মানুষের স্রষ্টা তাকে একটি সমাজপ্রিয় প্রাণীর ফিতরাত দান করেছেন। এর কারণ, মানুষের সৃষ্টি এভাবে হয় না যে, তার স্রষ্টা তাকে আসমানে কোথাও বানিয়ে ভরা যৌবন দিয়ে সরাসরি জমিনে নাজিল করেন; অতঃপর বার্ধক্য ও জরাগ্রস্ত হওয়ার পর্যায়গুলো অতিক্রম করানো ছাড়াই ঐ যৌবন অবস্থাতেই তাকে ফিরিয়ে নেন। এর বিপরীতে মানুষের বিষয়টি এমন যে, সে স্তরে স্তরে অন্ধকারের মধ্যে এক অসহায় শিশুরূপে অস্তিত্ব লাভ করে। মায়ের কোলে চোখ খোলে। আধো আধো কথা বলে, খেলাধুলা করে, অন্যের হাত দিয়ে খায়, পান করে এবং নিজের প্রয়োজনগুলো পূরণ করে। সে প্রথমে জমিনে হামাগুড়ি দেয়, হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে চলে এবং তারপর অনেক কষ্টে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যোগ্য হয়। এর পরেও কদমে কদমে তার সাহায্যের প্রয়োজন হয়। এমনকি শৈশব ও কৈশোরের অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করে সে পনেরো বা ষোলো বছরের বয়সে পৌঁছে কোথাও গিয়ে যুবক হয়। তার এই যৌবনকালও বিশ-ত্রিশ বছরের বেশি দীর্ঘ হয় না। এরপর সে দেখতে পায়, বার্ধক্যের লক্ষণসমূহ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে; এবং বহুবার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার চরম শিখর স্পর্শ করার পর সে আবার অসহায় শিশুদের মতো অন্যের দয়া ও করুণার ওপর জীবনের দিনগুলো পূর্ণ করতে বাধ্য হচ্ছে।
মানুষের এই অবস্থা অনিবার্যভাবে দাবি করে যে, সে এক সমাজপ্রিয় সত্তার জীবনযাপন করবে। নারী ও পুরুষ হিসেবে এই সমাজবদ্ধতা সৃষ্টির শুরু থেকেই সম্পূর্ণভাবে স্বয়ং মানুষের ভিতরেই লুকানো থাকে। এটাকে খুঁজে বের করতে তাকে নিজের অস্তিত্বের বাইরে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। সে এই দুনিয়ায় আসে তখন নিজের জীবন-সামগ্রী এবং ঘর-সংসার সাথে নিয়েই আসে, আর তা উপত্যকা ও পর্বতমালা হোক কিংবা তা মরুভূমি ও প্রান্তর হোক — সব জায়গায় সে নিজের মজলিস নিজেই সাজিয়ে নেয়।
মানুষের ইতিহাস বলে, তার সৃষ্টির মাঝে নিহিত এই পরিকল্পনাকে সামনে রেখে সাইয়্যিদুনা আদম (আলাইহিস সালাম) যখন প্রথম মানুষ হিসেবে এই দুনিয়ায় আসেন, তখন তাকে একা পাঠানো হয়নি, বরং তার সাহচর্যের জন্য আল্লাহতায়ালা তারই প্রজাতি থেকে তার জন্য জোড়া সৃষ্টি করেছেন। তারপর তা থেকে বহু নারী ও পুরুষ দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন, এমনকি [এর ধারাবাহিকতায়] পরিবার, গোত্র এবং পরিশেষে রাষ্ট্রিয় পর্যায় পর্যন্ত সমাজব্যবস্থা অস্তিত্বে এসেছে, যাতে মানুষের জন্য সেসব জিনিস সহজলভ্য হয়ে গেল, যা তার গোপন সক্ষমতাগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য অপরিহার্য ছিল।
এই বাস্তবতাগুলোকে সামনে রেখেই নবী (আলাইহিমুস সালাম)-দের ধর্মে স্বামী-স্ত্রীর স্থায়ী সাহচর্যের পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। মানুষকে তার শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত সামনে রাখলে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, তার জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক প্রয়োজনের নিরিখে এই পদ্ধতি-ই বুদ্ধি ও ফিতরাতের অনুকূল। স্বামী-স্ত্রীর স্থায়ী সম্পর্কের মাধ্যমে যে সমাজব্যবস্থা অস্তিত্বে আসে, তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মানুষের বুদ্ধি-বিবেকের পথনির্দেশের জন্য নবী (আলাইহিমুস সালাম)-দের মাধ্যমে মানবজাতিকে একটি বিস্তারিত বিধি-বিধান দেওয়া হয়েছে। সেই বিধি-বিধানকে আমরা নিম্নোক্ত শিরোনামের অধীনে বর্ণনা করতে পারি:
নিকাহ (বিবাহ)
নারী ও পুরুষের একে অপর থেকে যৌন তৃপ্তি অর্জনের বৈধ পদ্ধতি কেবল নিকাহ (বিবাহ)। প্রকাশ্যে ইজাব ও কবুলের সাথে এটা নারী ও পুরুষের মধ্যে স্থায়ী সাহচর্যের একটি অঙ্গীকার, যা মানুষের সামনে এবং কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্বের পক্ষ থেকে এই উপলক্ষে জিকির ও নসিহতের পর পূর্ণ ব্যবস্থাপনা ও গাম্ভীর্যের সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়। বিবাহের জন্য নারীরাও পুরুষদের মতো নিজের ইচ্ছার মালিক এবং খোদায়ি সীমার ভিতরে নিজের ফয়সালা করার জন্য পুরোপুরি স্বাধীন। তাদের সম্মতি ছাড়া কোনো কিছুই তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
মাহরামগণ
