আল-ইসলাম

অধ্যায় 8

১. ইবাদতের বিধি-বিধান

জাভেদ আহমেদ গামিদি

ধর্মের উদ্দেশ্য তাজকিয়াতাজকিয়ার পূর্ণতার চরম শিখরে পৌঁছানোর মাধ্যম হলো আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার আবদমাবুদের সম্পর্ক সঠিক পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এই সম্পর্ক যত মজবুত হয়, মানুষ নিজের ইলম ও আমলের পবিত্রতায় ততই উন্নতি করে। মহব্বত, ভয়, ইখলাস ও বিশস্ততা এবং আল্লাহতায়ালার অপরিসীম নিয়ামত ও অগণিত ইহসানের জন্য অনুভব ও স্বীকৃতির আবেগ — এগুলো এই সম্পর্কের বাতিনি বা অভ্যন্তরীণ বহিঃপ্রকাশ। মানুষের দিন ও রাতে এটার প্রকাশ সাধারণত তিনটি রূপে হয়: উপাসনা, আনুগত্য এবং ধর্মীয় আত্মমর্যাদা ও সহযোগিতা। নবী (আলাইহিমুস সালাম)-দের ধর্মে ইবাদতসমূহ এই সম্পর্কের কথা স্মরণ করানোর জন্যই নির্ধারিত হয়েছে। নামাজ ও যাকাত হলো উপাসনা। কুরবানি ও উমরার হাকিকতও এটাই। রোজা ও ইতিকাফ হলো আনুগত্য; অন্যদিকে হজ্জ হচ্ছে আল্লাহতায়ালার জন্য ধর্মীয় আত্মমর্যাদা ও সহযোগিতার প্রতীকী প্রকাশ।

নামাজ 

এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত নামাজ। ধর্মের হাকিকত নিয়ে যদি চিন্তা করেন, তবে তা মাবুদের মারেফত এবং তাঁর দরবারে ভয় ও মহব্বতের আবেগের সাথে বিনয় ও দাসত্ব ছাড়া আর কিছু নয়। এই হাকিকতের সবচেয়ে সুস্পষ্ট প্রকাশ হলো উপাসনা। তাসবিহ ও তাহমিদ, দোয়া ও মোনাজাত এবং রুকু ও সেজদা এই উপাসনার ব্যবহারিক রূপ। নামাজ এটাই এবং এটা অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণভাবে এই সবগুলো বিষয়কে নিজের মধ্যে ধারণ করে।

ধর্মে এই ইবাদতের গুরুত্ব অপরিসীম। ইমানি বিষয়ে তাওহিদের যে মর্যাদা, আমলের ক্ষেত্রে নামাজের মর্যাদা ঠিক তেমন। আল্লাহর স্মরণকে কায়েম রাখার জন্য নামাজ ফরজ করা হয়েছে। কুরআন থেকে জানা যায় যে, আল্লাহর নিদর্শনসমূহের স্মরণ থেকে খোদার যে মারেফত অর্জিত হয় এবং সেটা থেকে আল্লাহতায়ালার জন্য মহব্বত ও শুকরিয়ার যে আবেগ মানুষের ভিতরে সৃষ্টি হয় বা হওয়া উচিত, তার প্রথম ফল হচ্ছে: এই নামাজ। এটা ইসলামের স্তম্ভ। দুনিয়া ও আখিরাতে একজন মানুষ যেসব শর্তের ভিত্তিতে মুসলমান হিসেবে গণ্য হবে, তার একটি শর্ত হচ্ছে নামাজ। নামাজ ধর্মে অটল থাকার মাধ্যম; নামাজ বিপদ দূর করে, গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেয়; এটা সত্যের দাওয়াতের পরিচয়, সত্যের পথে অবিচল থাকার ভিত্তি, মহাবিশ্বের ফিতরাত এবং প্রকৃত জীবন। খোদাতায়ালার মারেফত, তাঁর জিকির ও ফিকির (চিন্তা) এবং তাঁর নৈকট্যের অনুভূতি যখন পূর্ণতার চরম শিখরে পৌঁছায়, তখন তা নামাজে রূপান্তরিত হয়। দুনিয়ার সকল খোদায়ি মারেফত অর্জনকারীদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, আসল জীবন হলো অন্তরের জীবন, আর অন্তরের জীবন হলো এই মারেফত, জিকির ও ফিকির এবং আল্লাহর নৈকট্য। এই জীবন মানুষ কেবল নামাজ থেকে লাভ করে এবং নামাজের মাধ্যমেই তা টিকে থাকে। 

নামাজের ইতিহাস

নামাজের ইতিহাস ঠিক ততটাই প্রাচীন, যতটা প্রাচীন ধর্ম নিজেই। নামাজের ধারণা সকল ধর্মে বিদ্যমান ছিল এবং এর রীতিনীতি ও আদায়ের সময়কালও কম-বেশি নির্ধারিত ছিল। হিন্দুদের ভজন, পার্সিদের জমজমা, খ্রিষ্টানদের প্রার্থনা এবং ইহুদিদের মাযামির (স্তবগান) — সবই এটারই স্মৃতিচিহ্ন। কুরআন জানাচ্ছে, আল্লাহর সকল নবী নামাজের শিক্ষা দিয়েছেন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুয়ত যে ইব্রাহিমি ধর্মের সংস্কারের জন্য হয়েছিল, তাতেও এর মর্যাদা ছিল সবচেয়ে অগ্রগণ্য। কুরআন যখন মানুষকে নামাজের নির্দেশ দিল, তখন এটা তাদের জন্য কোনো অপরিচিত বিষয় ছিল না। তারা এর আদব, শর্তাবলি এবং আমল ও জিকির-আজকার সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিল। ফলে কুরআন এটার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেনি। ইব্রাহিমি ধর্মের একটি ঐতিহ্য হিসেবে নামাজ যেভাবে আদায় করা হতো, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরআনের নির্দেশে কিছু পরিবর্তনের সাথে এটাকে তার অনুসারীদের জন্য জারি করেন এবং বংশপরম্পরায় তারা ঠিক সেভাবেই নামাজ আদায় করে আসছে।

নামাজের শর্তাবলি

নামাজের জন্য যেসব বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি, তা হলো:

· নামাজ আদায়কারী নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকবে না।

· তিনি যদি নারী হন, তবে হায়েজ (মাসিক) ও নেফাস (সন্তান জন্মদান পরবর্তী রক্তস্রাব) অবস্থায় থাকবেন না।

· তিনি ওজু অবস্থায় থাকবেন এবং হায়েজনেফাস অথবা জানাবাতের (স্ত্রী-সহবাস বা বীর্যপাতের কারণে সৃষ্ট অপবিত্রতা) পরে গোসল করে নেবেন।

· সফর, অসুস্থতা অথবা পানির অপ্রাপ্যতার ক্ষেত্রে এই দুই পদ্ধতিই কঠিন হয়ে পড়লে তিনি তায়াম্মুম (মাটি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন) করবেন।

· কিবলার দিকে মুখ করে নামাজের জন্য দাঁড়াবেন।

ওজু করার নিয়ম হলো: প্রথমে মুখ ধোয়া হবে, তারপর কনুই পর্যন্ত হাত ধোয়া হবে, তারপর পুরো মাথা মাসেহ করা হবে এবং এরপর পা ধুয়ে নেওয়া হবে।

ওজু যদি একবার করা হয়, তবে ততক্ষণ পর্যন্ত তা বহাল থাকে, যতক্ষণ না কোনো ওজু ভঙ্গকারী কোনো অবস্থা মানুষের সামনে আসে। অতএব, ওজুর এই হেদায়েত ঐ অবস্থার জন্য, যখন ওজু থাকে না। কিন্তু যদি কেউ মনের প্রফুল্লতার জন্য নতুন করে ওজু করে, তবে সেটা ভিন্ন কথা।

ওজু ভঙ্গের কারণগুলো নিম্নরূপ:

১. প্রস্রাব করা

২. পায়খানা করা

৩. বায়ু নির্গত হওয়া, চাই তা শব্দের সাথে হোক বা নিঃশব্দে

৪. মযি (যৌন উত্তেজনায় নির্গত পাতলা তরল) বা ওদি (প্রস্রাবের আগে-পরে আসা সাদা আঠালো তরল) নির্গত হওয়া।

সফর, অসুস্থতা বা পানির অপ্রাপ্যতার ক্ষেত্রে ওজু ও গোসল — উভয়টিই কঠিন হয়ে পড়লে আল্লাহতায়ালা অনুমতি দিয়েছেন যে, ব্যক্তি তায়াম্মুম করতে পারে। এর নিয়ম হলো: কোনো পাকপবিত্র জায়গা দেখে সেটা দিয়ে চেহারা ও হাত মাসেহ করা। এটা সব ধরনের অপবিত্রতার জন্য যথেষ্ট। ওজু ভঙ্গকারী কিছু ঘটে গেলে তারপরও এটা করা যেতে পারে এবং সহবাসের পর জানাবাতের গোসলের বদলেও এটা করা যেতে পারে। অধিকন্তু, অসুস্থতা ও সফরের অবস্থায় পানি থাকা সত্ত্বেও মানুষ তায়াম্মুম করতে পারে।

