেই সম্ভব হতে পারে। এটা ছাড়া এই হক আদায় কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।
তৃতীয় কথা এটা বলা হয়েছে যে, এর পাশাপাশি তাদের জন্য সর্বদা দোয়া করতে হবে: হে রব! যেমনিভাবে তারা স্নেহ ও মমতা দিয়ে আমাদের শৈশবে লালন করেছেন, ঠিক তেমনি তাদের বার্ধক্যে আপনি তাদের ওপর আপনার রহমত নাজিল করুন। এই দোয়া পিতামাতার হক এবং সেই হকের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়, যা পিতামাতার সাথে সন্তানের সম্পর্কের ওপর অর্পিত হয়। আবার এটা সেই ভালোবাসার অনুভূতির সঞ্চালকও বটে, যা আল্লাহতায়ালা পিতামাতার সাথে সদাচরণের ক্ষেত্রে দাবি করেছেন।
পিতামাতা ছাড়াও এই দুনিয়ায় যেসব সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সেগুলোর প্রতিও মানুষের আচরণ ধাপে ধাপে এমনই হওয়া উচিত। আত্মীয়স্বজন, এতিম ও মিসকিন, প্রতিবেশী, মুসাফির ও অধীনস্থদের ব্যাপারেও আল্লাহতায়ালা মানুষকে এই নসিহত করেছেন।
আল্লাহর পথে ব্যয় (ইনফাক)
তৃতীয় নির্দেশ হলো, আল্লাহর পথে ব্যয় করা। এর অর্থ: আল্লাহতায়ালা মানুষকে যে সকল নিয়ামত দান করেছেন, সে যেভাবে সেগুলো নিজের জন্য ব্যয় করে, ঠিক তেমনি ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক প্রয়োজন মিটানোর পর সে যেন সেগুলো অন্য মানুষের জন্যও ব্যয় করে। কুরআন থেকে এটা স্পষ্ট যে, এই দুনিয়ায় আল্লাহর বান্দা হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য দুটি জিনিসের প্রয়োজন:
এক. স্রষ্টার সাথে বান্দার সম্পর্ক সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
দুই. সৃষ্টির সাথে তার সম্পর্ক সঠিকভাবে গড়ে ওঠা।
প্রথমটি অর্জিত হয় নামাজের মাধ্যমে, যা আল্লাহতায়ালার সাথে বান্দার ভালোবাসার প্রাথমিক বহিঃপ্রকাশ। দ্বিতীয় জিনিসটি অর্জিত হয় ব্যয়ের মাধ্যমে, যা তাঁর সৃষ্টির প্রতি [বান্দার] ভালোবাসার প্রাথমিক প্রকাশ। এর প্রতিদানও হয় আল্লাহর ভালোবাসা। কারণ, মানুষ যা কিছু ব্যয় করে, প্রকৃতপক্ষে তা আসমানে সঞ্চয় করতে থাকে এবং সাইয়্যিদুনা মসিহ (আলাইহিস সালাম)-এর বাণী অনুসারে, এটার কারণে মানুষের মনও সেখানেই আবদ্ধ থাকে।
এই ব্যয় হচ্ছে: আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও মিসকিনদের হক, যা আদায় করা অপরিহার্য। এতে অবহেলা করলে মানুষকে আল্লাহতায়ালার দৃষ্টিতে [অন্যের] অধিকার হরণের অপরাধে অপরাধী বানাতে পারে। কুরআন এই কথা অন্যত্র স্পষ্টভাবে বলেছে: যদি কেউ এসব হক উপেক্ষা করে ধন-সম্পদ জমা করে, তবে তা হবে: কানয [পুঞ্জীভূত সম্পদ] এবং এর শাস্তি জাহান্নামের আগুন, যা থেকে প্রত্যেক মুমিন বান্দার উচিত নিজ রবের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা।
এই ব্যয়ের তাওফিক তাদেরই হয়, যারা নিজের খরচে ভারসাম্য বজায় রাখে এবং আল্লাহতায়ালা যে রিজিক তাদেরকে দান করেন, সেটাকে নিজের কোনো কৌশল বা প্রজ্ঞার ফল নয়, বরং সেটাকে আল্লাহর অনুগ্রহের ফল মনে করে। এরসাথে আরও দুইটি কথা বলা হয়েছে:
এক — সম্পদকে যত্রতত্র উড়িয়ে দেওয়া জায়েজ নয়। এটা আল্লাহর নিয়ামত এবং এর ব্যাপারে সঠিক আচরণ হলো: ভারসাম্য বজায় ও সাশ্রয়ী হওয়ার মাধ্যমে মানুষ নিজের বৈধ প্রয়োজনে সম্পদ ব্যয় করবে এবং যা কিছু বাঁচাবে, সেটাকে হকদারদের আমানত মনে করবে এবং এই আমানত অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আদায় করবে। এর কারণ, যে ব্যক্তি নিজের প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও সামঞ্জস্যের নীতি অবলম্বন করে না, সে নিজের শখ মেটানো থেকে অবসর পায় না যে, অন্যদের অধিকার আদায় করবে। বলা হয়েছে, যারা নিজেদের সম্পদ এভাবে উড়ায়, তারা শয়তানের ভাই; এবং শয়তান তার রবের প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ। শয়তান তাদেরকে প্ররোচিত করে নিজের পথে লাগিয়ে দেয় এবং তাদের দিয়ে এমনসব কাজে খরচ করায়, যার দ্বারা তারা খোদার সন্তুষ্টি অর্জনের পরিবর্তে তাঁর অসন্তুষ্টি নিয়ে ফিরে আসে। এই বিষয়ে সঠিক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের ব্যাখ্যা এভাবে দেওয়া হয়েছে যে, মানুষ না নিজের হাত একেবারে গুটিয়ে নেবে, আর না একেবারে খুলে বসবে, যেন প্রয়োজনের সময় নিরূপায় ও লজ্জিত হয়ে বসে থাকতে হয়; বরং ভারসাম্যের সাথে খরচ করবে এবং সবসময় কিছু বাঁচিয়ে রাখবে, যেন নিজের এবং অন্যদের হক যথাসময়ে আদায় করতে পারে।