মা, মেয়ে, বোন, ফুফু, খালা, ভাগনি এবং ভাতিজির সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ। আল্লাহতায়ালা চান যে, মায়ের জন্য ছেলে, মেয়ের জন্য বাবা, বোনের জন্য ভাই, ফুফুর জন্য ভাতিজা, খালার জন্য ভাগনে, ভাগনির জন্য মামা এবং ভাতিজির জন্য চাচার দৃষ্টি যৌনতা ও কামনার সব ধরনের কলুষতা থেকে মুক্ত থাকুক। কারণ, [আত্মীয়তার] এই বন্ধনগুলোতে এ ধরনের সম্পর্ক মানব মর্যাদা বিধ্বংসী এবং লজ্জা ও শরমের সেই পবিত্র অনুভূতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী, যা মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টির কারণ। দুধপানের মাধ্যমে সৃষ্ট সম্পর্কের বিধানও একই। অতএব, বংশীয় সম্পর্কের কারণে যেসব সম্পর্ক হারাম হয়, দুগ্ধপানের কারণেও সেসব সম্পর্ক হারাম হয়। বংশ ও দুগ্ধপানের পর একটি সম্পর্ক হচ্ছে: বৈবাহিক। এ থেকে যে সম্পর্কগুলো তৈরি হয়, সেগুলোর পবিত্রতাও মানব ফিতরাতের নিকট সুস্পষ্ট। সে অনুযায়ী শ্বশুরের জন্য পুত্রবধূ এবং স্বামীর জন্য স্ত্রীর মা, [পূর্বের ঘরের] মেয়ে, বোন, খালা, ফুফু, ভাগনি ও ভাতিজির সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ। তবে এই সম্পর্কগুলো যেহেতু স্ত্রী ও স্বামীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর ফলে এগুলোর মধ্যে এক ধরনের দুর্বলতা তৈরি হয়, তাই কুরআন এতে এই তিনটি শর্তারোপ করেছে:
এক — [পূর্বের ঘরের] মেয়ে কেবল সেই স্ত্রীর হারাম, যার সাথে নির্জনবাস (সহবাস) করা হয়েছে।
দুই — পুত্রবধূ হারাম হওয়ার জন্য ছেলে ঔরসজাত হওয়া জরুরি।
তিন — স্ত্রীর বোন, ফুফু, খালা, ভাগনি ও ভাতিজির হারাম হওয়ার বিষয়টি ঐ অবস্থার সাথে নির্দিষ্ট, যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাহের সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে।
এই সম্পর্কগুলো ছাড়াও সৎ মায়ের সাথে এবং সেই নারীর সাথেও বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যে অন্যের বিবাহে আবদ্ধ রয়েছে।
সীমা ও শর্তাবলি
বিবাহ মালের বিনিময়ে অর্থাৎ মোহরানার সাথে হতে হবে। কুরআন বলেছে যে, আল্লাহতায়ালার আরোপিত একটি ফরজ হিসেবে এটা বিবাহের একটি আবশ্যক শর্ত। নারী ও পুরুষের বিবাহের মাধ্যমে স্থায়ী সাহচর্যের যে অঙ্গীকার করে, তাতে আজীবন ভরণপোষণের দায়িত্ব পুরুষই পালন করে আসছে; এবং এটা তার-ই প্রতীক (token)। এর কোনো পরিমাণ নির্ধারিত করা হয়নি। এটাকে সমাজের প্রথা ও মানুষের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অতএব, নারীর সামাজিক মর্যাদা এবং পুরুষের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে তারা যতটুকু মোহরানা চায়, নির্ধারণ করতে পারে।
বিবাহের জন্য চারিত্রিক পবিত্রতাও জরুরি। কোনো ব্যভিচারী কোনো পবিত্রা নারীর সাথে এবং কোনো ব্যভিচারিণী কোনো পবিত্র পুরুষের সাথে বিবাহ করতে পারে না; তবে এ শর্তে যে, যদি বিষয়টি আদালত পর্যন্ত না পৌঁছায় এবং তারা তওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে নিজেদের এই গুনাহ থেকে পবিত্র করে। শিরকের বিষয়টিও একই। যেভাবে এই বিষয়টি মেনে নেওয়া যায় না যে, স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে কেউ অন্য কারও বিছানায় শোবে, ঠিক তেমনি এটাও কোনো মুসলমানের জন্য সহনীয় হতে পারে না যে, তার ঘরে খোদাতায়ালার সাথে অন্য কারও উপাসনা করা হবে, বরং এটা তার কাছে অন্য কারও বিছানায় শোয়ার চেয়েও বেশি ঘৃণ্য বিষয় হবে। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে অবশ্য এতটুকু শিথিলতা আছে যে, তাদের পবিত্রা নারীদের সাথে আল্লাহতায়ালা মুসলমানদের বিবাহের অনুমতি দিয়েছেন। এর কারণ, শিরকের মতো নাপাকিতে পুরোপুরি লিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও তারা মূলত তাওহিদে বিশ্বাসী।
অধিকার ও অবশ্য পালনীয় কর্তব্য
পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটি একটি ছোট রাষ্ট্রের মতো। যেভাবে প্রতিটি রাষ্ট্র তার প্রতিষ্ঠা ও টিকে থাকার জন্য একজন প্রধান বা নেতৃত্বের দাবি রাখে, তেমনি এই রাষ্ট্রটিও একজন প্রধানের দাবি রাখে। এই রাষ্ট্রে নেতৃত্বের স্থান পুরুষকেও দেওয়া যায় এবং নারীকেও [দেওয়া যায়]। কুরআন জানিয়েছে যে, পুরুষের কিছু সৃষ্টিগত সামর্থ্যের পরিপ্রেক্ষিতে এটা তাকে দেওয়া হয়েছে এবং এর আবশ্যিক ফল হিসেবে নারীদের নিকট দাবি করা হয়েছে যে, প্রথমত, তাদের উচিত স্বামীদের সাথে সদ্ভাব ও আনুগত্যের আচরণ অবলম্বন করা। দ্বিতীয়ত, স্বামীর গোপন বিষয়সমূহ এবং তার ইজ্জত ও সম্মানের হেফাজত করা।
নারী যদি স্বামীর এই অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে ঘরের শৃঙ্খলা ওলটপালট করতে উদ্যত হয়, তবে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন যে, নিজের ঘর বাঁচানোর জন্য পুরুষ তিনটি পথ অবলম্বন করতে পারে:
প্রথমত — নারীকে নসিহত করা। কুরআনে এর জন্য ‘ওয়াজ’ (وعظ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ: এক্ষেত্রে কিছুটা শাসন বা তিরস্কারও করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত — তার সাথে ঘনিষ্ঠতা বা মেলামেশা বর্জন করা, যাতে সে বুঝতে পারে যে, সে যদি নিজের আচরণ পরিবর্তন না করে, তবে এর ফলাফল অস্বাভাবিক হতে পারে।
তৃতীয়ত — নারীকে শারীরিক শাস্তি দেওয়া। এই শাস্তি কেবল ততটুকুই হতে পারে, যতটুকু একজন শিক্ষক তার প্রশিক্ষণাধীন ছাত্রকে অথবা একজন বাবা তার সন্তানকে দেয়।