তায়াম্মুম দ্বারা আপাতদৃষ্টিতে কোনো পবিত্রতা অর্জিত হয় না, কিন্তু যদি একটু চিন্তা করেন, তবে আসল পবিত্রতার পদ্ধতিকে মনের স্মৃতিতে বজায় রাখার দিক থেকে তায়াম্মুমের বড় গুরুত্ব রয়েছে। শরিয়তে সাধারণত এই বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয় যে, যখন আসল সুরতে কোনো হুকুমের ওপর আমল করা সম্ভব হয় না বা খুব কঠিন হয়ে পড়ে, তখন সাদৃশ্যপূর্ণ রূপে তার স্মৃতি অবশিষ্ট রাখা হয়। এর উপকার হচ্ছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া মাত্রই মানুষের মেজাজ বা স্বভাব আসল রূপের দিকে ফিরে যেতে প্রস্তুত হয়।

নামাজের আমল বা কাজ

নামাজের জন্য যে আমলসমূহ নির্ধারিত করা হয়েছে, সেগুলো হলো:

· নামাজ শুরু করার সময় ‘রফউল ইয়াদাইন’ করা, অর্থাৎ দুই হাত ওপরের দিকে তোলা।

· কিয়াম করা (দাঁড়ানো)।

· এরপর রুকু করা।

· রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়ানো (কওমা)।

· এরপর পরপর দুটি সেজদা করা।

· প্রতি দুই রাকাত পর এবং শেষ রাকাতে নামাজি ব্যক্তি ‘কাদা’ (দুই পা ভাঁজ করে বসা) পদ্ধতিতে বসবেন।

· নামাজ শেষ করার ইচ্ছা থাকলে ‘কাদা’ পদ্ধতিতে বসা অবস্থায় মুখ ফিরিয়ে (সালামের মাধ্যমে) নামাজ শেষ করা।

নামাজের জিকির-আজকার

নামাজের জিকিরসমূহ নিম্নরূপ:

· নামাজ শুরুর সময় ‘আল্লাহু আকবার’ (اَللّٰہُ اَکْبَرُ) বলা।

· কিয়ামের (দাঁড়ানো) অবস্থায় সুরা ফাতিহা পাঠ করা এবং এরপর নিজের সুবিধা অনুযায়ী কুরআনের অন্য কোনো অংশ তিলাওয়াত করা।

· রুকুতে যাওয়ার সময় ‘আল্লাহু আকবার’ (اَللّٰہُ اَکْبَرُ) বলা।

· রুকু থেকে ওঠার সময় ‘সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ’ (سَمِعَ اللّٰہُ لِمَنْ حَمِدَہُ) বলা।

· সেজদায় যাওয়া এবং সেজদা থেকে ওঠার সময়ও ‘আল্লাহু আকবার’ (اَللّٰہُ اَکْبَرُ) বলা।

· বসা অবস্থা থেকে পুনরায় দাঁড়ানোর সময় ‘আল্লাহু আকবার’ (اَللّٰہُ اَکْبَرُ) বলা।

· নামাজ শেষ করার জন্য ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ (اَلسَّلَامُ عَلَیْکُمْ وَرَحْمَۃُ اللّٰہِ) বলা।

اَللّٰہُ اَکْبَرُ (আল্লাহ সবচেয়ে বড়), سَمِعَ اللّٰہُ لِمَنْ حَمِدَہُ (আল্লাহ তার কথা শুনেছেন, যে তাঁর হামদ করেছে) এবং اَلسَّلَامُ عَلَیْکُمْ وَرَحْمَۃُ اللّٰہِ (আপনার ওপর শান্তি ও আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক) — ইমাম সবসময় এগুলো উচ্চস্বরে বলবে। মাগরিব ও এশার প্রথম দুই রাকাতে এবং ফজর, জুমআ ও দুই ঈদের নামাজে তিলাওয়াতও উচ্চস্বরে হবে। মাগরিবের তৃতীয় এবং এশার তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে এটা সবসময় নিচুস্বরে হবে। জোহর ও আসরের নামাজে একই পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে। এই নামাজগুলোর চার রাকাতেই তিলাওয়াত নিচুস্বরে হবে।

নামাজের জন্য শরিয়তের নির্ধারিত জিকিরসমূহ এগুলোই এবং এগুলোর ভাষা আরবি। এগুলো ছাড়াও নামাজ আদায়কারী যে ভাষায় চায় তাসবিহ ও তাহমিদ এবং দোয়া ও মোনাজাত জাতীয় অন্য কোনো জিকির নিজের নামাজে করতে পারেন।

নামাজের ওয়াক্ত বা সময়

মুসলমানদের জন্য দিন-রাত মিলিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়েছে। এই ওয়াক্তসমূহ নিম্নরূপ:

ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব এবং এশা।

· ফজর: যখন ভোরের সাদা আভা কালো রেখা থেকে আলাদা হয়ে যায়।

· জোহর: সূর্য মধ্যাকাশ থেকে ঢলে পড়ার সময়।

· আসর: যখন সূর্য চোখের দৃষ্টিসীমা থেকে কিছুটা নিচে নেমে আসে।

· মাগরিব: সূর্যাস্তের সময়।

· এশা: আকাশের লাল আভা শেষ হয়ে যাওয়ার সময়।

ফজরের সময় সূর্যোদয় পর্যন্ত, জোহরের সময় আসর পর্যন্ত, আসরের সময় মাগরিব পর্যন্ত, মাগরিবের সময় এশা পর্যন্ত এবং এশার সময় মধ্যরাত পর্যন্ত থাকে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় যেহেতু (অন্য ধর্মে) সূর্যের পূজা করা হতো, তাই এই দুই সময়ে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নবী (আলাইহিমুস সালাম)-দের ধর্মে নামাজের সময় সব সময় এমনই ছিল।

নামাজের রাকাত সংখ্যা

নামাজের জন্য যে রাকাতসমূহ নির্ধারিত, সেগুলো নিম্নরূপ:

· ফজর           : ২ রাকাত।

· জোহর         : ৪ রাকাত।

· আসর          : ৪ রাকাত।

· মাগরিব        : ৩ রাকাত।

· এশা             : ৪ রাকাত।

নামাজের ফরজ রাকাত এগুলোই, যা ছেড়ে দিলে কিয়ামতে জবাবদিহি করতে হবে। তাই যেসব অবস্থায় নামাজ কসর (সংক্ষেপ) করার অনুমতি আছে, তা ছাড়া এই নামাজগুলো অবশ্যই পড়তে হবে। এগুলো বাদে বাকি সব নামাজই নফল, যা পড়লে সওয়াব পাওয়া যাবে, কিন্তু না পড়লে আল্লাহতালার পক্ষ থেকে কোনো শাস্তির ভয় নেই।

নামাজের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়

কোনো বিপদ, দুশ্চিন্তা বা চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সময় যদি নামাজের ওয়াক্ত হয়, তবে আল্লাহতায়ালা অনুমতি দিয়েছেন যে, হেঁটে বা সওয়ারিতে (বাহনে) থাকা অবস্থায় যেভাবে সম্ভব নামাজ পড়া যাবে। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই জামাতের আয়োজন থাকবে না, কিবলার দিকে মুখ করার বাধ্যবাধকতা থাকবে না এবং নামাজের সাধারণ নিয়মগুলোও সব ক্ষেত্রে নির্ধারিত পদ্ধতিতে পালন করা সম্ভব হবে না।

সফর বা ভ্রমণের সময় এমন পরিস্থিতি দেখা দিলে কুরআন আরও জানিয়েছে যে, মানুষ নামাজ কমিয়ে (সংক্ষিপ্ত করে) পড়তে পারে। পারিভাষিকভাবে এটাকে কসর বলা হয়। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জন্য এই সুন্নাত কায়েম করেছেন যে, কেবল চার রাকাতের নামাজগুলো দুই রাকাত করে পড়া হবে। দুই এবং তিন রাকাতের নামাজে কোনো কমতি হবে না। অতএব ফজর এবং মাগরিবের নামাজ এমন অবস্থাতেও পূর্ণ পড়া হবে। কারণ, ফজর আগে থেকেই দুই রাকাত এবং মাগরিব হলো দিনের বিতর তথা বেজোড়, তাই এই নামাজগুলোর ধরনে কোনো পরিবর্তন হবে না।

নামাজের রাকাত সংখ্যায় এই ছাড় দেওয়ার বিষয় থেকে সময়ের ক্ষেত্রেও ছাড় পাওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। অর্থাৎ এ ধরনের সফরে জোহর-আসর এবং মাগরিব-এশা একত্রে (জমা করে) পড়া যেতে পারে।

নামাজের জামাত

নামাজ যদিও একা-একা পড়া যায়, তবে উত্তম হলো জামাতের সাথে এবং সম্ভব হলে কোনো ইবাদতখানা তথা মসজিদে গিয়ে তা আদায় করা। এই উদ্দেশ্যে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইয়াসরিব শহর বা মদিনাতে পৌঁছে সবার আগে মসজিদ নির্মাণ করেন এবং এখান থেকেই মুসলমানদের প্রতিটি পাড়া ও মহল্লায় মসজিদ নির্মাণের ঐতিহ্য শুরু হয়। মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ পড়ার অনেক ফজিলত রয়েছে। নারীরা অবশ্য এর থেকে ব্যতিক্রম। তবে কোনো মুসলমান পুরুষের উচিত নয় কোনো কারণ ছাড়া জামাত ত্যাগ করা।

জামাত কায়েম করার নিয়ম

১.   নামাজের আগে আজান দেওয়া হবে, যাতে মানুষ আজান শুনে জামাতে শামিল হতে পারে। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আজানের জন্য যে বাক্যগুলো নির্ধারণ করেছেন, সেগুলো হলো:

اَللّٰہُ اَکْبَرُ؛ اَشْہَدُ اَنْ لَّا اِلٰہَ اِلَّا اللّٰہُ؛ اَشْہَدُ اَنَّ مُحَمَدًا رَّسُوْلُ اللّٰہِ؛ حَیَّ عَلَی الصَّلٰوۃِ؛ حَیَّ عَلَی الْفَلَاحِ؛ اَللّٰہُ اَکْبَرُ؛ لَا اِلٰہَ اِلَّا اللّٰہُ.