দুই — রিজিকের সংকীর্ণতা ও প্রশস্ততা আল্লাহতায়ালার প্রজ্ঞা ও ইচ্ছার অধীন। মানুষের দায়িত্ব কেবল এটাই যে, সে পূর্ণ মেহনতের সাথে এর উপায়-উপকরণ সৃষ্টি। যারা এই বাস্তবতা বোঝে না, তারা অন্যদের জন্য খরচ করা তো দূরের কথা — অনেক সময় এমন পাষাণ হয়ে যায় যে, দারিদ্র্যের আশঙ্কায় নিজের সন্তানদের পর্যন্ত হত্যা করে। এতে বিশেষভাবে আরব জাহেলিয়াতের সময় মেয়েদের জীবন্ত কবর দেওয়ার সেই নিষ্ঠুর প্রথার দিকে ইশারা রয়েছে, যার বড় কারণ এটাই ছিল যে, তারা মনে করত নারী যেহেতু উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নয়, তাই তার লালন-পালনের বোঝা কেন কাঁধে নেওয়া হবে। [কুরআনে] ঘোষণা করা হয়েছে, তাদেরকে হত্যা করো না, তাদেরও আমরাই রিজিক দিই এবং তোমাদেরও; এবং নিশ্চিন্ত থাকো যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতিটি অবস্থার পর্যবেক্ষক এবং তাদের রক্ষক। তিনি তাদের ব্যাপারে বেখবর নন।
সতীত্ব ও চারিত্রিক পবিত্রতা
চতুর্থ নির্দেশ হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি যেন জিনা-ব্যভিচারের ধারে-কাছেও না যায়। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে, এটা প্রকাশ্য অশ্লীলতা এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ। এটার তাৎপর্য হচ্ছে: জিনা-ব্যভিচার যে মন্দ ও অশ্লীল কাজ — তার জন্য কোনো দলিল ও প্রমাণের প্রয়োজন নেই। মানুষের ফিতরাত এটাকে সবসময় বড় গুনাহ ও গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করে আসছে এবং এই ফিতরাত যতক্ষণ না পুরোপুরি বিকৃত হচ্ছে, ততক্ষণ এভাবেই গণ্য করতে থাকবে। মানুষের ব্যাপারে এই বাস্তবতা একেবারেই অনস্বীকার্য যে, পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটি তার জন্য পানি ও বাতাসের মতোই অপরিহার্য প্রয়োজন। এই প্রতিষ্ঠানটি সঠিক মানবীয় অনুভূতির সাথে কেবল তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় এবং টিকে থাকতে পারে, যখন স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক স্থায়ী সাহচর্যের হয়। এই জিনিসটি হারিয়ে গেলে তা থেকে মানবীয় ও আধ্যাত্মিক অনুভূতিবর্জিত পশুদের একটি পাল অস্তিত্বে আসতে পারে, কিন্তু তা থেকে কোনো সুস্থ সমাজ এবং সুস্থ সভ্যতা গড়ে উঠতে পারে না।
এই কাজের বীভৎসতার কারণেই আল্লাহতায়ালা কেবল এতটুকু কথা বলেননি যে, জিনা-ব্যভিচার করো না, বরং বলেছেন যে, জিনা-ব্যভিচারের ধারে-কাছেও যেও না। অর্থাৎ এমন সব বিষয় থেকে দূরে থাকো, যা জিনা-ব্যভিচারকে উসকে দেয়, এর প্রতি প্ররোচনা সৃষ্টি করে এবং এর কাছে নিয়ে যায়। নারী-পুরুষের মেলামেশার যে আদব কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, তা মূলত মানুষকে এ ধরনের বিষয় থেকে বাঁচাতেই নির্ধারণ করা হয়েছে। সেগুলোর সারকথা হচ্ছে: পুরুষ ও নারী উভয়েই নিজ নিজ শারীরিক ও মানসিক চাহিদার নিরিখে নিজেদের দৃষ্টিকে যতটা সম্ভব সংযত রাখবে এবং নিজের দেহের লজ্জাস্থানসমূহ যতদূর সম্ভব ঢেকে রাখবে; আর এমন কোনো কথা বলবে না, যা একে অন্যের যৌন আবেগকে উসকে দেয়। এর কারণ, শয়তান যখন কোনো সমাজে জিনা-ব্যভিচারকে সাধারণ করতে চায়, তখন তার আক্রমণের সূচনা সাধারণত এসব বিষয় থেকেই করে। কুরআন থেকে জানা যায় যে, আদম ও হাওয়ার বেলায় শয়তান এই পথেই আক্রমণ চালিয়েছিল। এই কারণেই আল্লাহতায়ালা জিনা-ব্যভিচারের প্রচার-প্রসার এবং এর জন্য প্ররোচনা সৃষ্টির চেষ্টাকে বড় অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।
মানুষের জীবনের পবিত্রতা