এই তিনটি পদ্ধতিই পর্যায়ক্রমিক ও ধাপে ধাপে ব্যবহারের জন্য। অর্থাৎ প্রথমটির পর দ্বিতীয়টি এবং দ্বিতীয়টির পর তৃতীয় পদ্ধতি কেবল তখনই অবলম্বন করা উচিত, যখন ব্যক্তি নিশ্চিত হয় যে, এতে কাজ হয়নি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। স্বামীর সংশোধনমূলক ক্ষমতার এটাই শেষ সীমা। এর মাধ্যমে যদি সংশোধন হয়, তবে নারীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার পথ খোঁজা উচিত নয়।
স্ত্রী যদি অপছন্দনীয়ও হয়, তবুও তার কাছ থেকে নিজের দেওয়া উপঢৌকন বা সম্পদ ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য তাকে সংকটে ফেলা এবং কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা করা কোনো মুমিন ব্যক্তির জন্য বৈধ নয়। এ ধরনের আচরণ কেবল তখনই গ্রাহ্য করা যেতে পারে, যখন সে প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। এ জাতীয় কোনো কাজ যদি তার দ্বারা প্রকাশ না পায়, সে নিজের আনুগত্যে অটল থাকে এবং পবিত্রতার সাথে জীবনযাপন করে, তবে কেবল স্ত্রী পছন্দ নয় — এই ভিত্তিতে তাকে কষ্ট দেওয়া ন্যায়বিচার এবং মহত্ত্ব ও আভিজাত্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। চারিত্রিক কলুষতা অবশ্যই ঘৃণ্য বিষয়, কিন্তু কেবল চেহারা পছন্দ না হওয়া বা রুচির অমিলের কারণে তাকে ভদ্রোচিত সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। অপছন্দ হওয়া সত্ত্বেও তার সাথে সেই আচরণ করা উচিত, যা ভদ্রলোকদের জন্য শোভনীয়, বুদ্ধি-বিবেক ও ফিতরাতের অনুকূল, দয়া ও সহমর্মিতা-ভিত্তিক এবং যাতে ন্যায়বিচারের দাবিগুলো রক্ষা করা হয়।
বহুবিবাহ
মানুষের সৃষ্টি যে ফিতরাতের ওপর হয়েছে, তার আলোকে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটি তার আসল গুণাবলিসহ একজন পুরুষ ও নারীর বিবাহের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। সভ্যতার প্রয়োজন এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থের কারণে বহুবিবাহের প্রথা কম-বেশি প্রতিটি সমাজেই বিদ্যমান ছিল; এবং এগুলোর প্রতি লক্ষ্য রেখেই আল্লাহতায়ালা তাঁর কোনো শরিয়তেই এটাকে নিষিদ্ধ করেননি। তবে এতিমদের কল্যাণের কথা মাথায় রেখে কুরআন যখন এই প্রথা থেকে উপকার নেওয়ার উৎসাহ দিয়েছে, তখন এর সাথে এই দুটি শর্তও আরোপ করেছে:
এক — এতিমদের অধিকার রক্ষার মতো কল্যাণের জন্যও কোনো ব্যক্তির বিবাহে নারীর সংখ্যা চারের বেশি হওয়া উচিত নয়।
দুই — স্ত্রীদের মধ্যে ইনসাফের শর্তটি এমন এক অটল শর্ত যে, ব্যক্তি যদি এটা পূরণ করতে সক্ষম না হয়, তবে এ ধরনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কল্যাণের কারণেও একের অধিক বিবাহ করা তার জন্য বৈধ নয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, বাহ্যিক আচরণ এবং অন্তরের টানের মধ্যে কোনো দিক থেকে কোনো পার্থক্য অবশিষ্ট থাকবে না। এ ধরনের ইনসাফ কারও সাধ্যের মধ্যে নেই এবং কেউ চাইলেও তা করতে পারে না। অন্তরের ঝোঁকের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকে না, সুতরাং এতটুকুই যথেষ্ট যে, স্বামী এক স্ত্রীর দিকে এমনভাবে ঝুঁকে না পড়ে, যাতে অন্যজন একেবারে ঝুলে থাকার অবস্থায় পৌঁছে যায়।
বিবাহ এতিমদের অধিকার দেখাশোনার জন্য করা হোক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে — মোহরানা এবং ইনসাফ নারীর অধিকার এবং এটা অত্যন্ত আনন্দের সাথে আদায় করা উচিত। কিন্তু যদি আশঙ্কা থাকে যে, স্ত্রীদের মধ্যে সমান অধিকারের বেলায় অনড় থাকার ফলে স্বামী স্ত্রীর প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শন করবে বা পিছু ছাড়ানোর চেষ্টা করবে, তবে এতে কোনো ক্ষতি নেই যে, যদি উভয় মিলে নিজেদের মধ্যে কোনো সমঝোতা করে নেয়।
সহবাসের সীমারেখা
হায়েজ (ঋতুস্রাব) ও নেফাস (সন্তান প্রসব পরবর্তী রক্তস্রাব)-এর দিনগুলোতে স্বামী-স্ত্রীর যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ। এই বিধিনিষেধ রক্ত বন্ধ হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকে, এরপর তা আর থাকে না। তবে সঠিক পদ্ধতি হলো, যখন নারী গোসল করে পবিত্রতা অর্জন করবে, তখনই তার সাথে মিলিত হওয়া উচিত এবং [এই মিলন] অবশ্যই সেই পথেই হতে হবে, যা আল্লাহ এর জন্য নির্ধারণ করেছেন।
ইলা
কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন রাখা বৈধ নয়। এমনকি যদি এর জন্য কসমও খাওয়া হয়, তবে তা ভেঙে ফেলা জরুরি। এর জন্য চার মাস সময় নির্ধারিত। স্বামী বাধ্য যে, এই সময়ের মধ্যে হয় সে স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করবে, অথবা তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তাকে তালাক দেবে।
জিহার