আল্লাহু আকবার; আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ; আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ; হাইয়্যা আলাস সালাহ; হাইয়্যা আলাল ফালাহ; আল্লাহু আকবার; লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।

“আল্লাহ সবচেয়ে বড়; আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল; নামাজের দিকে আসো; কল্যাণের দিকে আসো; আল্লাহ সবচেয়ে বড়; আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।”

২.   মুক্তাদি (ইমামের অনুসারী) একজন হলে তিনি ইমামের ডান পাশে দাঁড়াবেন। আর একাধিক হলে ইমাম মাঝখানে থাকবেন এবং মুক্তাদিরা তার পিছনে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবেন।

৩.   নামাজ শুরু করার জন্য ইকামত বলা হবে। ইকামতে আজানের শব্দগুলোই পুনরায় বলা হবে। পার্থক্য কেবল এতটুকু যে, حَیَّ عَلَی الْفَلَاحِ (হাইয়্যা আলাল ফালাহ)-এর পর ইকামত প্রদানকারী قَدْ قَامَتِ الصَّلٰوۃُ (কাদ কামাতিস সালাহ — নামাজ দাঁড়িয়ে গেছে) কথাটি বলবেন।

৪.   আজানের বাক্যগুলো প্রয়োজনে একের অধিকবার বলা যেতে পারে।

৫.   ইকামতের বাক্যগুলোও প্রয়োজনে একইভাবে পুনরাবৃত্তি করা যেতে পারে।

নামাজে ভুল

নামাজের জন্য যে সমস্ত আমল ও জিকির নির্ধারিত, সেগুলোর মধ্যে কোনো ভুল হয়ে গেলে অথবা সন্দেহ হয় যে ভুল হয়েছে, তবে এই সুন্নাত নির্ধারিত রয়েছে যে, ভুলের প্রতিকার করা সম্ভব হলে সেটা করার পর, আর সম্ভব না হলে প্রতিকার ছাড়াই নামাজের শেষে দুটো অতিরিক্ত সেজদা করবে।

জুমার নামাজ

জুমার দিনে মুসলমানদের ওপর এটা আবশ্যক করা হয়েছে যে, তারা জোহরের নামাজের পরিবর্তে এই দিনের জন্য নির্ধারিত একটি বিশেষ সম্মিলিত বা জামাতবদ্ধ নামাজের আয়োজন করবে। এই নামাজের পদ্ধতি হলো:

· এই নামাজ দুই রাকাত পড়া হবে।

· জোহরের নামাজের বিপরীতে এই নামাজের উভয় রাকাতেই তিলাওয়াত উচ্চস্বরে হবে।

· নামাজের জন্য তাকবির (ইকামত) বলা হবে।

· নামাজের আগে ইমাম উপস্থিত মুসল্লিদের উপদেশ ও নসিহতের জন্য দুটো খুতবা দেবেন। এই খুতবা দাঁড়িয়ে দিতে হবে। প্রথম খুতবার পর এবং দ্বিতীয় খুতবা শুরু করার আগে ইমাম কয়েক মুহূর্তের জন্য বসবেন।

· নামাজের আজান তখন দেওয়া হবে, যখন ইমাম খুতবা দেওয়ার জায়গায় চলে আসবেন।

· আজান হওয়ার সাথে সাথেই সমস্ত মুসলমান পুরুষের জন্য জরুরি যে, যদি কোনো যুক্তিসঙ্গত ওজর না থাকে, তবে তারা নিজেদের কাজকর্ম ছেড়ে নামাজের জন্য উপস্থিত হবে।

· নামাজের খুতবা এবং এর ইমামতি মুসলমানদের আরবাব-এ-হাল ও আকদ (রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল বা শাসনকর্তা) করবেন। এই নামাজ কেবল সেই সব স্থানেই আদায় করা হবে, যা তাদের পক্ষ থেকে জামাতের জন্য নির্ধারণ করা হবে এবং যেখানে তারা নিজে অথবা তাদের কোনো প্রতিনিধি ইমামতির জন্য উপস্থিত থাকবেন।

দুই ঈদের নামাজ

ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনেও মুসলমানদের ওপর এটা আবশ্যক যে, সূর্যোদয়ের পর এবং দ্বিপ্রহরের আগে তারা জুমার মতোই একটি সম্মিলিত নামাজের আয়োজন করবে। এর পদ্ধতি নিম্নরূপ:

· এই নামাজ দুই রাকাত পড়া হবে।

·  উভয় রাকাতেই তিলাওয়াত উচ্চস্বরে হবে।

· কিয়ামের (দাঁড়ানো) অবস্থায় নামাজিরা কয়েকটি অতিরিক্ত তাকবির বলবেন।

· এই নামাজের জন্য কোনো আজান বা তাকবির (ইকামত) হবে না।

· নামাজের পর ইমাম উপস্থিতদের নসিহতের জন্য দুটো খুতবা দেবেন। এই খুতবা দাঁড়িয়ে দিতে হবে। প্রথম খুতবার পর এবং দ্বিতীয় খুতবা শুরুর আগে ইমাম কয়েক মুহূর্ত বসবেন।

· এই নামাজের খুতবা এবং ইমামতিও জুমার নামাজের মতো মুসলমানদের আরবাব-এ-হাল ও আকদ (রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল বা শাসনকর্তা) করবেন এবং এই নামাজ সেসব স্থানেই আদায় করা হবে, যা তাদের পক্ষ থেকে নির্ধারিত এবং যেখানে তারা নিজে বা তাদের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন।

জানাজার নামাজ

মৃত ব্যক্তির জন্য জানাজার নামাজও নবী (আলাইহিমুস সালাম)-দের ধর্মে আবশ্যক করা হয়েছে।

মৃত ব্যক্তিকে গোসল ও দাফন-কাফনের প্রস্তুতির পর এই নামাজ যেভাবে আদায় করা হবে, তা হলো:

· মৃত ব্যক্তিকে নিজের এবং কিবলার মাঝখানে রেখে মুক্তাদিরা ইমামের পিছনে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবেন।

· রফউল ইয়াদাইন বা দুই হাত তুলে ‘আল্লাহু আকবার’ (اَللّٰہُ اَکْبَرُ) বলে নামাজ শুরু করা হবে।

· ঈদের নামাজের মতো এই নামাজেও কয়েকটি অতিরিক্ত তাকবির বলা হবে।

· কিয়াম বা দাঁড়ানো অবস্থাতেই তাকবির এবং দোয়ার পর সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করা হবে।

নামাজের ক্ষেত্রে এটাই সর্বনিম্ন ইবাদত, যার জন্য মুসলমানদের দায়বদ্ধ (মুকাল্লাফ) করা হয়েছে।

[নফল নামাজ]

কুরআনের নির্দেশ হচ্ছে, যে ব্যক্তি নিজের আগ্রহে নেক কাজ করবে, আল্লাহ তা কবুল করবেন। একইভাবে বলা হয়েছে, বিপদের সময় সবর এবং নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। এই নির্দেশের আলোকে মুসলমানরা এই ফরজ নামাজ ছাড়াও সাধারণত নফল নামাজের আয়োজন করে। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেসব নফল নামাজ পড়েছেন বা পড়তে উৎসাহিত করেছেন, সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ হাদিসের কিতাবসমূহে দেখা যেতে পারে।

যাকাত

নামাজের পর যাকাত দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মানুষ সাধারণত নিজের মাবুদের উপাসনার জন্য যেসব নিয়ম গ্রহণ করেছে, তার মধ্যে একটি হলো — নিজের সম্পদ, গবাদি পশু এবং উৎপাদন থেকে একটি অংশ খোদার দরবারে নজরানা হিসেবে পেশ করা। এটাকে সদকা, নিয়াজ, নজরানা বা ভোগ হিসেবে অভিহিত করা হয়।নবী (আলাইহিমুস সালাম)-দের ধর্মে যাকাতের মূল অবস্থান এটাই এবং এ কারণেই এটাকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়। কুরআন বেশ কিছু স্থানে যাকাতের জন্য ‘সদকা’ শব্দ ব্যবহার করেছে এবং স্পষ্ট করেছে যে, এটা অন্তরের বিনয় ও নম্রতা সহকারে আদায় করতে হবে। এ ব্যাপারে প্রচলিত নিয়ম ছিল যে, নজরানা পেশ করার পর তা ইবাদতখানা থেকে তুলে নিয়ে এটার খাদেমদের দেওয়া হতো, যেন তারা ইবাদত করতে আসা মানুষদের সেবা করতে পারে। এখন সেই পদ্ধতি আর নেই। এর পরিবর্তে মুসলমানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে এই সম্পদ আরবাব-এ-হাল ও আকদ (রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলদের) নিকট সোপর্দ করতে হবে। তবে এতে যাকাতের মূল হাকিকতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। এটা খোদার জন্যই নির্ধারিত এবং বান্দারা যখন যাকাত আদায় করে, তখন এটার কবুল হওয়ার ফয়সালাও খোদার দরবার থেকেই হয়।