পঞ্চম নির্দেশ হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি যেন কাউকে হত্যা না করে। ধর্ম ও নৈতিকতার দৃষ্টিতে মানুষের জীবনের যে পবিত্রতা ও মর্যাদা সবসময় স্বীকৃত ছিল, এটা তারই বর্ণনা। কুরআন জানিয়েছে যে, মানুষের জীবনের পবিত্রতার বিষয়ে ইতিপূর্বে বনি ইসরাইলকে একই তাগিদ দেওয়া হয়েছিল এবং আল্লাহতায়ালা তাদের ওপর এটা বিধিবদ্ধ করে দিয়েছিলেন যে, একজন মানুষকে হত্যা করা প্রকৃতপক্ষে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার সমান।
এর সাথে কুরআন এ কথাও স্পষ্ট করেছে যে, এই অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তিদের ব্যাপার কেবল আল্লাহতায়ালার সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, বরং নিহত ব্যক্তির অভিভাবকদের সাথেও সংশ্লিষ্ট; এবং আল্লাহতায়ালা তাদেরকে পূর্ণ এখতিয়ার দিয়েছেন। তাই দুনিয়ার কোনো আদালত তাদের ইচ্ছা ব্যতিরেকে হত্যাকারীকে ছাড় দিতে পারে না। আদালতের দায়িত্ব হচ্ছে, তারা যদি কিসাস তথা রক্তের বদলে রক্তের ব্যাপারে জোর দেয়, তবে তাদেরকে সহায়তা করা এবং তারা যা চায়, তা পূর্ণ শক্তি দিয়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা।
এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ
ষষ্ঠ নির্দেশ হচ্ছে, এতিমের সম্পদে অবৈধ হস্তক্ষেপ করা যাবে না। এই নির্দেশের শব্দগুলো ঠিক সেগুলোই, যা উপরে জিনা-ব্যভিচার থেকে বিরত রাখার জন্য এসেছে। অর্থাৎ এতিমের কল্যাণ ও মঙ্গলের উদ্দেশ্য ছাড়া তার সম্পদের ধারে-কাছেও যেও না। এর তাৎপর্য হচ্ছে, এতিমের সম্পদে কেবল ঐ হস্তক্ষেপ-ই জায়েজ, যা তার সুরক্ষা ও বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে করা হয় এবং ততক্ষণই করা যাবে, যতক্ষণ না এতিম সাবালকত্বে পৌঁছে নিজের সম্পদের দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করার যোগ্য হয়।
অঙ্গীকার রক্ষা করা
সপ্তম নির্দেশ হচ্ছে, যে অঙ্গীকারই করা হোক না কেন, তা সর্বাবস্থায় পূরণ করতে হবে। বলা হয়েছে যে, এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কুরআনের কিছু জায়গায় এই বিধান একই গুরুত্বের সাথে এসেছে। জিহাদ ও কিতালের (যুদ্ধ) ক্ষেত্রেও কুরআনে বর্ণিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হচ্ছে: এই অঙ্গীকার পালন। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তার সাহাবিদেরকে এক পর্যায়ে আরবের মুশরিকদের সাথে করা সমস্ত চুক্তি শেষ করে চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেখানেও এই কথা স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কোনো চুক্তি যদি মেয়াদের শর্তসহ করা হয়ে থাকে, তবে তার মেয়াদ অবশ্যই পূর্ণ করতে হবে। আরেক জায়গায় আরও বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে যে, কোনো চুক্তিবদ্ধ জাতি যদি মুসলমানদের ওপর জুলুমও করে, তবুও চুক্তি ভঙ্গ করে মজলুমদেরকে সাহায্য করা যাবে না।
পরিমাপ ও ওজনে সততা
অষ্টম নির্দেশ হচ্ছে, পরিমাপ ও ওজনে কমবেশি করা যাবে না। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, তিনি আসমান ও জমিনকে একটি মিজান তথা ন্যায্য মানদণ্ডের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন; অতএব এটা অপরিহার্য যে, মানুষও নিজের এখতিয়ারভুক্ত ক্ষেত্রে ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং সবসময় সঠিক মাপে মাপবে এবং ঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করবে। এতে স্পষ্ট যে, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান এবং নিজের হাকিকতের বিচারে এটা সেই ইনসাফের মানদণ্ডের শাখা, যার ওপর এই দুনিয়া টিকে আছে। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি এটা থেকে বিচ্যুত হয়, তবে এর অর্থ হচ্ছে, ন্যায়বিচার ও ইনসাফের বিষয়ে তার ধারণায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে এবং আল্লাহর ‘কায়েম বিল কিসত’ (ন্যায়বিচারক) হওয়ার আকিদা তার মাঝে আর অবশিষ্ট নেই। এরপর, স্বাভাবিকভাবেই অর্থনীতি ও সামাজ ব্যবস্থার পুরো কাঠামো তছনছ হয়ে যায় এবং সভ্যতার কোনো ইটও নিজের জায়গায় বহাল থাকে না।