যদি কোনো ব্যক্তি মুখ ফসকে স্ত্রীকে নিজের মায়ের সাথে, অথবা স্ত্রীর কোনো অঙ্গকে মায়ের কোনো অঙ্গের সাথে তুলনা করে, তবে এর মাধ্যমে স্ত্রী মা হয়ে যায় না এবং সেই মর্যাদা লাভ করে না, যা মায়ের প্রাপ্য। অতএব, এ ধরনের তুলনার মাধ্যমে না কারও বিবাহ ভেঙে যায়, আর না তার স্ত্রী তার জন্য মায়ের মতো হারাম হয়ে যায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তাকে কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হবে। মানুষের সামাজিক জীবনে এ ধরনের কথার প্রভাব অত্যন্ত অস্বাভাবিক হয়, এ কারণে জরুরি যে, তাকে শাস্তি দেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে সে সতর্কতা অবলম্বন করে এবং অন্যরাও এ থেকে শিক্ষা পায়। তাই আল্লাহতায়ালার ফয়সালা হলো, স্ত্রীকে স্পর্শ করার আগে স্বামীকে নিজের গুনাহের কাফফারা আদায় করতে হবে। এই কাফফারা নিম্নরূপ:
· একটি দাস বা দাসী মুক্ত করা।
· সেটা সম্ভব না হলে টানা দুই মাস রোজা রাখা।
· এটাও সম্ভব না হলে ৬০ জন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো।
তালাক
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিলমিশ না হলে নবী (আলাইহিমুস সালাম)-দের ধর্মে বিচ্ছেদের অবকাশ সবসময়ই ছিল। পারিভাষিকভাবে এটাকে ‘তালাক’ বলা হয়। এ পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে প্রত্যেকের এই ইচ্ছা থাকা উচিত যে, যে সম্পর্ক একবার স্থাপিত হয়েছে, সেটাকে যতটা সম্ভব ভেঙে যাওয়া থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা। কিন্তু সংশোধনের সম্ভাব্য সব উপায় অবলম্বনের পরেও যদি পরিস্থিতির উন্নতি না হয় এবং পরিষ্কার বোঝা যায় যে, এখন আর এই সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব নয়, তবে তালাকের আগে সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে আল্লাহতায়ালা স্বামী-স্ত্রীর গোত্র, সমাজ এবং তাদের আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন এগিয়ে আসে এবং নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে বিষয়গুলো মিমাংসার চেষ্টা করে। এর পদ্ধতি এভাবে বলা হয়েছে যে, স্বামী ও স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন করে সালিশ (বিচারক) নিযুক্ত করা হবে এবং তারা উভয় মিলে তাদের মধ্যে সমঝোতা করাবে। এতে প্রত্যাশা করা যায়, যে বিবাদ দুই পক্ষ নিজেরা মীমাংসা করতে সফল হয়নি, তা পরিবারের মুরুব্বি এবং অন্যান্য শুভাকাঙ্ক্ষী ও সহানুভূতিশীলদের হস্তক্ষেপে মিটে যাবে।
পুরুষ পরিবারের প্রধান, আবার ভরণপোষণ ও অন্যান্য খরচের দায়িত্বও তার ওপর। তাই তালাকের অধিকারও তাকেই দেওয়া হয়েছে। সুতরাং নারী যদি বিচ্ছেদ চায়, তবে সে তালাক দেবে না; বরং স্বামীর কাছে তালাকের দাবি করবে। সাধারণ অবস্থায় প্রত্যাশা এটাই যে, যেকোনো সজ্জন ব্যক্তি জীবনধারণের কোনো পথ না পেয়ে এই দাবি মেনে নেবেন; কিন্তু যদি এমনটা না হয়, তবে নারী আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে, যা স্বামীকে তালাক দেওয়ার নির্দেশ দেবে, অথবা বিবাহ বাতিলের ফয়সালা করবে।
স্বামী নিজে তালাক দিক কিংবা স্ত্রীর দাবিতে তাকে পৃথক করার ফয়সালা করুক — উভয় ক্ষেত্রেই কুরআনে যে পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, তা নিম্নরূপ:
১. তালাক ইদ্দতের বিবেচনায় দেওয়া হবে। এর অর্থ: স্ত্রীকে তৎক্ষণাৎ পৃথক করার জন্য তালাক দেওয়া বৈধ নয়। তালাক যখন দেওয়া হবে, তখন একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর পৃথক হওয়ার নিয়তে দেওয়া হবে। পারিভাষিকভাবে ‘ইদ্দত’ শব্দটি সেই মেয়াদের জন্য ব্যবহৃত হয়, যাতে স্ত্রী স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর পর অন্য কোনো ব্যক্তির সাথে বিবাহ করতে পারে না। যেহেতু এই মেয়াদ মূলত নির্ধারণই করা হয়েছে নারীর গর্ভের অবস্থা পুরোপুরি স্পষ্ট হওয়ার জন্য, তাই জরুরি হলো স্ত্রীকে ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হওয়ার পর এবং তার সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন না করেই তালাক দেওয়া।
২. ইদ্দত অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গণনা করা উচিত। তালাকের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল, এ থেকে নারী-পুরুষ এবং তাদের সন্তান ও পরিবারের জন্য অনেক আইনি সমস্যা তৈরি হয়। তাই জরুরি হলো, যখন তালাক দেওয়া হবে, তখন এর সময় ও তারিখ মনে রাখা এবং এটাও মনে রাখা যে, তালাকের সময় নারীর অবস্থা কেমন ছিল, ইদ্দত কখন শুরু হয়েছে, এটা কতদিন বহাল থাকবে এবং কবে শেষ হবে।
৩. ইদ্দত পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত স্বামীর প্রত্যাবর্তনের অধিকার রয়েছে। স্বামী যদি প্রত্যাবর্তন না করে, তবে ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শেষ হবে। সুতরাং এটা যখন সমাপ্তির পথে থাকবে, তখন স্বামীর ফয়সালা করা উচিত যে, সে স্ত্রীকে রাখবে, নাকি বিদায় করবে। উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহর হুকুম হলো: বিষয়টি ‘মারুফ’ অনুযায়ী অর্থাৎ উত্তম পন্থায় হতে হবে। এ বিষয়ে স্বয়ং কুরআনে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা হলো:
প্রথমত, স্ত্রীকে কোনো সম্পদ, সম্পত্তি, অলংকার ও পোশাকাদি ইত্যাদি — তা যত মূল্যেরই হোক না কেন — যদি উপহার হিসেবে দেওয়া হয়, তবে তা ফিরিয়ে নেওয়া বৈধ নয়। ভরণপোষণ এবং মোহরানা নারীর অধিকার, সেগুলো ফেরত নেওয়া বা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এগুলি ছাড়া যা কিছু দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারেও কুরআনের নির্দেশ হচ্ছে: সেগুলো কখনো ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। তবে দুটি অবস্থা এর ব্যতিক্রম:
এক — স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে খোদায়ি সীমারেখা অনুযায়ী মিলমিশ সম্ভব না হয়, সমাজের দায়িত্বশীলরাও যদি সেটাই অনুভব করেন, কিন্তু স্বামী কেবল এ কারণে তালাক দিতে রাজি না হয় যে, তার দেওয়া সম্পদগুলোও এর সাথে চলে যাবে — তবে স্ত্রী এই সম্পদ বা এর কিছু অংশ ফেরত দিয়ে স্বামীর কাছ থেকে তালাক নিতে পারে। যদি কখনো এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তবে স্বামীর জন্য তা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ নয়।
দুই — স্ত্রী যদি প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। এতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তিই ধসে পড়ে, তাই স্বামীর জন্য বৈধ যে, এই অবস্থায় সে নিজের দেওয়া সম্পদ স্ত্রীর কাছ থেকে ফিরিয়ে নেবে।
দ্বিতীয়ত, স্ত্রীকে স্পর্শ করার আগে বা তার মোহরানা নির্ধারিত হওয়ার আগে তালাক দেওয়া হলে মোহরানার বিষয়ে স্বামীর কোনো দায়িত্ব নেই। কিন্তু মোহরানা নির্ধারিত হলে এবং স্পর্শ করার আগে তালাক দেওয়ার উপক্রম হলে নির্ধারিত মোহরানার অর্ধেক আদায় করতে হবে; যদি না নারী নিজের ইচ্ছায় পুরোটা ছেড়ে দেয় অথবা পুরুষ পুরোটা আদায় করে।
তৃতীয়ত, স্ত্রীকে জীবনযাপনের কিছু আসবাবপত্র দিয়ে বিদায় করা। কুরআন এটাকে আল্লাহভীরু এবং ইহসান অবলম্বনকারীদের ওপর একটি হক বা অধিকার হিসেবে গণ্য করেছে। এর পরিমাণ সমাজের রীতি এবং পুরুষের আর্থিক অবস্থার নিরিখে নির্ধারিত হবে। তালাক যদি নারীকে স্পর্শ না করে বা মোহরানা নির্ধারণ না করে দেওয়া হয়, তবুও আল্লাহতায়ালার ইরশাদ হলো: এই হক আদায় করা উচিত।
৪. ইদ্দত চলাকালীন স্বামী যদি প্রত্যাবর্তন করে, তবে নারী যথারীতি তার স্ত্রী হিসেবে গণ্য হবে। তালাক এবং তালাকের পর প্রত্যাবর্তনের এই অধিকার প্রতিটি ব্যক্তির জন্য একটি বিবাহের সম্পর্কে দুইবার পর্যন্ত রয়েছে। এর পরে এই অধিকার অবশিষ্ট থাকে না। সুতরাং একটি বিবাহের সম্পর্কে দুইবার প্রত্যাবর্তনের পর তৃতীয়বার আবার যদি বিচ্ছেদের উপক্রম হয় এবং স্বামী তালাক দেয়, তবে এর ফলে নারী চিরতরে তার থেকে পৃথক হয়ে যাবে; যদি না অন্য কোনো ব্যক্তির সাথে তার বিবাহ হয় এবং সেও তাকে তালাক দেয়।
৫. স্বামী তালাক দিক বা প্রত্যাবর্তন করুক — উভয় ক্ষেত্রেই তার উচিত নিজের এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে দুইজন বিশ্বস্ত মুসলমানকে সাক্ষী রাখা। এর উদ্দেশ্য: দুই পক্ষের কেউ যেন পরবর্তীতে কোনো কথা অস্বীকার করতে না পারে এবং যদি কোনো বিবাদ সৃষ্টি হয়, তবে তার ফয়সালা যেন সহজে হয়।
৬. তালাকের ইদ্দত সাধারণ অবস্থায় তিন ঋতুকাল এবং গর্ভবতী হওয়ার ক্ষেত্রে সন্তান প্রসব পর্যন্ত। নারী যদি ঋতুস্রাব থেকে নিরাশ হয় অথবা ঋতুর বয়সে পৌঁছানো সত্ত্বেও তার ঋতুস্রাব না হয়, তবে এই ইদ্দত তিন মাস হবে। নারী যদি অস্পর্শিতা হয় [অর্থাৎ যার সাথে সহবাস করা হয়নি], তবে তার যেহেতু গর্ভধারণের প্রশ্নই ওঠে না, তাই তার কোনো ইদ্দতও নেই।
ইদ্দতের সময়কাল সম্পর্কিত যে বিধানগুলো কুরআনে বলা হয়েছে, তা হলো:
প্রথমত, নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, এ সময়ে না স্ত্রী নিজের ঘর ছাড়বে এবং না স্বামীর অধিকার আছে যে, সে তাকে ঘর থেকে বের করে দেবে। এভাবে একত্রে থাকার ফলে প্রত্যাশা করা যায় যে, অন্তরে পরিবর্তন আসবে, উভয়ে নিজেদের আচরণ পর্যালোচনা করবে এবং তাদের ভেঙে যাওয়া ঘর পুনরায় শান্ত হবে। ঐ অবস্থা এর ব্যতিক্রম, যখন পুরুষ নারীকে কোনো প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হওয়ার কারণে তালাক দেয়। এই অবস্থায় স্পষ্টত স্বামীর কাছে এমন দাবি করা বৈধ নয় যে, সে এমন নারীকে ঘরে রাখবে। আর যে উদ্দেশ্যে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তা-ও এ ক্ষেত্রে অর্জিত হতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, বলা হয়েছে যে, ইদ্দত চলাকালীন সময়ে সে নারীকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বসবাসের জায়গা এবং ভরণপোষণ প্রদান করবে এবং এই সময়ে এমন কোনো পথ অবলম্বন করবে না যাতে তার আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় এবং সে কয়েক দিনের মধ্যে অতিষ্ঠ হয়ে তার ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়।