যাকাতের ইতিহাস

যাকাতের ইতিহাস সেটাই, যা নামাজের ইতিহাস। কুরআন থেকে জানা যায় যে, নামাজের মতো যাকাতের বিধানও নবী (আলাইহিমুস সালাম)-দের শরিয়তে সব সময় বিদ্যমান ছিল। আল্লাহতায়ালা যখন মুসলমানদের যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিলেন, তখন এটা তাদের জন্য কোনো অপরিচিত বিষয় ছিল না। ইব্রাহিমি ধর্মের সমস্ত অনুসারী যাকাতের নিয়ম সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিল। ফলে এটা আগে থেকেই বিদ্যমান একটি সুন্নাত ছিল, যা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খোদাতায়ালার হুকুমে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের পর মুসলমানদের মধ্যে জারি করেছেন।

যাকাতের উদ্দেশ্য

যদি গভীরভাবে চিন্তা করা হয়, তবে যাকাতের উদ্দেশ্য এর নাম থেকেই নির্ধারিত হয়। এই শব্দটির মূল হচ্ছে: ‘বৃদ্ধি’ ও ‘পবিত্রতা’। সুতরাং, যাকাত বলতে সেই মাল বা সম্পদকে বোঝায়, যা আত্মিক পরিশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জনের জন্য ব্যয় করা হয়। এর থেকে স্পষ্ট যে, যাকাতের উদ্দেশ্য সেটাই, যা পুরো ধর্মের মূল উদ্দেশ্য। যাকাত মানুষের নফসকে সেই সব কলুষতা ও আবর্জনা থেকে পাক-পবিত্র করে, যা সম্পদের মোহের কারণে অন্তরে দানা বাঁধে। যাকাত সম্পদে বরকত সৃষ্টি করে এবং মানুষের আত্মিক পবিত্রতা বৃদ্ধির কারণে পরিণত হয়। আল্লাহর পথে ব্যয় বা ইনফাকের এটাই ন্যূনতম দাবি, যা একজন মুসলমানকে সর্বাবস্থায় পূরণ করতে হয়। যেহেতু যাকাত আল্লাহর পথে ব্যয়ের প্রাথমিক ধাপ, তাই এর মাধ্যমে সেই উচ্চতর স্তর হয়তো অর্জিত হয় না, যা আল্লাহর পথে ব্যয়ের সাধারণ বা উচ্চতর দাবিগুলো পূরণের মাধ্যমে অর্জিত হয়; তবুও যাকাতের মাধ্যমে মানুষের অন্তর তার প্রতিপালকের সাথে জুড়ে যায়। দুনিয়া এবং দুনিয়াবি সহায়-সম্পত্তির প্রতি অত্যাধিক মায়ার কারণে মানুষের মাঝে আল্লাহতায়ালার প্রতি যে গাফিলতি বা উদাসীনতা তৈরি হয়, যাকাত আদায়ের ফলে তা অনেকটা দূর হয়।

যাকাতের বিধান

যাকাতের বিধান নিম্নরূপ:

১.   উৎপাদন, ব্যবসা ও বিনিয়োগের উৎসসমূহ, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র এবং নিসাব (নির্ধারিত সীমা)-এর কম সম্পদ — এগুলো ছাড়া কোনো কিছুই যাকাত থেকে ব্যতিক্রম নয়। এটা প্রতিটি সম্পদ, সব ধরনের গবাদি পশু এবং সব ধরনের উৎপাদনের ওপর ধার্য হবে এবং প্রতিবছর রাষ্ট্রের প্রত্যেক মুসলমান নাগরিকের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে সংগ্রহ করা হবে।

২.   যাকাতের হার নিম্নরূপ:

· নগদ সম্পদ বা মালের ক্ষেত্রে: বার্ষিক ২.৫% (আড়াই শতাংশ)।

· উৎপাদনের ক্ষেত্রে:

- যদি উৎপাদনে মূলত শ্রম অথবা মূলত পুঁজি ব্যবহার করা হয়, তবে প্রতিবার উৎপাদনের সময় তার ১০%।

- যদি শ্রম ও পুঁজি — উভয়ের সংমিশ্রণে উৎপাদিত হয়, তবে ৫%।

- যদি কোনো শ্রম বা পুঁজি ছাড়াই সরাসরি খোদার দান হিসেবে (যেমন প্রাকৃতিক বনের ফল) পাওয়া যায়, তবে ২০%।

· গবাদি পশুর ক্ষেত্রে:

ক. উট:

-  ৫ থেকে ২৪টি পর্যন্ত: প্রতি ৫টি উটের জন্য ১টি ছাগল।

-  ২৫ থেকে ৩৫টি পর্যন্ত: ১টি এক বছর বয়সী উটনী; যদি তা না থাকে তবে ১টি দুই বছর বয়সী পুরুষ উট।

-  ৩৬ থেকে ৪৫টি পর্যন্ত: ১টি দুই বছর বয়সী উটনী।

-  ৪৬ থেকে ৬০টি পর্যন্ত: ১টি তিন বছর বয়সী উটনী।

-  ৬১ থেকে ৭৫টি পর্যন্ত: ১টি চার বছর বয়সী উটনী।

-  ৭৬ থেকে ৯০টি পর্যন্ত: ২টি দুই বছর বয়সী উটনী।

-  ৯১ থেকে ১২০টি পর্যন্ত: ২টি তিন বছর বয়সী উটনী।

-  ১২০টির বেশি হলে: প্রতি ৪০টির জন্য ১টি দুই বছর বয়সী মাদি উটনী এবং প্রতি ৫০টির জন্য ১টি তিন বছর বয়সী উটনী।

 খ. গরু:

-  প্রতি ৩০টির জন্য ১টি এক বছর বয়সী এবং প্রতি ৪০টির জন্য ১টি দুই বছর বয়সী বাছুর।

গ. ছাগল:

-  ৪০ থেকে ১২০টি পর্যন্ত: ১টি ছাগল।

-  ১২১ থেকে ২০০টি পর্যন্ত: ২টি ছাগল।

-  ২০১ থেকে ৩০০টি পর্যন্ত: ৩টি ছাগল।

-  ৩০০-এর বেশি হলে: প্রতি ১০০টির জন্য ১টি করে ছাগল।

৩.   কুরআনে যাকাতের জন্য যে খাতগুলো বর্ণিত হয়েছে, তার বিবরণ হলো:

· অভাবী ও মিসকিনদের জন্য।

·  রাষ্ট্রের সকল কর্মচারীর পারিশ্রমিক হিসেবে।

·  ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সকল রাজনৈতিক ব্যয়ের জন্য।

·  সব ধরনের দাসত্ব বা গোলামি থেকে মুক্তির জন্য।

·  লোকসান, জরিমানা বা ঋণের বোঝায় জর্জরিত মানুষদের সাহায্যের জন্য।

·  ধর্মের সেবা এবং জনকল্যাণমূলক কাজে।

·  মুসাফিরদের সাহায্য এবং তাদের জন্য রাস্তা, সেতু ও সরাইখানা নির্মাণের জন্য।

৪.   যাকাতের একটি প্রকার হচ্ছে: সদকাতুল ফিতর। এটা একজন ব্যক্তির সকাল-সন্ধ্যার খাবারের সমপরিমাণ সম্পদ, যা ছোট-বড় প্রত্যেকের জন্য দেওয়া আবশ্যক করা হয়েছে। এটা রমজান শেষে ঈদের নামাজের আগে আদায় করতে হয়।

রোজা

নামাজ ও যাকাতের পরে তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত রোজা। আরবি ভাষায় রোজার জন্য ‘সওম’ শব্দ এসেছে, যার অর্থ: কোনো জিনিস থেকে বিরত থাকা এবং তা পরিত্যাগ করা। শরিয়তের পরিভাষায় এই শব্দ বিশেষ সীমা ও নিয়ম সহকারে পানাহার ও দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে বিরত থাকার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটাই মূলত রোজা। মানুষ যেহেতু এই দুনিয়ায় নিজের একটি কর্মময় সত্তাও রাখে, তাই আল্লাহতায়ালার জন্য মানুষের ইবাদতের আবেগ যখন তার কর্মময় সত্তার সাথে সম্পৃক্ত হয় তখন উপাসনার সাথে আনুগত্যও শামিল হয়। রোজা এই আনুগত্যেরই প্রতীকী প্রকাশ। এতে বান্দা নিজের প্রতিপালকের আদেশে এবং তাঁর সন্তুষ্টি ও খুশির অন্বেষণে কিছু বৈধ কাজকে নিজের জন্য হারাম সাব্যস্ত করে আনুগত্যের মূর্ত প্রতীকে পরিণত হয়, আর এভাবে সে নিজের অবস্থা দ্বারা যেন এই কথাই ঘোষণা করে যে, আল্লাহতায়ালা এবং তাঁর আদেশের চেয়ে বড় কিছু-ই নেই। তিনি যদি ফিতরাতের নিয়ম দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বৈধ কোনো জিনিসও তার জন্য নিষিদ্ধ করেন, তবে বান্দা হিসেবে শোভনীয় এটাই যে, সে বিনাবাক্যে এই আদেশের সামনে মস্তক অবনত করবে।

একটু চিন্তা করলে দেখবেন যে, আল্লাহর মহিমা ও প্রতাপ এবং তাঁর মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি ও স্বীকৃতির এই অবস্থা মূলত তাঁর শুকরিয়া আদায়েরই বাস্তবিক প্রকাশ। অতএব, কুরআন এই ভিত্তিতেই রোজাকে খোদার বড়ত্ব ঘোষণা এবং শুকরিয়া আদায় হিসেবে গণ্য করেছে এবং বলেছে: এই উদ্দেশ্যে রমজান মাসকে এজন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে যে, কুরআনের সুরতে আল্লাহ যে হেদায়েত এই মাসে তোমাদের দান করেছেন — যাতে রয়েছে বুদ্ধি-বিবেকের জন্য দিকনির্দেশনা এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নিরূপণের স্পষ্ট ও অকাট্য দলিল-প্রমাণাদি — সেটার জন্য আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশ করো এবং তাঁর শোকরগুজার হও।