পণ্যে ভেজাল দেওয়ার বিষয়টিও একই রকম। যদি কোনো ব্যক্তি দুধে পানি, চিনিতে বালি এবং গমে যব মিশিয়ে বিক্রি করে, তবে সে একই অপরাধ করে। কারণ, পুরো ওজন দিয়েও সে ক্রেতাকে তার কেনা জিনিসটি পুরোপুরি দিচ্ছে না। এটা প্রকৃতপক্ষে অন্যের হকে হাত দেওয়া, যার পরিণতি দুনিয়া ও আখিরাত — উভয় জগতে নিশ্চিতভাবে মন্দ হবে। এজন্য বলা হয়েছে যে, যখন মাপবে, তখন পাত্র পূর্ণ করে দেবে এবং যখন ওজন করবে, তখন সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করবে, কারণ এটাই উত্তম এবং পরিণামের বিবেচনায়ও এটাই উৎকৃষ্ট।
কুসংস্কার ও ধারণার অনুসরণ
নবম নির্দেশ হচ্ছে, যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, কেউ যেন তার পিছনে না পড়ে। কুরআন সতর্ক করছে যে, এটাকে সামান্য বিষয় মনে করা উচিত নয়, কারণ মানুষের শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং হৃদয় ও মস্তিষ্ক — প্রতিটি জিনিসকে একদিন আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। অর্থাৎ কোনো মুসলমানের জন্য এটা জায়েজ নয় যে, সে কুধারণা করবে কিংবা কারো ওপর অপবাদ দেবে, যাচাই ছাড়া কারো বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেবে অথবা নিছক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে গুজব ছড়াবে; কিংবা নিজের প্রতিপালকের যাত ও সিফাত এবং তাঁর হুকুম ও হেদায়েতের ব্যাপারে অলীক ধারণা, কুসংস্কার এবং অসার অনুমানের ভিত্তিতে কোনো দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করবে।
অহংকার ও দম্ভ
দশম নির্দেশ হচ্ছে, খোদাতায়ালার জমিনে কেউ যেন দম্ভভরে না চলে, কারণ এটা অহংকারী ও দাম্ভিকদের চলন। তাই বলা হয়েছে, তুমি জমিনে যতই সজোরে পা ফেলে চলো না কেন, জমিনকে তুমি বিদীর্ণ করতে পারবে না; এবং যতই উদ্ধত হয়ে ও মাথা উঁচু করে চলো না কেন, পাহাড়ের উচ্চতায় তুমি পৌঁছাতে পারবে না।
এ ধরনের চালচলন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের অন্তরের পরিচয় বহন করে। সম্পদ, ক্ষমতা, রূপ-সৌন্দর্য, জ্ঞান, শক্তি এবং এ রকম যত বিষয় মানুষের ভিতরে অহংকার সৃষ্টি করে, সেগুলোর প্রত্যেকটির অহংকার তার চলনে এক বিশেষ ধাঁচে প্রকাশ পায় এবং এই কথার প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায় যে, তার অন্তর দাসত্বের চেতনা থেকে খালি এবং তাতে আল্লাহর মহিমার কোনো ধারণা নেই। যে অন্তরে দাসত্বের চেতনা এবং আল্লাহর মহিমার ধারণা থাকে, তা কেবল তাদের বুকেই স্পন্দিত হয়, যাদের মাঝে বিনয় ও নম্রতার অবস্থা বিরাজ করে। তারা দম্ভ ও ঔদ্ধত্য দেখানোর পরিবর্তে মাথা নত করে চলে।
এখানে এই কথা স্পষ্ট থাকা উচিত যে, মানুষের এই অহংকার ও দম্ভ কেবল তার চলনেই প্রকাশ পায় না; বরং তার কথা, বেশভূষা, পোশাক এবং ওঠা-বসা — প্রতিটি জিনিসেই ফুটে ওঠে। সুতরাং, এমন জিনিসের ব্যবহার নিষিদ্ধ মনে করা উচিত, যা দ্বারা আভিজাত্যের প্রদর্শনী হয় কিংবা যা বড়াই করা, দম্ভোক্তি করা, মিথ্যে অহমিকা দেখানো, অন্যদের ওপর প্রভাব খাটানো কিংবা বখাটেদের স্টাইলে ধমক দেওয়া ব্যক্তিদের বেশভূষার সাথে সংশ্লিষ্ট। এমনকি দাড়ি ও গোঁফ রাখা এবং পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রেও কোনো অহংকারী রূপ অবলম্বন করা উচিত নয়।
শুধু এতটুতুই নয়, মানুষের এই মানসিক অবস্থা কিছু বড় বড় গুনাহের কারণও হয়ে ওঠে। সুতরাং বাস্তবতা এই যে, সত্যকে সত্য জেনেও তাকে অস্বীকার করা, বর্ণ ও জাত এবং বংশ-পরিচয়ের বিচারে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করা, অন্যদের তুচ্ছ তুচ্ছ জ্ঞান করে তাদের উপহাস করা, তাদের দোষারোপ করা, মন্দ উপাধিতে ডাকা এবং পিছনে তাদের দোষ চর্চা করার মতো গুনাহগুলোর মূল চালিকাশক্তি হলো মানুষের এই আত্মগৌরব, অহংকার ও দম্ভ। আল্লাহতায়ালা এসব কিছু থেকেও অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
তাওরাতের দশ নির্দেশের (Ten Commandments) মতো এগুলো কুরআনের দশ নির্দেশ (আহকামে আশারা)। সমগ্র আখলাকিয়াত তথা নৈতিকতা এই দশ নির্দেশের-ই শাখা। আল্লাহতায়ালা যেসব গুনাহকে বড় গুনাহ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে অভিহিত করেছেন, সেগুলো এই নির্দেশের লঙ্ঘনের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়। কুরআন এই বিষয়ে সুস্পষ্ট যে, এই লঙ্ঘনের শাস্তি মানুষকে কিয়ামতের দিন ভোগ করতে হতে পারে। অতএব, প্রতিটি মুসলমানের জন্য এটা জরুরি যে, এই বিষয়ে সে সতর্ক থাকবে। আর এজন্য এই তিনটি কথা সামনে রাখা উচিত:
