ধর্মের প্রতিটি দিক থেকে মানুষের নফসের তাজকিয়া বা পরিশুদ্ধি চায়, এজন্য ধর্ম সব সময় এই বিষয়ে জোর দিয়েছে যে, আত্মিক পবিত্রতার সাথে সাথে পানাহারের বস্তুসমূহের ব্যাপারেও ‘খবিস ও তাইয়্যেব’ তথা অপবিত্র ও পবিত্রের পার্থক্য যেন সর্বাবস্থায় বজায় থাকে। মানুষের ফিতরাত এই বিষয়ে সাধারণত তাকে সঠিক পথনির্দেশনা প্রদান করে এবং সে কোনো দ্বিধা ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে, কোনটি পবিত্র (তাইয়্যেব) এবং কোনটি অপবিত্র (খবিস)। সে চিরকালই জানে যে, সিংহ, চিতা, হাতি, চিল, কাক, শকুন, ঈগল, সাপ, বিচ্ছু এবং স্বয়ং মানুষ কোনো খাদ্যবস্তু নয়। সে জানে যে, ঘোড়া এবং গাধা দস্তরখানের স্বাদের জন্য নয়, বরং এগুলোকে সওয়ারি বা বাহনের কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এই প্রাণীগুলোর মলমূত্রের অপবিত্রতা সম্পর্কেও সে পুরোপুরি অবগত। নেশাজাতীয় দ্রব্যের অপবিত্রতা বোঝার ক্ষেত্রেও তার বুদ্ধি-বিবেক সাধারণত সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। অতএব খোদাতায়ালার শরিয়ত এই বিষয়ে মানুষকে মূলত তার ফিতরাতের নির্দেশনার ওপরই ছেড়ে দিয়েছে।
মানুষের এই ফিতরাত কখনো কখনো বিকৃত হয়, কিন্তু দুনিয়াতে মানুষের অভ্যাসের অধ্যয়ন বলে যে, তাদের একটি বড় অংশ এই বিষয়ে সাধারণত ভুল করে না। মূলত এই কারণে শরিয়ত এ ধরনের কোনো বিষয়কে তার আলোচনার বিষয় বানায়নি। এই অধ্যায়ে শরিয়তের আলোচ্য বিষয় কেবল সেসব প্রাণী এবং তাদের সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি — যেগুলোর হালাল ও হারামের সিদ্ধান্ত কেবল বুদ্ধি-বিবেক ও ফিতরাতের নির্দেশনায় গ্রহণ করা মানুষের জন্য সম্ভব ছিল না। শূকর গবাদি পশুর অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু সে হিংস্র প্রাণীর মতো মাংসও খায়, এমতাবস্থায় তাকে কি খাওয়ার উপযোগী প্রাণী হিসেবে গণ্য করা হবে নাকি হবে না? যেসব প্রাণী আমরা জবাই করে খাই, সেগুলো যদি জবাই করা ছাড়া মারা যায়, তবে তাদের ব্যাপারে হুকুম কী হওয়া উচিত? এই প্রাণীগুলোর রক্ত কি তাদের মলমূত্রের মতো অপবিত্র, নাকি সেগুলোকে হালাল ও পবিত্র ঘোষণা করা হবে? এগুলো যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে জবাই করা হয়, তারপরও কি এগুলো হালাল থাকবে? এই প্রশ্নগুলোর কোনো স্পষ্ট ও অকাট্য জবাব যেহেতু মানুষের জন্য দেওয়া কঠিন ছিল, এজন্য আল্লাহতায়ালা তাঁর নবীদের মাধ্যমে মানুষকে জানিয়েছেন যে, শূকর, রক্ত, মৃত প্রাণী এবং খোদা ছাড়া অন্য কারও নামে জবাই করা প্রাণীও খাওয়ার জন্য পবিত্র নয় এবং মানুষের উচিত সেগুলো থেকে বেঁচে থাকা।
এই বিধানের যে ব্যাখ্যা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, তা হচ্ছে:
১ — স্বাভাবিক মৃত্যুতে মারা যাওয়া প্রাণী এবং আকস্মিক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া প্রাণীর মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হবে না, এই দুটোই সমানভাবে মৃত হিসেবে গণ্য হবে। কোনো হিংস্র পশুর ছিঁড়ে ফেলা প্রাণীও মৃত — যদি না তাকে জীবিত পাওয়া যায় এবং তখন জবাই করে নেওয়া হয় [তাহলে তা ভিন্ন কথা]।
২ — প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রাণী যদি শিকারকে ছিঁড়ে ফেলে এবং শিকার জবাই করার সুযোগ আসার আগেই প্রাণ হারায়, তবে এমন ক্ষেত্রে শিকারি প্রাণীর ছিঁড়ে ফেলাই ঐ জন্তুর ‘তাযকিয়া’ তথা জবাই সম্পন্ন হয়েছে বলে গণ্য হবে, সুতরাং তাকে জবাই করা ছাড়াই খাওয়া যেতে পারে। তবে এর জন্য জরুরি হলো যে, শিকারি প্রাণী যেন জন্তুটি তার মালিকের জন্য ধরে রাখে। তাতে যদি শিকারি প্রাণীটি কিছু খেয়ে ফেলে, তবে সেই শিকার আর জায়েজ থাকবে না।
৩ — সেই প্রাণীও হারাম, যা কোনো আস্তানাতে বা বেদিতে জবাই করা হয়েছে। পশু জবাইয়ের সময় যদি ‘গাইরুল্লাহ’ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নাম নেওয়া হয়নি, কিন্তু সেখানে আল্লাহর নামও নেওয়া হয়নি, তবে সেটাও এই হারামের অন্তর্ভুক্ত। একই বিষয় সেই জবাইকৃত পশু ও শিকারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যার ওপর আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে, কিন্তু নাম নেওয়া ব্যক্তি আল্লাহতায়ালাকে বিশ্বাস করে না, অথবা বিশ্বাস করলেও [আল্লাহকে] দেবতাদের মজলিসে একজন ‘রব্বুল আরবার’ (প্রভুদের প্রভু) হিসেবে মানে এবং শিরক-কে মূলত নিজের ধর্ম হিসেবে গণ্য করে।
৪ — এই হারামসমূহের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হচ্ছে: নিরুপায় অবস্থা — এবং সেটাও এভাবে যে, ব্যক্তি তাতে আগ্রহী হবে না এবং প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম করবে না।