এটার চরম উৎকর্ষ এই যে, মানুষ রোজার অবস্থায় নিজের ওপর আরও কিছু সীমাবদ্ধতা আরোপ করে এবং অন্যদের থেকে পৃথক হয়ে কয়েক দিনের জন্য মসজিদে বসে এবং বেশি বেশি আল্লাহর ইবাদত করে। পারিভাষিকভাবে এটাকে ইতিকাফ বলে। ইতিকাফকে যদিও রমজানের রোজার মতো আবশ্যক করা হয়নি, কিন্তু তাজকিয়ায়ে নফস (আত্মিক পরিশুদ্ধি)-এর দৃষ্টিকোণ থেকে এর গুরুত্ব অপরিসীম। রোজা, নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াতের সংমিশ্রণে যে বিশেষ অবস্থার সৃষ্টি হয় এবং নফসের ওপর নির্জনতা ও আল্লাহর প্রতি একাগ্রতা যে ছাপ ফেলে, তার মাধ্যমে রোজার আসল উদ্দেশ্য পূর্ণমাত্রায় অর্জিত হয়।

রোজার ইতিহাস

নামাজের মতো রোজার ইতিহাসও অত্যন্ত প্রাচীন। কুরআন জানাচ্ছে যে, রোজা মুসলমানদের ওপর ঠিক তেমনি ফরজ করা হয়েছে, যেমনি তা পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ওপর ফরজ করা হয়েছিল। সুতরাং, বাস্তবতা হচ্ছে: নফসের প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে রোজার ধারণা সমস্ত ধর্মেই রয়েছে। 

রোজার উদ্দেশ্য

রোজার উদ্দেশ্য কুরআন এভাবে বর্ণনা করেছে, মানুষ যেন রোজার মাধ্যমে খোদার তাকওয়া অবলম্বন করে। কুরআনের পরিভাষায় তাকওয়ার অর্থ: মানুষ প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহতায়ালার নির্ধারিত সীমার ভিতরে রেখে জীবনযাপন করবে এবং নিজের অন্তরের গহীনে এই বিষয়ে ভয় পাবে যে, সে যদি কখনো এই সীমা ভাঙে, তবে এর শাস্তি থেকে আল্লাহ ছাড়া কেউ তাকে রক্ষা করতে পারবে না।

রোজার নিয়ম-কানুন

রোজার নিময়-কানুন নিম্নরূপ:

· রোজার নিয়তে এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পানাহার ও দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে বিরত থাকাই রোজা।

·  এই বিধি-নিষেধ ফজর থেকে রাত শুরু হওয়া পর্যন্ত জারি থাকে, সুতরাং রোজার রাতগুলোতে পানাহার ও দাম্পত্য-সঙ্গীর কাছে যাওয়া পুরোপুরি জায়েজ।

·  রোজার জন্য রমজান মাসকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে; তাই যে ব্যক্তি এই মাসে উপস্থিত থাকবে, তার ওপর এই পুরো মাসের রোজা রাখা ফরজ।

·  অসুস্থতা বা সফরের কারণে অথবা অন্য কোনো বাধ্যবাধকতার কারণে মানুষ যদি রমজানের রোজা পূর্ণ করতে না পারে, তবে তার জন্য আবশ্যক যে, অন্য দিনগুলোতে রোজা রেখে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া এবং [যতগুলো রোজা রাখতে পারেনি, ততগুলো রোজা রেখে] সংখ্যা পূর্ণ করা।

·  হায়েজনেফাসের অবস্থায় রোজা রাখা নিষিদ্ধ। কিন্তু এভাবে ছেড়ে দেওয়া রোজাগুলোও পরবর্তীতে অবশ্যই পূর্ণ করতে হবে।

·  রোজার চরম উৎকর্ষ হচ্ছে ইতিকাফ। আল্লাহতায়ালা যদি কোনো ব্যক্তিকে ইতিকাফের তাওফিক দেন, তবে তার উচিত যে, রোজার মাসে যত দিনের জন্য সম্ভব হয়, দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে আল্লাহর ইবাদতের জন্য মসজিদে নির্জনবাস অবলম্বন করা এবং কোনো অপরিহার্য মানবিক প্রয়োজন ছাড়া মসজিদ থেকে বের না হওয়া।

·  ইতিকাফের জন্য বসলে রোজার রাতে পানাহার করতে কোনো বাধা নেই, কিন্তু দাম্পত্য-সঙ্গীর কাছে যাওয়া তার জন্য জায়েজ থাকে না। ইতিকাফের অবস্থায় আল্লাহতায়ালা এটাকে নিষিদ্ধ করেছেন।

হজ্জ ও উমরা

হজ্জ ও উমরা উভয়ে ইব্রাহিমি ধর্মে ইবাদতের চরম উৎকর্ষ। হজ্জ ও উমরার ইতিহাস সেই ঘোষণার মাধ্যমে শুরু হয়, যা ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) মসজিদে হারাম নির্মাণের পর করেছিলেন — যেন মানুষ মহান খোদাতায়ালার উদ্দেশ্যে নজরানা পেশ করতে আসে এবং তাওহিদের ওপর ইমানের যে অঙ্গীকার তারা করেছে, এখানে এসে সেটাকে নবায়ন করে।

নিজ মাবুদের জন্য ইবাদতের আবেগের এটাই শেষ পর্যায় যে, তাঁর আহ্বানে বান্দা নিজের জান ও মাল — সবকিছু তাঁর দরবারে উৎসর্গ করতে হাজির হবে। হজ্জ ও উমরাহ এই উৎসর্গের-ই এক জীবন্ত রূপ। এই উভয় ইবাদত একই বাস্তবতা ধারণ করে। পার্থক্য শুধু এই যে, উমরাহ যেখানে সংক্ষিপ্ত, সেখানে হজ্জ সেটারই বিস্তারিত রূপ। হজ্জের মাধ্যমে সেই উদ্দেশ্য পুরোপুরি ফুটে ওঠে, যার জন্য জান-মাল উৎসর্গের দাবি করা হয়েছে।

আল্লাহতায়ালা জানিয়েছেন যে, আদমের সৃষ্টির মাধ্যমে দুনিয়ায় তাঁর যে পরিকল্পনা শুরু হয়েছে, ইবলিস প্রথম দিন থেকেই সেটার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ফলে আল্লাহর বান্দারা এখন কিয়ামত পর্যন্ত তাদের এই চিরশত্রু [শয়তান] ও তার বংশধরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত। এটাই এই দুনিয়ার পরীক্ষা, যার সফলতা বা ব্যর্থতার ওপর মানুষের অনন্ত ভবিষ্যতের নির্ভর করছে। আমরা আমাদের জান ও মাল এই যুদ্ধের জন্যই আল্লাহর পথে উৎসর্গ করি। ইবলিসের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধকে-ই হজ্জের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই চিত্রায়ণটি এমন:

· আল্লাহর বান্দারা তাদের প্রতিপালকের ডাকে দুনিয়ার ধন-সম্পদ এবং এর আনন্দ ও ব্যস্ততা থেকে হাত গুটিয়ে নেয়।

·  এরপর ‘লাব্বাইক লাব্বাইক’ (لَبَّیْکَ لَبَّیْکَ) বলতে বলতে রণক্ষেত্রে পৌঁছায় এবং ঠিক মুজাহিদদের মতো একটি উপত্যকায় তাঁবু ফেলে অবস্থান নেয়।

·  পরের দিন এক খোলা ময়দানে পৌঁছে তারা নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, এই যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার জন্য দোয়া ও মোনাজাত করে এবং নিজের ইমামের খুতবা শোনে।

·  যুদ্ধের পরিস্থিতির চিত্রায়ণের দাবি অনুযায়ী তারা নামাজ কসর করে ও জমা (বা একত্রে) আদায় করে; এবং পথে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করে পুনরায় নিজেদের তাঁবুতে ফিরে আসে।

·  এরপর শয়তানের ওপর পাথর নিক্ষেপ করে, নিজেদের পশুর কুরবানি পেশ করার মাধ্যমে নিজেকে মহান রবের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে, মাথা মুণ্ডন করে এবং নজরানার তাওয়াফ [অর্থাৎ জিয়ারতের তাওয়াফ] সম্পন্ন করতে তারা মূল ইবাদতগাহে (কাবা শরিফে) এবং কুরবানিগাহে উপস্থিত হয়।

·  তারপর সেখান থেকে ফিরে আসে এবং পরবর্তী দুই বা তিনদিন একইভাবে শয়তানের ওপর পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে।

এই দিক থেকে দেখলে, হজ্জ ও উমরাতে ‘ইহরাম’ এই বিষয়ের প্রতীক যে, মুমিন বান্দা দুনিয়ার ভোগ-বিলাস, ব্যস্ততা ও প্রিয় বস্তুগুলো থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে এবং দুটো সেলাইবিহীন চাদরে নিজের শরীর ঢেকে, খালি মাথায় এবং কিছুটা খালি পায়ে একেবারে সংসারবিরাগীদের বেশ ধারণ করে নিজের প্রতিপালকের দরবারে পৌঁছানোর জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছে।