এক — এই নির্দেশগুলোর কোনটি যদি অজান্তে লঙ্ঘিত হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ তার জন্য পাকড়াও করবেন না। তাঁর কানুন হচ্ছে: অনিচ্ছাকৃতভাবে যদি এমন কিছু হয়ে যায়, যা আপাতদৃষ্টিতে নিষিদ্ধ কাজ, কিন্তু সেটাতে প্রকৃতপক্ষে সেই নিষিদ্ধ কাজের নিয়ত ছিল না, তবে তিনি সে বিষয়ে কোনো কৈফিয়ত তালাশ করবেন না।
দুই — কেউ যদি এই নির্দেশগুলোর লঙ্ঘন থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে, তবে এর প্রতিদান এই যে, আল্লাহতায়ালা তাঁর অসীম রহমতে তার ছোট গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেবেন; অন্যথায় ছোট-বড় সব গুনাহ তার আমলনামায় লিপিবদ্ধ হবে এবং তাকে সেগুলোর হিসাব দিতে হবে।
তিন — আবেগের বশবর্তী হয়ে কেউ যদি এই নির্দেশগুলোর কোনো একটি লঙ্ঘন করে, তবে তার উচিত তাওবা করে নিজের আচরণ সংশোধন করা। এর জন্য জরুরি যে, যত দ্রুত সম্ভব তওবা করা। আল্লাহতায়ালা কুরআনে স্পষ্ট করেছেন যে, তাঁর ওপর কেবল তাদেরই তওবা কবুল করার হক প্রতিষ্ঠিত, যারা আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো গুনাহ করে, অতঃপর দ্রুত তওবা করে। যারা সারাজীবন গুনাহে ডুবে থাকে এবং যখন দেখে মৃত্যু মাথার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন তওবার ওজিফা পড়তে শুরু করে — আল্লাহর কাছে তাদের তওবা কোনো তওবা নয়। একইভাবে, যারা জেনে-বুঝে সত্যকে অস্বীকার করে, তাদের তওবাও তওবা নয় — যদি তারা মৃত্যুর সময় পর্যন্ত এই অস্বীকারের ওপর অটল থাকে।
তওবা কবুল হওয়া এবং না হওয়ার এই দুটো অবস্থা কুরআন নির্ধারিত করে দিয়েছে। এরপর কেবল একটি অবস্থাই বাকি থাকে যে, কোনো ব্যক্তি গুনাহের পর দ্রুত তওবা করার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেনি, কিন্তু সে এতটুকু দেরিও করেনি যে, মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়েছে। এই অবস্থা সম্পর্কে কুরআন নীরব। এই নীরবতা যেভাবে আশা জাগায়, একইভাবে ভয়ও সৃষ্টি করে; এবং কুরআনের উদ্দেশ্য এটাই মনে হয় যে, বিষয়টি ভয় ও আশার মাঝখানেই থাকুক। এ ধরনের লোকদের ব্যাপারে শাফায়াত তথা সুপারিশের আশা করা যেতে পারে।
জামাল ও কামাল (সৌন্দর্য ও পূর্ণতা)
মানুষের নৈতিক সত্তার সৌন্দর্য যখন স্রষ্টা ও সৃষ্টি — উভয় ক্ষেত্রে পূর্ণতার স্তরে পৌঁছায়, তখন তার থেকে যে গুণাবলি জন্ম নেয় কিংবা কুরআনের দৃষ্টিতে জন্ম নেওয়া উচিত — আল্লাহতায়ালা সেগুলোও এক জায়গাতেই বর্ণনা করেছেন। এগুলো দশটি বিষয় এবং পুরো কুরআনে এগুলোর ব্যাপারে কোনো সংযোজন হয়নি। কুরআনের নিকট ধর্মের জামাল ও কামাল (সৌন্দর্য ও পূর্ণতা) এটাই। কুরআন তার অনুসারীদের এই স্তরে পৌঁছাতে এবং এটা অর্জন করতে আহ্বান জানায়।
এই গুণাবলি নিম্নরূপ:
ইসলাম
প্রথম বিষয় — ইসলাম। এখানে যে পদ্ধতিতে এটা ইমানের সাথে এসেছে, সে পদ্ধতিতে এটা দ্বারা ধর্মের বাহ্যিক দিক উদ্দেশ্য। অর্থাৎ ঐ হেদায়েত, যা মানুষের কথাবার্তা, কাজকর্ম এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাথে সম্পর্কিত। সুতরাং মানুষের জিহ্বা যদি আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশে খোলা ও বন্ধ হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে, তার চোখ যদি তাঁদের ইশারায় দেখতে ও অবনমিত হতে তৈরি থাকে, তার কান যদি তাঁদের নির্দেশনায় শুনতে ও শুনতে অস্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে, তার হাত যদি তাঁদের আদেশে উঠতে ও নত হতে অপেক্ষমান থাকে এবং তার পা যদি তাঁদের ফরমানে চলতে ও থেমে যেতে দ্বিধা না করে, তবে এটাই হলো ইসলাম। কুরআন থেকে জানা যায় যে, এর সর্বোত্তম নমুনাও নবী (আলাইহিমুস সালাম)-গণ। সেজন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, আত্মসমর্পণ ও সন্তুষ্টির (তাসলিম ও রেজা) এই স্তরে পৌঁছানোর জন্য মানুষ যেন সেই মহাপুরুষদের অনুসরণ করে, যাদেরকে আল্লাহ তাদের জন্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন।