তৃতীয়ত, ইদ্দতের সময়ে নারী নিজের গর্ভ গোপন করার চেষ্টা করবে না। আল্লাহতায়ালা অত্যন্ত কঠোরভাবে এ বিষয়ের তাগিদ দিয়েছেন; কারণ ইদ্দতের হুকুম দেওয়াই হয়েছে এ জন্য যে, নারী গর্ভবতী কি না — তার ফয়সালা হয়।
৭. তালাকের পরেও যদি তালাকদাতা স্বামী চায় যে, নারী তার শিশুকে দুধ পান করাবে, তবে তার উচিত দুই বছর পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করা। নারী এর জন্য রাজি থাকলে পুরুষ তাকে এই সেবার পারিশ্রমিক প্রদান করবে এবং এই পারিশ্রমিক পারস্পরিক পরামর্শে ও উত্তম পন্থায় নির্ধারিত হবে। শিশুর পিতা মৃত্যুবরণ করলে উল্লিখিত দায়িত্ব ও অধিকারের ক্ষেত্রে তার উত্তরাধিকারীর অবস্থানও ঠিক তাই হবে। দুই পক্ষ এই মেয়াদ কমও করতে পারে এবং শিশুর পিতা বা তার উত্তরাধিকারী মায়ের বদলে অন্য কোনো নারীকে দিয়ে দুধ পান করাতে চাইলে তারও অনুমতি আছে — তবে শর্ত এই যে, যদি শিশুর মায়ের সাথে পাওনা পরিশোধের যে চুক্তি হয়েছে, তা পূর্ণ করা হয়।
৮. তালাকের পর নারীর কোনো সিদ্ধান্তে বাধা দেওয়ার অধিকার পূর্বের স্বামীর আর থাকে না। নারী যখন চাইবে এবং যেখানে চাইবে বিয়ে করতে পারে। তার এই সিদ্ধান্ত যদি সামাজিক রীতি অনুযায়ী হয়, তবে এতে কোনো আপত্তির অবকাশ থাকতে পারে না।
স্বামীর মৃত্যু
বিধবার ইদ্দত চার মাস দশ দিন। সাধারণ তালাকপ্রাপ্ত নারীর তুলনায় এই বৃদ্ধি এ কারণে হয়েছে যে, তাকে এমন পবিত্র অবস্থায় তালাক দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে স্বামীর সাথে তার মিলন হয়নি; কিন্তু বিধবার জন্য এ ধরনের কোনো নিয়ম বানানো যেহেতু সম্ভব নয়, তাই সতর্কতার দাবি ছিল যে, দিন বাড়িয়ে দেওয়া হোক।
তালাকপ্রাপ্তা ও বিধবার জন্য ইদ্দতের বিধান যেহেতু একই উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে, তাই তালাকের ক্ষেত্রে যেসব ব্যতিক্রমের কথা বর্ণিত হয়েছে, বিধবার ইদ্দতের ক্ষেত্রেও সেগুলো একইভাবে গণ্য হবে। সুতরাং অস্পর্শিতা [অর্থাৎ অবিবাহিত অবস্থায় স্বামী মারা যাওয়া] বিধবার জন্য কোনো ইদ্দত থাকবে না এবং গর্ভবতী বিধবার ইদ্দত সন্তান প্রসবের পর শেষ হবে।
ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর নারী স্বাধীন এবং নিজের বিষয়ে যে পদক্ষেপ উপযুক্ত মনে করবে, তা গ্রহণ করতে পারে। তবে সমাজের রীতিনীতি মানা তার উচিত — অর্থাৎ এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যাতে পরিবারগুলোর ইজ্জত, খ্যাতি, মর্যাদা এবং ভালো রেওয়াজ-রীতির ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এটা খেয়াল রাখা হলে তার বা তার অভিভাবকদের ব্যাপারে কোনো দোষারোপ করা যায় না।
যদি কোনো ব্যক্তি কোনো বিধবাকে বিবাহ করতে চায়, তবে ইদ্দত চলাকালীন সময়ে সে এতটুকু করতে পারে যে, নিজের মনে এই ইচ্ছা স্থির করবে বা ইশারা-ইঙ্গিতে মুখে কোনো কথা বলবে; কিন্তু তার জন্য কখনো বৈধ নয় যে, কোনো শোকাহত পরিবারের আবেগের খেয়াল না রেখে নারীর কাছে বিবাহের প্রস্তাব পাঠাবে অথবা কোনো গোপন অঙ্গীকার করবে।
স্বামীদের জন্য জরুরি যে, তারা তাদের বিধবা স্ত্রীদের জন্য এক বছরের ভরণপোষণ এবং নিজেদের ঘরে বসবাসের ওসিয়ত করে যাবেন; যদি না তারা নিজেরাই নিজেদের ইচ্ছায় স্বামীর ঘর ছেড়ে দেয় বা এই জাতীয় অন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়।
নারী ও পুরুষের মেলামেশা
বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্তরের পবিত্রতা বজায় রাখার জন্য আল্লাহতায়ালা নারী ও পুরুষের মেলামেশার কিছু আদব বা শিষ্টাচার নির্ধারণ করেছেন। এই আদবগুলো নিম্নরূপ:
১. একে অপরের বাড়িতে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে হুট করে এবং অনুমতি ছাড়া ভিতরে প্রবেশ করা জায়েজ নয়। এ ধরনের অবস্থায় জরুরি হচ্ছে, ব্যক্তি প্রথমে ঘরের লোকদের কাছে নিজের পরিচয় দেবে; যার মার্জিত ও ভদ্রোচিত পদ্ধতি হলো: দরজায় দাঁড়িয়ে সালাম দেওয়া। এতে ঘরের লোকেরা জানতে পারবে যে, আগন্তুক কে, সে কী চায় এবং তার ঘরে প্রবেশ করা সমীচীন কি না। এরপর তারা যদি সালামের উত্তর দেয় এবং অনুমতি মেলে, তবেই ঘরে প্রবেশ করবে। অনুমতি দেওয়ার মতো ঘরে কেউ না থাকলে, অথবা কেউ থাকা সত্ত্বেও তার পক্ষ থেকে বলে দেওয়া হয় যে, এই মুহূর্তে দেখা করা সম্ভব নয়, তবে মনে কোনো সংকীর্ণতা অনুভব না করে ফিরে যাবে।
এর উদ্দেশ্য আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের সাহচর্য থেকে বঞ্চিত করা বা তাদের সামাজিক স্বাধীনতায় বিধি-নিষেধ আরোপ করা নয়। তাই মানুষ নিজে হোক বা তাদের অসহায় ও অক্ষম আত্মীয়-পরিজন, যারা তাদের বাড়িতে চলাফেরা করে, তাদের জন্য একে অপরের বাড়িতে আসা-যাওয়া, দেখা-সাক্ষাৎ এবং নারী-পুরুষের আলাদাভাবে বা একত্রে বসে পানাহার করায় কোনো বাধা নেই। না তাদের নিজেদের ঘরে কোনো বাধা আছে, না বাপ-দাদার ঘরে, না মায়েদের ঘরে, না ভাই ও বোনদের ঘরে, না চাচা, ফুফু, মামা ও খালাদের ঘরে, না তত্ত্বাবধানাধীন ব্যক্তিদের ঘরে এবং না বন্ধুদের ঘরে। তবে এতটুকু জরুরি যে, ঘরে প্রবেশের সময় আপনজনদের সালাম করবে।