·  ‘তালবিয়া’ হলো সেই আহ্বানের জবাব, যা সাইয়্যিদুনা ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) বাইতুল হারামের পুনর্নির্মাণের পর আল্লাহতায়ালার আদেশে একটি পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে দিয়েছিলেন। এখন এই আহ্বান দুনিয়ার কোণায় কোণায় পৌঁছেছে এবং আল্লাহর বান্দারা তাঁর নিয়ামতের স্বীকৃতি ও তাঁর তাওহিদের ঘোষণা দিয়ে এই আহ্বানের জবাবে ‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ (لَبَّیْکَ، اَللّٰہُمَّ لَبَّیْکَ)-এর এই হৃদয়স্পর্শী সুরের মূর্ছনা পাঠ করে।

·  ‘তাওয়াফ’ হলো নজরানার প্রদক্ষিণ। ইব্রাহিমি ধর্মে এই ঐতিহ্য প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে যে, যাকে কুরবানি করা হবে অথবা যাকে ইবাদতগাহের খিদমতের জন্য উৎসর্গ করা হবে, তাকে ইবাদতগাহ বা কুরবানিগাহের সামনে প্রদক্ষিণ করানো হবে।

·  ‘হাজরে আসওয়াদ’ চুম্বন বা স্পর্শ করা হলো অঙ্গীকার নবায়নের প্রতীক। এতে বান্দা এই পাথরকে রূপকভাবে নিজের প্রতিপালকের হাত সাব্যস্ত করে সেই হাতে নিজের হাত রাখে এবং অঙ্গীকার ও চুক্তির প্রাচীন ঐতিহ্য অনুযায়ী একে চুম্বন করে নিজের এই অঙ্গীকার নবায়ন করে যে, ইসলাম গ্রহণ করে সে জান্নাতের বিনিময়ে নিজের জান ও মাল — সবই আল্লাহর কাছে সোপর্দ করেছে।

·  ‘সাই’ হলো ইসমাইল (আলাইহিস সালাম)-এর কুরবানি-গাহের তাওয়াফ। সাইয়্যিদুনা ইব্রাহিম সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে এই কুরবানিগাহ দেখেছিলেন এবং এরপর আদেশ পালনের জন্য দ্রুতগতিতে হেঁটে মারওয়ার দিকে গিয়েছিলেন। সুতরাং সাফা মারওয়ার এই প্রদক্ষিণ হলো নজরানার তাওয়াফ, যা প্রথমে মূল ইবাদতগাহের সামনে এবং এরপর কুরবানির জায়গায় সম্পন্ন করা হয়।

·  ‘আরাফাত’ হলো ইবাদতগাহের স্থলাভিষিক্ত, যেখানে শয়তানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের মুজাহিদরা সমবেত হয়, নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা চায় এবং এই যুদ্ধে সফলতার জন্য দোয়া ও মোনাজাত করে।

·  ‘মুযদালিফা’ হলো পথের যাত্রাবিরতি, যেখানে তারা রাত কাটায় এবং সকালে উঠে ময়দানে নামার আগে আরও একবার দোয়া ও মোনাজাত করে।

·  ‘রমি’ বা পাথর নিক্ষেপ হলো ইবলিসের ওপর অভিশাপ এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রতীক। এই কাজ এই সংকল্পের সাথে করা হয় যে, মুমিন বান্দা ইবলিসের পরাজয় ছাড়া আর কিছুতেই সন্তুষ্ট হবে না। এটা জানা কথা যে, মানুষের এই চিরশত্রু যখন কুমন্ত্রণা দেয়, তখন সে একবার কুমন্ত্রণা দিয়েই দমে যায় না, বরং এই সিলসিলা জারি রাখে। তবে প্রতিরোধ করলে তার আক্রমণ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। তিন দিনের রমি এবং এর জন্য প্রথমে বড় ও পরে ছোট জামারায় পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে এই বিষয়টি-ই প্রকাশ করে।

·  ‘কুরবানি’ হলো জীবনের মুক্তিপণ (ফিদিয়া) এবং মাথার চুল মুণ্ডন করা এই বিষয়ের প্রতীক যে, নজরানা পেশ করা হয়েছে এবং এখন বান্দা তার মহান রবের আনুগত্য ও চিরস্থায়ী দাসত্বের এই চিহ্ন নিয়ে নিজের ঘরে ফিরতে পারে।

এসব থেকে আন্দাজ করা যায় যে, হজ্জ কতটা অনন্য সাধারণ একটি ইবাদত, যা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর জীবনে অন্তত একবার ফরজ করা হয়েছে।

হজ্জ ও উমরার উদ্দেশ্য

হজ্জ ও উমরার উদ্দেশ্য সেটাই, যা এগুলোর হাকিকত, অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার নিয়ামতসমূহের স্বীকৃতি, তাঁর তাওহিদের অঙ্গীকার এবং এই কথার স্মরণ করানো যে, ইসলাম কবুল করে আমরা নিজেদেরকে প্রতিপালকের কাছে উৎসর্গ করেছি। এগুলোই সেই বিষয়, যেগুলোর মারেফত এবং যেগুলোর হৃদয়-মননে প্রোথিত হওয়াকে কুরআন হজ্জের স্থানসমূহের উপকারিতা হিসেবে অভিহিত করেছে। এই উদ্দেশ্য জিকিরের ঐ শব্দগুলো দ্বারা অত্যন্ত নিপুণভাবে স্পষ্ট হয়, যা এই ইবাদতের জন্য নির্ধারিত। বিষয়টি পরিষ্কার যে, জিকিরের শব্দগুলো এই উদ্দেশ্যকে সামনে তুলে ধরতে এবং মন-মগজে পুরোপুরি বদ্ধমূল করতে নির্বাচন করা হয়েছে। তাই ইহরাম বাঁধার পর এই শব্দগুলো প্রত্যেক ব্যক্তির জবান থেকে অনবরত জারি থাকে:

لَبَّیْکَ، اَللّٰھُمَّ لَبَّیْکَ؛ لَبَّیْکَ لَاشَرِیْکَ لَکَ، لَبَّیْکَ؛ اِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَۃَ لَکَ وَالْمُلْکَ؛ لَاشَرِیْکَ لَکَ.

“আমি হাজির, হে আল্লাহ, আমি হাজির; আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই; আমি হাজির; হামদ তোমারই জন্য, সব নিয়ামত তোমারই এবং বাদশাহিও কেবল তোমারই জন্য; তোমার কোনো শরিক নেই।”

হজ্জ ও উমরার দিনসমূহ

উমরার জন্য কোনো সময় নির্ধারিত নেই। এটা পুরো বছরের মধ্যে মানুষ যখন চায়, তা করতে পারে। হজ্জের জন্য অবশ্য ৮ই জিলহজ্জ থেকে ১৩ই জিলহজ্জ পর্যন্ত দিনসমূহ নির্ধারিত এবং হজ্জ কেবল এই দিনগুলোতেই হতে পারে।

হজ্জ ও উমরার পদ্ধতি

হজ্জ ও উমরার জন্য যে পদ্ধতি নির্ধারিত করা হয়েছে, তা এই যে:

১. উমরা

এই ইবাদতের নিয়ত করে ইহরাম বাঁধা।

বাইরে থেকে আগতরা এই ইহরাম নিজেদের মিকাত থেকে বাঁধবেন; আর যারা স্থায়ীভাবে থাকেন — চাই তারা মক্কাবাসী হোন বা সাময়িকভাবে মক্কায় অবস্থানরত হোন — তারা হারামের সীমানার বাইরের কোনো জায়গা থেকে ইহরাম বাঁধবেন; এবং যারা এই সীমানার বাইরে, কিন্তু মিকাতের ভিতরে বসবাস করেন, তাদের মিকাত সেই জায়গা, যেখানে তারা অবস্থান করছেন এবং তারা সেখান থেকেই ইহরাম বাঁধবেন এবং তালবিয়া পাঠ করা শুরু করবেন।

বাইতুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছানো পর্যন্ত তালবিয়ার জিকির জারি থাকবে।

সেখানে পৌঁছে বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করা হবে।

তারপর সাফা মারওয়াতে সাই করা হবে।

হাদির পশু সাথে থাকলে সেগুলো কুরবানি করা হবে।

কুরবানির পর পুরুষরা মাথা মুণ্ডন করে বা চুল কেটে এবং মহিলারা নিজেদের বেণীর শেষ থেকে সামান্য চুল কেটে ইহরাম খুলবেন।

এই ইহরাম একটি পরিভাষা। এর অর্থ হচ্ছে, এখন তারা কামনার কোনো কথা বলবেন না; সাজসজ্জার কোনো কিছু — যেমন: সুগন্ধি ইত্যাদি ব্যবহার করবেন না; নখ কাটবেন না, শরীরের কোনো অংশের পশম ফেলবেন না, ময়লা-আবর্জনা দূর করবেন না, এমনকি নিজেদের শরীরের উকুনও মারবেন না; শিকার করবেন না; সেলাই করা কাপড় পরবেন না; নিজেদের মাথা, মুখমণ্ডল ও পায়ের উপরের অংশ খোলা রাখবেন এবং একটি চাদর লুঙ্গি হিসেবে বাঁধবেন ও একটি গায়ে জড়িয়ে নেবেন।

মহিলারা অবশ্য সেলাই করা কাপড় পরবেন এবং মাথা ও পা-ও ঢেকে রাখতে পারবেন। তাদের জন্য কেবল মুখমণ্ডল ও হাত খোলা রাখা জরুরি।

মিকাত সেই স্থানসমূহকে বলে, যা হজ্জ ও উমরার উদ্দেশ্যে আগতদের জন্য [মসজিদে] হারামের সীমানা থেকে কিছুটা দূরত্বে নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলোর সামনে তারা ইহরাম ছাড়া যেতে পারবে না। এই জায়গাগুলো পাঁচটি:

-        মদিনা থেকে আগতদের জন্য ‘জুল-হুলাইফা’,

-        ইয়ামেন থেকে আগতদের জন্য ‘ইয়ালামলাম’,

-        মিসর ও শাম থেকে আগতদের জন্য ‘জুহফা’,

-        নজদ থেকে আগতদের জন্য ‘কারন’ এবং

-        পূর্ব দিক থেকে আগতদের জন্য ‘জাতে-ইরক’।

তালবিয়া বলতে —

لَبَّیْکَ، اَللّٰھُمَّ لَبَّیْکَ؛ لَبَّیْکَ لَاشَرِیْکَ لَکَ، لَبَّیْکَ؛ اِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَۃَ لَکَ وَالْمُلْکَ؛ لَاشَرِیْکَ لَکَ.

লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক; লাব্বাইক লা-শারিকা লাকা, লাব্বাইক; ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা ওয়াল মুলক; লা-শারিকা লাক — এর জিকির বোঝায়, যা ইহরাম বাঁধার পরপরই শুরু হয় এবং বাইতুল্লাহ পৌঁছানো পর্যন্ত সমানভাবে জারি থাকে। হজ্জ ও উমরার জন্য এটাই একমাত্র জিকির, যা আল্লাহতায়ালা নির্ধারণ করেছেন।

তাওয়াফ শব্দটি সেই সাত চক্করের জন্য ব্যবহৃত হয়, যা সব ধরনের নাপাকি থেকে পবিত্র হয়ে বাইতুল্লাহর চারদিকে প্রদক্ষিণ করাকে বোঝায়। এর প্রত্যেক চক্কর হাজরে আসওয়াদ[[1]] থেকে শুরু হয়ে সেখানেই শেষ হয় এবং প্রতিটি চক্করের শুরুতে হাজরে আসওয়াদের ‘ইসতিলাম’ করা হয়। ‘ইসতিলাম’ মূলত হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করা বা হাত দিয়ে সেটা স্পর্শ করে নিজের হাতে চুমু দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত পরিভাষা। ভিড়ের মধ্যে হাত দিয়ে বা হাতের লাঠি দিয়ে বা এই জাতীয় কিছু দিয়ে ইশারা করাও ‘ইসতিলাম’-এর জন্য যথেষ্ট মনে করা হয়।

সাই বলতে সাফামারওয়ার তাওয়াফ-কে বোঝায়। এটাও সাত চক্কর, যা সাফা থেকে শুরু হয়। সাফা থেকে মারওয়া পর্যন্ত একটি এবং মারওয়া থেকে সাফা পর্যন্ত দ্বিতীয় চক্কর গণনা করা হয়। এগুলোর মধ্যে শেষ চক্কর মারওয়াতে গিয়ে শেষ হয়।

কুরবানির মতো সাফামারওয়ার এই সাই-ও নফল হিসেবে করা হয়। এটা উমরার কোনো আবশ্যিক অংশ নয়। উমরা এটা ছাড়াও আদায় হয়ে যায়।

হাদি শব্দটি সেই পশুদের জন্য ব্যবহৃত হয়, যেগুলোকে [মসজিদে] হারামে কুরবানির জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। অন্য পশু থেকে সেগুলোকে আলাদা রাখার জন্য তাদের শরীরে চিহ্ন দেওয়া হয় এবং গলায় ফিতা পরানো হয়।

২. হজ্জ

উমরার মতো হজ্জের জন্যও প্রথম কাজ এটাই যে, হজ্জের নিয়তে এটার ইহরাম বাঁধা।

বাইরে থেকে আগতরা এই ইহরাম নিজেদের মিকাত থেকে বাঁধবেন; আর যারা স্থায়ীভাবে থাকেন — চাই তারা মক্কাবাসী হোন বা সাময়িকভাবে মক্কায় অবস্থানরত হোন অথবা হারামের সীমানার বাইরে কিন্তু মিকাতের ভিতরে বসবাস করেন — তাদের মিকাত সেই জায়গা, যেখানে তারা অবস্থান করছেন এবং তারা সেখান থেকেই ইহরাম বাঁধবেন এবং তালবিয়া পাঠ শুরু করবেন।

৮ই জিলহজ্জ মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন এবং সেখানে অবস্থান করবেন।

৯ই জিলহজ্জ সকালে আরাফাতের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।

সেখানে পৌঁছে ইমাম জোহরের নামাজের আগে হজ্জের খুতবা দেবেন, তারপর জোহর ও আসরের নামাজ জমা ও কসর করে পড়া হবে।

নামাজ থেকে অবসর হয়ে যতক্ষণ সম্ভব হয়, আল্লাহতায়ালার দরবারে তসবিহতাহমিদ, তাকবির ও তাহলিল এবং দোয়া ও মোনাজাত করা হবে।

সূর্যাস্তের পর মুজদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।

সেখানে পৌঁছে মাগরিব ও এশার নামাজ জমা ও কসর করে পড়া হবে।

রাতে এই ময়দানেই অবস্থান করা হবে।

ফজরের পর এখানেও কিছুক্ষণের জন্য আরাফাতের মতোই তসবিহতাহমিদ, তাকবির ও তাহলিল এবং দোয়া ও মোনাজাত করা হবে।

তারপর মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন এবং সেখানে জামারাতুল আকাবা-র কাছে পৌঁছে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করা হবে এবং এই জামারা-তে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করা হবে।

হাদির পশু সাথে থাকলে অথবা মানত ও কাফফারার কোনো কুরবানি ওয়াজিব হয়ে থাকলে, সেই কুরবানি করা হবে।

তারপর পুরুষরা মাথা মুণ্ডন করে বা চুল কেটে এবং মহিলারা নিজেদের বেণীর শেষ থেকে সামান্য চুল কেটে ইহরামের পোশাক খুলবেন।

তারপর বাইতুল্লাহতে পৌঁছে সেটার তাওয়াফ করা হবে।

ইহরামের সমস্ত বিধি-নিষেধ তাওয়াফের সাথেই শেষ হবে, এরপর যদি ইচ্ছা থাকে, তবে নফল হিসেবে সাফা মারওয়ার সাই-ও করা যেতে পারে।

তারপর মিনাতে ফিরে এসে দুই বা তিনদিন অবস্থান করা হবে এবং প্রতিদিন প্রথমে জামারাতুল উলা, তারপর জামারাতুল উসতা এবং এরপর জামারাতুল উখরা-তে সাতটি করে কঙ্কর মারা হবে।

সাইয়্যিদুনা ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর সময় থেকে হজ্জ ও উমরার মানাসিক বা বিধান এগুলোই। কুরআন এগুলোতে কোনো পরিবর্তন করেনি, শুধু এতটুকু করেছে যে, এগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু ধর্মীয় বিধি-বিধানের ব্যাখ্যা প্রদান করেছে।

এই বিধানসমূহ নিচে দেওয়া হলো:

প্রথম বিধান হচ্ছে — হজ্জ ও উমরা সম্পর্কিত যে পবিত্রতা আল্লাহতায়ালা প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেগুলোকে সম্মান করা ইমানের দাবি এবং তা সর্বাবস্থায় বহাল থাকা উচিত। তবে অন্যপক্ষ যদি এগুলো মান্য করতে অস্বীকার করে, তাহলে এর বদলে মুসলমানদেরও অধিকার আছে যে, তারা সমপর্যায়ের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কারণ, এ ধরনের পবিত্রতা পারস্পরিকভাবেই টিকে থাকতে পারে; কোনো পক্ষ একা নিজ উদ্যোগে তা বজায় রাখতে পারে না।

দ্বিতীয় বিধান হচ্ছে — এই অনুমতি থাকা সত্ত্বেও মুসলমানরা নিজেদের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে না। এগুলো আল্লাহর পবিত্র বিষয়, এগুলো ভাঙার ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়া নিকৃষ্টতম অপরাধ। এ ধরনের পদক্ষেপে লিপ্ত হওয়া কোনো অবস্থাতেই উচিত নয়।

তৃতীয় বিধান হচ্ছে — ইহরাম অবস্থায় শিকারের নিষেধাজ্ঞা কেবল স্থলচর প্রাণীদের জন্য; জলজ প্রাণী শিকার করা বা অন্যের করা শিকার খাওয়া — উভয়ই জায়েজ। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ এই ছাড়ের সীমা অতিক্রমের চেষ্টা করবে। স্থলভাগের শিকার সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ। সুতরাং যদি কোনো ব্যক্তি জেনেবুঝে এই গুনাহের কাজ করে, তবে তাকে কাফফারা আদায় করতে হবে।

কাফফারা আদায়ের তিনটি পদ্ধতি রয়েছে:

· যে ধরনের প্রাণী শিকার করা হয়েছে, গৃহপালিত চতুষ্পদ পশু থেকে একই শ্রেণির কোনো পশু কুরবানির জন্য বাইতুল্লাহ-তে পাঠানো হবে।

·  এটা সম্ভব না হলে, সেই প্রাণীর মূল্যের অনুপাতে মিসকিনদের খাওয়ানো হবে।

·  এটাও কঠিন হলে, যতজন মিসকিনকে খাওয়ানো কারও ওপর আবশ্যক হতো — ততদিন রোজা রাখা হবে।

পশুর বিনিময় কী হবে, কিংবা পশু কুরবানি অসম্ভব হলে তার মূল্য কত হবে, অথবা তার বিনিময়ে কতজন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো হবে, বা কতগুলো রোজা রাখা হবে — তার ফয়সালা মুসলমানদের মধ্য থেকে দুইজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি করবেন, যেন অপরাধীর জন্য নিজের নফসের প্রতি পক্ষপাতের কোনো সুযোগ অবশিষ্ট না থাকে।