ইমান
দ্বিতীয় বিষয় — ইমান। এটা ধর্মের অভ্যন্তরীণ রূপ এবং এখানে এটা দ্বারা সেই নিশ্চিত বিশ্বাস তথা ইয়াকিন উদ্দেশ্য, যা আল্লাহতায়ালা এবং তাঁর দাবিসমূহ সম্পর্কে তাঁর প্রকৃত মারেফতের সাথে অর্জিত হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহকে এমনভাবে বিশ্বাস করে যে, আত্মসমর্পণ ও সন্তুষ্টির একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিজের অন্তর ও মস্তিষ্ককে তাঁর কাছে সোপর্দ করে, কুরআনের পরিভাষায় সে হচ্ছে: মুমিন। হৃদয়ের পবিত্রতা, বুদ্ধির আলো এবং সংকল্পের পরিচ্ছন্নতা এটা থেকেই অর্জিত হয়। এই ইমান-ই জ্ঞান ও কর্ম — উভয়কে একসাথে প্রভাবিত করে এবং মানুষের পুরো সত্তার ওপর ছায়া বিস্তার করে। অতঃপর আল্লাহর স্মরণ, তাঁর আয়াতসমূহের তিলাওয়াত এবং নিজের ভিতরে ও বাইরের জগতে এসব আয়াতের বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে ইমানের বৃদ্ধি ঘটে। কুরআনে এর দাবি এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, দুনিয়ার কোনো জিনিসই ইমানের ধারকদের কাছে আল্লাহ ও রাসুলের চেয়ে বেশি প্রিয় হওয়া উচিত নয়।
কুনুত
তৃতীয় বিষয় — কুনুত। এটা সেই মানসিক অবস্থা, যা মানুষকে পূর্ণ ইখলাস এবং একাগ্রতার সাথে সর্বদা নিজের প্রতিপালকের আনুগত্যে অবিচল রাখে। মুমিন বান্দার অস্তিত্বের অন্তঃস্থলে বান্দা ও মাবুদের সম্পর্কের সবচেয়ে উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ এটাই। সুতরাং ‘কানিতিন’ হলো সেই সব লোক, যারা সর্বদা দাসত্বের মধ্যে থাকে। দুঃখ, সুখ, উত্তেজনা, আবেগ এবং আনন্দ ও বেদনার কোনো অবস্থাতেই নিজের স্রষ্টার অবাধ্য হয় না। কামনার জোয়ার, আবেগের আক্রমণ এবং লালসার ভিড়ও যেন তাদের আল্লাহর সামনে কখনো বেয়াদব হতে না দেয়। তাদের অন্তর হবে আল্লাহর আরশ এবং তাঁর শরিয়তকে তারা হাজির অবস্থায় দেওয়া নির্দেশ মনে করবে, যা লঙ্ঘন করার কল্পনাও দরবারে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো ব্যক্তি করতে পারে না। একটু গভীরভাবে ভেবে দেখলে বোঝা যায়, এটা ঠিক সেই অবস্থা — যা এই পুরো জগৎ এবং এর সমস্ত সৃষ্টি তাদের নিজেদের অস্তিত্ব ও অবস্থা দিয়ে প্রকাশ করছে।
সিদক
চতুর্থ বিষয় — সিদক। এটা কথা, কাজ এবং সংকল্প — এই তিনের মিল ও দৃঢ়তার বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। মানুষের মুখ থেকে যেন সত্যের পরিপন্থী কোনো শব্দ না বের হয়, তার কথা ও কাজে কোনো বৈপরীত্য না থাকে এবং সে নিজের প্রতিটি কথা রক্ষা করে — তবে এটাই হচ্ছে: কথা ও কাজের সত্যবাদিতা। কিন্তু এর সাথে নিয়ত ও সংকল্পের সত্যবাদিতাও অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। কুরআন এর বিপরীত চরিত্রকে নিফাক এবং এটাকে ইখলাস হিসেবে অভিহিত করেছে। অতঃপর বিভিন্ন জায়গায় স্পষ্ট করেছে যে, আল্লাহর কাছে কর্মের আসল রূপ সেটাই, যা হৃদয়ের কারখানায় তৈরি হয়। অতএব সিদক-এর পূর্ণতার স্তর অর্জিত হয় কথা, কাজ ও সংকল্পের এই সামঞ্জস্য থেকে।
সবর
পঞ্চম বিষয় — সবর। এটা প্রাথমিক অর্থে নফস বা প্রবৃত্তিকে অস্থিরতা ও ব্যাকুলতা থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে আসে। এরপর এর মাধ্যমে বাধা-বিপত্তি ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বীরত্ব, দৃঢ়তা ও অবিচলতার সাথে নিজের অবস্থানে অটল থাকার অর্থ এতে সৃষ্টি হয়েছে। এটা কোনো অক্ষমতা বা হীনম্মন্যতার বিষয় নয়, যা নিরুপায় অবস্থায় বাধ্য হয়ে গ্রহণ করা হয়; বরং এটা দৃঢ় সংকল্প ও সাহসের উৎস এবং গোটা জীবনাচার ও চরিত্রের জামাল ও কামাল (সৌন্দর্য ও পূর্ণতা)। সবর থেকেই মানুষের মধ্যে এই মানসিক শক্তি সৃষ্টি হয় যে, জীবনের অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতাগুলোর ব্যাপারে অভিযোগ বা আর্তনাদের পরিবর্তে সে সেগুলোকে সন্তুষ্টির সাথে কবুল করে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে মনে করে সেগুলোকে স্বাগত জানায়; কর্মের ফল পেতে দেরি হলে বিচলিত হয় না; অস্থিরতা ও ব্যাকুলতা থেকে বেঁচে থাকে; মন্দ আচরণকারীদের বিরুদ্ধেও নিজের অন্তরে প্রতিশোধের কোনো আবেগ সৃষ্টি হতে দেয় না; হকের সপক্ষে দাঁড়ানোর সুযোগ আসলে মৃত্যুকে সামনে দেখেও অবিচল থাকে; দুঃখ ও সুখের প্রতি অবস্থায় আত্মসংবরণ করে; এবং যে বিষয়কে কর্তব্য ও আবশ্যক মনে করে, সারা জীবন তার ওপর অটল থাকে।