২. যেসব জায়গায় মানুষের স্ত্রী-সন্তান বসবাস করে না, সেসব স্থানের জন্য এই বিধিনিষেধ জরুরি নয়। অর্থাৎ হোটেল, সরাইখানা, মেহমানখানা, দোকান, অফিস, বৈঠকখানা ইত্যাদি। একইভাবে বাড়িতে যাতায়াতকারী খাদেম এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের জন্য সবসময় অনুমতি নেওয়া জরুরি নয়। তাদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, তারা তিনটি সময়ে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করবে:
· ফজর নামাজের আগে, যখন মানুষ বিছানায় থাকে।
· জোহরের সময়, যখন তারা বিশ্রামের জন্য পোশাক খুলে রাখে এবং
· এশার পর, যখন তারা ঘুমানোর জন্য বিছানায় চলে যায়।
এগুলো ছাড়া অন্য সময়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু এবং ঘরের খাদেমরা নারী ও পুরুষদের কাছে তাদের একান্ত যাপনের জায়গায় এবং তাদের কামরায় অনুমতি ছাড়া আসতে পারে। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর এই সুযোগ আর থাকবে না। সাবালক হওয়ার পর তাদের জন্যও জরুরি হবে যে, সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করা।
৩. এসব স্থানে যদি নারীরা উপস্থিত থাকে, তবে আল্লাহর হুকুম হচ্ছে: পুরুষরাও যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নারীরাও [যেন দৃষ্টি সংযত রাখে]। দৃষ্টিতে লজ্জা থাকবে এবং পুরুষ-নারী একে অপরের রূপ-সৌন্দর্য উপভোগ করা, অবয়ব পর্যবেক্ষণ করা এবং একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকা থেকে বিরত থাকবে — তবেই এই হুকুমের উদ্দেশ্য নিশ্চয় পূর্ণ হবে। কারণ, এর লক্ষ্য না-তাকানো বা সবসময় নিচের দিকে তাকিয়ে থাকা নয়, বরং লোলুপ দৃষ্টিতে না তাকানো এবং দৃষ্টিকে দেখার জন্য একেবারে অবাধ ছেড়ে না দেওয়া।
৪. এ ধরনের ক্ষেত্রে লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে হবে। এর অর্থ হলো — না সেগুলোর প্রতি অন্যদের কোনো আসক্তি থাকবে, আর না সেগুলো অন্যদের সামনে উন্মুক্ত করা হবে। বরং নারী ও পুরুষ এক জায়গায় উপস্থিত থাকলে গোপনাঙ্গগুলো আরও বেশি গুরুত্বের সাথে ঢেকে রাখতে হবে। এতে স্পষ্টতই বড় ভূমিকা পালন করে পোশাকের পরিচ্ছন্নতা ও শালীনতা। নারী ও পুরুষ উভয়েই এমন পোশাক পরবে, যা সৌন্দর্যের সাথে সাথে গোপনাঙ্গগুলোকেও পুরোপুরি আবৃত করে। এরপর সাক্ষাতের সময় এই খেয়াল রাখতে হবে যে, ওঠা-বসায় কোনো ব্যক্তি যেন উলঙ্গ না হয়।
৫. নারীদের জন্য বিশেষভাবে জরুরি যে, তারা সাজসজ্জার কোনো কিছু নিজেদের মাহরাম আত্মীয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও সামনে প্রকাশ করবে না। তবে সৌন্দর্যের ঐসব বিষয় এর ব্যতিক্রম, যা সাধারণত প্রকাশ থাকে; অর্থাৎ হাত-পা এবং চেহারার সাজগোজ ও অলংকার ইত্যাদি। এই অঙ্গগুলো ছাড়া বাকি সব জায়গার সৌন্দর্য নারীদের ঢেকে রাখা উচিত; এমনকি পুরুষদের উপস্থিতিতে নিজের পা জমিনে জোরে আঘাত করে হাঁটা থেকেও বিরত থাকা উচিত — যাতে তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ না হয়।
৬. নারীর বুক যেহেতু সংবেদনশীল অঙ্গ, আবার গলায় অলংকারও থাকে, তাই এ ধরনের ক্ষেত্রে একে ওড়না দিয়ে ঢেকে নেওয়া উচিত। বুক ও গ্রীবা ঢেকে রাখার এই হুকুম সেই বৃদ্ধাদের জন্য নয়, যারা আর বিবাহের আশা রাখে না; শর্ত হলো: তারা যেন সৌন্দর্য প্রদর্শনকারিণী না হয়। তবুও তাদের জন্যও পছন্দনীয় বিষয় হলো: সতর্কতা অবলম্বন করা এবং পুরুষদের উপস্থিতিতে ওড়না না খোলা। এটাই তাদের জন্য উত্তম।
পিতামাতা
বিবাহের মাধ্যমে যে সম্পর্কগুলো তৈরি হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হলো পিতামাতার। তাদের সাথে সদ্ব্যবহারের শিক্ষা সকল আসমানি কিতাবে দেওয়া হয়েছে। এর যেসব সীমা কুরআন নির্ধারণ করেছে, তা নিম্নরূপ:
১. নিজের প্রতিপালকের পর মানুষের উচিত সবচেয়ে বেশি নিজের মা-বাবার কৃতজ্ঞ হওয়া। এই কৃতজ্ঞতা কেবল মুখে আদায়ের বিষয় নয়, এর আবশ্যিক দাবি হলো: ব্যক্তি তাদের সাথে অত্যন্ত সম্মানের সাথে আচরণ করবে, তাদের বিরুদ্ধে মনে কোনো অসন্তোষ দানা বাধতে দেবে না, তাদের সামনে বেয়াদবিমূলক কোনো কথা মুখ দিয়ে বের করবে না, বরং কোমলতা, ভালোবাসা, উদারতা ও আনুগত্যের পথ অবলম্বন করবে। তাদের কথা মেনে চলবে এবং বার্ধক্যের অসহায়ত্বে তাদের প্রতি মমতা ও সান্ত্বনা প্রদান করবে।