চতুর্থ বিধান হচ্ছে — হজ্জ ও উমরার উদ্দেশ্যে সফরকারীরা যদি কোনো জায়গায় আটকা পড়ে এবং তাদের জন্য সামনে অগ্রসর হওয়া সম্ভব না হয়, তবে উট, গরু, ছাগল — এর মধ্য থেকে যা সহজলভ্য, তা কুরবানির জন্য পাঠাবে; আর পাঠানো সম্ভব না হলে সেখানেই কুরবানি করবে এবং মাথা মুণ্ডন করে ইহরাম খুলবে। তাদের হজ্জ ও উমরা এটাই। তবে এ বিষয়ে এই কথা স্পষ্ট থাকা উচিত যে, কুরবানি এমন কোনো স্থানে করা হোক কিংবা তা মক্কা ও মিনায় করা হোক — কুরবানির আগে মাথা মুণ্ডন করা জায়েজ নয়; যদি না কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয় কিংবা তার মাথায় কোনো কষ্ট থাকে এবং সে কুরবানির আগেই মাথা মুণ্ডন করতে বাধ্য হয়। কুরআন অনুমতি দিয়েছে যে, এ ধরনের বাধ্যবাধকতা দেখা দিলে মানুষ মাথা মুণ্ডন করবে, কিন্তু রোজা বা সদকা বা কুরবানির মাধ্যমে তার ফিদিয়া দেবে এবং সেগুলোর সংখ্যা ও পরিমাণ নিজেদের বিবেচনা অনুযায়ী যা উপযুক্ত মনে হবে, তা নির্ধারণ করবে।

পঞ্চম বিধান হচ্ছে — বাইর থেকে আগমনকারীরা যদি এক সফরে হজ্জ ও উমরা — দুটোই একসাথে করতে চান, তাহলে করতে পারেন। এর পদ্ধতি হলো: তারা আগে উমরা করে ইহরাম খুলবেন, তারপর ৮ই জিলহজ্জ মক্কাতেই পুনরায় ইহরাম বেঁধে হজ্জ করবেন। এটা মূলত একটি ছাড় বা অবকাশ, যা আল্লাহতায়ালা দুইবার সফরের কষ্টের কথা বিবেচনা করে বাইরে থেকে আগত হজ্জ পালনকারীদের দান করেছেন। সুতরাং তারা এর ফিদিয়া দেবেন। এর দুটি পদ্ধতি রয়েছে:

· উট, গরু এবং ছাগলের মধ্য থেকে যে প্রাণী সহজলভ্য, তা কুরবানি করা।

·  এটা সম্ভব না হলে দশটি রোজা রাখা: তিনটি হজ্জের দিনগুলোতে এবং সাতটি হজ্জ থেকে ফেরার পর।

এখান থেকে স্পষ্ট যে, আল্লাহতায়ালার কাছে উত্তম এটাই যে, হজ্জের জন্য আলাদা এবং উমরার জন্য আলাদা সফর করা। সুতরাং কুরআন স্পষ্ট করেছে যে, এই সুবিধা ঐ লোকদের জন্য নয়, যাদের ঘরবাড়ি মসজিদুল হারামের নিকটে।

ষষ্ঠ বিধান হচ্ছে — মিনা থেকে ১২ই জিলহজ্জ তারিখেও ফিরে আসা যাবে এবং চাইলে ১৩ই জিলহজ্জ পর্যন্তও অবস্থান করা যাবে। আল্লাহতায়ালা জানিয়েছেন যে, উভয় অবস্থাতে কোনো গুনাহ নেই। কারণ, আসল গুরুত্ব এটা নয় যে, মানুষ কতদিন অবস্থান করল, বরং গুরুত্ব হলো — যতদিনই থাকুক, খোদাতায়ালাকে স্মরণে রেখে এবং তাঁকে ভয় করে অবস্থান করুক।

কুরবানি

দুনিয়ার সকল ধর্মেই কুরবানি আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভের একটি বড় মাধ্যম হিসেবে বিদ্যমান। কুরবানির হাকিকত সেটাই, যা যাকাতের। তবে কুরবানি সম্পদের ক্ষেত্রে নয়, বরং প্রাণের নজরানা, যা সেই পশুর বিনিময়ে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়, যাকে আমরা প্রাণের স্থলাভিষিক্ত বানিয়ে কুরবানি করি।

কুরবানির ইতিহাস

এটার ইতিহাস আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সময় থেকে শুরু হয়। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, তার দুই ছেলে (হাবিল ও কাবিল) নিজ নিজ নজরানা আল্লাহতায়ালার দরবারে পেশ করলে একজনের নজরানা কবুল করা হয় এবং অন্যজনেরটা কবুল করা হয়নি। বাইবেলে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, হাবিল এই উপলক্ষে তার ভেড়া-ছাগল থেকে প্রথম জন্ম নেওয়া কিছু বাচ্চার কুরবানি পেশ করেছিল।

স্বাভাবিকভাবেই এ পদ্ধতি পরবর্তীতেও বহাল ছিল। ফলে সব ধর্মেই এর নিদর্শন আমরা সমস্ত ধর্মে দেখতে পাই। সাইয়্যিদুনা ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর কুরবানির পর অবশ্য এই ইবাদত যে গুরুত্ব, মহিমা, ব্যাপকতা ও সর্বজনীনতা লাভ করেছে, তা এর আগে নিঃসন্দেহে ছিল না। তাকে যখন এই নির্দেশ দেওয়া হয় যে, তিনি পুত্রের পরিবর্তে পশু কুরবানি করবেন, তখন আল্লাহতায়ালা বললেন — আমরা ইসমাইলকে ‘এক মহান যবেহ’-এর বিনিময়ে মুক্ত করেছি। এর অর্থ হচ্ছে: ইব্রাহিমের এই নজরানা কবুল করা হয়েছে এবং এখন বংশপরম্পরায় মানুষ নিজেদের কুরবানির মাধ্যমে এই ঘটনার স্মৃতি বজায় রাখবে। হজ্জ ও উমরা উপলক্ষে এবং ঈদুল আজহার দিনে এই কুরবানি-ই আমরা নফল ইবাদত হিসেবে পূর্ণ ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালন করি।

কুরবানির উদ্দেশ্য

এটার উদ্দেশ্য আল্লাহতায়ালার শুকরিয়া আদায় করা। আমরা যখন কুরবানির পশুগুলোকে আমাদের প্রাণের নজরানার প্রতীক বানিয়ে খোদাতায়ালার দরবারে পেশ করি, তখন যেন ইসলাম ও বিনয়ের সেই হেদায়েতের জন্য আল্লাহতায়ালার শুকরিয়া আদায় করি, যার বহিঃপ্রকাশ সাইয়্যিদুনা ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) তার একমাত্র পুত্রের কুরবানি দেওয়ার মাধ্যমে করেছিলেন। এই উপলক্ষে তাকবির ও তাহলিলের শব্দগুলোও এই উদ্দেশ্যে উচ্চারিত হয়।

যদি ভেবে দেখেন, তবে এটা ইবাদতের চূড়ান্ত শিখর। আমরা নিজেদের এবং নিজেদের পশুর মুখ কিবলার দিকে করে ‘বিসমিল্লাহি, ওয়াল্লাহু আকবার’ বলে কিয়াম বা সেজদার অবস্থায় এই অনুভূতির সঙ্গে নিজেদের পশুগুলোকে প্রতিপালকের নামে উৎসর্গ করি যে, প্রকৃতপক্ষে আমরা নিজেদেরকেই আল্লাহর চরণে উৎসর্গ করছি।

কুরবানির নিয়ম

এটার নিয়ম হচ্ছে:

· কুরবানি গৃহপালিত চতুষ্পদ শ্রেণির সমস্ত পশুর হতে পারে।

·  এটার পশু ত্রুটিমুক্ত এবং উপযুক্ত বয়সের হওয়া উচিত।

·  কুরবানির সময় ‘ইয়াওমুন নাহর’ — ১০ই জিলহজ্জ ঈদুল আজহার নামাজ থেকে অব্যাহতির পর শুরু হয়।

·  এটার দিনগুলো সেগুলোই, যা মুজদালিফা থেকে ফেরার পর মিনায় অবস্থানের জন্য নির্ধারিত। পারিভাষিকভাবে এগুলোকে আইয়ামে তাশরিক বলা হয়। কুরবানি ছাড়াও এই দিনগুলোতে এই সুন্নাতও কায়েম করা হয়েছে যে, প্রত্যেক নামাজের জামাতের পর তাকবির বলা হবে। নামাজের পর তাকবিরের এই নির্দেশ সাধারণ। এটার জন্য কোনো বিশেষ শব্দ শরিয়তে নির্ধারণ করা হয়নি।

·  কুরবানির গোশত মানুষ নিজেও কোনো দ্বিধা ছাড়াই খেতে পারে এবং অন্যদেরও খাওয়াতে পারে।



[1] এটা বাইতুল্লাহর পুরাতন নির্মাণের পাথর, যা অঙ্গীকার নবায়নের প্রতীক হিসেবে সেটার এক কোণে স্থাপন করা হয়েছে।

GCIL Bangla

Visit us

Suite 230, 3620 N Josey Ln,

Carrollton, Dallas, TX 75007

Contact us via email

info@almawridus.org

Copyright 2025, Ghamidi Center of Islamic Learning. All Rights Reserved. GCIL is an initiative of Al-Mawrid U.S. A 501(c)(3) tax-exempt organization in the U.S. Federal EIN: 46-5099190.