মানুষের চরিত্রের এই দিকটি দিয়েই আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে সেই সম্পর্ক তৈরি হয়, যাকে তাওয়াক্কুল (নির্ভরতা) বলে। অর্থাৎ সব অবস্থায় একমাত্র আল্লাহর ওপরই ভরসা করা। ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ হলো এই আত্মসমর্পণ ও নিজেকে সোপর্দ করার বাণী। কুরআনের বর্ণনা হচ্ছে, ঐসব লোকের জন্য আল্লাহতায়ালার বিশেষ করুণা ও অনুগ্রহ রয়েছে, যারা এই বাণীর ওপর অটল থাকে এবং এভাবেই দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়।
খুশু
ষষ্ঠ বিষয় — খুশু। আল্লাহতায়ালার মাহাত্ম্য এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের সঠিক ধারণা থেকে যে নম্রতা, দৈন্য ও বিনয় মানুষের ভিতরে সৃষ্টি হয়, কুরআন তাকে ‘খুশু’ হিসেবে অভিহিত করে। এটা হৃদয়ের একটি অবস্থা, যা তাকে আল্লাহর সামনে নত করে এবং অন্য মানুষের জন্যেও তার অন্তরে মায়া ও মমতার আবেগ সৃষ্টি করে।
প্রথম অবস্থায়, এর সর্বোত্তম প্রকাশ ঘটে নামাজে — বিশেষ করে রাতের নামাজে; যখন মুমিন বান্দা দুনিয়ার সব কিছু থেকে আলাদা হয়ে একাকী নিজের প্রতিপালকের সাথে চুপিচুপি কথা বলে এবং নিজের নিঃসঙ্গতাকে আল্লাহর জিকির ও শুকরিয়ায় পূর্ণ করে দেয়।
দ্বিতীয় অবস্থায়, এই অবস্থা মুমিন বান্দার পুরো ব্যক্তিত্বের ওপর প্রভাব ফেলে এবং তাকে নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য আপাদমস্তক স্নেহশীল, নিজের বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী ও সাক্ষাৎকারীদের জন্য আগাগোড়া রহমত এবং নিজের সমাজের জন্য হেদায়েতের এক উৎস বানিয়ে দেয়। এ ধরনের সহনশীল ও দয়ালু মানুষদের মাধ্যমেই সেই সভ্যতা অস্তিত্বে আসে, যা জমিনে আল্লাহর জান্নাত এবং প্রতিটি সুস্থ স্বভাবের মানুষের লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু।
সদকা
সপ্তম বিষয় — সদকা। আল্লাহর পথে ব্যয়ের একটি স্তর হচ্ছে, মানুষ নিজের সম্পদ থেকে ফরজ যাকাত আদায় করবে। দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে, নিজের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনের অতিরিক্ত যা কিছু আছে, সেটাকে সমাজের হক মনে করবে এবং যখন কোনো দাবি সামনে আসবে, তখন তা উদারচিত্তে পূরণ করবে। তৃতীয় স্তর হচ্ছে, নিজের আকাঙ্ক্ষাকে দমন করে এবং নিজের প্রয়োজনে আত্মত্যাগ করেও অন্যের প্রয়োজন পূরণ করা। সদকা প্রদানকারীদের বর্ণনায় এই সবগুলো অবস্থাই শামিল হতে পারে, কিন্তু গুণাবলি বর্ণনার ক্ষেত্রে যখনই এই শব্দ ব্যবহৃত হবে, তখন সেটা দ্বারা মূলত সদকার পূর্ণতার স্তরের দিকেই ইশারা করা হয়। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির মধ্যে এই গুণ থাকার অর্থ — তিনি একজন উদার ও বড় মনের মানুষ, যিনি আল্লাহর পথে খরচ করার কোনো সুযোগই হাতছাড়া হতে দেন না। বান্দাদের সাথে সম্পর্কের দিক থেকে এটা সেই খুশু-র-ই বহিঃপ্রকাশ, যা আগে উল্লেখ করা হয়েছে। নামাজ ও আল্লাহর পথে ব্যয়ের কথা কুরআনে এই কারণেই পাশাপাশি আসে।
রোজা
অষ্টম বিষয় — রোজা। এটা আত্মসংবরণ এবং সবর অর্জনের বিশেষ ইবাদত। কুরআনে এর উদ্দেশ্য এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, এর দ্বারা তাকওয়া অর্জিত হয়। সুতরাং গুণাবলি বর্ণনার ক্ষেত্রে যখন রোজাদারদের কথা আসবে, তখন এর দ্বারা সেসব লোক উদ্দেশ্য হবে, যারা তাকওয়া অর্জনের এতই আগ্রহী যে, এর জন্য তারা অধিকাংশ সময় রোজা রাখে। এ থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, তারা মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকে, অশ্লীলতা পরিহার করে এবং নিজেদের জীবনে সর্বোচ্চ নৈতিকতার সর্বোত্তম নমুনা হয়।