২. পিতামাতার এই মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও এই অধিকার তাদের নেই যে, তারা কাউকে আল্লাহতায়ালার শরিক করার জন্য সন্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। এই বিষয়ে সন্তানদের উচিত তাদের আনুগত্য স্পষ্টভাবে অস্বীকার করা এবং সর্বাবস্থায় সেসব মানুষের পথ অনুসরণ করা, যারা খোদাতায়ালার দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। খোদাতায়ালা থেকে বিমুখ হওয়ার দাওয়াত পিতামাতা দিলেও তা গ্রহণ করা যাবে না। আল্লাহতায়ালার অন্যান্য আদেশ ও নির্দেশও এর অধীনেই গণ্য হবে এবং পিতামাতার কথায় সেগুলোর লঙ্ঘন করা কারও জন্য জায়েজ হবে না।
৩. শিরকের মতো গুনাহতে অটল থাকা সত্ত্বেও দুনিয়ার বিষয়ে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নীতি প্রথা অনুযায়ী একইভাবে বজায় রাখতে হবে। তাদের প্রয়োজন যথাসাধ্য পূরণের চেষ্টা করতে হবে এবং তাদের জন্য হেদায়েতের দোয়াও সমানভাবে জারি রাখতে হবে। ধর্ম ও শরিয়তের বিষয় আলাদা; কিন্তু এ জাতীয় বিষয়ে সন্তানের পক্ষ থেকে কোনোভাবেই কোনো ত্রুটি হওয়া উচিত নয়।
এতিম
শিশুরা যদি পিতৃহীন হয়, তবে তাদের বিষয়াবলী নিয়ে কুরআন কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। এগুলোর সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ:
১. এতিমদের অভিভাবকরা তাদের সম্পদ তাদের হাতে তুলে দেবে, তা নিজেরা আত্মসাৎ করার চেষ্টা করবে না। অন্যায় ও অবিচারের মাধ্যমে এতিমের সম্পদ গ্রাস করা মানে নিজের পেটে আগুন ভরা। তাই কোনো ব্যক্তি যেন নিজের খারাপ মাল এতিমদের ভালো মালের সাথে বদলে নেওয়ার চেষ্টা না করে এবং প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাতে সেটাকে নিজের মালের সাথে মিশিয়ে খাওয়ার সুযোগ তৈরি না করে। এ ধরনের সংমিশ্রণ যদি কখনো করা হয়, তবে তা আত্মসাতের জন্য নয় বরং তাদের কল্যাণ ও তাদের বিষয়াদি সংশোধনের জন্য হওয়া উচিত।
২. এতিমদের মালের হেফাজত এবং তাদের অধিকার রক্ষা করা একটি বড় দায়িত্ব। মানুষের জন্য একা এই দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয় এবং তারা যদি মনে করে যে, এতিমের মাকে এটার সাথে যুক্ত করে তারা নিজেদের জন্য সুবিধা তৈরি করতে পারবে — তবে তাদের উচিত তাদের মায়েদের মধ্য থেকে যারা তাদের জন্য বৈধ, তাদের মধ্য থেকে দুই, তিন বা চারজনকে বিবাহ করা। কিন্তু এই অনুমতি কেবল তখনই, যখন স্ত্রীদের মধ্যে ইনসাফ বজায় রাখা সম্ভব হবে। যদি এই আশঙ্কা থাকে যে, তারা এতে সফল হবে না, তবে এতিমদের কল্যাণের মতো নেক উদ্দেশ্যের কারণেও একের অধিক বিবাহ করবে না। ইনসাফের ওপর অটল থাকার জন্য এই পদ্ধতিই অধিক সঠিক। এর সাথে এটাও জরুরি যে, এই নারীদের মোহরানা সেই পদ্ধতিতেই দিতে হবে, যেভাবে সাধারণ নারীদের দেওয়া হয়। এই অজুহাত দেখানো যাবে না যে, বিবাহ যেহেতু তাদেরই সন্তানের উপকারে করা হয়েছে, তাই এখন আর কোনো দায়িত্ব অবশিষ্ট নেই। হ্যাঁ, যদি তারা নিজেদের খুশিতে মোহরানার কোনো অংশ মাফ করে দেয়, বা অন্য কোনো ছাড় দেয়, তবে তাতে অসুবিধা নেই। মানুষ চাইলে তা গ্রহণ করতে পারে।
৩. এতিমদের মাল তাদের হাতে বুঝিয়ে দেওয়ার যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা তখনই কার্যকর করা হবে, যখন তারা নিজেদের মাল সামলে নেওয়ার বয়সে পৌঁছাবে। এর আগে জরুরি হলো যে, এটা অভিভাবকদের হেফাজত ও নজরদারিতে থাকবে এবং তারা এতিমদের যাচাই করতে থাকবে — তাদের মধ্যে বিষয়গুলো বোঝার বোধ-বুদ্ধি এবং নিজের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে কি না। এই সময়ে তাদের প্রয়োজনগুলো অবশ্য সচ্ছলতার সাথে পূরণ করা হবে। তারা বড় হবে — এই আশঙ্কায় তাদের মাল দ্রুত উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা যাবে না; এবং কথাবার্তায় তাদের প্রতি মমতা ও সান্ত্বনার বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে।
৪. অভিভাবক যদি সচ্ছল হয়, তবে নিজের এই সেবার বিনিময়ে তার কিছু নেওয়া উচিত নয়; কিন্তু গরিব হলে এতিমের মাল থেকে নিজের সেবার পারিশ্রমিকের নিয়ম অনুযায়ী গ্রহণ করতে পারে।
৫. মাল বুঝিয়ে দেওয়ার সময় কিছু বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখা উচিত — যাতে কোনো কুধারণা এবং মতভেদ বা বিবাদের সম্ভাবনা না থাকে। এরপর মনে রাখা উচিত যে, একদিন এই হিসাব আল্লাহতায়ালার কাছেও দিতে হবে এবং তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ, তাঁর থেকে কোনো কিছু গোপন করা যায় না।
৬. মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে ওয়ারিসদের অংশ যদিও নির্ধারিত, কিন্তু উত্তরাধিকার বণ্টনের সময় নিকটাত্মীয় এবং এতিম ও মিসকিনরা উপস্থিত হলে — আইনি দিক থেকে তাদের কোনো অধিকার আছে কি না, তা বিবেচনা না করেই — তাদের কিছু দিয়ে এবং ভালো কথা বলে বিদায় করতে হবে। এ ধরনের ক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষের মনে রাখা উচিত যে, তার সন্তানরাও এতিম হতে পারে এবং সেও একইভাবে তাদেরকে অন্যদের করুণার মুখাপেক্ষী রেখে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারে।