হিফজে ফুরুজ
নবম বিষয় — হিফজে ফুরুজ। অর্থাৎ যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটা আত্মসংবরণ ও তাকওয়ার ফল। নগ্নতা, অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতা পরিহারকারীদের জন্য এই পরিভাষা কুরআনের বহু স্থানে এসেছে। এর অর্থ, তারা নিজেদের সতীত্ব ও চারিত্রিক পবিত্রতা চূড়ান্ত পর্যায়ে রক্ষা করে। সেজন্য আল্লাহ যেখানে অনুমতি দিয়েছেন, তা ছাড়া নির্জনে বা প্রকাশ্যে তারা নিজেদের সতর (আবরণ) কারো সামনে খোলে না এবং এমন পোশাক কখনো পরিধান করে না, যা এমন অঙ্গগুলোকে প্রকাশ করে — যেগুলোর মধ্যে কোনো দিক থেকে যৌন আকর্ষণ থাকে। অশ্লীলতা পরিহারের এই স্তর থেকেই সেই সংস্কৃতি জন্ম নেয়, যেখানে হায়া বা লজ্জা শাসন করে এবং নারী ও পুরুষ উভয়ই নিজের শরীরকে যতটা সম্ভব খোলামেলা রাখার পরিবর্তে যতটা সম্ভব ঢেকে রাখতে উদগ্রীব থাকে।
জিকরে কাসির
দশম বিষয় — জিকরে কাসির। অর্থাৎ আল্লাহকে খুব বেশি স্মরণ করা। মুমিন বান্দার অন্তরে যখন নিজের প্রতিপালকের খেয়াল পুরোপুরি গেঁথে যায়, তখন সে নির্দিষ্ট সময়ে ইবাদত করাকেই যথেষ্ট মনে করে না; বরং সবসময় নিজের জিহ্বাকে আল্লাহর জিকিরে চালু রাখে। আল্লাহতায়ালার নিদর্শনসমূহের মধ্যে কোনো নিদর্শন দেখে সে ‘সুবহানাল্লাহ’ (سُبْحَانَ اللَّهِ) বলে। কোনো কাজ সে ‘বিসমিল্লাহ’ (بِسْمِ اللَّه) শুরু দিয়ে করে। কোনো নিয়ামত পেলে সে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ (اَلْحَمْدُ لِلّٰه) বলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। ‘ইনশাআল্লাহ’ (إِنْ شَاءَ اللَّه) এবং ‘মাশাআল্লাহ’ (مَا شَاءَ اللَّه) ছাড়া নিজের কোনো ইচ্ছা বা সংকল্প সে ব্যক্ত করে না, নিজের প্রতিটি বিষয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চায়। কোনো বিপদ এলে আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী হয়। প্রতিটি সমস্যায় তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করে। ঘুমানোর সময় তাঁকে স্মরণ করে ঘুমায় এবং জেগে ওঠার সময় তাঁর নাম নিয়েই ওঠে। মোটকথা প্রতিটি মুহূর্তে এবং প্রতিটি বিষয়ে তার মুখে আল্লাহরই জিকির থাকে। শুধু তাই নয়, নামাজ পড়ে তো সে আল্লাহকে স্মরণ করে; রোজা রাখে তো আল্লাহকে স্মরণ করে; কুরআন তিলাওয়াত করে তো আল্লাহকে স্মরণ করে; দান-খয়রাত করে তো আল্লাহকে স্মরণ করে; মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকে তো আল্লাহকে স্মরণ করে; কখনো মন্দ কাজ করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তৎক্ষণাৎ তাঁর দিকে ফিরে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে।
এই জিকিরের একটি রূপ হচ্ছে: ফিকির (চিন্তা)। খোদাতায়ালার এই দুনিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায় — এতে রয়েছে হাজারো সৃষ্টি, তাদের নানা রঙ-বর্ণ এবং বিচিত্রতা; মানুষের বুদ্ধি ও তার কারিশমা; সমুদ্রের গর্জন, নদীর প্রবাহ, দোদুল্যমান সবুজ শ্যামলিমা এবং আকাশ থেকে বর্ষিত পানি; দিন-রাত্রির আবর্তন; বাতাস ও মেঘমালার ক্রিয়াকলাপ; আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং তাদের বিস্ময়কর গঠন; তাদের উপকারিতা ও কল্যাণ; তাদের উদ্দেশ্য ও প্রজ্ঞা; তারপর নিজের ভিতরে ও বাইরের জগতে খোদার সেই সব নিদর্শন, যা প্রতি মুহূর্তে নতুন মহিমায় প্রকাশিত হয়। মুমিন বান্দা আল্লাহর এসব আয়াত নিয়ে চিন্তা করে, তখন এগুলো তার হৃদয় ও মস্তিষ্ককে আল্লাহর স্মরণে ভরে দেয়। সে চিৎকার করে ওঠে — হে প্রতিপালক, এই কারখানা আপনি অনর্থক তৈরি করেননি। আপনার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মহিমার পরিপন্থী যে, আপনি কোনো উদ্দেশ্যহীন কাজ করবেন। আমি জানি, এই রঙ ও সুবাসের জগতের সমাপ্তি অবশ্যই একদিন কর্মফল দিবসের মাধ্যমে হবে, যেখানে তারা শাস্তি ও লাঞ্ছনার মুখোমুখি হবে, যারা আপনার এই পৃথিবীকে কোনো খেলোয়াড়ের খেলা মনে করে জীবন অতিবাহিত করে। তাদের পরিণাম থেকে আমি আপনার পানাহ চাই।
